বই: অগতির গতি
'মনে পড়ে, ছেলেবেলায় যে বই পেতুম হাতে
ঝুঁকে পড়ে যেতুম পড়ে তাহার পাতে পাতে।
কিছু বুঝি, নাই বা কিছু বুঝি,
কিছু না হোক পুঁজি,
হিসাব কিছু না থাক্ নিয়ে লাভ অথবা ক্ষতি,
অল্প তাহার অর্থ ছিল, বাকি তাহার গতি।
মনের উপর ঝরনা যেন চলেছে পথ খুঁড়ি,
কতক জলের ধারা আবার কতক পাথর নুড়ি।
সব জড়িয়ে ক্রমে ক্রমে আপন চলার বেগে
পূর্ণ হয়ে নদী ওঠে জেগে।
শক্ত সহজ এ সংসারটা যাহার লেখার বই
হালকা করে বুঝিয়ে সে দেয় কই।
বুঝছি যত খুঁজছি তত, বুঝছি নে আর ততই—
কিছু বা হাঁ, কিছু বা না, চলছে জীবন স্বতই।'
—যাত্রাপথ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বইমেলা থেকে বেরিয়ে রাস্তা পেরিয়ে উল্টো দিকের ফুটপাতে ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই ভয়ংকরভাবে আহত হয়েছিলেন এক চিন্তক-সাহিত্যিক। সেদিনের সেই অসফল মৃত্যুদূত তার আর পিছু ছাড়েনি। খুব দ্রুতই তার প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল দূর বিদেশের বুকে। বই নিয়ে সুন্দর এক কবিতা আছে সেই সাহিত্যিকের! প্রথম দুই বাক্য পড়েই তন্ময় ও মুগ্ধ হতে হয়—'বইয়ের পাতায় প্রদীপ জ্বলে/বইয়ের পাতা স্বপ্ন বলে।' অথচ এমন এক কবিতা কারও কারও ভালো লাগেনি। একদা কিশোরদের পাঠ্য বইয়েও স্থান করে নিয়েছিল এই কবিতা, কিন্তু ভালো না লাগার দল তাতে আপত্তি তুলেছিল। অতএব কবিতাটি বাদ পড়েছিল সেখান থেকে। বইমেলা থেকে বেরোনোর পর আরেক চিন্তক-লেখকের পরিণতি হয়েছিল আরও ভয়াবহ—পেছন থেকে চাপাতি দিয়ে তাকে কোপানো হয়েছিল, তিনি আর বাঁচতে পারেননি, হাসপাতালে নেয়ার পর সে রাতেই তার মৃত্যু ঘটেছিল। তার স্ত্রীও লেখক, তিনিও সেদিন আহত হয়েছিলেন। তাদের বইপত্র এখন এ দেশের কোনো কোনো বইয়ের দোকানে ঘোষণা দিয়েই রাখা হয় না, অনেক দোকানে আবার খুঁজে পাওয়া যায় না; সতর্ক, ফিসফিসানো কণ্ঠে কেউ কেউ বলেন, আছে, তবে নিতে হবে গোপনে। যে মৃত্যুদূত একদা বইলেখকের জীবন কেড়ে নিয়েছিল, পাঠকের মৃত্যুর আগাম ঘোষণাও সে দিয়ে রেখেছে। জানি না, মৃত্যুর ঘ্রাণ কেমন; তবে গন্ধবিহীন মৃত্যুসংবাদ ঘুর ঘুর করে আমাদের চারপাশে।
কখনো কখনো এসব মনে পড়ে; মনে পড়ায় শিউরে উঠি, সংশয়ও জাগে—সত্যিই কি ঘটেছে এসব ঘটনা? তা-ও আমাদের এই দেশে? বই কি তা হলে এখন মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে হত্যাকাণ্ডে? হননযজ্ঞে? মবকাণ্ডে? কিংবা উদ্বুদ্ধ করেছে আগেও? উজ্জ্বল অনুভূতি বর্ণনা, আবেগের ঝরনাধারা, যুক্তির প্রখর রৌদ্র পাঠককে তা হলে আর মুগ্ধ করে না, মগ্ন করে না? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে রকম হয়েছিল, 'বুঝছি যত খুঁজছি তত', সে রকম আর হয় না এখন তবে? যুক্তির সামনে যুক্তি খুঁজে পাই না বলে যুক্তির পথ কেটে ফেলাই তা হলে ক্রমশ নিয়তি হয়ে উঠছে এই মানবজাতির!
এখনো জনপ্রিয় শিল্পী যে জন লেনন—তাকে হত্যা করেছিল ২৫ বছরের এক যুবক, যার নাম মার্ক ডেভিড চ্যাপমান। ম্যানহাটানে লেননের অ্যাপার্টমেন্টের সামনে ১৯৮০ সালের ৮ ডিসেম্বর তাকে হত্যা করেছিল চ্যাপম্যান। কোথাও পড়েছিলাম, লেননকে সে চারটি গুলি চালিয়ে হত্যার পর হাত থেকে বন্দুক ফেলে দেয়। পালানোর চেষ্টাও করেনি। বরং সেখানেই বসে বসে শান্তভাবে একটি বই পড়তে শুরু করে। পুলিশ যখন তাকে ধরতে আসে, তখনো সে নাকি ভীষণ নিস্পৃহ ভঙ্গিতে পড়ছিল বইটি। সেটি ছিল মার্কিন লেখক জে ডি স্যালিঙ্গারের একটি উপন্যাস 'দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই'। ১৯৫১ সালে প্রথম ছাপা হয় বইটি, অসম্ভব জনপ্রিয়তা পায় এবং প্রকাশের ত্রিশ বছরে এসে তা এক যুবককে খুন করার পথে ঠেলে দেয়। বইটির কাহিনির কেন্দ্রে ছিল হতাশায় ভোগা মাত্র ১৭ বছরের এক তরুণ হলডেন কউফিল্ড। ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও জীবনের প্রতি বিশ্বাস সে হারিয়ে ফেলেছিল; অবশ্য পরে তা খুঁজেও পেয়েছিল।
চ্যাপম্যান নিজেকে খুঁজে পেয়েছিল 'দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই'-এর এই হলডেন কউফিল্ডের মধ্যে। এতই একাত্ম হয়ে গিয়েছিল তার সঙ্গে যে নিজের নামও পাল্টে রেখেছিল হলডেন কউফিল্ড। পুলিশ তাকে ধরার পর দেখতে পেয়েছিল, বইটার ওপর সে 'এটাই আমার জবানবন্দি' এই লাইনটি লিখে সেটার নিচে স্বাক্ষর করেছে 'হলডেন কউফিল্ড' নামে। কিন্তু হলডেনের মতো চ্যাপম্যান আর জীবনের প্রতি বিশ্বাস ফিরে পায়নি। হয়তো সে কারণেই সে নির্দ্বিধায় লেননকে হত্যা করতে পেরেছিল। বিচারক যখন তাকে হত্যার কারণ জানতে চেয়েছিল, সে নাকি তখন বলেছিল, 'বিকজ হি ওয়াজ ফেমাস'। অবশ্য সাজিয়ে-গুছিয়ে আরও কিছু কারণ সে দাঁড় করিয়েছিল—যেমন বিটলস যখন খ্যাতির তুঙ্গে, লেনন তখন সদর্পে ঘোষণা করেছিলেন, 'যিশুর চেয়েও জনপ্রিয় বিটলস'; তা ছাড়া তিনি লিখেছেন 'গড' ও 'ইমাজিনে'র মতো দুটি গান—এসবের মধ্যে দিয়ে প্রমাণ করেছেন, আসলে তিনি প্রতারক, যার কথার সঙ্গে কাজের কোনো মিল নেই। চ্যাপম্যান বলেছিল, সত্যিই যদি 'দি ক্যাচার ইন দ্য রাই'—এর হলডেন কউফিল্ড থাকত, তা হলে সেও প্রতারণার দায়ে লেননকে খুন করত।
তাহলে 'দি ক্যাচার ইন দ্য রাই'কে আমরা কি এখন অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করাব? কারণ, একজন মানুষকে বইটি উদ্বুদ্ধ করেছে খুন করতে? কিংবা অপরাধী ঘোষণা করব কি জে ডি স্যালিঙ্গারকে? কারণ, এমন কিছু তিনি লিখেছেন, যা পড়ে একজন মানুষ উদ্বুদ্ধ হয়েছে হত্যা করতে?
২. এখন আর এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজি না। উত্তর খুঁজবার মানে হয় না। যার গন্তব্য তাকেই ঠিক করে নিতে দেয়া ভালো, সে আসলে কোথায় যাবে। মানুষ তার সভ্যতার হাজার হাজার বছর তো বই ছাড়াই পাড়ি দিয়েছে, বই ছাড়াই তার জ্ঞানভান্ডার সংরক্ষণ করেছে আর রেখে গেছে পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে; তা হলে জোর দিয়ে কি আর কাউকে বলতে পারি, অক্ষরজ্ঞান ছাড়া তুমি বাঁচতে পারবে না, বর্ণমালার এক গৌণ জগতে না যাওয়া অবধি তুমি তোমার অনুভূতিকে প্রকাশ করতে পারবে না, বিদ্যায়তনের ধাপগুলো একের পর এক টপকাতে না পারলে তুমি শিক্ষিত হবে না? তবে যুক্তি যদি মানতে হয়, তবে এটাও তো স্বীকার করতে হবে, মানুষই হাজার বছরের তপস্যায় জেনেছে, জ্ঞান সংরক্ষণ আর অনুভূতির প্রকাশকে ধরে রাখার জন্যে সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও নিরাপদ হলো অক্ষর বা মুখ থেকে নিঃসৃত ধ্বনি, ধ্বনির বৈচিত্র্যের মধ্যে দিয়ে উদ্গত অনুভূতি ও জ্ঞান ধরে রাখার জন্যে তার সাধনাও তো এক দিনের নয়। বই বলতে এখন আমরা কেবল বুঝি কাগজের বই; ধারণাও করতে পারি না, গাছের বাকলে বা পাতায়ও মানুষ অক্ষর উৎকীর্ণ করে নিজের জ্ঞান, নীতি, আদর্শ, অনুভূতি লিখে রাখত; লিখে রাখত পাথরে ও ধাতুতে। কত কষ্টই না করেছে মানুষ তার শিশুমানবকে এই পৃথিবীর উপযোগী করে তুলবে বলে, তার চোখের মণিতে খানিকটা লাবণ্য যোগ করবে বলে, তার ভাতের থালায় সাম্য আনবে বলে! সেসব হিসাবনিকাশ করলে এই ছাপাখানার কাণ্ডকারখানা তো একেবারে শিশু পর্যায়ের।
তবে অস্বীকার তো করতে পারব না, আমি সেসব যুগের নই—আমি বইয়ের যুগের মানুষ। আমার বেড়ে ওঠা বইয়ের ভেতর দিয়ে, আমার বিস্তৃতি বইয়ের ভেতর দিয়ে, আমি আমার চেয়ে বড় স্বপ্ন দেখতে শিখেছি বইয়ের ভেতর দিয়ে।
কিন্তু সে স্বপ্ন কি কাউকে খুন করার, নিষিদ্ধ করার? বই পড়তে পড়তে মানুষ নষ্ট হয়ে যায়, সে কথা অবশ্য বহুবার শুনেছি, অভিযুক্ত হয়েছি নিজেও; শুনেছি 'পাঠ্যবইয়ের' বাইরে অন্য কিছু কখনো পড়তে নেই। আর বইয়ের মৃত্যু ঘোষণা করার কত শত আয়োজন চারপাশে, তা-ও তো দেখি! প্রাচীন যুগের নালন্দা বারবার পুড়েছে। কারণ, বই আছে সেখানে, সেই বই থেকে মানুষ জ্ঞান আহরণ করতে পারে বলে। আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়েছিল আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত লাইব্রেরি। সেখানেও ছিল নাকি পাঁচ লাখ বই। আর গুটেনবার্গের মতো ছাপাখানা তো ছিল না তখন, তাই এমন ভাবাও ভুল হবে যে ওসব বইয়ের দ্বিতীয় কপি আছে! এ লাইব্রেরিও নাকি পুড়েছে কয়েকবার।
চীনের সম্রাট কি শিং হুয়ানও পুড়িয়েছিলেন অসংখ্য বই, লক্ষ্য ছিল একটাই—অতীতের অন্য কোনো সম্রাটের সঙ্গে তাকে তুলনা করার পথ রুদ্ধ করা। আর ১৯৩৩ সালে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর বই বহ্নুৎসবের কথা তো সবারই জানা। হাজার চল্লিশেক লোক বার্লিনের জাতীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হয়ে উদ্যাপন করেছিল সেই বহ্নুৎসব। অপরাধ করার জন্যে অসংখ্য মানুষও যে একত্র হতে পারে, অপরাধ করেও প্রাণে প্রাণ মিলিয়ে উল্লাস করতে পারে, তার বড় একটি উদাহরণ বার্লিনের এই বই বহ্নুৎসব। বই পুড়তে দেখেছি আমরা শ্রীলঙ্কাতে—আমাদের এই স্মরণকালেই, ১৯৮১ সালে। তামিল-অধ্যুষিত জাফনার পাবলিক লাইব্রেরিতে ২০০ পুলিশ আগুন জ¦ালিয়ে মাত্র এক রাতের মধ্যেই পুড়িয়েছিল লাখখানেক বই আর হাজার দশেক নথিপত্র।
সাংবাদিকেরা তখন লিখেছিলেন, এ হলো 'কালচারাল জেনোসাইড'। কিন্তু কী আসে যায় সাংবাদিকদের কথাবার্তায়। মাত্র কয়েক বছর পরে তালেবানরা আফগানিস্তানের কাবুলের ক্ষমতা নিয়ে ১৯৮৭ সালে লুটপাট করেছিল নাসির-ই-খুসরু ফাউন্ডেশন। তখন পোড়ানো হয়েছিল ৫৫ হাজার খুবই দুর্লভ বই। এমনকি নদীতেও ফেলা হয়েছিল অসংখ্য বই। সেখানকার একটি বইও রেহাই পায়নি তালেবানদের হাত থেকে—এমনকি হাজার বছরের পুরোনো কোরআন আর ১২০০ শতকে লেখা ফিরদৌসির বহুল আলোচিত শাহনামা! ২০০৩ সালে ইরাকের জাতীয় গ্রন্থাগারও পুড়েছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের হামলায়—বই তো বটেই, অটোম্যান সাম্রাজ্যের দুষ্প্রাপ্য সব নথিপত্রও পুড়েছে, তাতে কী হয়েছে? কী দরকার ওই সবের? বরং শিরোধার্য ১৯৮৪-তে লেখা জর্জ অরওয়েলের ওই বাক্য 'The past was erased, the erasure was forgotten, the lie became truth'।
হ্যাঁ, মিথ্যা এখন সত্যে পরিণত হয়েছে। কারণ, যুদ্ধের প্রথম বলি সত্য। সত্য এখন মিথ্যা, মিথ্যা এখন সত্য—তাই চারপাশে আজকাল কেবল বহ্নুৎসব আর বহ্নুৎসব। কোনো কালেই আমি সাহসী ছিলাম না; সাহসের (যদি সেটাকে সাহস বলা যায়!) মধ্যে ছিল ওইটুকু মাত্র—বইপত্র পড়া, বাবা-মা, প্রিয়জন কোনো বইকে বয়সোপযোগী না বললে সেটি পড়বার জন্যে আরও মুখিয়ে ওঠা। সে সাহসে কি ঘুণ ধরেছে? তা-ও জানি না।
তবু চোখ বড় প্রত্যাশী, বড় আগ্রাসী, বড় লোভী, জোয়ার-ভাটাময় নদী; আজও এ চোখ বই খুঁজে মরে, বুঝি বা না বুঝি—কিছু পুঁজি জমুক বা না জমুক—পড়তে ইচ্ছে করে, হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে তার গতির ভেতর; প্রশ্ন করি বা না করি, প্রশ্ন জমাই তার স্রোতরাশি থেকে। আর বইপোড়া আগুনের আঁচ অনুভব করি চোখেমুখে। সারা শরীরে।
১৯ ফাল্গুন ১৪৩২, বুধবার
