নতুন বাণিজ্য চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য পারস্পরিক শুল্কের হার কমিয়ে ১৯% করল যুক্তরাষ্ট্র
বাংলাদেশের ওপর আরোপিত রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পারস্পরিক শুল্কহার কমিয়ে ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করে বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ সময় রাতে ওয়াশিংটনে চুক্তি স্বাক্ষরের পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চতর পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা টিবিএসকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সোমবার রাতে বাণিজ্য মাহবুবুর রহমান টিবিএসকে বলেন, বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় বাণিজ্য চুক্তিতে নিজ নিজ দেশের পক্ষে স্বাক্ষর করেন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) জেমিসন গ্রিয়ার এবং বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।
সংশোধিত এই শুল্কহার যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রধান তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রেখেছে। বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের ওপর পাল্টা শুল্ক নির্ধারিত হয়েছে ২০ শতাংশ, আর ভারত পেয়েছে বাংলাদেশের চেয়ে ১ শতাংশ কম—১৮ শতাংশ। পাকিস্তান, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রেও ১৯ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি তৈরি পোশাক রপ্তানি করে চীন, এরপরই রয়েছে ভিয়েতনাম। এরপরই বাংলাদেশ তৃতীয় আর ভারত রয়েছে চতুর্থ স্থানে।
গত বছরের আগস্ট থেকে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ পারস্পরিক এই শুল্ক আরোপ করে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। এতে রপ্তানিতে চাপ তৈরি হলে শুল্ক কমাতে আলোচনা শুরু করে ঢাকা। নীতিনির্ধারকেরা আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, শুল্কহার ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা যেতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি।
বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পারস্পরিক শুল্কের হার (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) ১৫ শতাংশ না হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাণিজ্যসচিব বলেন, প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলের কোনো দেশের রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ কমিয়ে ১৫ শতাংশ করেনি। তাছাড়া, ভারতের সঙ্গে চূড়ান্ত হওয়া বাণিজ্য চুক্তির কিছুটা প্রভাবও বাংলাদেশের ওপর পড়েছে, যেখানে ভূরাজনৈতিক বিবেচনা থাকতে পারে, যার প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়তে পারে।
এপ্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের সাবেক মহাপরিচালক মো. হাফিজুর রহমান টিবিএসকে বলেন, ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করার ক্ষেত্রে নমনীয় হয়। সে কারণে ভারত রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ রেট নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাড়তি কিছু সুবিধা পেয়েছে।
তবে তিনি বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের কারণ দেখছেন না। তিনি বলেন, "ভারতের জন্য রেসিপ্রোকাল শুল্কহার ১৮% হলেও—যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারতের তৈরি পোশাকের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা করতে কোন সমস্যা হবে না। বাংলাদেশে শ্রমিকের মজুরি হার কম হওয়ার কারণে ভারতের চেয়ে উৎপাদন খরচ কম হওয়ায়, বাংলাদেশের ওপর ১৯ শতাংশ শুল্ক আরোপ হলেও তাতে রপ্তানিতে কোন সমস্যা হবে না।"
শুল্ক ছাড়ের পাশাপাশি চুক্তিতে আরও কয়েকটি বাণিজ্য ও কৌশলগত অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা ব্যবহার করে বাংলাদেশে উৎপাদিত পোশাকের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে যুক্তরাষ্ট্র, যা উভয় দেশের টেক্সটাইল সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য লাভজনক হতে পারে।
বাণিজ্য উপদেষ্টা জানান, বাণিজ্য উত্তেজনা কমানোর বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে হিসাব দিয়েছেন তিনি।
এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাড়তি দামে তুলা, গম, সয়াবিন, এলএনজিসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানির বিষয়ও স্থান পেয়েছে চুক্তিতে। এছাড়া, ই-কমার্সে ট্যারিফ আরোপ না করা, যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত অনুযায়ী ইন্টেলেকচুয়াল মেধাস্বত্ব অধিকার (আইপি) মেনে চলা এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) সংস্কারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে সমর্থন দিতে হবে বাংলাদেশকে।
চুক্তির বিষয়ে আজ একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে জনসমক্ষে বিস্তারিত তুলে ধরবে সরকার।
