লামিনে ইয়ামালের ছোট ভাই কেইন কেন বিশ্বকাপের তারকা হয়ে উঠছে
চলতি বিশ্বকাপের সেরা পারফরম্যান্সটা সবে উপহার দিয়েছে স্পেন। অস্ট্রিয়া ততক্ষণে ৩-০ গোলে পিছিয়ে। ঠিক সেই মুহূর্তেই টিভি ক্যামেরার লেন্স ঘুরে গেল গ্যালারির দিকে।
উল্লসিত স্প্যানিশ সমর্থকদের ভিড়ে ক্যামেরা জুম করল এক ছোট্ট ছেলের ওপর। মিকেল ওয়ারজাবালের ৮৯ মিনিটের গোল উদযাপনে আনন্দে ফেটে পড়েছে সে। দু'হাত শূন্যে ছুড়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে: 'ভামোস (Vamooos)'!
সম্প্রচারকারী টিম যে নেহাতই কাকতালীয়ভাবে তাকে ক্যামেরায় ধরেছে, তা কিন্তু নয়। ছেলেটি স্প্যানিশ সেনসেশন লামিনে ইয়ামালের তিন বছর বয়সি সৎ ভাই, কেইন। ফুটবল মহলে সে এখনই বেশ পরিচিত মুখ।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে জন্ম কেইনের। সে ইয়ামালের মা শেইলা এবানার সন্তান। দুজনের বাবা আলাদা হলেও ইয়ামাল ও কেইনের সম্পর্ক ভীষণ নিবিড়। বৃহস্পতিবার রাউন্ড-অভ-৩২-এর ম্যাচে প্লেয়ার অভ দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হওয়ার পর মিক্সড জোনে সংবাদমাধ্যমের সামনে সে কথাই তুলে ধরেন ইয়ামাল।
১৮ বছর বয়সি এই ফুটবলার বলেন, 'ছোট ভাইকে এত খুশি হতে দেখলে আমি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। তাছাড়া আমার মা এবং বন্ধুরা সবসময় যে জীবনের স্বপ্ন দেখেছেন, তাদেরকে সেই জীবনযাপন করতে দেখতেও ভালো লাগে।
'আমার ছোট ভাই-ই আমার সব। ওকে আমি ভীষণ ভালোবাসি; মনে হয় ও যেন আমার নিজের সন্তান।'
একজন ফুটবলার হিসেবে ইয়ামালের আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ তার পারিবারিক বন্ধন। যখনই তাকে খেলার চাপ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়, জানতে চাওয়া হয় স্কুলপড়ুয়া কিশোর থেকে বিশ্বতারকা হয়ে ওঠার এই রকেট-গতির উত্থানের সাথে তিনি মানিয়ে নেন কীভাবে, ইয়ামাল বারবার তার শৈশবের দিনগুলোতে ফিরে যান। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে যখন বার্সেলোনার সঙ্গে নতুন চুক্তি সই করেন, তিনি নিশ্চিত করেছিলেন যেন তার পুরো পরিবার তার পাশে থাকে।
গত সপ্তাহে স্প্যানিশ রেডিও স্টেশন কাদেনা সার-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইয়ামাল বলেন, 'দেখুন, মায়ের বয়স যখন মাত্র ১৬, তখন আমার জন্ম হয়। বাবাকেও বেঁচে থাকার তাগিদে রাস্তায় বের হতে হতো। কখনো কখনো আমাদের জন্য খাবার জোটাতে রাস্তার পরিত্যক্ত জিনিসপত্রও কুড়াতে হয়েছে তাকে। আমার কাছে জীবনের আসল চাপ সেটাই। আমি এখন যেটা অনুভব করি, সেটা কোনো চাপই নয়।'
ইয়ামালের ঘনিষ্ঠরা জানান, পেশাদার ফুটবলে পা রাখার পর থেকেই এই ফুটবলারের অন্যতম অগ্রাধিকার ছিল পরিবারের সবটুকু চাহিদা পূরণ করা। এ থেকেই হয়তো বোঝা যায়, ছোট ভাই কেন সবসময় তার জীবনের এত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা জুড়ে আছে।
বার্সেলোনার প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই গ্যালারিতে দেখা যায় কেইনকে। ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তে হওয়া অনেক অ্যাওয়ে ম্যাচেও সে থাকে। সেপ্টেম্বরে ব্যালন ডি'অর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ইয়ামাল যখন প্যারিসে গেলেন, কেইনও তার সঙ্গী হয়েছিল। রেড কার্পেটে একটা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফুটবল নিয়ে তার মেতে থাকা এবং ইয়ামালের সাথে ক্যামেরার সামনে পোজ দেওয়া নজর কেড়েছিল সবার।
যারা বার্সেলোনায় ইয়ামালের পথচলা অনুসরণ করেন, কিংবা নিয়মিত স্প্যানিশ ফুটবলের খোঁজখবর রাখেন, তাদের কাছে স্পটলাইটের এই আলো কেইনের ওপর পড়তে দেখাটা নতুন কিছু নয়। স্পেনের হয়ে ২০২৪ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পর সম্ভবত প্রথমবারের মতো জনপ্রিয়তার স্বাদ পেয়েছিল সে। সেবার পরিবারের সঙ্গে মাঠে নেমে দলের শিরোপা উদযাপনে যোগ দিয়েছিল কেইন। খুনসুটিতে মেতে উঠেছিল একাধিক ফুটবলারের সঙ্গে।
বড় ভাই ইয়ামালের তারকাখ্যাতি আকাশছোঁয়া হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেইনও হয়ে উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়া সেনসেশন। ছোট ভাইয়ের সঙ্গে টিকটক নাচের ভিডিও কিংবা বাগানে ফুটবল নিয়ে মেতে থাকার ক্লিপস আপলোড করেছেন ইয়ামাল।
গত মৌসুমে ক্যাম্প ন্যু-র মাঠে বার্সেলোনার লা লিগ শিরোপা উদযাপনের সময় আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল কেইন। জন্মদিনের পার্টিতে তার নাচ কিংবা আদুরে গলায় বার্সার প্রিয় খেলোয়াড়দের নাম বলা—সবকিছু ঘিরেই আলাদা এক ভক্তশ্রেণি তৈরি হয়েছে। আর এসব ভিডিও ধারণ ও প্রকাশ করেছেন তার বড় ভাই।
ডিসেম্বরে যখন নিজের (বর্তমানে সাবেক) ফ্ল্যাটের একটি ট্যুর ভিডিও দিয়ে ইউটিউব চ্যানেল চালু করেন ইয়ামাল, সেখানেও দেখিয়েছেন ছোট ভাইয়ের ছবি। জানিয়েছেন, কীভাবে কেইন সবসময় ইয়ামালের একটি ছোট মূর্তি নিয়ে খেলতে চায়। এটি মূলত একটি 'কাগানের'—কাতালান বড়দিনের ঐতিহ্যবাহী ও কাল্ট বস্তু।
বাড়িতে বসে কেইনের বার্সেলোনার অ্যান্থেম গাওয়া এবং ভাইয়ের নামে উল্লাস করার ভিডিও তো আছেই। বার্সা ও অ্যাথলেটিক ক্লাবের মধ্যকার এক লা লিগা ম্যাচের পর তাকে বার্সার বিশাল মাসকট 'ক্যাট'-এর সঙ্গে দুষ্টুমি করতে এবং স্পেন দলে ইয়ামালের সবচেয়ে কাছের বন্ধু নিকো উইলিয়ামসের সঙ্গে খেলতেও দেখা গেছে।
বার্সেলোনায় সব সময় স্পটলাইটের আলো থাকে ঠিকই। তবে একটা বিশ্বকাপ যে মাত্রার উন্মাদনা নিয়ে আসে, তার কাছে ওসব কিছুই নয়।
অস্ট্রিয়া ম্যাচে কেইনের উদযাপনের ফুটেজ এরপর অসংখ্যবার শেয়ার করা হয়েছে। স্পেনে এটি পরিণত হয়েছে সবচেয়ে বেশি মন্তব্য পাওয়া মিমগুলোর একটিতে। এমনকি জাতীয় দলের অন্যান্য খেলোয়াড়রাও মেতেছেন এতে।
তাকে ঘিরে উন্মাদনা এতটাই যে সম্প্রচারকারী চ্যানেল ড্যাজন-এর ওই ক্লিপের নিচে এক্স-এ এক ব্যবহারকারী রীতিমতো অভিযোগই করে বসলেন! তার বিরক্তি, 'সামনের স্বর্ণকেশী মহিলা' ক্যামেরার ভিউ ঢেকে দিচ্ছেন।
সেই মন্তব্যের জবাব দিতে হাজির হলেন খোদ স্প্যানিশ স্ট্রাইকার বোরহা ইগলেসিয়াস। তিনি বুঝিয়ে বললেন, ওই 'স্বর্ণকেশী মহিলা' এইমাত্র 'আপনাদের জোড়া গোল উপহার দিয়েছেন।' কারণ তিনি ছিলেন ওয়ারজাবালের মা। বিশ্বকাপে স্পেন দলের সব খেলোয়াড়ের পরিবারের সদস্যরা একই গ্যালারি থেকে ম্যাচ দেখেন।
মায়ের ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইলেও (যার ফলোয়ার সংখ্যা ৭ লাখেরও বেশি) কেইনের নিয়মিত উপস্থিতি। স্পনসর করা বিভিন্ন কনটেন্টেও দেখা যায় তাকে। যেমন সম্প্রতি আপলোড করা এক ভিডিওতে বার্সেলোনার উপকূলের ছোট্ট শহর প্রেমিয়া দে মার-এর একটি সুশি রেস্তোরাঁ তুলে ধরা হয়েছে।
কেইনকে নিয়ে মা এবানার বেশিরভাগ পোস্টই মূলত পারিবারিক আনন্দঘন মুহূর্তের প্রতিচ্ছবি। তবে ইয়ামাল-শিবিরের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, বিভিন্ন ব্র্যান্ড এখনই কেইনের সঙ্গে সম্ভাব্য কোলাবোরেশনের জন্য যোগাযোগ শুরু করেছে।
শুক্রবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের মুখোমুখি হচ্ছে স্পেন। শিগগিরই যে কেইনকে আবারও ক্যামেরায় দেখা যাবে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়—সম্ভবত উল্লাসে মাতোয়ারা অবস্থায়।
