অনলাইন ভ্যাট রিফান্ডে জটিলতা; আটকে আছে ১,৫০০ কোটি টাকা
স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যে দেশে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) রিফান্ড ব্যবস্থাকে ম্যানুয়াল পদ্ধতি থেকে অনলাইনে রূপান্তর করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে এ পরিবর্তনে ইতিবাচক ফল আসার বদলে ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। এতে করে প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকার ভ্যাট রিফান্ড কার্যত আটকে রয়েছে বলে জানা গেছে।
অনলাইন ভ্যাট রিফান্ড পদ্ধতি চালুর সময় এনবিআর জানিয়েছিল, এতে ব্যবসায়ীরা ডিজিটালভাবে আবেদন করতে পারবেন এবং সহজেই সরাসরি ব্যাংক হিসাবে রিফান্ড পাবেন। সে সময় উদ্যোগটিকে বিভিন্ন মহল স্বাগত জানিয়েছিল।
তবে এখন ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাস্তবতা ভিন্ন। নতুন এই ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে আগের ম্যানুয়াল পদ্ধতির তুলনায় আরও বেশি জটিল হয়ে উঠেছে।
আগের ব্যবস্থায় অতিরিক্ত ভ্যাট ও সংশ্লিষ্ট শুল্কের পুরো অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য আবেদন করা যেত, যদিও প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ ছিল। কিন্তু নতুন অনলাইন ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীরা কেবল আংশিক রিফান্ডের জন্যই আবেদন করতে পারছেন। এর সঙ্গে অডিটসহ অতিরিক্ত শর্ত যুক্ত হওয়ায় প্রক্রিয়াটি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এর ফলে কোটি কোটি থেকে শুরু করে শত শত কোটি টাকার ভ্যাট রিফান্ড কার্যত আটকে আছে বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা।
তাদের অভিযোগ, নতুন করে সৃষ্ট রিফান্ডের অর্থ অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে দাবি করা গেলেও আগের বকেয়া রিফান্ডের অর্থ এখনো ফেরত দেওয়া হচ্ছে না।
এনবিআরের মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলোতে কথা বলেও এ অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ সমস্যার কোনো আশু সমাধান নেই। এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ বাড়ছে এবং অনলাইন ব্যবস্থার প্রতি তাদের আস্থাও কমে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে, কাস্টমস বন্ড ব্যবস্থাপনা অটোমেশন করার পর ব্যবসায়ীদের তা মানতে বাধ্য করা হলেও প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার সক্ষমতা এখনো এনবিআরের তৈরি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে ইউটিলিটি পারমিশন পেতে দেরি হওয়ার পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে হয়রানির অভিযোগও করেছেন ব্যবসায়ীরা।
গত ৭ জানুয়ারি এনবিআর জানায়, ভ্যাট রিফান্ডের জন্য আবেদন করা হলে সহজেই ওই অর্থ প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে জমা হবে। অনলাইন ভ্যাট রিফান্ড মডিউল বাস্তবায়নের ফলে করদাতাদের রিফান্ড আবেদন সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দ্রুত নিষ্পন্ন করা সম্ভব হবে বলেও জানানো হয়।
তবে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন পদ্ধতিতে আবেদন শুরু করার পরই তারা প্রকৃত সমস্যাগুলো টের পেতে শুরু করেছেন।
আংশিক রিফান্ড, নেই ক্লেইম করার অপশন
দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান কনফিডেন্স গ্রুপ-এর প্রায় ১৪০ কোটি টাকার সমপরিমাণ ভ্যাট রিফান্ড তৈরি হয়েছে—অর্থাৎ সরকার প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে এ পরিমাণ অর্থ অতিরিক্তভাবে কেটে নিয়েছে, যা ইতোমধ্যে ক্লেইম (দাবি) করা হয়েছে।
তবে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, অনলাইন পদ্ধতিতে রিফান্ড ক্লেইম করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, কেবল আমদানি পর্যায়ে কাটা ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এডভান্স ট্যাক্স) ফেরত চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং এর বাইরে পরিশোধিত সম্পূরক শুল্কের (এসডি) অর্থ দাবি বা ক্লেইম করার কোনো অপশন নেই।
কনফিডেন্স গ্রুপ-এর পরিচালক সালমান করিম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "আগে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ভ্যাট, আয়কর বা এসডি হিসেবে যে অর্থ কর্তন করা হতো, হিসাব মিলিয়ে রিফান্ডের আবেদন করলে তা ফেরত পাওয়া যেত—হয়তো সময় লাগত। কিন্তু নতুন অনলাইন ভ্যাট রিফান্ড মডিউলে ২ শতাংশ অ্যাডভান্স ট্যাক্স ছাড়া অন্য কোনো রিফান্ড ক্লেইম করার অপশনই নেই।"
তিনি বলেন, "ফলে এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি আদায় করা ভ্যাট ও এসডির অর্থ ফেরত পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে গেছে।"
তিনি আরও বলেন, সরকারের কাছে প্রতিষ্ঠানের পাওনা অর্থ থাকলেও সরকারের কাছে ভ্যাটের টাকা দিতে হলে তা সমন্বয়ের সুযোগও নেই।
"নতুন ব্যবস্থা আমাদের জন্য সহজ হয়নি, বরং আর্থিক চাপ বাড়িয়েছে। হিসাব করলে রিফান্ড হিসেবে আমার পাওনা ৪০ টাকা, কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় সরকার আমাকে দিচ্ছে মাত্র দুই টাকা," যোগ করেন তিনি।
এই চিত্র শুধু কনফিডেন্স গ্রুপ-এর নয়, অন্যান্য বড় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও প্রায় একই রকম বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের আরেক শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপের সংশ্লিষ্ট বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "আগে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ভ্যাট ও অ্যাডভান্স ট্যাক্স মিলিয়ে ৭৪ কোটি টাকার রিফান্ড ক্রিয়েট হয়েছিল, যা আমরা ক্লেইম করেছিলাম। অনলাইন পদ্ধতি চালু হওয়ার পর বলা হলো—আগের সব বাদ দিয়ে নতুন পদ্ধতিতে আবেদন করতে হবে।"
তিনি বলেন, নতুন ব্যবস্থায় অ্যাডভান্স ট্যাক্স ছাড়া অন্য কোনো ভ্যাটের অর্থ ক্লেইম করা যাচ্ছে না। "সহজ করতে গিয়ে সহজ হয়নি, বরং আরও কঠিন করা হয়েছে।"
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যমান ভ্যাট আইনে রিফান্ড ক্লেইমের জন্য অডিট বাধ্যতামূলক ছিল না। নতুন ব্যবস্থায় অডিটের শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। এর বাইরে আরও কিছু কঠিন শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যার ফলে বাস্তবে রিফান্ড পাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বড় অঙ্কের রিফান্ড বকেয়া
ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটের তথ্য অনুযায়ী, ওই কমিশনারেটেই অন্তত ২৫টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২১১ কোটি টাকার ভ্যাট রিফান্ড ক্লেইম জমা রয়েছে। নতুন নিয়মে এসব প্রতিষ্ঠানকে অনলাইনে আবার রিফান্ড আবেদন করতে হবে।
তবে এ পদ্ধতিতে আবেদন করলে তারা কেবল সামান্য একটি অংশের জন্যই ক্লেইম করতে পারবেন।
ঢাকার দুটি ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার নতুন ব্যবস্থায় আংশিক ভ্যাট রিফান্ড ক্লেইম করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কমিশনার দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "এর কারণ কী—সে ব্যাখ্যা এনবিআর ভালো বলতে পারবে।"
গত ২৫ নভেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে এই জটিলতার কারণ জানতে চাইলে এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান বলেন, ধীরে ধীরে প্রক্রিয়াটি সহজ হবে।
তবে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্কের (এসডি) রিফান্ড নতুন পদ্ধতিতে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই—এমনটাই সংশ্লিষ্ট বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
এনবিআরের সদস্য সৈয়দ মুশফিকুর রহমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "নতুন ব্যবস্থায় অ্যাডভান্স ট্যাক্স ক্লেইম করা যাবে। কেউ হিসাব করার পর যদি ভ্যাট পাওনা হন, তাহলে আইন অনুযায়ী রিবেটের জন্য ক্লেইম করবেন।"
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, "অতীতে কমিশনারেট অফিসগুলো যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই রিফান্ড অনুমোদন দিত। এতে অনিয়ম হয়েছে বলে আমরা ধারণা করছি।"
তিনি বলেন, "অনিয়ম ঠেকাতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভ্যাট রিফান্ড হবে না; কেউ পাওনা হলে রিবেট ক্লেইম করতে পারবেন।"
'মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলা'
ব্যবসায়ীরা জানান, ২০২৩ সালের আগ পর্যন্ত আদায়কৃত ভ্যাট, এসডি ও অ্যাডভান্স ট্যাক্সের রিফান্ড ক্লেইম করা যেত এবং দেরিতে হলেও—ক্ষেত্রবিশেষে দুই থেকে তিন বছর পর—তা পাওয়া যেত। তবে ২০২৩ সালে এসে এসডির রিফান্ড ক্লেইম বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর নতুন অনলাইন পদ্ধতি চালু করে ভ্যাট রিফান্ড পাওয়ার পথও কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
একটি বড় স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, "সরকারের কাছে আমার পাওনা হলে তারা সুযোগ পেলে আগেই টাকা নিয়ে নেয়। কিন্তু আমার পাওনা হলে না দেওয়ার নানা অজুহাত তৈরি হয়—নতুন ব্যবস্থা তার বড় উদাহরণ।"
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, রিফান্ড আবেদন প্রক্রিয়ায় কর্মকর্তাদের জন্য ২৪টি চেকলিস্ট অনুসরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে রিফান্ড পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এনবিআরের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নন বিশেষজ্ঞরাও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও কর বিশেষজ্ঞ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "ভ্যাট রিফান্ড দিতে এনবিআর আইনগতভাবে বাধ্য।"
তিনি বলেন, "যদি কোনো প্রতিষ্ঠান অনিয়মের মাধ্যমে রিফান্ড নেয়, তাহলে সেই অনিয়ম ধরার সক্ষমতা এনবিআরের গড়ে তোলা উচিত। কিন্তু মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলা সমাধান নয়।"
