বিশ্বকাপের সব ম্যাচ দেখার বিনিময়ে ৫০ হাজার ডলার করে পাচ্ছেন দুই ফ্যান
গ্রুপ পর্ব শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বকাপে এখন প্রতিদিন ছয়টি করে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতগুলো ম্যাচ টানা দেখাটা রীতিমতো একটি পূর্ণকালীন চাকরির মতোই।
তবে কেভিন আকোতো এবং অস্টিন ফ্রাঙ্কলিনের জন্য এটা সত্যিই একটি ফুলটাইম চাকরি। বিশ্বকাপের ১০৪টি ম্যাচ দেখার জন্য তারা দুজনেই ৫০ হাজার ডলার করে পাচ্ছেন।
মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম ফক্স ওয়ানের 'চিফ ওয়ার্ল্ড কাপ ওয়াচারস' (প্রধান বিশ্বকাপ দর্শক) হিসেবে এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময় ধরে এই কাজ করছেন এই দুই ফুটবল ভক্ত। এই স্বপ্নের চাকরির অভিজ্ঞতা জানতেই তাদের সঙ্গে কথা বলেছিল বিবিসি।
নিউইয়র্কের বিখ্যাত টাইমস স্কয়ারের ঠিক মাঝখানে তাদের জন্য কাচ দিয়ে একটি বিশেষ কিউবিক্যাল বা ঘর তৈরি করা হয়েছে, যা পাশ দিয়ে যাওয়া যেকোনো মানুষের নজর কাড়বে। বাইরের ভক্তরাও চাইলে কাচের ভেতর দিয়ে তাদের দেখতে পারেন।
এই ঘরের ভেতর রিক্লাইনার চেয়ার, বাদামি চামড়ার সোফা, দুটি বড় স্ক্রিনের টেলিভিশন, এমনকি একটি ফুসবল টেবিলও রয়েছে। সত্যিকারের একজন ফুটবল ভক্তের স্বপ্নের ঘর বানাতে এখানে সব ধরনের ফুটবল মার্চেন্ডাইজ এবং নানা রকম স্ন্যাকসের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
কেভিন বিবিসিকে বলেন, 'বিশ বছর বয়সী যেকোনো তরুণের কল্পনায় যেমনটা থাকে, ঠিক তেমন। একজন ফুটবল ভক্ত হিসেবে আপনি এখানে যা যা রাখতে চাইতেন, ঠিক তা-ই রাখা হয়েছে।'
ফ্লোরিডায় বাবুর্চির কাজ করতেন কেভিন, আর অস্টিন ফিলাডেলফিয়ার একজন ইনফ্লুয়েন্সার। হাজার হাজার প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে তারা এই কাজ পেয়েছেন। তাদের কাজ শুধু সব কটি ম্যাচ দেখাই নয়, বরং ভক্তদের জন্য বিভিন্ন কনটেন্টও তৈরি করা।
'এটা একটা ম্যারাথন'
আরও কয়েক সপ্তাহ ধরে এই কাজ চালিয়ে যেতে হবে। তাই তারা নিজেদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
কেভিন বলেন, 'আমি কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, অস্টিনও একটু ক্লান্ত। তাই যা কিছু ঘটছে, তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া শিখছি।'
অস্টিনও তার সঙ্গে একমত। এই অভিজ্ঞতাকে তিনি অনেকটা সামার ক্যাম্পের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, এখানে একটা দিনের সঙ্গে আরেকটা দিন যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
অস্টিন বলেন, 'এটি একটি বিশাল ম্যারাথন। কাজটা তুলনামূলকভাবে সহজ—আমি সোফায় বসে ফুটবল দেখছি। কিন্তু এটা বেশ ক্লান্তিকর।'
সৌভাগ্যবশত, এই কাজের জন্য তাদের টাইমস স্কয়ারের ওই কাচের ঘরে ঘুমাতে হয় না। নিজেদের শিফট শেষ হলে তারা বিশ্রাম নিতে নিজেদের বাসস্থানে ফিরে যেতে পারেন।
ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী
ইতিমধ্যেই এই জুটি বেশ কিছু ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছেন। তারা যখন বসে বসে আর্জেন্টাইন বারবিকিউ খাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই লিওনেল মেসিকে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ভাঙতে দেখেছেন। এই কাজের আরেকটি বড় সুবিধা হলো, যে দেশগুলো খেলছে, সেই দেশের ঐতিহ্যবাহী খাবার পরিবেশন করা হয় তাদের।
ম্যাচের ফাঁকে ফাঁকে তারা ভক্তদের সঙ্গেও কথা বলার সুযোগ পান। যেমন, টাইমস স্কয়ারে ভিড় জমানো হাজার হাজার ব্রাজিলিয়ান ভক্তের সঙ্গে তারা কথা বলেছেন। এই পর্যটন এলাকাটি বিশ্বকাপ দেখতে আসা দর্শকদের জন্য একটি বড় আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। নরওয়ের ভক্তরাও এখানে এসে তাদের বিখ্যাত 'ভাইকিং রোয়িং' (নৌকা বাওয়ার অভিনয়) উদযাপন করেছেন।
অস্টিন জানান, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভক্তদের সঙ্গে দেখা করা, ফুটবল ও সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলা এবং যুক্তরাষ্ট্রে তাদের অভিজ্ঞতা শোনাটাই তার এই কাজের সবচেয়ে প্রিয় অংশ।
তিনি বলেন, 'সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমি প্রায়ই ভুলে যাই যে আমি টাইমস স্কয়ারে আছি এবং মানুষ আমাকে দেখছে। আমি হয়তো ১০-১৫ মিনিট ধরে একটা ম্যাচ দেখছি এবং এর মধ্যে পুরোপুরি ডুবে গেছি। হঠাৎ ডানে তাকিয়ে কেভিনকে দেখি এবং দেখি টাইমস স্কয়ারে এত মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে—তখন সত্যি সব ভুলে যাই।'
কার হাতে উঠবে বিশ্বকাপ?
তাদের ভবিষ্যদ্বাণী কী? কেভিন বাজি ধরছেন স্পেনের ওপর। যদিও নিজের শেকড়ের টানে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ঘানাকে সমর্থন করছেন।
অস্টিন নরওয়ের জার্সি পরেন। এর পেছনে ব্যক্তিগত কোনো কারণ নেই, বরং টুর্নামেন্টে নরওয়ে এবং ম্যানচেস্টার সিটির স্ট্রাইকার আর্লিং হলান্ডের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সই এর কারণ।
অস্টিন বলেন, 'স্পেন বা ফ্রান্স জিতবে, এমনটা বলা খুব সহজ। কিন্তু আমার মনে হয় নরওয়ে শিরোপার খুব কাছাকাছি আছে। যদি ভাগ্য সহায় হয়, আমি পুরোপুরি বিশ্বাস করি যে তারা বিশ্বকাপ বাড়ি নিয়ে যেতে পারবে।'
দর্শকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
তবে এই কাজ নিয়ে দর্শকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
নরওয়ের ৫২ বছর বয়সী ভক্ত ইমুন্ড লিল্যান্ড এবং তার ১৫ বয়সী মেয়ে ক্যামিলের মতে, কোনো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ছাড়া ১০৪টি ম্যাচ টানা দেখাটা হয়তো একটু 'ওভারডোজ' বা বাড়াবাড়ি পর্যায়ের।
১৮ বছর বয়সী ম্যাথিউ মেন্ডেজ বিবিসিকে বলেন, বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোই বিশ্বকাপ উপভোগ করার সেরা উপায়।
তবে ২০ বছর বয়সী মিগুয়েল সানচেজ এই দুই তরুণের ভাগ্য দেখে অবাক। তিনি বলেন, 'কী! এটা তো সরাসরি মাঠে গিয়ে খেলা দেখার চেয়েও ভালো! বিশ্বকাপ দেখার জন্য টাকা পাওয়া—এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য, দারুণ একটা ব্যাপার।'
