ময়ূরের ‘কুৎসিত’ রূপ: বিপর্যস্ত জনজীবন
সৌন্দর্যের কারণে দুনিয়াজুড়ে যে পাখির সুনাম, সেই পাখির কুৎসিত দিকের দেখা পাচ্ছে নিউজিল্যান্ড। দেশটির খামারগুলোতে তাণ্ডবলীলা চালাচ্ছে ময়ূর। খেয়ে ফেলছে ফসল, কৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা এবং জমির মালিকদের করে তুলছে ক্ষুব্ধ।
'প্রদর্শনী থেকে পাখিদের রেহাই দেওয়া'র ডাক নিউজিল্যান্ড বার্ডস অনলাইন নামে একটি সংস্থা ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে দেশটিতে এই বর্ণিল পাখির শুধু প্রাকৃতিক পরিবেশেই দেখা মিলছে।
রগচটা ও বুনো আচরণের জন্য খ্যাত ময়ূর দেশটির নর্থ আইল্যান্ড অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে অর্নিথোলজিক্যাল সোসাইটি অব নিউজিল্যান্ড। ক্রাইস্টচার্চ ও ডুনেডিন অঞ্চলের মতো দক্ষিণাঞ্চলেও ব্যাপকসংখ্যক ময়ূর রয়েছে।
এই 'জেট ফাইটার' পাখি অবিরত ওড়ালের রেকর্ড গড়ে ফেলেছে!
তবে অপোসাম (বৃক্ষবাসী স্তন্যপায়ী প্রাণীবিশেষ), ফেরেট, বেজি ও ইঁদুরের মতো যে প্রাণীগুলো প্রাকৃতিকভাবে ময়ূর শিকারী বলে খ্যাত, দেশজুড়ে সেগুলোর বিস্তার সুনিয়ন্ত্রিত রাখার ফলে 'নির্ভয়' এই পাখি দিনে দিনে আরও বেশি ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠছে।
ময়ূরের জন্য অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভোজের ব্যবস্থা রাখছেন স্থানীয় অনেক কৃষক; তারা এ পাখির পছন্দের খাদ্যশস্য ভুট্টা, গম ও ক্লোভার চাষ করছেন জমিনে।
নিউজিল্যান্ডে দেশীয় পণ্য থেকে আয়ের প্রায় ৫ শতাংশ আসে কৃষিখাত থেকে।
'যখন চারপাশে প্রচুর ময়ূর শিকারী প্রাণী ছিল, তখন এই পাখিরা কোনো ঝামেলার কারণ হয়ে ওঠেনি। কিন্তু এখন বলতে গেলে সে রকম কোনো প্রাণীই নেই; তাছাড়া ময়ূরের জন্য খাবারও রয়েছে প্রচুর,' বলেন নর্দার্ন আইল্যান্ড অঞ্চলের ফেডারেটেড ফারমার্সের মুখপাত্র ও ওয়াঙ্গানুই শহরের কৃষক গ্র্যান্ট অ্যাডকিন্স।
'ওরা রাই শস্যের ঘাস ও ক্লোভার খেতে ভালোবাসে। চারপাশে মনের সুখে ঘুরে বেড়ায় আর আমাদের চারণভূমির টাটকা সব সবুজ ঘাস ও ফসল সাবাড় করে দেয়।'
অ্যাডকিন্সের ধারণা, তার অঞ্চলে কয়েক হাজার ময়ূর রয়েছে। তার অনুযোগ, এই পাখির সংখ্যাবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কোনো আগ্রহ নেই; তারা বরং অপোসাম ও ইঁদুর নিয়ন্ত্রণেই মনোযোগী।
নিউজিল্যান্ড বার্ড অনলাইনের তথ্যমতে, ২০১১ সালের এপ্রিলে ওরেরে পয়েন্ট অঞ্চলের এক মাঠে একসঙ্গে শতাধিক ময়ূর দেখা গেছে। অন্যদিকে, ২০১৬ সালের জুনে হক'স বে অঞ্চলের ওতানেতে দেখা মিলেছে আরও শতাধিক ময়ূরের।
'গুলি করে' এই পাখির সংখ্যা বৃদ্ধি সামলানোর চেষ্টা করেছিলেন কৃষকেরা, তবে সে কর্মও সহজ নয়; কেননা, ময়ূর খুবই চতুর এবং 'মারাত্মক সংখ্যাবৃদ্ধির ব্যাপারে খুবই সচেতন' পাখি!
ময়ূরকে কাজে লাগানোর কোনো বৈধ অনুমোদন দেশটিতে নেই। তাছাড়া, কৃষকরা একবার গুলি চালালে ওরা দ্রুতই দূরত্ব বজায় রাখার কৌশল শিখে নেয়।
'১২ বছরেরও বেশিকাল ধরে ওদের সংখ্যা দিন দিন হু-হু করে বাড়ছে এবং ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র,' বলেন অ্যাডকিন্স। 'এ অঞ্চলে রয়েছে হাজারও (ময়ূর)। আমার প্রতিবেশীদের সমভূমিগুলোতে একেক দলে দেড় শতাধিক ময়ূরের দেখা পাই। ওরা দলবেঁধে সব ঘাস সাবাড় করে ফেলে। যে পরিমাণ ঘাস ওরা খায়, আমাদের গবাধি পশুদের খাওয়ার মতো কিছুই থাকে না।'
'ঝাঁক বেঁধে দৌড়-ঝাঁপ'
পাখিবিশারদ টনি বুচ্যাম্প জানান, বুনো ময়ূর সারা পৃথিবীতেই বিরল। এ ধরনের পাখি সাধারণত ভারতীয় উপমহাদেশেই বাস করে।
নিউজিল্যান্ডে ময়ূর সম্পর্কে মানুষের ধারণা কম। কেননা, এই পাখি বনাঞ্চলে এবং দেশটির নির্জন অঞ্চলগুলোতে থাকে। তাছাড়া, সরকার এ পাখির স্থানীয় প্রজাতিগুলোকে রক্ষার ব্যাপারে আন্তরিকভাবে মনোযোগী।
''নিউজিল্যান্ডের বেশির ভাগ মানুষেরই 'বিদেশি' পাখি নিয়ে মাথাব্যথা নেই, আর এটিই এ দেশের বিশেষত্ব,' বলেন বুচ্যাম্প।
''আমার ধারণা, আমাদের খামার ব্যবস্থাপনা চর্চার অনেকটুকুই 'বিদেশি' পাখিদের সংখ্যা বৃদ্ধিকে উৎসাহ যোগায়। নর্থল্যান্ডে কৃষকরা ভুট্টা চাষ করেন। অথচ ভুট্টা এ পাখিদের বেশ আকৃষ্ট করে। ওরা এ শস্য খেতে ভালোবাসে খুব।''
বুচ্যাম্প জানান, মাত্র ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে দেশি পাখি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন পাখিবিশারদরা। তার মানে, পাখি সম্পর্কে এ দেশের মানুষের ধারণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আর, 'বিদেশি' পাখি নিয়ে গবেষণা এখনো অধরাই রয়ে গেছে।
'ময়ূরকে যথেষ্ট ভালোভাবে বুঝতে পারা সম্ভব কি না, আমি নিশ্চিত নই,' বলেন বুচ্যাম্প।
২০৫০ সালের মধ্যে ইঁদুর, বেজি ও অপোসামের মতো আক্রমণাত্মক প্রাণীগুলোকে সম্পূর্ণ নির্মূলের ব্যাপারে নিউজিল্যান্ড সরকার প্রতীজ্ঞাবদ্ধ। ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে ওপসামের পশম মূল্যবান হিসেবে গণ্য হওয়ায় দেশটিতে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রজাতির প্রাণী ফাঁদ পেতে ধরা দিন-দিন একটি মূলধারার শখে পরিণত হয়েছে।
কিন্তু অপোসামের সংখ্যা ক্রমাগত কমতে থাকায় ময়ূরের সংখ্যা এভাবে বাড়ছে বলে অভিমত অ্যাডকিন্সের। ময়ূর বাসা বাঁধে জমিনে; আর অপোসাম, ফেরেট, বেজি ও ইঁদুর হরদম ময়ূরের ডিম খেয়ে ফেলে।
'ওরা (ময়ূর) যথেষ্ট স্মার্ট। যখনই একটা চলতে শুরু করে, বাকিগুলোও দল বেঁধে পিছু পিছু ছুট দেয়,' বলেন অ্যাডকিন্স।
'যখনই ওরা বুঝে যায়, গুলি করা হবে, তখন আপনি চাইলেও ২০০ থেকে ৩০০ মিটারের মধ্যে ওদের নাগাল পাবেন না!'
এই পাখি যে 'চূড়ান্ত রকমের সাবধানী,' এ ব্যাপারে বুচ্যাম্পও একমত। 'বিপদ টের পেলে সেখান থেকে ৫০০ মিটারের দূরত্ব বজায় রাখে ওরা।'
হরাইজন রিজিওনাল কাউন্সিলের বায়োডাইভারসিটি, বায়োসিকিউরিটি অ্যান্ড পার্টনারশিপস ম্যানেজার রড স্মাইলি জানান, ওই অঞ্চলে বুনো ময়ূরের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে তিনি 'উদ্বিগ্ন'।
'তৃণভূমি ও ফসলের ক্ষতি করে ময়ূর,' এ অভিমতের পাশাপাশি স্মাইলি আরও জানান, তবু কাউন্সিলের পেস্ট ম্যানেজমেন্ট পরিকল্পনায় এ প্রাণীকে অন্তর্ভুক্ত করেননি তারা। ২০১৭ সালে ওই পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করা হবে।
স্থানীয় এক প্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের মুখপাত্র জানিয়েছেন, ময়ূর 'সংরক্ষণ কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।'
সাউথ আইল্যান্ডে ঘের দিয়ে বিশেষ 'আবাসস্থলে' বেশ কিছু ময়ূরকে আলাদা করে রাখা হয়েছে বলে জানা গেলেও অ্যাডকিন্স উদ্বেগ প্রকাশ করেন, ঠিকঠাক খোঁজ রাখা না হলে এই পাখি সারা দেশে বেপরোয়াভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ: রুদ্র আরিফ
