রুমকির শিক্ষক হবার স্বপ্ন পূরণ হবে তো?
মহানগরীর পাঠানপাড়ার বাড়িতে নিজের ঘরের বিছানায় বসে ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’ বইটির পাতা উল্টাচ্ছেন একটি মেয়ে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে পড়েন তিনি। পুরো নাম রাজিয়া সুলতানা রুমকি। অদম্য মনোবলের এ মেয়েটি স্বপ্ন দেখেন, লেখাপড়া শেষ করে শিক্ষক হবেন তিনি।
কিন্তু সে পথে বাধাও যে অনেক। শারীরিকভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষ হওয়াটা তার কাছে কোনো বিষয় নয়। চলাফেরার জন্য তার মায়ের কোল আর হুইলচেয়ারই হল ভরসা। সেভাবেই তিনি পড়াশুনা চালিয়ে এসেছেন এ যাবত।
সমস্যা তৈরি করছে তার পরিবারের আর্থিক টানাপড়েন। যেটি নিয়ে রুমকির মা-বাবাও চিন্তিত এখন।
১৯৯৯ সালের ২৫ নভেম্বর জন্ম নেওয়া মেয়েটির দেহে একদম শৈশবেই কোমরের নিচের অংশটুকু প্যারালাইজড হয়ে যায়।
পাঁচ-ছ’ বছর বয়সে স্কুলজীবন শুরু হয়েছিল রুমকির। কিন্তু শারীরিক সমস্যার কারণে পঞ্চম শ্রেণির পর দু’বছর বন্ধ ছিল তার স্কুলে যাওয়া। সারাক্ষণ ঘরে দমবন্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি চাইতে রুমকি এই শারীরিক অক্ষমতা নিয়েই লেখাপড়া শুরু করলেন।
তারপর লেখাপড়া যে কেবল চালিয়ে গিয়েছেন তা নয়, ভালো ফলাফলও করেছেন। ২০১৬ সালে এসএসসি ও ২০১৮ সালে এইচএসসি পাশ করে ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর এখন স্বপ্ন দেখেন, লেখাপড়া শেষ করে শিক্ষকতা করার।
রুমকির বাবা পিকআপ চালান। দুটি সন্তানের মধ্যে রুমকিই বড়। আর মা নাজনীন বেগম রয়েছেন মেয়ের পাশে পাশে। বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েকে কোলে করে নিয়ে যান কখনও কখনও। আবার হুইল চেয়ারে করেও যান রুমকি।
এমনিতে রোজ ১০০ টাকা লাগে রুমকির বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতের খরচ। এটা দেওয়াও ওর পরিবারের জন্য কঠিন বলে রুমকি মাঝে মাঝেই ক্লাস বাদ দেন।
রুমকি বললেন, “যেদিন একটা কিংবা দুটো ক্লাস থাকে সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া হয় না। রোজ ১০০টাকা খরচ করা আমার বাবার পক্ষে সম্ভব না। তাই ইচ্ছা থাকলেও প্রতিদিন ক্লাসে যাই না। ’’
এমনকি যেদিন সকাল ন’টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ক্লাস থাকে, সেদিন দুপুরবেলায় না খেয়েই থাকেন মা-মেয়ে।
রুমকিকে বহনকারী হুইল চেয়ারটারও নড়বড়ে অবস্থা। নতুন আরেকটি কেনা তার কাছে এখন স্বপ্ন মাত্র।
ওদিকে, শেষ কবে চিকিৎসক দেখিয়েছেন রুমকি সেটাও মনে নেই তার। পরিবারের জমানো টাকার পুরোটাই শেষ হয়ে গেছে মেয়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে নাজনীন বেগমই রুমকিকে কোলে করে তোলেন ওপরে। প্রতিদিন এভাবে সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করতে কষ্ট হয় তার। সে কথা জানিয়ে বললেন, “রুমকির বাবা ছোট একটা পিক-আপ চালায়। পরিবারেরে আয় বলতে তার ওই উপার্জনটুকুই।’’
বিশ্ববিদ্যালয়ে দুবার বৃত্তির আবেদন করেছেন রুমকি। এখনও পাননি। আর্থিক সহযোগিতা বলতে কেবল সমাজসেবা অধিদফতর থেকে তিন মাস অন্তর পাওয়া দু’হাজার ১০০ টাকা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক পিএম সফিকুল ইসলাম রুমকির বিষয়ে বললেন, ‘‘বিভাগের শিক্ষকরা ওর ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিক। ও যেন কখনও মনোবল না হারায়, সেজন্য শিক্ষকরা তাকে উৎসাহ দেন।”
মানুষ গড়ার কারিগর হতে চান যে মেয়েটি, আর্থিক অস্ব্চ্ছলতা তার লক্ষ্যে পৌঁছুনোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না তো?
