‘দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই চুক্তি করো’: কিউবাকে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিউবাকে 'চুক্তি করতে' আহ্বান জানিয়ে সতর্ক করেছেন যে তা না হলে এর পরিণতি ভোগ করতে হবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ভেনেজুয়েলা থেকে কিউবায় তেল ও অর্থের প্রবাহ এখন বন্ধ হয়ে যাবে। খবর বিবিসির।
৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে চালানো এক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী দেশটির নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর থেকেই ট্রাম্প কিউবার দিকে বিশেষভাবে নজর দিচ্ছেন।
কিউবার দীর্ঘদিনের মিত্র দেশ ভেনেজুয়েলা প্রতিদিন দ্বীপ দেশটিতে প্রায় ৩৫ হাজার ব্যারেল তেল দেশটিতে পাঠায় বলে ধারণা করা হয়।
এ বিষয়ে কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, 'হস্তক্ষেপ ছাড়াই জ্বালানি আমদানি করার অধিকার আমাদের রয়েছে'। একই সঙ্গে দেশটির প্রেসিডেন্ট বলেন, 'আমরা কী করব, তা কেউ আমাদের বলার অধিকার রাখে না'।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ভেনেজুয়েলার তেলবাহী জাহাজগুলো জব্দ করার মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া কৌশলটি কিউবার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটকে ইতোমধ্যে আরও তীব্র করতে শুরু করেছে।
গত শুক্রবার ট্রাম্প প্রশাসন পঞ্চম তেলবাহী ট্যাংকারটি জব্দ করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, জাহাজটি ভেনেজুয়েলা থেকে নিষেধাজ্ঞাভুক্ত তেল বহন করছিল।
রোববার ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, 'কিউবা বহু বছর ধরে ভেনেজুয়েলার বিপুল পরিমাণ তেল এবং অর্থের ওপর ভর করে টিকে ছিল। বিনিময়ে কিউবা ভেনেজুয়েলার শেষ দুই স্বৈরশাসককে 'নিরাপত্তা পরিষেবা' প্রদান করত, কিন্তু এখন আর তা হবে না!'
ট্রাম্প বলেন, 'কিউবায় আর কোনো তেল বা অর্থ যাবে না—একদম শূন্য! আমি তাদের জোরালো পরামর্শ দিচ্ছি যেন অনেক দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই তারা একটি চুক্তিতে আসেন।'
তবে সেই চুক্তির শর্ত কী হতে পারে বা কিউবা কী ধরনের পরিণতির মুখে পড়তে পারে—সে বিষয়ে কিছু স্পষ্ট করেননি ট্রাম্প।
এদিকে কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ বলেন, এই ক্যারিবীয় দ্বীপ রাষ্ট্রটির যে কোনো আগ্রহী রপ্তানিকারকের কাছ থেকে 'হস্তক্ষেপ বা যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থার অধীনতা ছাড়াই' জ্বালানি আমদানি করার 'সম্পূর্ণ অধিকার' রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো কিউবা অন্য রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে 'ব্ল্যাকমেইল বা সামরিক চাপের' কাছে নতি স্বীকার করে না।
ট্রাম্প একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করতে চালানো অভিযানের কথাও উল্লেখ করেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের বিরুদ্ধে মাদক পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে।
কিউবা বহু বছর ধরে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব পালন করে আসছে। কিউবার সরকার জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে চালানো যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে দেশটির ৩২ জন নাগরিক নিহত হয়েছেন।
ট্রাম্প বলেন, 'গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় সেই কিউবানদের অধিকাংশ এখন মৃত, এবং ভেনেজুয়েলার আর সেই সব ঠগ ও চাঁদাবাজদের থেকে সুরক্ষার প্রয়োজন নেই, যারা তাদের বহু বছর ধরে জিম্মি করে রেখেছিল।'
তিনি বলেন, 'ভেনেজুয়েলার পাশে এখন যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে—যা বিশ্বের (এখন পর্যন্ত) সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী—তাদের রক্ষা করার জন্য, এবং আমরা অবশ্যই তাদের রক্ষা করব।'
এদিকে রদ্রিগেজ বলেন, কিউবা কোনো দেশকে যে নিরাপত্তা সেবা দিয়েছে, তার বিনিময়ে তারা 'কখনোই কোনো আর্থিক বা বস্তুগত ক্ষতিপূরণ পায়নি'।
ট্রাম্প প্রশাসন কিউবা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনার কথা জানায়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এর আগে বলেছেন, দেশটি 'পতনের দ্বারপ্রান্তে' থাকায় সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইঙ্গিত দেন, কিউবার নেতাদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। তিনি বলেন, তিনি যদি কিউবা সরকারের কেউ হতেন তবে তিনি 'উদ্বিগ্ন' হতেন এবং 'তাঁরা এখন বিরাট বিপদে আছেন'।
রোববার ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট পুনরায় শেয়ার করেন, যেখানে ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে কিউবান–আমেরিকান ও ফ্লোরিডার সাবেক সিনেটর, কিউবান নির্বাসিতদের সন্তান মার্কো রুবিও ভবিষ্যতে কিউবার প্রেসিডেন্ট হতে পারেন।
ওই পোস্টটি শেয়ার করে ট্রাম্প মন্তব্য করেন, 'আমার কাছে এটি চমৎকার মনে হচ্ছে!'
ট্রাম্প ক্রমেই মার্কিন নীতিকে ১৮২৩ সালের পুনরুজ্জীবিত 'মনরো ডকট্রিন'-এর আদলে সাজাচ্ছেন, যা পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিশ্রুতি দেয়—তিনি এর নতুন নাম দিয়েছেন 'ডনরো ডকট্রিন'।
গত কয়েক মাস ধরে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ক্রমেই লাতিন আমেরিকা এবং সেই সব বামপন্থী নেতাদের ওপর কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, যাদের সঙ্গে ট্রাম্পের আদর্শগত পার্থক্য রয়েছে; এবং এই মার্কিন পদক্ষেপগুলোকে মাদক পাচারের বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে যুক্তিযুক্ত করা হচ্ছে।
কারাকাসে নজিরবিহীন অভিযানের পর ট্রাম্প বলেছিলেন যে, কলম্বিয়াকে লক্ষ্য করে একটি সামরিক অভিযান চালানো 'ভালো শোনায়' এবং তিনি বারবার দেশটির প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে 'সাবধান থাকার' হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্র কলম্বিয়ার প্রথম বামপন্থী নেতা পেত্রোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং দাবি করে যে, তিনি মাদক কার্টেলগুলোকে 'বিকশিত' হওয়ার সুযোগ দিচ্ছেন।
ট্রাম্প আরও বলেন, মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক 'ঢল নামছে', যোগ করে বলেন, 'আমাদের কিছু একটা করতেই হবে'। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মাদক কার্টেল দমনে মেক্সিকোতে মার্কিন সেনা পাঠানোর প্রস্তাবও দিয়েছেন। তবে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম প্রকাশ্যে মেক্সিকোর ভূখণ্ডে কোনো মার্কিন সামরিক অভিযানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।
১৯৫৯ সালে কমিউনিস্ট ফিদেল কাস্ত্রো মার্কিন সমর্থিত একটি সরকারকে উৎখাত করার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র এবং কিউবার মধ্যে এক বৈরী সম্পর্ক বিদ্যমান।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার অধীনে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, ট্রাম্প প্রশাসন সেগুলোর অনেক পদক্ষেপই বাতিল বা উল্টে দিয়েছে।
দ্বিতীয় মেয়াদে শপথ নেওয়ার কিছুকাল পরেই ট্রাম্প কিউবাকে পুনরায় 'সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র' হিসেবে তালিকাভুক্ত করেন, যা মাত্র কয়েকদিন আগেই তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তুলে নিয়েছিলেন।
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল রোববার বলেন, 'যারা মানবজীবনসহ সবকিছুকে ব্যবসায় পরিণত করে, তাদের কিউবার বিরুদ্ধে কোনো বিষয়ে—একেবারেই কোনো বিষয়ে—আঙুল তোলার নৈতিক অধিকার নেই।'
তিনি আরও বলেন, 'যারা আজ হিস্টিরিয়াগ্রস্ত হয়ে আমাদের দেশের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছে, তারা আসলে এই জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থা বেছে নেওয়ার সার্বভৌম সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ বলেই এমনটা করছে।'
