ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় মার্কিন অর্থনীতিতে আস্থার চরম ধস প্রকাশ পেল জরিপে
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ক্রমাগত বাড়তে থাকায় মাত্র ১৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে "ভালো" বা "চমৎকার" বলে মনে করছেন। খ্যাতনামা জরিপ সংস্থা– গ্যালাপের নতুন এক সমীক্ষায় এই নজিরবিহীন চিত্র উঠে এসেছে।
গত শুক্রবার প্রকাশিত এই জরিপটি আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করল। এই নির্বাচনের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি মার্কিন পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ বা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে কি না।
'গ্যালাপস ইকোনমিক কনফিডেন্স ইনডেক্স' (অর্থনৈতিক আস্থা সূচক) নামের এই সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের অর্থনীতিতে জনগণের আস্থার সূচক মাইনাস ৪৫ (-৪৫)-এ নেমে এসেছে।
জরিপে অংশ নেওয়া ৪৯ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক বা খারাপ এবং ৩৪ শতাংশ এটিকে 'মোটামুটি' বলে অভিহিত করেছেন। একই সাথে, ৭৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন, অর্থনীতি দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে, যেখানে মাত্র ২০ শতাংশের মতে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হচ্ছে।
বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি (যা এখন মাইনাস ৩৩) এবং অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের পূর্বাভাস বা আউটলুক (যা এখন মাইনাস ৫৬)—এই দুটির গড় হিসাব করে সামগ্রিক আস্থার সূচকটি নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০২২ সালের পর মার্কিন অর্থনীতি নিয়ে এই সূচকে এটিই সবচেয়ে খারাপ চিত্র। উল্লেখ্য, ২০২২ সালে কোভিড-১৯ মহামারি এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর বিশ্বজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় নাটকীয়ভাবে বেড়েছিল।
গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরানের সাথে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই যুদ্ধ শুরু করার আগে যেখানে প্রতি গ্যালন (৩.৮ লিটার) পেট্রলের গড় দাম ৩ ডলারের কম ছিল, তা এখন বেড়ে ৪.৫৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন সরকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলমান এই তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে দেশটিতে সামগ্রিক ভোক্তা মূল্যস্ফীতি বা নিত্যপণ্যের দাম ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ কয়েক ডজন শীর্ষ কর্মকর্তা এবং শত শত বেসামরিক নাগরিককে হত্যাকারী মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলার জবাবে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'হরমুজ প্রণালী' বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম হু হু করে বাড়ছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোয় জাহাজ আসা-যাওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
গত এপ্রিল মাসে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি শুরু হলেও, যুদ্ধের কোনো স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় এই অর্থনৈতিক ও নৌ-অবরোধগুলো এখনও বহাল রয়েছে। তদুপরি, ইরান এখন হরমুজ প্রণালীর ওপর নিজেদের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব দাবি করছে, যা যুদ্ধের আগে একটি মুক্ত আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও, জ্বালানির দাম যেহেতু বৈশ্বিক বাজারের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়, তাই এই সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার খেসারত দিতে হচ্ছে মার্কিন ভোক্তাদের—যার ফলে তাদের দৈনন্দিন খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে।
অথচ নির্বাচনের সময় প্রার্থী হিসেবে ট্রাম্প নিজেকে "শান্তির" প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি বারবার বলেছিলেন যে, তিনি "আমেরিকা ফার্স্ট" (আমেরিকা প্রথম) নীতি অনুসরণ করবেন, যেখানে বিদেশি সামরিক আগ্রাসনের চেয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুগুলোকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
কিন্তু কোনো প্রত্যক্ষ উসকানি ছাড়াই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইসরায়েলের সাথে যৌথভাবে ইরানে আকস্মিক হামলা চালান। অবশ্য ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, তেহরান যাতে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সেজন্য এই সামরিক অভিযান চালানো অপরিহার্য ছিল।
তবে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টার বিষয়টি বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। এমনকি খোদ ট্রাম্পের নিজস্ব গোয়েন্দা প্রধান তুলসি গ্যাবার্ডও স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, তেহরান কোনো পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে না।
ট্রাম্প অবশ্য বারবারই যুক্তি দেখিয়েছেন যে, এই যুদ্ধের পেছনে হওয়া বিশাল ব্যয় ও ত্যাগ বৃথা যাবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই সংঘাত শেষ হওয়া মাত্রই পেট্রলের দাম দ্রুত আগের অবস্থায় নেমে আসবে।
গত মাসে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর এই যুদ্ধের একটি আইনি যৌক্তিকতা প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, ওয়াশিংটন তার "মিত্র দেশ ইসরায়েলের অনুরোধে এবং তাদের যৌথ আত্মরক্ষার্থে, পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সহজাত আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগের অংশ হিসেবে" এই যুদ্ধে যোগ দিয়েছে।
এরপর গত শুক্রবারের এই গ্যালাপ জরিপটি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একের পর এক নেতিবাচক জনমত জরিপের সর্বশেষ সংযোজন মাত্র।
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে প্রকাশিত নিউ ইয়র্ক টাইমস/সিয়েনা-র একটি পৃথক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩১ শতাংশ ভোটার ইরানের সাথে যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্পের ভূমিকাকে সমর্থন বা অনুমোদন করেছেন।
এর আগে চলতি মাসের শুরুর দিকে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, যুদ্ধের কারণে সৃষ্টি হওয়া অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং মার্কিন জনগণের আর্থিক কষ্ট—ইরানের প্রতি তাঁর কঠোর নীতি নির্ধারণে কোনো প্রভাব ফেলছে না।
সে সময় নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে ট্রাম্প বলেছিলেন, "আমি আমেরিকানদের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে ভাবি না। আমি কারও কথাই ভাবি না। আমি কেবল একটি জিনিস নিয়েই ভাবি: আমরা ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র পেতে দিতে পারি না। ব্যস এটুকুই। এটাই একমাত্র বিষয় যা আমাকে চালিত করছে।"
