অলিম্পিক বয়কট ও আমেরিকার কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি
পৃথিবীতে অলিম্পিক বয়কট শুরু হয়েছিল ১৯৫৬ সালে। অস্ট্রেলিয়া সে বছরই প্রথম অলিম্পিক অনুষ্ঠানের দায়িত্ব পেয়েছিল। এটাই অলিম্পিকের ইতিহাসে প্রথম বয়কটের ঘটনা। আটটি দেশ বিভিন্ন কারণে গেমস বয়কট করে। এর মধ্যে চার দল বয়কট করে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরায়েলের সুয়েজ খাল দখলের কারণে। তিনটি দেশ বয়কট করে সোভিয়েত ইউনিয়নের হাঙ্গেরি দখলের কারণে। আরেকটি দেশ গেমসে চীনের উপস্থিতির প্রতিবাদে বয়কট করে।
১৯৫৬ সালের পর আরও ছয়বার বয়কটের ঘটনা ঘটেছে। ১৯৬৪ এবং ১৯৭৬ সালের পর বড় বয়কটের ঘটনা ঘটে ১৯৮০ সালে। সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে সৈন্য প্রেরণ করে। তারই প্রতিবাদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মস্কোতে অনুষ্ঠিতব্য গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক বয়কট করে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তখন কার্টার। সোভিয়েত ভিন্নমতাবলম্বী আন্দ্রে শাখারভ প্রথম অলিম্পিক বয়কটের ডাক দিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী আলাদাভাবে আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের সময় সীমা নির্ধারণ করে দেন। এর মধ্যে সোভিয়েত আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার না করলে তারা মস্কোর অলিম্পিক বয়কট করবে। বয়কটের এই ডাকে সাড়া দিয়ে পৃথিবীর অনেক দেশ মস্কো অলিম্পিক বর্জন করেছিল।
যে আফগানিস্তানে সোভিয়েত সৈন্য প্রেরণ কেন্দ্র করে অলিম্পিক বর্জনের ঘটনা ঘটেছিল সেই আফগানিস্তানের সামগ্রিক রাজনীতির পরিণতি কোথায় পৌঁছেছে তা আজকের বিশ্ব দেখছে। ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত দখলদারিত্বের বিপক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সহয়তায় রাশিয়ার বিরুদ্ধে আফগানদের নিয়ে মুজাহিদীন বাহিনী সৃষ্টির মাধ্যমে সোভিয়েত বিতাড়নের লড়াই শুরু হয়। মুজাহীদদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেয় মার্কিন শক্তি। এই লড়াইয়ে সোভিয়েত বাহিনীর পরাজয় ঘটেছিল প্রায় দশ বছর পরে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৮৮ সালের মে মাস থেকে শুরু করে ১৯৮৯ সালের মধ্যে সব সৈন্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিল।
এর পরের ইতিহাস আমরা জানি। সোভিয়েত রাশিয়ার আফগান ত্যাগের পর আমেরিকাও আফগানিস্তান ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু যে আফগানিস্তান তারা ফেলে গেছে সেখানে এখন সাম্প্রদায়িক শক্তি ভালোভাবেই জেঁকে বসেছে। মার্কিন বৈদেশিক সমর নীতির কারণেই আফগানিস্তানে আজ সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায় আসতে পেরেছে।
মার্কিনিরা পৃথিবীর মানুষকে মানবতার কথা বললেও তার নিজ দেশে মানবতা কতটুকু রক্ষা হচ্ছে সে প্রশ্ন সমস্ত বিশ্বের কাছেই এখন সুস্পষ্ট। বর্ণবাদের আঘাত এখনো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে স্পষ্ট ও বর্তমান। এখন এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ আরো কয়েকটি দেশ বেইজিংয়ের শীতকালীন অলিম্পিক বয়কটের ভিন্নধর্মী ডাক দিয়েছে।
বেইজিংয়ে চলা বর্তমান অলিম্পিকে তারা খেলোয়াড় পাঠালেও আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের দেশের কর্মকর্তাদের সেখানে প্রেরণ করা হয়নি। কারণ হিসেবে তারা দেখিয়েছে সেই পুরনো গল্প; মানবাধিকারের প্রশ্ন, জিনজিয়াংয়ে উইঘুর মুসলিমদের বিরুদ্ধে চীনা অবস্থান। পুরোনো এই মানবাধিকারের গল্প আবার সামনে নিয়ে এসেছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন দেশ।
তবে এবারকার বয়কট একটু ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। এবার তারা সরাসরি পুরো অনুষ্ঠান বয়কট না করে কর্মকর্তা পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে কিংবা উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বয়কট করেছে। কূটনীতিকদের অনুপস্থিতির পাশাপাশি খেলার নানা দিক, নানা সাংগঠনিক যোগ্যতা ও দক্ষতার প্রশ্নও তোলা হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মানবাধিকার প্রশ্ন তোলা হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বেইজিংয়ে যে পরিমাণ বরফ থাকার কথা ছিল তা নেই। ফলে খেলা চালানোর জন্য বেইজিং কর্তৃপক্ষকে প্রচুর পরিমাণে বরফ তৈরি করতে হয়েছে।
অতীতের ইতিহাস থেকে আমরা দেখি অলিম্পিক বর্জনের ভেতর দিয়ে কেউ তেমন কোনো রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন করতে পারেনি। কেবল বিশ্বকে বিভক্ত করা ছাড়া। তবুও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জয়ের ভেতর দিয়ে বিশ্বের উপর যে কর্তৃত্ববাদের সৃষ্টি হয়েছে, তা অব্যাহত রাখতে দেশটি নানা কৌশল নিয়ে থাকে। নানা বিতর্ক সৃষ্টি করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তারা নানা বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে।
আমেরিকার তরফ থেকে সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি বাহিনী ও তার কিছু কর্মকর্তার উপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, অথচ এর থেকে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি বর্তমানে ভারতের জম্মু-কাশ্মীরে বিরাজ করছে। বিনা বিচারে বহু হত্যা সংঘটিত হচ্ছে। সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বন্ধু হিসাবে ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি তাদের চোখে ধরা পড়ছে না।
কাশ্মীরে দীর্ঘদিন ধরে ইন্টারনেট সুবিধা বন্ধ রাখা এবং কয়েক শত যুবকের নিখোঁজ হওয়া তাদের কাছে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে মনে হচ্ছে না। অতীতে গুজরাট দাঙ্গার জন্য যাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তাদের সবার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন কর্তৃত্ববাদের হাত থেকে বিশ্বকে বের হতে হলে সবার আগে তাদের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। পৃথিবীতে আমাদের মতো দেশগুলোর পক্ষে তা কতটুকু সম্ভব তা সবাইকে ভাবতে হবে।
