পরিবেশবান্ধব জ্বালানি: দুই বিলিয়নিয়ার আম্বানি ও আদানির টার্গেট এক
মুকেশ আম্বানির প্রতিদ্বন্দ্বীরা এবার একটু দম ফেলার সুযোগ পাবেন। তবে সেই সুযোগও সম্ভবত সীমিতই থাকবে। পেট্রোরাসায়নিক জ্বালানি সম্রাট আম্বানি সম্প্রতি পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও শক্তিখাতে ৭৫ হাজার কোটি রুপি (১০ বিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন। আগামী তিন বছরের এই বিনিয়োগকে জীবনের "সবথেকে চ্যালেঞ্জিং" সিদ্ধান্ত গ্রহণ বলে অংশীদারদের কাছে মন্তব্য করেছেন আম্বানি।
ভারতের সবথেকে ক্ষমতাধর ব্যবসায়ীর সামনে এই বিনিয়োগের পরিমাণ খুব বড় কিছু বলে মনে হবে না। বিশেষ করে, মহামারির সময় যখন তার মূলধন সংগ্রহের পরিমাণ ৪৪ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে, ১৮০ বিলিয়ন ডলারের রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যালেন্স শিটও নিট ঋণ মুক্ত করা হয়েছে।
ভারতের কয়লা-জ্বালানি নির্ভর অর্থনীতিতে বিভিন্ন জ্বালানি উৎস নিয়ে পরিবর্তনমূলক ভাবনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়েই আছে। তবে, আম্বানির নতুন এই উদ্যোগ তার ফোরজি টেলিকম বিনিয়োগের মতোই আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে।
ফোরজি বিনিয়োগের সময় সমালোচকরা মন্তব্য করেছিলেন যে, আম্বানির এই সিদ্ধান্ত অতিরিক্ত উৎসুকতা ছাড়া কিছু নয়। তা না হলে, ইতোমধ্যে যে খাতে ডজনখানেক প্রতিদ্বন্দ্বী আছে, সেখানে আসার অর্থ নেই। কিন্তু, মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে প্রযুক্তিখাতে আম্বানির এই উদ্যোগ ৪২ কোটির বেশি গ্রাহক সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়।
ব্যাংক দেউলিয়ার শিকার বহু অপারেটরকে পথে বসিয়ে আম্বানি খুব শিগগিরই গুগলের আলফাবেট ইনকর্পোরেটেডের সাথে মিলিতভাবে বিশ্বের অন্যতম সস্তা স্মার্টফোন বাজারে আনতে চলেছেন।
সৌরবিদ্যুৎ জ্বালানির ক্ষেত্রেও আম্বানি যদি একইভাবে আগ্রাসী হয়ে উঠেন, তবে কৌশল অবলম্বনে অন্যান্য উচ্চাকাঙ্খী প্রতিদ্বন্দ্বীদের পুনর্বিবেচনার পথ খুঁজতে হবে।
প্রতিদ্বন্দ্বীদের এই তালিকায় আছে ফ্রান্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠান টোটাল-এনার্জিস এসই'র নাম। ভারতের আরেক ধনকুবের গৌতম আদানির আদানি গ্রিন এনার্জি লিমিটেডের ২০ শতাংশের অংশীদার টোটাল-এনার্জিস। আদানির ২৫ গিগাওয়াট সৌরশক্তি উৎপাদনের বিভিন্ন প্রকল্পে সরাসরি বিনিয়োগ করেছে ফ্রান্সের এই প্রতিষ্ঠান। তিন বছরে ৫০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে এই উদ্যোগ।
আম্বানির পেছনে চলতি বছরের শুরুতে এশিয়ার দ্বিতীয় ধনী ব্যক্তির স্থান দখল করেন গৌতম আদানি। তার লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের বৃহত্তম নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনকারীতে পরিণত হওয়া।
আম্বানি কি গৌতম আদানির লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথে এসে দাঁড়াচ্ছেন? প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিজের রাজ্য গুজরাটের এই দুই ব্যবসায়ী এখন পর্যন্ত পৃথক খাতে ব্যবসায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করে এসেছেন। তথ্য-নির্ভর ভোক্তা খাত যেমন রিটেইলে এবং টেলিকম নিয়ে ব্যস্ত আছেন আম্বানি। অন্যদিকে, আদানির মনোযোগ অবকাঠামো এবং ইউটিলিটি খাতে। তবে, এবার সম্ভবত নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে মুখোমুখি হতে চলেছেন দুজনেই।
আম্বানির প্রাথমিক পরিকল্পনা পুরোপুরি কর্তৃত্বপূর্ণ নয়। তিনি ২০৩০ সাল নাগাদ মোদির ৪৫০ গিগাওয়াট পরিবেশবান্ধব জ্বালানি শক্তির লক্ষ্যপূরণে কেবল ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করতে চান। কেননা, সম্ভবত নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত তেমন সমর্থন পায়নি।
গত এক দশকে ৯০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পর রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ জানিয়েছে যে, আগামী ১০ বছরে তাদের আরও ২০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের "অনুঘটক হওয়ার সক্ষমতা" আছে।
পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ছাড়াও নতুন করে গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান থেকে শুরু করে হোয়াটসঅ্যাপে ই-কমার্সের মতো আরও বহু ব্যবসায় বিনিয়োগ করছে ভারতের এই বৃহত্তম ব্যবসায়ী এন্টারপ্রাইজ। এছাড়া, তাদের সম্পদের পরিমাণও অগাধ। সেইসাথে আছে, গুগল এবং ফেসবুল ইঙ্কের মতো প্রভাবশালী সব বন্ধু।
সৌদি আরাবিয়ান অয়েল কোম্পানির প্রধান ইয়াসির আল-রুমাইয়ান রিয়ালেন্স পর্ষদে যোগদান করতে চলেছেন। দেরীতে হলেও আরামকোকে ভারতের পশ্চিম উপকূলে রিলায়েন্সের মুনাফা বহুল তেল শোধনাগার ব্যবসার কৌশলগত সহযোগী হিসেবে পেতে এবং নিম্ন কার্বনের অয়েল-টু কেমিক্যাল (ওটুসি) সাম্রাজ্যের কেন্দ্র পুনর্দখল নিতেই রিলায়েন্সের এই সিদ্ধান্ত।
নতুন সব উদ্যোগে বিনিয়োগ করতে সাহায্য করবে রিলায়েন্সের বার্ষিক প্রাক-কর বা পরিচালন আয় (ইবিআইটিডিএ), যার পরিমাণ ১৩ বিলিয়ন ডলার। ঋণের বৈশ্বিক মূল্যায়ন ফিচ রেটিংস অনুসারে প্রতিষ্ঠানটির বৈদেশিক মুদ্রা ঋণের রেটিং বিবিবি। এই রেটিংয়ের মান ভারত সরকারের থেকে এক ধাপ বেশি।
অন্যদিকে, আদানি গ্রুপের তালিকাভুক্ত গোষ্ঠীগুলোর পরিচালন আয় (ইবিআইটিডিএ) সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। এছাড়া, সমন্বিত নিট ঋণের পরিমাণও ১৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
গত এক বছরে দারুণভাবে উত্থানের পর, অপেক্ষাকৃত ছোট এই প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার মূল্য সম্প্রতি টালমাটাল এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অস্বচ্ছ বৈদেশিক কিছু বিনিয়োগের বিষয় সামনে আসতেই বাড়তে থাকা উদ্বেগের মাঝে শেয়ারের মূল্য এখন অস্থিতিশীল।
ভারতের বন্দর, বিমানবন্দর, কয়লা খনি, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সঞ্চালন, গ্যাস সরবরাহ, মজুদাগার এবং তথ্য কেন্দ্র ঘিরে আদানির বিস্তৃত স্বপ্ন পূরণ করতে বিনিয়োগের ভূমিকা যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
একইসঙ্গে, অপেক্ষাকৃত অধিক সম্পদশালী আম্বানির ব্যবসায়িক পরিধির এই বিস্তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকছে। রিলায়েন্স ই-কমার্স খাতে আমাজন ডট কম ইঙ্ক এবং ওয়ালমার্ট ইঙ্কের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। ৩০০ মিলিয়ন ভারতীয় যারা এখন পর্যন্ত টুজি ডিভাইস ব্যবহার করেন, তাদের জন্য গুগলের সাথে কাস্টম-নির্মিত জিওফোন নেক্সটের সাথে শীঘ্রই মুখোমুখি হতে চলেছে শাওমি করপোরেশন।
অন্যদিকে, প্রযুক্তিগত পরিষেবার অপরিচিত দুনিয়াতেও হানা দিচ্ছেন আম্বানি। মুকেশ আম্বানি কেবল ভারতেই ফাইভজি প্রচলনে প্রথম হতে চান না, তার ইচ্ছা বৈশ্বিকভাবে অন্যান্য অপারেটরদের কাছেও তা বিক্রি করা। তবে, সম্ভবত সেজন্য তাকে হুয়াওয়ে টেকনোলজিসের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে।
এদিকে, আদানি এখন বাণিজ্য বিস্তারের জন্য অধৈর্য হয়ে পড়েছেন। বন্দরের সফল ব্যবসার বাইরে গিয়ে আদানি এখন বিভিন্ন খাত থেকে আয় নিশ্চিত করতে চাচ্ছেন। আর সেজন্যই তার লক্ষ্য ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের মধ্য থেকে নিশ্চিত মূলধন সংস্থান ধরে ফেলা, যাদের গড় আয় নিম্ন-মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চ-মধ্যবিত্ত আয়ের মধ্যেই অবস্থিত। কিন্তু, আম্বানির তাড়াহুড়োটা ঠিক কোথায়?
এতসব ব্যবসা সত্ত্বেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ৬৪ বছর বয়সী আম্বানির বিনিয়োগ থেকে ধারণা করা যায় যে তিনি এবার উত্তরাধিকার পরিকল্পনা নিয়ে বেশ গুরুত্বের সাথেই ভাবছেন। ছোট ভাই অনিলের সাথে পারিবারিক সম্পদের বন্টন নিয়ে মুকেশ আম্বানির অতীত অভিজ্ঞতার কারণেই সম্ভবত তিনি প্রাপ্তবয়স্ক তিন সন্তানের প্রত্যেকের জন্য রিলায়েন্সের মূলধন সুবিধা থেকে নিজে থেকে টিকে থাকা বৃহৎ ব্যবসা গড়ে তোলার প্রয়োজন বোধ করছেন।
আর এ কারণেই আশা করা যায় যে, সৌর প্যানেল, ব্যাটারি, সবুজ হাইড্রোজেন ও জ্বালানি সেল প্রতিটির জন্য চলতি সপ্তাহে আম্বানির চার গিগা ফ্যাক্টরির ঘোষণা কেবলমাত্র এক নতুন যাত্রার সূত্রপাত। তবে, ছোট এই ধাক্কা খুব দ্রুতই বড় সব ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
• লেখক: ব্লুমবার্গের মতামত কলাম লেখক অ্যান্ডি মুখার্জি শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং আর্থিক সেবাখাত নিয়ে বিশ্লেষণ করেন। তিনি বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ব্রেকিংভিউজেও কলাম লিখতেন।
• সূত্র: ব্লুমবার্গ থেকে অনূদিত
