বেশিরভাগ ভারতীয়দের শখের বশে বই পড়ার অভ্যাস কম, তবুও দেশজুড়ে কেন এত সাহিত্য উৎসবের ধুম?
উৎসবের আমেজ, গান-বাজনা এবং বলিউডের তারকাদের মেলা—ভারতের বই উৎসবগুলো এখন অনেকটা এমনই। সেখানে বইয়ের চেয়ে বরং উৎসবের আয়োজন আর চাকচিক্যই বেশি চোখে পড়ে। তবে এত কিছুর ভিড়েও লেখক আর তাদের লেখনী কিন্তু পাঠকের মনে ঠিকই দাগ কেটে যায়।
প্রকাশনা সংস্থা 'রোলি বুকস'-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রমোদ কাপুর একটি মজার অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন। ভারতীয় ক্রিকেট কিংবদন্তি বিষেন সিং বেদীর আত্মজীবনী যখন ছাপার প্রস্তুতি চলছিল, তখন বেদী জানলেন প্রথম দফায় মাত্র ৩ হাজার কপি বই ছাপা হবে। শুনে তো তিনি অবাক! কিছুটা প্রতিবাদের সুরেই বললেন, 'মাঠে আমাকে দেখতে ৫০-৬০ হাজার মানুষ ভিড় করে, আর আপনি ভাবছেন আমার বই মাত্র ৩ হাজার কপি বিক্রি হবে?'
প্রমোদ কাপুর তখন তাকে বুঝিয়ে বলেন, স্টেডিয়ামের সেই ভক্তরা কিন্তু বইয়ের ক্রেতা নন। ২০২১ সালের সেই পরিস্থিতির এখনো তেমন কোনো বদল হয়নি। ভারতে সাধারণত একটি ইংরেজি বই ৩ থেকে ৪ হাজার কপির বেশি বিক্রি হয় না। যদি কোনো বই ১০ হাজার কপির গণ্ডি ছাড়াতে পারে, তবেই তাকে 'বেস্টসেলার' হিসেবে গণ্য করা হয়।
ভারতে বই পড়ার খুব একটা জোরালো ঐতিহ্য নেই। লেখক ও কলামিস্ট পারসা ভেঙ্কটেশ্বর রাও জুনিয়র মনে করেন, সমাজবিজ্ঞানীদের এটি নিয়ে গবেষণা করা উচিত। তাঁর মতে, 'হয়তো আমাদের দেশে গল্প বলার মৌখিক ঐতিহ্য অনেক বেশি শক্তিশালী বলেই এমনটা হয়। আমাদের মহাকাব্যগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম মুখে মুখেই চলে আসছে। কিন্তু ভারতীয়রা কেন বই কেনা বা পড়ার প্রতি এত কম আগ্রহী, সেটা আমার কাছে এখনো এক বড় রহস্য।'
বই নেই ঘরে, তবুও উৎসবের ধুম
ভারতের বেশির ভাগ মধ্যবিত্তের ঘরে বইয়ের দেখা মেলে না। বিমানবন্দর বা রেল স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকলেও কাউকে বই পড়তে দেখা যায় না। অনেক বিত্তবান আবার কেবল আভিজাত্য দেখাতে লাইব্রেরি সাজিয়ে রাখেন, যেখানে 'রিডার্স ডাইজেস্ট'-এর মতো পত্রিকাও বাঁধাই করে সাজানো থাকে। প্রশ্ন হলো, পড়ার এই অনভ্যাসের মধ্যেও প্রতিবছর শীতকালে ভারতের ছোট-বড় শহরগুলোতে শখানেক সাহিত্য উৎসব বা 'লিট ফেস্ট' কীভাবে আয়োজিত হয়?
উত্তরটা হলো—ভারতে এই উৎসবগুলো কেবল বইয়ের জন্য নয়। এগুলো আসলে এক একটি জমকালো আয়োজন, যেখানে গান, নাচ, হস্তশিল্প আর মুখরোচক খাবারের পসরা বসে। জয়পুর লিটারেচার ফেস্টিভ্যালের মতো বড় আয়োজনে যে লাখ লাখ মানুষ জড়ো হয়, তার বড় কারণ বইয়ের বাইরের এই বাড়তি বিনোদন।
দিল্লির 'ফুল সার্কেল পাবলিশিং'-এর সিইও প্রিয়াঙ্কা মালহোত্রা বলেন, 'মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে বই কেনা এখনো একধরনের বিলাসিতা। অনেকের কাছে বই উৎসব মানে একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা, যেখানে বই থাকে নেপথ্যে, মূল আকর্ষণে নয়।'
বেনারস লিট ফেস্টের চিত্রটাও অনেকটা একই। একপাশে যখন বই বনাম পর্দার লড়াই নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা চলছে, ঠিক তার পাশেই তাজ গঞ্জেস হোটেলের লনে চলছে নানা আয়োজন। ধুলোমাখা আমগাছের নিচে বসে ছবি আঁকছেন স্থানীয় শিল্পীরা।
সারাদিন ধরে সেখানে চলে মূকাভিনয়, স্ট্যান্ডআপ কমেডি, হস্তশিল্পের প্রদর্শনী আর ফ্যাশন শো। প্রধান মঞ্চে গ্র্যামিজয়ী বিশ্বমোহন ভাটের শাস্ত্রীয় সংগীত শুনতে ভিড় জমান শত শত মানুষ। ভারতীয়রা সাধারণত নীরবতার চেয়ে একটু শোরগোল আর উৎসবের আমেজ বেশি পছন্দ করে।
এই উৎসবের সভাপতি দীপক মাধোক মনে করেন, শুধু আলোচনা দিয়ে দর্শক টানা সম্ভব নয়। তাই তিনি এর নাম দিয়েছেন 'মসলা মিক্স', যেখানে সবার জন্য কিছু না কিছু থাকবে। তিনি তাঁর স্কুলের শিক্ষার্থীদের একটি শর্ত দিয়ে উৎসবে আনেন—তারা সেলফি বুথে যত খুশি ছবি তুলতে পারবে, তবে অন্তত একজন লেখকের বক্তব্য তাদের শুনতে হবে এবং পরে স্কুলে তা নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
১১ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী সূর্যবংশ রাজ জানায়, সে এখানে এসেছে কারণ সে পাঠ্যবইয়ের বাইরের ইতিহাস জানতে ভালোবাসে। দীপক মাধোকের আশা, এভাবেই হয়তো নতুন প্রজন্মের মধ্যে বই পড়ার বীজ বপন করা সম্ভব হবে।
সাক্ষরতা বেড়েছে, তবে বাড়েনি অভ্যাস
ভারতে সাক্ষরতার হার বাড়লেও আনন্দের জন্য বই পড়ার অভ্যাস এখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি। ছুটির দিনে সপরিবারে শপিং মলে গিয়ে বার্গার খাওয়ার যে চল, লিট ফেস্টগুলো এখন তারই একটি বিকল্প হয়ে উঠছে। সেখানে অনুপম খেরের মতো বলিউড তারকা, প্রভাবক বা খেলোয়াড়দের দেখার সুযোগ মেলে, আর বারানসির মতো উৎসবে প্রবেশাধিকারও থাকে পুরোপুরি ফ্রি।
পাবলিশিং হাউস 'জাগারনাট বুকস'-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা চিকি সরকার মনে করেন, ভারতে এখনো বইপড়ুয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণি সেভাবে গড়ে ওঠেনি। তাঁর মতে, 'সাহিত্য উৎসবগুলো এখন কেবল একটি প্রাণবন্ত পরিবেশ তৈরি করে। মর্যাদাপূর্ণ এমন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে নিজেকে 'কুল' বা 'আধুনিক' হিসেবে জাহির করার সুযোগ পায় মানুষ। কিন্তু বইয়ের সঙ্গে তাঁদের সংযোগটা আসলে খুব একটা গভীর নয়।'
সাবেক কূটনীতিক ও লেখক পবন ভার্মা অবশ্য এর পেছনে গভীরতার অভাবকে দায়ী করেছেন। তিনি খেয়াল করেছেন, জয়পুর উৎসবে তরুণদের ভিড় উপচে পড়লেও তাঁদের পছন্দের ধরন বদলেছে। তিনি বলেন, 'এখনকার পাঠকরা গভীর বা ধ্রুপদি সাহিত্যের চেয়ে বরং ছোট, সহজ ও সংক্ষেপে কোনো কিছুর সারমর্ম পড়তে বেশি পছন্দ করেন—যা হয়তো বিমানে ভ্রমণের অল্প সময়েই শেষ করা যায়।'
বই পড়ার অনভ্যাসের পেছনে স্মার্টফোনকে একটি বড় কারণ মনে করেন প্রিয়াঙ্কা মালহোত্রা। তিনি বলেন, 'ভারত এখন বিশ্বের অন্যতম বড় মোবাইল ডেটা ব্যবহারকারী দেশ। মানুষের হাতে যেটুকু অবসর সময় থাকে, তার বেশির ভাগই এখন কেড়ে নিয়েছে ইউটিউব, রিলস বা অনলাইন গেম। ফলে বই পড়ার আর সময় থাকছে না।'
তবে ভারতে ইংরেজি বইয়ের বাজার আসলে পুরো চিত্রটা তুলে ধরে না। বেশির ভাগ ভারতীয় ইংরেজিতে কাজ চালালেও তাঁদের চিন্তা, আবেগ আর স্বপ্নের ভাষা হলো নিজের মাতৃভাষা। তা সত্ত্বেও হিন্দি, গুজরাটি, তামিল বা বাংলার মতো ২৪টি আঞ্চলিক ভাষার বই বিক্রির সঠিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না।
কলামিস্ট পারসা ভেঙ্কটেশ্বর রাও জুনিয়র বলেন, 'আঞ্চলিক ভাষায় বই বিক্রির তথ্য পাওয়া কঠিন। তবে আমরা জানি, তৃণমূল পর্যায়ে সাহিত্যচর্চা এখনো বেশ সচল। সেখানে লেখকদের প্রভাবও অনেক বেশি। কোনো রাজ্যের সামাজিক বা রাজনৈতিক বিষয়ে তাঁদের মতামত বেশ গুরুত্ব পায়।'
এর একটি বড় উদাহরণ কন্নড় ভাষার নারীবাদী লেখক বানু মুশতাক। নিজ রাজ্যে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত। কিন্তু গত বছর তার বই 'হার্ট ল্যাম্প' ইংরেজিতে অনূদিত হওয়ার পরই তিনি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পান এবং ২০২৫ সালে ইন্টারন্যাশনাল বুকার প্রাইজ জেতেন। অর্থাৎ, ইংরেজি অনুবাদ না হওয়া পর্যন্ত অনেক বড় লেখকের কাজও রাজ্যের সীমানার মধ্যেই আটকে থাকছে।
সাহিত্যের 'গণতন্ত্রীকরণ'
বারানসি উৎসবে আসা মার্কিন লেখক ড্যান মরিসন মনে করেন, আঞ্চলিক সাহিত্য এখনো এক রুদ্ধদ্বার পৃথিবী। তিনি বলেন, 'ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে হয়তো অসাধারণ সব সাহিত্য সৃষ্টি হচ্ছে, কিন্তু ইংরেজি অনুবাদ না হওয়া পর্যন্ত বাইরের কেউ তার ঘ্রাণ পাচ্ছে না।'
তবে ভারতের ছোট ছোট শহরগুলোতে যেভাবে সাহিত্য উৎসব ছড়িয়ে পড়ছে, তাকে 'সাহিত্যের গণতন্ত্রীকরণ' হিসেবে দেখছেন ড্যান মরিসন। তাঁর মতে, দশ বছর আগে যেসব জায়গায় এমন উৎসবের কথা কেউ কল্পনাও করতে পারত না, এখন সেখানেও মানুষের ঢল নামছে। বই পড়ার অভ্যাস যেমনই হোক, মানুষের এই সমাগমই আগামীর সম্ভাবনা জাগিয়ে রাখছে।
ড্যান মরিসনের মতে, মানুষ ঠিক কী কারণে বই উৎসবে ভিড় করছে, তা নিয়ে তর্কের অবকাশ থাকলেও এর কোনো নেতিবাচক দিক নেই। তিনি বলেন, 'অন্তত আপনি এমন এক সাংস্কৃতিক পরিবেশের মধ্যে সময় কাটাচ্ছেন, যা কোনো মোবাইল বা কম্পিউটারের পর্দা নয়।'
বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষার্থী ২২ বছর বয়সী আর্য মোহনের চোখেও এক ধরনের আশাবাদ দেখা গেল। বেনারস লিট ফেস্টের লনে যখন একদিকে বাঁশির সুর ভেসে আসছে, আর অন্যপাশে পাল্লা দিচ্ছে একটি র্যাপ ব্যান্ড—তখন আর্য মোহনকে দেখা গেল গম্ভীর কিছু বই হাতে। তিনি পড়ছেন ক্রিস্টোফার হিচেন্স এবং দস্তয়েভস্কির 'ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট'।
উৎসবে আসা উদ্দেশ্যহীন ভিড় থেকে আর্য মোহন নিজেকে আলাদা রাখলেও পুরো বিষয়টি নিয়ে তিনি বেশ ইতিবাচক। তিনি বলেন, 'এই উৎসবগুলো অন্তত বই নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তো তৈরি করছে। এই হাজারো মানুষের মধ্য থেকে যদি গুটিকয়েক মানুষও এমন কিছু শোনে বা শেখে, যা তাঁদের সারাজীবন মনে থাকবে, তবেই এই আয়োজন সার্থক।'
উৎসবের এই চাকচিক্য আর হইহুল্লোড়ের আড়ালে হয়তো এভাবেই নিভৃতে তৈরি হচ্ছে আগামীর কিছু নতুন পাঠক।
