ভ্যাকসিন নিয়ে অতি-সতর্কতা ঝুঁকিপূর্ণ, ইউরোপের ভুল থেকে যা শিক্ষণীয়

জনমনে সংশয় দূর করতে গত শুক্রবার অ্যাস্ট্রাজেনেকার আবিষ্কৃত কোভিড-১৯ টিকা নেন যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রীদ্বয়। কিন্তু ডেনমার্ক, নরওয়ে এবং সুইডেনে তেমনটি দেখা যায়নি। এখনও এসব দেশের জাতীয় টিকাদানে স্থগিত রয়েছে প্রতিষেধকটির প্রয়োগ। ইইউভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে এমন বিভাজন নিঃসন্দেহে বিভ্রান্তিকর। সেই পরিস্থিতির আরও অবনতি করেছে ফ্রান্সের ঘোষণা। দেশটি কেবলমাত্র ৫৫ বছর ঊর্দ্ধ নাগরিকদের ক্ষেত্রে টিকাটি প্রযোজ্য হবে বলে জানিয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক সকল জনগোষ্ঠীর মধ্যে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা প্রয়োগের অনুমতি দিলেও, দুই সপ্তাহ আগে শুধুমাত্র ৬৫ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে টিকাটি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল ফ্রান্স ও জার্মানি। ফ্রান্সের সাম্প্রতিক ঘোষণা তাই ভ্যাকসিন সংশয়বাদীদের প্রচারকে শক্তিশালী করে।
ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য বাদে- রক্ত জমাট বাঁধার আশঙ্কায় অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকাদান বন্ধ রেখেছে ইউরোপের অধিকাংশ দেশ। মহামারির তৃতীয় ঢেউ যখন ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হেনেছে, তার মধ্যেই হয়েছে এসব ঘটনা। স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্বেগের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদন চাওয়ার সুযোগও কমেছে অ্যাস্ট্রাজেনেকার সামনে।
সরল কথায়, এই ভ্যাকসিনটির বিতর্কে বিভাজিত হয়েছে বিশ্ব। বিভেদের এই দেওয়াল নিয়ামক সংস্থার নৈতিকতা নিয়েও ব্যতিক্রমী কিছু প্রশ্ন সামনে আনে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো কোনো প্রতিষেধকের ঝুঁকি ও লাভের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে যে নীতি মেনে চলে- তার মারাত্মক কিছু ত্রুটি উঠে এসেছে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে। এমনটা হওয়াই বরং স্বাভাবিক ছিল, কারণ এবারই প্রথম একটি রোগ প্রতিরোধে একাধিক সংস্থার আবিষ্কৃত ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে। ইউরোপের ভুল থেকে পাওয়া শিক্ষা- তাই বাকি বিশ্বের জন্যেও প্রযোজ্য।
একটু পেছন ফিরে তাকালে দেখা যাবে, বর্তমানে যে নীতিমালার আলোকে অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন অধিকাংশ ইইউভুক্ত দেশ স্থগিত রেখেছে তার জন্ম ১৯৭০ এর দশকে। ওই সময়ে ইউরোপীয় দেশসমূহের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা শক্তিশালী রুপ নিতে থাকে এবং তার আওতায় ঘোষিত হয় নতুন মানদণ্ডের সতর্ক বিধি। সেখানে বলা হয়, "কোনো সিদ্ধান্ত বা নীতির আলোকে যদি পরিবেশ বা নাগরিকদের জন্য ক্ষতি হচ্ছে এমন সন্দেহ দেখা দেয় এবং তা প্রমাণ করার পক্ষে যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক তথ্যাদি না থাকে- তাহলে বিষয়টি আদৌ ক্ষতিকর নয় কিনা- তা প্রমাণের দায়ভার সিদ্ধান্ত নেওয়া কর্তৃপক্ষের উপরই বর্তাবে।"
মৌলিক নীতিটি শুনতে চমৎকার মনে হয়। আসলে এর সাহায্যেই পরিবেশ দূষণমুক্ত জ্বালানি ব্যবহার কমিয়ে সরকারি অর্থায়নে সুবিশাল পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করতে পেরেছিল ফ্রান্স ও জার্মানি। চিকিৎসকরা যেমন প্রথমেই রোগীর কোনো প্রকার ক্ষতি না করার শপথ নেন- তারই প্রতিধ্বনি করে যেন এটি।
বর্তমানের সঙ্গে তার যোগসূত্র এই যে, অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকায় ক্ষতি হওয়ায় প্রমাণ না মিললেও- ক্ষতির ঝুঁকি আছে জেনে এর টিকাদান চালিয়ে গেলে তার দায়ভার সরকারের কাঁধেই বর্তাবে। তৈরি হবে অদূর ভবিশ্যতে বিশাল অংকের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মতো পরিস্থিতি।
তাইতো, ৫৫ বছরের এক নারী অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন নেওয়ার পর রক্ত জমাট বেঁধে মারা যাওয়ার পরপরই তড়িঘড়ি করে স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয় একের পর এক ইউরোপিয় রাষ্ট্র। আলোচিত সেই সতর্কতা বিধি অনুসারে বৈজ্ঞানিক নিরীক্ষার ফল আসা পর্যন্ত টিকাদান স্থগিত রেখে অপেক্ষা করাটা ন্যায়সঙ্গত। কারণ, তাতেই জানা যাবে রক্ত জমাট বাঁধার সঙ্গে আসলেই ভ্যাকসিনের সংযোগ আছে কিনা।
তবে নৈতিকতা কী কালোত্তীর্ণ? বরং, বর্তমান সময়ের আলোকে তার বিচার হওয়া উচিৎ ছিল; টিকাগ্রহণের সম্ভাব্য ঝুঁকি ও লাভ তুলনা করে। মহামারির প্রকোপের মধ্যে অপ্রমাণিত সন্দেহে টিকাদান বাতিল করাটা এই মুহূর্তে হয়তো অত্যাবশ্যক ছিল না। আমাদের জীবনকালের সবচেয়ে বড় এই সঙ্কটের মুহূর্তে টিকা নেওয়ার লাভটাই সবচেয়ে বেশি। অধিকাংশ ইউরোপিয় দেশ সেকথা ভুলে গেছে সহজেই। তাদের দেরির সিদ্ধান্তে প্রতিনিয়ত নিয়ন্ত্রণহীন ভাবে বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছে জীবাণু। বাড়ছে নতুন সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার। সার্বিক জনসংখ্যার মধ্যে রোগ প্রতিরোধ গড়ে তোলার উদ্যোগও হয়েছে বিলম্বিত।
পেনশন ফান্ডের টাকা শেয়ারে বা বন্ডে বিনিয়োগ না করে, লোকসানের ভয়ে বিছানার তোশকের নিচে জমিয়ে রাখার মতোই বোকামি- যেন শুধু ভ্যাকসিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ঘিরে উদ্বেগ।
সবচেয়ে বড় কথা এই সিদ্ধান্ত সঠিক না ভুল- তা প্রমাণের দায় বিজ্ঞানের। সীমিত সময়ে নির্ভুলভাবে সে ছাড়পত্র দেওয়া বিজ্ঞানীদের জন্য প্রচণ্ড নেতিবাচক ও প্রায় অসম্ভব এক চ্যালেঞ্জ বলে জানান ডেভিড স্যালিসবুরি। তিনি যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগের টিকাদান কর্মসূচির সাবেক প্রধান। তার মতে, সব টিকারই কিছু না কিছু ঝুঁকি থাকে- কিন্তু তাই বলে রক্ত জমাট বাঁধার ঘটনাগুলো যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে- ততোটা মারাত্মক মোটেও নয়।
ইইউ ওষুধ প্রশাসন ইউরোপিয়ান মেডিসিন্স এজেন্সি (ইএমএ) গত সপ্তাহে জানায়, গত ১৬ মার্চ পর্যন্ত যুক্তরাজ্য ও ইইউভুক্ত দেশগুলোতে মোট ২ কোটি ব্যক্তিকে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার ডোজ দেওয়া হয়েছে। আর রক্ত জমাট বাঁধা বা থ্রোম্বোসিসের ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে মাত্র ২৫ জনের মধ্যে। সেটা টিকা নেওয়ার কারণেই হয়েছে নাকি অন্য শারীরিক সমস্যা প্রভাবিত – তা এখনও নির্ণয় করা যায়নি। ইএমএ বলেছে, "টিকাগ্রহীতাদের মধ্যে থ্রোম্বোসিসের পরিমাণ সাধারণ জনসংখ্যার চাইতেও কম।" সাধারণ জনসংখ্যা বলতে, যারা টিকাগ্রহণ করেননি তাদের কথা বলা হয়েছে। সংস্থাটি আরও বলে, "অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা নেওয়ার ফলে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বৃদ্ধির কোনো প্রমাণ মেলেনি।"
আসল সত্যিটা হলো; কয়েক ধরনের প্রতিষেধকের মজুদ হাতে থাকায় নির্দিষ্ট একটি ভ্যাকসিনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার উৎসাহ পেয়েছেন ইউরোপিয় কর্মকর্তারা। অতীতে এমন অবস্থার কথা চিন্তা করে কোনো নীতিমালা তৈরিও করা হয়নি। কেবল ২০২০ সালের অতিমারিতেই বিশ্ববাসী বুঝতে পারে, বিভিন্ন সংস্থার তৈরি প্রতিষেধকের সাহায্যেই কোভিড-১৯ মোকাবিলা করতে হবে। তখন কিন্তু, একারণে সরকারি পর্যায়ে তৈরি হওয়া অবিশ্বাস কিভাবে দূর করা হবে সেটা নিয়ে তেমন পরিকল্পনাও লক্ষ্য করা যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ল্যাংগন মেডিকল সেন্টারের জৈব-নৈতিকতা বিভাগের প্রধান আর্থার ক্যাপলান বলেন, "এতগুলো টিকা একসঙ্গে বাজার আসার ঘটনা নজিরবিহীন। সত্যি বলতে কী এর কোনো পরিকল্পনাই আমরা করতে পারিনি।"
- লেখক পরিচিতি: বাজার বিষয়ক জ্যেষ্ঠ সম্পাদক জন অথারস, ব্লুমবার্গের আগে ২৯ বছর চাকরি করেন ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে। তার লেখা একটি বহুল আলোচিত গ্রন্থ 'দ্য ফিয়ারফুল রাইজ অব দ্য মার্কেটস।'