ইতিহাসের পথে ফুটবলের জাদুকর মেসি
বুধবারের পড়ন্ত বিকেলে বার্সেলোনার রাস্তাঘাট ক্রমে জনশূন্য হতে শুরু করেছিল। হাতে তখনো ঘণ্টাখানেক সময়। আমি দ্রুত ফিরছিলাম নির্দিষ্ট সেই গন্তব্যে, যেখানে বসে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড সেমিফাইনাল দেখার কথা। বারবার ড্যাশবোর্ডের ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলাম; একদিকে খেলা শুরুর বাঁশি মিস করার ভয়, অন্যদিকে আরও বড় এক আশঙ্কা—হয়তো এই শুরুটাই হতে যাচ্ছে লিওনেল মেসির শেষ।
আটলান্টার ইনডোর স্টেডিয়ামে জর্জিয়ার প্রচণ্ড গরম থেকে বাঁচতে ছাদ আটকে দেওয়া হয়েছে। সেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মাঠে মেসির মধ্যে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না। সেমিফাইনালের শুরুটাই ছিল যেন এক লড়াই—মাঠজুড়ে সজোরে চলা পায়ের মহড়া, মরিয়া হয়ে টানাটানি, আর বল দখলের তীব্র কাড়াকাড়ি। ইংল্যান্ডের তরুণ খেলোয়াড়রা চেপে ধরছিল, ধাক্কা দিচ্ছিল, আর অবিরাম বলের পিছু ছুটছিল।
কিন্তু এই সব উন্মাতাল গতির মাঝখানে মেসি কেবল হাঁটছিলেন।
৩৯ বছর বয়সে এসে টুর্নামেন্টের অন্যতম বয়োজ্যেষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে মেসি এখন আগের চেয়ে কম দৌড়ান, মাঠের কম জায়গা জুড়ে তার বিচরণ। সোমবারের (রবিবার দিবাগত রাত) ফাইনালটি হতে যাচ্ছে নিশ্চিতভাবেই তার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। অতীতের অনেক টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনা তার প্রতিভা নিয়ে সন্দেহ করেছে, প্রতিটি ব্যর্থতার জন্য তাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু মেসি নিঃসন্দেহে ফুটবলকে বদলে দিয়েছেন। বল পায়ে একজন খেলোয়াড় কী করতে পারেন কেবল সেটুকুই নয়, বরং বল পাওয়ার আগে একজন খেলোয়াড় কী দেখতে পান—সেই সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছেন তিনি। ধৈর্যকে তিনি রূপ দিয়েছেন আক্রমণের অন্যতম হাতিয়ারে।
একটি ফুটবল ম্যাচ মূলত দুটি ঘড়িতে চলে। একটি গ্যালারির সেই উজ্জ্বল ও নিষ্ঠুর ডিজিটাল ঘড়ি; আর অন্যটি চলে আরও নিভৃতে, যেখানে একজন ডিফেন্ডার ক্লান্ত হয়ে পড়েন, একজন মিডফিল্ডার কয়েক ইঞ্চির নিয়ন্ত্রণ হারান, কিংবা কোনো এক পাসের গলি প্রয়োজনের চেয়ে এক সেকেন্ড বেশি সময় খোলা থাকে। মেসি সেই দ্বিতীয় ঘড়িটি দেখার মতো যথেষ্ট ধীরলয়ে নড়াচড়া করেন—কে তাকে অনুসরণ করছে, কে হাল ছেড়ে দিল, আর পরবর্তী ফাঁকা জায়গাটা কোথায় তৈরি হবে। মাঠের যে দৌড়ঝাঁপ সবাই দেখতে পায়, সেটা মূলত ওই প্রথম ঘড়ির। মেসি অপেক্ষা করেন সেই গোপন মুহূর্তটির জন্য, যা ম্যাচের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে।
মেসি মাঠ থেকে হারিয়ে গেছেন বলে হাঁটেন না। তিনি হাঁটেন খেলায় প্রবেশ করার সঠিক মুহূর্তটি খুঁজে পেতে।
২৯ বছর বয়সেও তিনি এভাবেই হাঁটতেন। এমনকি ১৯ বছর বয়সেও তা-ই। তরুণ মেসির মিথ তৈরি হয়েছিল তার অবিশ্বাস্য গতির ওপর ভিত্তি করে—শরীরের ভারকেন্দ্র মাটির কাছাকাছি রেখে বলকে পায়ের ডগায় এমনভাবে রাখা, যা দেখে মনে হতো বলটি তার নিয়ন্ত্রণে নেই বরং বশীভূত। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের এমন সব সরু গলি দিয়ে তিনি বেরিয়ে যেতেন, যা তিনি ঢোকার আগে অস্তিত্বহীন মনে হতো। কিন্তু সেই সময়েও তার আসল দক্ষতা কেবল গতির ঝড় তোলা ছিল না; বরং খেলাটিকে সবার আগে পড়তে পারার সক্ষমতাই ছিল তার আসল শক্তি।
বার্সেলোনা ক্লাবে তিনি কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন। সেখানে তার সেই দূরদৃষ্টি একটি কাঠামোর মধ্যে কাজ করত। সতীর্থরা বল কেড়ে নিতেন, পাস দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতেন এবং রক্ষণভাগকে ব্যস্ত রেখে মেসির জন্য জায়গা করে দিতেন। যখন মেসি বল পেতেন, সেই বলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতো ভবিষ্যতের কয়েকটি সম্ভাব্য ছবি। মেসি যেন সেই সবগুলোই আগেভাগে দেখতে পেতেন।
মেসির ব্যক্তিগত জাদুকরী পারফরম্যান্সের আড়ালে সেই দলীয় কাঠামো অনেক সময় ঢাকা পড়ে যেত। লোকে ভাবত, শুধু বলটা তার পায়ে পৌঁছে দিলেই হলো, বাকি শৃঙ্খলা বা কৌশল তখন গৌণ। বার্সেলোনা মেসির প্রতিভাকে একটি সিস্টেম বা পদ্ধতির অংশ হিসেবে ব্যবহার করত। কিন্তু আর্জেন্টিনা দীর্ঘকাল সেই প্রতিভাকেই পুরো পদ্ধতির বিকল্প হিসেবে ভেবে ভুল করেছিল।
বছরের পর বছর ধরে আর্জেন্টাইনরা মেসিকে নিয়ে দুটি ভুল ধারণা পোষণ করেছে। তারা মেসির প্রতিভাকেই পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা হিসেবে ভেবেছিল এবং তার নিস্পৃহতাকে ভুল বুঝেছিল 'উদাসীনতা' হিসেবে।
মেসি স্বাভাবিকভাবেই ১০ নম্বর জার্সি পরেন। কিন্তু আর্জেন্টিনায় এই জার্সিটা একা কেউ পরে মাঠে নামেন না। ছোটখাটো গড়ন আর বাঁ পায়ের জাদুকর দিয়েগো ম্যারাডোনা এই জার্সিটাকে এক গণবিস্ফোরণে রূপ দিয়েছিলেন। ম্যারাডোনার কথা, দ্রোহ, আনন্দ আর যন্ত্রণা এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব ছিল। মেসি যখন এই ১০ নম্বর পেলেন, ম্যারাডোনা ততদিনে শ্রেষ্ঠত্বের এক নিজস্ব জাতীয় ভাষা তৈরি করে ফেলেছেন; প্রত্যাশা ছিল মেসিকেও সেই ভাষায় কথা বলতে হবে।
১৩ বছর বয়সে মেসি আর্জেন্টিনা ছেড়ে স্পেনে চলে যান। অনেক বছর পর যখন আর্জেন্টিনার মানুষ তার সত্যিকারের দেখা পেল, ততদিনে বার্সেলোনার তাঁবুতে তার পরিণত হওয়ার গল্পগুলো লেখা হয়ে গেছে। আর্জেন্টাইনরা সেই অতিপরিচিত ফুটবলীয় প্রতিভা—সেই ছোটখাটো গড়ন আর বাঁ পায়ের জাদু চিনতে পারলেও, সেই প্রতিভার আড়ালে থাকা মানুষটিকে ঠিক আপন করে নিতে পারছিল না।
লাতিন আমেরিকান ফুটবলে 'পেচো ফ্রিও' (Pecho frío) বা 'ঠান্ডা বুক' কথাটি সেই খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, যাদের চরম মুহূর্তে পর্যাপ্ত আবেগ বা মেজাজের অভাব থাকে বলে মনে করা হয়। বার্সেলোনায় মেসির সেই স্থিরতাকে ধরা হতো প্রখর একাগ্রতা হিসেবে; কিন্তু আর্জেন্টিনায় সেটাই ব্যবহার করা হতো তার বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে।
২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে তিন বছরে তিনটি ফাইনাল হারে আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানি শেষ মুহূর্তে গোল করে; পরের দুই কোপা আমেরিকা ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হার। প্রথম টাইব্রেকারে মেসি গোল করলেও দ্বিতীয়টিতে মিস করেন। সতীর্থরাও মিস করেছিলেন। কিন্তু ক্যামেরা বারবার কেবল মেসির দিকেই ফিরছিল।
সেই তৃতীয়বারের মতো পরাজয়ের পর মেসি আর কেবল পরাজিত দলের সেরা খেলোয়াড় ছিলেন না, বরং কেন আর্জেন্টিনা হারল—তার একমাত্র ব্যাখ্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। তার প্রতিভা হয়ে উঠেছিল আর্জেন্টিনার 'ইমার্জেন্সি সার্ভিস'—দল যখনই কোনো জট খুলতে ব্যর্থ হতো, আশা করা হতো মেসি একাই সব সমাধান করবেন। এরপর অভিমানে তিনি জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন।
কিন্তু তিনি ফিরেছিলেন।
২০১৮ সালে লিওনেল স্কালোনি কোচের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিটি আক্রমণের শুরু, মধ্যভাগ আর শেষ হওয়ার জন্য মেসির ওপর নির্ভর করা বন্ধ করে দিলেন। তিনি এমন এক মিডফিল্ড গড়লেন যারা বল কেড়ে নিয়ে সামনে বাড়াতে পারে, এমন আক্রমণভাগ তৈরি করলেন যারা মেসির সামনে দৌড়ে ডিফেন্ডারদের বিচলিত করতে পারে, আর এমন এক রক্ষণভাগ সাজালেন যারা বিপদে পিছু হটার বদলে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে জানে। তাদের এই কাজগুলো মেসিকে অনেকগুলো বিকল্প এনে দিল। মেসির প্রতিভা তখনো অনন্য ছিল, কিন্তু তা আর দলের একমাত্র পরিকল্পনা রইল না।
স্কালোনি তার চারপাশে এমন একদল তরুণকে রাখলেন যারা মেসিকে দেখে বড় হয়েছে। তারা তার হয়ে দৌড়ায়, তার হয়ে তর্কে জড়ায়, তার সঙ্গে গলা ছেড়ে গান গায়। তারা তার কাছে আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ চায় না। তারা মেসির জন্য এবং একে অপরের জন্য এমনভাবে খেলে, যেন সবকিছু আগে থেকেই জানা।
এই পরিবর্তনের সুফল দেখা গেল ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে। দীর্ঘ ২৮ বছর পর আর্জেন্টিনা বড় কোনো শিরোপার স্বাদ পেল, আর মেসি পেলেন সিনিয়র দলের হয়ে প্রথম ট্রফি। শেষ বাঁশি বাজার পর মেসি সতীর্থদের ভালোবাসার আলিঙ্গনে হারিয়ে গেলেন। এতকাল তিনি আর্জেন্টিনাকে বয়ে নিয়ে বেড়িয়েছেন; এবার সতীর্থরা তাকে কাঁধে তুলে নিল।
২০২২ বিশ্বকাপ মেসি ও আর্জেন্টিনার এই নতুন রসায়নকে বৈশ্বিক রূপ দিল। মেক্সিকোর বিপক্ষে বিদায়ের শঙ্কায় থাকা ম্যাচে মেসির সেই গোল যেন পুরো টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার তরীকে স্থিতিশীল করল। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে সেই শান্ত অধিনায়কের ক্রোধ ফুটে উঠল বাইরে; তিনি তর্ক করলেন, চিৎকার করলেন এবং অবাধ্য এক ভঙ্গিতে জয় উদ্যাপন করলেন। সতীর্থরাও যোগ দিলেন তার সঙ্গে।
তিনি ম্যারাডোনা হননি। তিনি নিজের স্বকীয়তায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন। ২০২২ বিশ্বকাপের ট্রফি যখন মেসি উঁচিয়ে ধরলেন, আর্জেন্টিনা ততদিনে শিখে গেছে তার নীরবতা আর ক্রোধ—উভয়ই আসলে জাতীয় প্রত্যাশার ভার বইবার নিজস্ব ভঙ্গি।
বুধবার আটলান্টার মাঠে দ্বিতীয়ার্ধের ১০ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডন আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে ফাঁকি দিয়ে গোল করলেন। ইংল্যান্ড ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল। হাতে বাকি আর ৩৫ মিনিট। এই স্কোরলাইন টিকে থাকলে মেসির শেষ বিশ্বকাপ এখানেই শেষ হয়ে যেত।
গ্যালারিতে আর্জেন্টাইন সমর্থকরা গাইছিল সেই চিরচেনা গান— 'por esta camiseta, ganar o morir' (এই জার্সির জন্য, হয় জয় নয় মৃত্যু)। ইংল্যান্ড খেলছিল জেতার জন্য বা বাড়ি ফেরার জন্য। কিন্তু আর্জেন্টিনা দেখছিল আরও বড় এক প্রান্তসীমা।
স্কালোনি রক্ষণাত্মক কৌশল ছেড়ে আক্রমণভাগ শক্তিশালী করলেন। ইংল্যান্ড ঠিক তার উল্টো পথে হেঁটে ডিফেন্ডার বাড়াল। আর্জেন্টিনা নিরাপত্তার বদলে সুযোগের সন্ধানে নামল। আর ইংল্যান্ড সেই সুযোগের বদলে সময়ের পিছু ছুটল।
মেসি তখন সেই সুযোগ আর সময়ের মাঝখানে হাঁটছিলেন। তিনি সব সময়ই হাঁটেন। যা বদলেছে তা হলো তার চারপাশের মানুষগুলো। অবশেষে তার দূরদৃষ্টির চাহিদা অনুযায়ী দৌড়াতে শুরু করল আর্জেন্টিনা। অন্য খেলোয়াড়রা ম্যাচটিকে সেই মুহূর্তের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল, যা কেবল মেসির চোখেই ধরা পড়ে।
৮৫ মিনিটে পেনাল্টি বক্সের ডান দিকে বল পেলেন মেসি। তার সতীর্থ এনজো ফার্নান্দেজকে দেখা গেল দুই ইংলিশ ডিফেন্ডারের মাঝের সামান্য এক চিলতে ঘাসের জায়গায়। মেসি পাস দিলেন। এনজো গোল করলেন। ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা সমতায় ফিরল।
সাত মিনিট পর, মেসি তার ডান পা দিয়ে একটি ক্রস বাড়ালেন দূর প্রান্তে থাকা লাউতারো মার্তিনেসের দিকে। দ্বিতীয় গোলের হাত ধরে আর্জেন্টিনা পৌঁছে গেল আরও একটি বিশ্বকাপ ফাইনালে।
মেসি ইংল্যান্ডকে দৌড়ে হারাননি। বরং আর্জেন্টিনা রাতটিকে এমনভাবে সাজিয়েছিল যাতে তিনি টিকে থাকতে পারেন।
ফাইনাল ম্যাচেও সেই নিষ্ঠুর ডিজিটাল ঘড়ি থাকবে। তবে মেসি তাকিয়ে থাকবেন সেই অন্য ঘড়িটির দিকে। ১৯ বছর বয়সে মনে হতো তিনি ভবিষ্যৎকে দৌড়ে ছাড়িয়ে যেতে পারেন। ৩৯ বছর বয়সে এসে তিনি সতীর্থদের পাশে নিয়ে সেই ভবিষ্যতের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছেন।
তিনি হাঁটবেন। আর্জেন্টিনা দৌড়াবে। সম্ভবত এটাই শেষবার, যখন আমরা তাদের এভাবে দেখতে পাব।
আজ রাতে যা-ই ঘটুক না কেন, সেটুকুই হবে আমাদের প্রাপ্তি। সেটুকুই যথেষ্ট।