করছাড় কমলেও বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও বিশ্বে অন্যতম সর্বনিম্ন
সরকার রাজস্ব আহরণ বাড়াতে করছাড় নীতিতে পরিবর্তন আনায় ২০২০-২১ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরের মধ্যে করছাড় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে এরপরও বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও বিশ্বের সর্বনিম্নগুলোর একটি রয়ে গেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ ট্যাক্স এক্সপেন্ডিচার (করব্যয়) রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে করছাড় ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ৮১৪ কোটি টাকা, যা ২০২২-২৩ অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ১৩২ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, এই সময়ে করছাড় কমেছে ১৮ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা।
২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ৭.৩০ শতাংশের সামান্য বেশি। পরবর্তী অর্থবছরে তা আরও কমে ৬.৭৩ শতাংশে নেমে আসে। যদিও তিন অর্থবছরে করছাড় কমেছে, তবুও এর পরিমাণ এখনও বড় আকারেই রয়েছে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট আয়কর আদায় ছিল প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা, ১ লাখ ৭ হাজার ১৩২ কোটি টাকার করছাড়ের যা প্রায় সমান। এটি জিডিপির ২.৩৯ শতাংশের সমান। অবশ্য ২০২০-২১ অর্থবছরে, যখন করব্যয় প্রতিবেদনটি প্রথম প্রকাশ করা হয়, তখন করছাড় ছিল আরও বেশি বা জিডিপির ৩.৫৬ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, করছাড় বলতে করব্যবস্থার স্বাভাবিক কাঠামো থেকে বিচ্যুতি বোঝায়, যেখানে ছাড়, রিবেট বা বিশেষ হারে কর আরোপের মাধ্যমে সামাজিক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করা হয়। এসব করছাড় কার্যত পরোক্ষ ভর্তুকি হিসেবে কাজ করে।
সহজভাবে বলতে গেলে, সরকার স্বাভাবিক করহারের তুলনায় যে কম হারে কিংবা পুরোপুরি কর ছাড় দেয় – তা করছাড় হিসেবে গণ্য হয়। সরকারের এ করছাড়কে করব্যয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এনবিআরের আয়কর নীতি বিভাগের সদস্য মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকি টিবিএসকে বলেন, "সরকার রাজস্ব আদায় বাড়ানোর স্বার্থে এক্সেম্পশনের (ছাড়ের) পরিমাণ কমানোর জন্য কাজ করছে গত কয়েক বছর ধরে। বিশেষত সানসেট ক্লজ এর আওতায়, কিছু খাতের এক্সেম্পশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তা আর বর্ধিত করা হয়নি। আবার কিছু ক্ষেত্রে সুবিধা সংকুচিত করা হয়েছে। ফলে সার্বিকভাবে করছাড়ের পরিমাণ কমছে।"
তিনি আরো বলেন, "এছাড়া ব্যক্তি খাতে ঢালাও যেসব ছাড় দেওয়া হতো, তাতেও রাশ টানা হয়েছে। অন্যদিকে যেসব খাত থেকে ট্যাক্স আদায় করা যেত না, সেখানে মিনিমাম ট্যাক্স আকারে কিছু ট্যাক্স আরোপ করা হয়েছে।"
"ফলে একদিকে কর আদায় বাড়ছে, অন্যদিকে ছাড়ের পরিমাণ কমছে। আমাদের দীর্ঘমেয়াদি টার্গেট হলো, ভবিষ্যতে করছাড়ের পরিমাণ বর্তমানের তুলনায় অর্ধেকে নামিয়ে আনা" –তিনি যোগ করেন।
সতর্ক থাকার পরামর্শ
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, রাজস্ব বাড়ানোর পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
প্রতিবেদন প্রণয়নে যুক্ত এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, আগের বছরগুলোর তুলনায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে করছাড় কমার হার তুলনামূলক কম হলেও পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের কাটছাঁট করা হয়েছে। "ফলে পরবর্তী বছরগুলোর যে প্রতিবেদন পাওয়া যাবে, তাতে ছাড় কমার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাবে" –বলেন তিনি।
তিনি সতর্ক করে বলেন, করছাড় তাৎক্ষণিকভাবে রাজস্ব কমালেও বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এনবিআরের আয়কর বিভাগের আরেক কর্মকর্তা জানান, নতুন করছাড় দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কঠোর যাচাই-বাছাই করা হবে।
তিনি বলেন, "প্রতিটি করছাড়ের অর্থনৈতিক অবদান মূল্যায়ন করা হবে। যেগুলো বিনিয়োগ বা কর্মসংস্থানে তেমন অবদান রাখে না, সেসব বাতিল করা হবে।"
তিনি আরও বলেন, নির্দিষ্ট মেয়াদের করছাড় আর নবায়ন করা হবে না এবং আগামী বাজেট থেকেই এ নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত অন্যতম সর্বনিম্ন। এটি দক্ষিণ এশিয়ার গড় প্রায় ১২ শতাংশের তুলনায় অনেক কম এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় ১৫ শতাংশের মানদণ্ডের নিচে রয়েছে, যা সরকারি ব্যয় ও টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে অপরিহার্য বলে বিবেচনা করা হয়।
ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক খাতে সর্বোচ্চ করছাড়
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে কোম্পানি ও ফার্মগুলোকে প্রায় ১৩টি খাতে করছাড় দেওয়া হয়েছে।
কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য করছাড় ছিল ৭৩ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা, আর ব্যক্তি করদাতার জন্য ছিল ৩৩ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা।
খাতভিত্তিক হিসাবে মাইক্রোক্রেডিট (ক্ষুদ্রঋণ) ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সবচেয়ে বেশি ১২ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকার করছাড় পেয়েছে। এরপর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৭ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা ছাড় দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া শেয়ারবাজারে মূলধনী মুনাফা, গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শিল্প, বেতন, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্ক, পোল্ট্রি ও মৎস্য, লভ্যাংশ, নন-গার্মেন্ট রপ্তানি, রপ্তানিতে নগদ প্রণোদনা, তথ্যপ্রযুক্তি ও সফটওয়্যার এবং শিক্ষা খাতও বড় অঙ্কের করছাড় পেয়েছে।
অন্যান্য খাত নামে ছোট খাতগুলোকে সম্মিলিতভাবে ৫৩ হাজার কোটি টাকার বেশি করছাড় দেওয়া হয়েছে আলোচ্য অর্থবছরে।
ব্যক্তিখাতে একক খাত হিসেবে সর্বোচ্চ ছাড় দেওয়া হয়েছে বেতনে, যার পরিমাণ ৫ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা। এরপর পোল্ট্রি ও মৎস্য খাত, শেয়ার থেকে মূলধনী মুনাফা এবং অন্যান্য খাতে ছাড় দেওয়া হয়েছে।
রেমিট্যান্সে করছাড় আলাদা করে দেখানো হয়নি
রেমিট্যান্স খাতে সরকার বড় অংকের করছাড় দিয়ে থাকে, যার পরিমাণ ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই অংক আলাদাভাবে না দেখিয়ে অন্যান্য খাতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা টিবিএসকে জানিয়েছেন।
তবে এই অর্থ কেন এই খাতে দেখানো হলো তা জানতে প্রতিবেদন প্রস্তুত কমিটির সমন্বয়ক ও এনবিআরের কমিশনার লুৎফুন্নাহার বেগমের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
অপব্যবহারের অভিযোগ
কিছু করছাড়ের ক্ষেত্রে অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ সরকার পোল্ট্রি ও মৎসখাতে বিনিয়োগ বাড়াতে এবং ছোট বিনিয়োগকারীদের সহায়তা দেওয়ার জন্য কম হারে কর নিয়ে থাকে। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনীতিবিদ, আমলা, ব্যবসায়ীদের একটি অংশ এই সুযোগ নিয়ে কালো টাকা সাদা করে আসছেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস প্রায় শত কোটি টাকা মৎস্য খাতের আয় দেখিয়েছেন, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমন উদাহরণও অনেক। কিন্তু এনবিআর এ খাতের করহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেও গত আওয়ামী লীগ সরকার এই সুবিধা বাতিল করেনি।
একইভাবে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকার পুরেপুরি করমুক্ত সুবিধা দিয়ে আসছে। তবে এই সুবিধা নেওয়ার জন্যও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
এসএমএসি অ্যাডভাইজরি লিমিটেড- এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, ধাপে ধাপে করছাড় কমানো সরকারের আর্থিক কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে তিনি বলেন, "মূল প্রশ্ন হলো—আয়কর আদায় কি একই হারে বাড়ছে?"
তিনি আরও বলেন, সব করছাড় জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিশ্চিত করতে একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রয়োজন।
"স্পষ্ট ও পরিমাপযোগ্য মানদণ্ডের ভিত্তিতে এসব করছাড় নির্ধারণ করতে হবে এবং প্রতিটির জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদ (সানসেট ক্লজ) থাকতে হবে। পুরো প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তবেই একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন সম্ভব হবে," তিনি বলেন।
