কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ, বিকল্পের খোঁজে ছুটছে বাংলাদেশ
কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান–কাতারএনার্জি দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তিতে 'ফোর্স মাজ্যুর' ঘোষণা করায় আগামী কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানায় জ্বালানি সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় সংস্থা পেট্রোবাংলা ক্রমেই অস্থির হয়ে ওঠা বৈশ্বিক বাজারে উচ্চমূল্যে স্পট কার্গো সংগ্রহের চেষ্টা শুরু করেছে।
বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি উৎপাদক এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী কাতারএনার্জি চলতি সপ্তাহে ইরানের হামলার পর উৎপাদন স্থগিত করে। এই প্রেক্ষাপটে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি ক্রয়ের নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে দেশব্যাপী জ্বালানি সংকট এড়ানো যায়।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, মার্চ মাসে সরবরাহের জন্য অন্তত চারটি স্পট কার্গো সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কাতারএনার্জির 'ফোর্স মাজ্যুর' নোটিশ
২ মার্চ কাতারএনার্জি চুক্তির ধারা ১৭ অনুযায়ী "সম্ভাব্য ফোর্স মাজ্যুর পরিস্থিতি" (বা নিয়ন্ত্রণের বাইরের পরিস্থিতি) উল্লেখ করে পেট্রোবাংলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেয়। এতে "অঞ্চলটিতে সাম্প্রতিক সংঘাতমূলক পরিস্থিতি"র কথা বলা হয়। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক চিঠি পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে জানান, বিকল্প বা জরুরি ব্যবস্থা ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হচ্ছে।
চুক্তি অনুযায়ী, চলতি বছরে বাংলাদেশের নির্ধারিত ১১৫টি এলএনজি কার্গোর মধ্যে ৪০টি সরবরাহ করার কথা ছিল কাতারএনার্জির। সেই সরবরাহ এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার উৎপাদন, রপ্তানি কার্যক্রম ও দৈনন্দিন জনজীবনে ব্যাপক গ্যাস সংকটের আশঙ্কা করছে পেট্রোবাংলা।
দীর্ঘমেয়াদি অন্য সরবরাহকারীদের মধ্যে কাতারএনার্জি ট্রেডিং এলএলসি, ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেড এবং এক্সেলারেট গ্যাস মার্কেটিং লিমিটেড-এর সরবরাহেও প্রভাব পড়তে পারে, কারণ তারাও কাতারের সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। যদিও ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলো সীমিত পরিসরে বিকল্প উৎস থেকে সংগ্রহের সুযোগ পেতে পারে।
ফোর্স মাজ্যুর ধারা অনুযায়ী প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ বা মহামারির মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা পরিস্থিতিতে চুক্তির বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
কাতারএনার্জি বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত এলএনজির প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ করে থাকে।
বিকল্পের খোঁজে দৌড়ঝাঁপ
নীতিনির্ধারকরা সতর্ক করে বলেছেন, এত বড় সরবরাহকারীর থেকে জোগান বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক সরবরাহ সংকোচনের পরিস্থিতিতে অন্য উৎস থেকে কার্গো সংগ্রহও ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়বে।
কাতারএনার্জির চিঠিতে বলা হয়, "বিক্রেতা এখনও পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছে; তবে এসব (যুদ্ধ) পরিস্থিতি চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ বাধ্যবাধকতা পালনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে—এ তথ্য ক্রেতাকে জানানো জরুরি বলে মনে করছে।"
এতে আরও বলা হয়, "পরিস্থিতির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আমরা আপনাদের হালনাগাদ জানাব এবং তথ্য পাওয়া মাত্র তা সরবরাহ করব।"
চিঠি পাওয়ার পরপরই পেট্রোবাংলা কাতারএনার্জিকে জবাব দিয়ে জানতে চায় সরবরাহ অব্যাহত থাকবে কি না, কারণ চিঠিতে "মে প্রিভেন্ট" বা "বাধা সৃষ্টি করতে পারে" শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে—যা অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এর আগেই ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় এলএনজি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছিল। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বিশ্ববাজারে পরিবহন করা হয়।
পেট্রোবাংলার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি মার্চে সাতটি এলএনজি কার্গো দেশে পৌঁছানোর কথা—এর মধ্যে ছয়টি কাতারএনার্জির, যা হরমুজ প্রণালি হয়ে আসার কথা, অন্য একটি আসবে অ্যাঙ্গোলা থেকে।
পেট্রোবাংলা ইতোমধ্যে কাতারএনার্জির চারটি কার্গো নিশ্চিত করেছে, তবে দুটি এখনো অনিশ্চিত।
এরফানুল হক বলেন, "আমরা কাতারএনার্জিকে চিঠি দিয়েছি, তারা সরবরাহ করতে পারবে কিনা তা আজকের (৩ মার্চ) মধ্যে নিশ্চিত করতে।"
বিকল্প পরিকল্পনা সক্রিয়
দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পেট্রোবাংলা বিকল্প পরিকল্পনা সক্রিয় করেছে এবং সোমবার তার তালিকাভুক্ত সরবরাহকারীদের কাছে ১৫ ও ১৮ মার্চ ডেলিভারির জন্য কোটেশন আহ্বান করেছে। এ দুটি সময়সূচিতে মূলত কাতারএনার্জির কার্গো আসার কথা ছিল, যা ফোর্স মাজ্যুর ঘোষণার পর অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
সংস্থাটির চেয়ারম্যান জানান, কাতারের সরবরাহ নির্ভরতার কারণে অন্যান্য সরবরাহকারীরা তাদের চুক্তি রক্ষা করতে পারবে কি না, সে বিষয়েও তাদের সঙ্গে পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে।
সরবরাহ ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে তেল-গ্যাস সরবরাহ শৃঙ্খল ইতোমধ্যেই নাজুক হয়ে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুদ্ধ আরও চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে—যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের আলোড়ন তোলে এবং তেল-গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দেয়।
অন্যদিকে ইরানের পূর্ণ অবরোধে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ আটকে পড়েছে, ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতা আরও বেড়েছে।
জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংঘাত অব্যাহত থাকলে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে বাংলাদেশকে বাধ্য হয়ে স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে হবে।
এরফানুল হক বলেন, "সরকার থেকে স্পট মার্কেটসহ বিকল্প উৎস সন্ধানের সবুজ সংকেত পেয়েছি। তবে কাতারএনার্জির মতো বৈশ্বিক জায়ান্ট উৎপাদন বন্ধ করায় প্রাপ্যতাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।"
দাম বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় সৃষ্ট শূন্যতা পূরণে পেট্রোবাংলাকে যত দ্রুত সম্ভব স্পট কার্গো সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।
উত্তেজনা বৃদ্ধির আগে স্পট এলএনজি প্রতি এমএমবিটিইউ ৯ ডলারের নিচে লেনদেন হচ্ছিল। সোমবার এশীয় স্পট এলএনজি সূচক—জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৩৬৫ ডলারে।
দাম আরও বাড়লে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।
দীর্ঘমেয়াদি উচ্চমূল্য পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে—এ প্রশ্নে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান সতর্ক আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, "আশা করি যুদ্ধ মাসের পর মাস চলবে না। সরবরাহ সচল রাখতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আনতেই হবে। নাহলে সব খাতে গ্যাস সরবরাহ কমানো ছাড়া উপায় থাকবে না।"
এপ্রিলের সরবরাহও অনিশ্চিত
নীতিনির্ধারকরা এখন এপ্রিল মাস নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। চলমান সংকটের ধারাবাহিক প্রভাব পড়ার মাসের চালানেও পড়তে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।
ভূরাজনৈতিক জটিলতা ও কাতারএনার্জির উৎপাদন বন্ধের প্রভাবের কারণে সরবরাহ শৃঙ্খল আরও নাজুক হয়ে পড়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান বলেন, ইতোমধ্যেই কার্গোর বিষয়ে নিশ্চয়তা চেয়ে এপ্রিলের সব সরবরাহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, "আমরা এপ্রিলের সরবরাহকারীদের চিঠি দিয়ে আগামী মাসের সরবরাহ বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে বলেছি। ১০ এপ্রিল পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।"
তাদের জবাবের ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে বলে জানান তিনি। "প্রয়োজনে স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত এলএনজি সংগ্রহের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে"- জানান তিনি।
মার্চ পেরিয়ে অনিশ্চয়তা এখন এপ্রিল পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় জ্বালানি কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, সময়মতো নিশ্চয়তা না পেলে গ্যাস সরবরাহ সচল রাখতে বাংলাদেশকে উচ্চমূল্যের স্পট কার্গোর ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হবে।
