বিদ্যুৎ নেই, নলকূপ পানির নিচে, নৌকা-সংকটে যেতে পারছেন না আশ্রয়কেন্দ্রে: সীমাহীন দুর্ভোগে বন্যাদুর্গত মানুষ
'গতকাল থেকে বিদ্যুৎ নেই। নলকূপ সব পানির নিচে। খাওয়ার পানির সংকট। গরু, হাঁস, মুরগি নিয়ে বিপদে মানুষ। এখানে ৯৫ শতাংশ বাড়িতে মাটির চুলায় রান্না হয়। বন্যার পানিতে সব তলিয়ে যাওয়ায় সকাল থেকে গ্যাসের সিলিন্ডার আর স্টোভের চুলার দাম তুঙ্গে। বলতে গেলে দুটোর কোনোটাই বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না।'
এভাবেই দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির কথা জানাচ্ছিলেন তাহিরপুর বাজার এলাকার বাসিন্দা অনন্যা মেহনাজ।
বন্যায় বিপর্যস্ত সিলেট-সুনামগঞ্জের লাখো মানুষ। বন্যার পানি ঢুকে পড়ছে বাড়িঘরে। বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন সিলেট-সুনামগঞ্জের প্রায় ২ লাখ গ্রাহক। ঘরে ঢুকে পড়া পানিতে আটকা পড়া মানুষদের উদ্ধারের জন্য সিলেট-সুনামগঞ্জে নামানো হয়েছে সেনাবাহিনী।
বন্যায় সিলেট ও সুনামগঞ্জের মানুষের সীমাহীন ভোগান্তির চিত্র উঠে আসছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে করা বিভিন্ন ব্যক্তির পোস্ট ও কমেন্টে।
তাহিরপুরের বাসিন্দা অনন্যা মেহনাজ ফেসবুকে লিখেছেন:
'টানা কারেন্ট না থাকার জন্যে এখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক ফ্ল্যাকচুয়েট করা শুরু করেছে। বিল্ডিংয়ের বাইরে বাজারসহ রাস্তা ডুবে গেছে। কিছু জায়গায় কোমর পানি। আপাতত সপ্তাহখানেকের প্রয়োজনীয় বাজার করে নিয়ে আমরা ঘরে উঠে যাচ্ছি। ৫ তলায় বাসা, কাজেই বন্যার পানি আসার ভয় নেই।'
এছাড়া বন্যায় সিলেট-সুনামগঞ্জ অঞ্চলের মানুষের দুরবস্থা নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন অর্থ বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জালাল আহমেদ। সেখানে তিনি লিখেছেন: 'সুরমা অববাহিকার সকল উপজেলায় ও সিলেট-সুনামগঞ্জ জেলা সদরে গত রাত থেকে অপ্রতিহত গতিতে পানি বেড়ে বেড়ে ঘর-বাড়ী-রাস্তা সব একাকার। মানুষ গৃহবন্দী। প্রায় সব গৃহে পানি। খাবার রান্না বন্ধ, বিদ্যুৎ নাই, পানীয় জল নাই, সব মিলিয়ে এক অসহনীয় অবস্থা। …পুরো বন্যা কবলিত অঞ্চলকে "দুর্গত এলাকা" ঘোষণা করা প্রয়োজন। উদ্ধার কাজে ও খাদ্য সরবরাহে সামরিক বাহিনীর আরও মোতায়েন প্রয়োজন হবে। সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।'
নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় সিলেট-সুনামগঞ্জের আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গেও ঠিকমতো যোগাযোগ করতে পারছেন না অনেকে। তেমনই একজন শুভ্রা কর। এক ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন:
'গতকাল রাত ৮টার পরেই উঠান পেরিয়ে আমাদের ঘরে পানি ঢুকতে শুরু করে। নিচের ছবিগুলো রাত ১০টার দিকে বাড়ি থেকে পাঠানো ভিডিও থেকে নেয়া। তখন জিনিসপত্র যতটা পারা যায় উপরে তুলে রাখা হচ্ছিলো। রাত ১১টার দিকে সর্বশেষ আলাপে জানতে পারি তারা তোশক, বালিশ, খাবার, ওষুধ এসব নিয়ে উপরে একটা অর্ধনির্মিত ঘরে চলে গেছে আপাতত রাত কাটানোর জন্য। এদিকে টয়লেট সব পানি উপচে ব্যবহার-অযোগ্য হয়ে পড়েছে এবং কারেন্ট না আসলে খাবার পানি নিয়েও চিন্তা করতে হবে স্বাভাবিক। এমতাবস্থায় "সকাল হোক এরপর দেখা যাবে"—এটুকুই ছিল বক্তব্য।
'এদিকে দিদির বাসা বাবার বাড়ি থেকে ৫০০-৬০০ মিটার দূরত্বে। দিদির সাথে শেষ কথা হয় রাত সাড়ে এগারোটার দিকে। দিদিদের বাসায়ও রাত ১১টার পর থেকে পানি ঢুকতে শুরু করে এবং তারাও তখন জিনিসপত্র উপরে তুলে কোনোরকমে খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ার প্রস্তুতিতে। "সকাল হোক এরপর দেখা যাবে"।
'দুই ক্ষেত্রেই আমার আসলে বলার তেমন কিছুই ছিল না। সকাল হোক তারপর দেখা যাবে—এটুকুই ভাবছিলাম। কিন্তু সকাল থেকে আর কোনো যোগাযোগ করাই সম্ভব হচ্ছে না। হতে পারে ফোনের নেটওয়ার্ক নেই অথবা চার্জ নেই বলে ফোন বন্ধ। জানি না…আসলে কিছুই জানি না…'
আবেদ হাসান রুদ্র ফেসবুকে লিখেছেন, 'সিলেটের পাওয়ার গ্রীড স্টেশনে আর ৪ ইঞ্চির মতো পানির লেভেল বৃদ্ধি পেলে পুরো সিলেটে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হবে। গ্রীড স্টেশন বন্ধ হওয়া মানে বুঝতে পারছেন? প্রত্যেকটা পেট্রোল পাম্প বন্ধ হয়ে যাবে। চাইলেও দুর্গত এলাকায় মানুষ ত্রাণ নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে না পরিবহণ ব্যবস্থার কারণে। নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা পুরো কলাপ্স করবে। সিলেটের সাথে অন্যান্য জেলার কোনো মানুষ যোগাযোগ করতে পারবে না। অলরেডি সুনামগঞ্জের অনেকের মোবাইলে চার্জ আছে। কিন্তু নেটওয়ার্ক না থাকার কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।'
রুদ্র আরও লিখেছেন: 'সুনামগঞ্জের মানুষদের অবস্থা বর্ণনাতীত। তারা এখন বুভুক্ষের মতো ত্রাণের জন্য অপেক্ষা করছে। অতীতের কোনো বন্যাতে যাদের বাড়িতে পানি ঢোকার রেকর্ড নাই তারাও পানির নিচে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে মানুষ কাকভেজা হয়ে, অনাহারে, অনিদ্রায় দাঁড়িয়ে আছে। এলাকার যুবসমাজ যারা মোটামুটি শ্রম দিয়ে সাহায্য করছিল, তারাও হাঁপিয়ে গেছে। ইমার্জেন্সি ক্রাইসিস রেসপন্স এগিয়ে না গেলে মানুষগুলো এমনিতেই মারা যাবে। ফসলের মায়ায় যারা গতকাল রাত পর্যন্ত পানি কমার অপেক্ষায় ছিল তারাও আজকে জীবনের মায়ায় সব ছেড়েছুড়ে নিরাপদ আশ্রয় খোঁজে বেড়াচ্ছে।'
ইমরান আহমেদ নামে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, 'সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা। এখানে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে মানুষ মরিয়া কিন্তু নৌকা সংকট। বিদ্যুৎ নেই ৪ দিন, নেটওয়ার্ক নেই, সবার ঘরে পানি, শুকনো খাবার নেই।'
মানুষ যখন নৌকা সংকটে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে পারছে না, এই পরিস্থিতিতে তাদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন অনেক ট্যুরিস্ট বোট হাউসের মালিক। ট্যুরিস্ট বোটগুলো এখন সেখানকার স্থানীয় জনগণের থাকার আবাসন হিসেবে ব্যবহার করছেন বেশিরভাগ ট্যুরিস্ট বোটের মালিকেরা।
মেহেদী হাসান মাহী ফেসবুকে লিখেছেন: 'সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ায় ট্যুরিস্ট বোটগুলো এখন সেখানকার স্থানীয় জনগণের থাকার আবাসন হিসেবে ব্যবহার করছে প্রায় বেশিরভাগ ট্যুরিস্ট বোটের মালিকেরা। …থাকার সমস্যার আপাত সমাধান হলেও রয়েছে এতগুলো মানুষের খাবারের সংকট।'
