যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জটিল চুক্তি নিয়ে সতর্ক আশাবাদের কথাই বলছেন ইরানিরা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি (এমওইউ) শুরুর দিকের বেশ কিছু টানাপোড়েন পেরিয়ে এপর্যন্ত টিকে গেছে। এর মধ্য দিয়ে প্রায় চার মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধের একটি সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের রূপরেখা তৈরি হয়েছে।
তবে চূড়ান্ত চুক্তির আগে এখনো অন্তত কয়েক মাস ধরে কঠিন এক আলোচনায় অংশ নিতে হবে। যেখানে চুক্তির সব খুঁটিনাটি দিক-রাজনৈতিক ও কারিগরি বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা বাকি রয়েছে। ফলে ইরানিরা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। এই অবস্থায়, তারা আশাবাদ ব্যক্ত করলেও, তার মধ্যে এক ধরনের সাবধানী ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তেহরানের মধ্যাঞ্চলের এক বাসিন্দা এহসান আল জাজিরাকে বলেন, "আমরা প্রতিদিনের বোমা হামলা থেকে এখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ভুট্টা কেনার আলোচনায় এসেছি। পরিবর্তনটা ইতিবাচক, তবে আমাদের জীবনযাত্রার মান দিন দিন আরও খারাপের দিকেই যাচ্ছে।"
চুক্তির অংশ হিসেবে, বিদেশে আটকে থাকা ইরানের নিজস্ব তহবিলের একটি অংশ অবমুক্ত করার খবরের সূত্র ধরে তিনি এই মন্তব্য করেন। এই অর্থ দিয়ে ইরান খাদ্য ও ওষুধের মতো মানবিক পণ্য কিনতে পারবে। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদুল নাসের হেম্মাতি গত মঙ্গলবার এক ভিডিও বার্তায় বলেন, মূল্য এবং গুণগত মান যদি সন্তোষজনক হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ভুট্টা, গম এবং অন্যান্য কৃষিজাত পণ্য কিনতে পারে তেহরান। তবে চুক্তিতে এমনটি করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
সমঝোতা স্মারকের অংশ হিসেবে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ একটি সাধারণ লাইসেন্স জারি করেছে। এই অনুমোদনের আওতায়, আগামী ২১ আগস্ট পর্যন্ত ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিকেল পণ্য এবং পরিশোধিত জ্বালানি তেল সরবরাহ ও বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তেল কিনে ইরানকে মার্কিন ডলারে মূল্য পরিশোধ করা যাবে।
এর অর্থ হলো, দেশটি এখন তেলের মূল্যে গোপনে বিশেষ ছাড় দেওয়া, ভিন্ন পথ ব্যবহার করা কিংবা জটিল পেমেন্ট বা পণ্য বিনিময় (বার্টার) পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করেই তেল বিক্রি করতে পারবে। ইরান ইতোমধ্যে গত কয়েক দিনে সুপারক্যারিয়ারে থাকা লাখ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে, যা দেশটির অর্থনীতিতে নতুন অর্থপ্রবাহ যুক্ত করছে।
তবে সাধারণ ইরানিরা এর সুফল সরাসরি বা তাৎক্ষণিকভাবে পাবেন না। তারা এখনো বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে রয়েছেন, বিশেষ করে খাদ্য ও ওষুধের দাম আকাশচুম্বী। গত মে মাসের শুরুতে এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের মান কমে প্রায় ১৯ লাখে নেমেছিল, যা জুনের মাঝামাঝি সময়ে কিছুটা শক্তিশালী হয়ে ১৫ লাখ ৩০ হাজারে দাঁড়ায়। অবশ্য বুধবার তেহরানের খোলা বাজারে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ১৬ লাখ ৪০ হাজার রিয়াল।
'প্রকৃত একটি চুক্তির' প্রত্যাশা
ইরানি কর্তৃপক্ষের মতে, তেলের পাশাপাশি ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর মাধ্যমে প্রচলিত সামুদ্রিক বাণিজ্যও পুনরায় কিছু কিছু চালু হচ্ছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) বন্দরগুলোতে আটকে থাকা জরুরি পণ্যগুলো খালাস করা হচ্ছে। তবে যুদ্ধের পর প্রতিবেশী এই বড় বাজারটি, যেখান থেকে অনেক পণ্য ইরানে পুনঃরপ্তানি করা হতো, তা ইরানি ব্যবসায়ীদের জন্য এখনো পুরোপুরি খুলে দেওয়া হয়নি।
তেহরানের জমহুরি বাণিজ্যিক এলাকায় আমদানিকৃত ইলেকট্রিক টুথব্রাশ, হেয়ার ড্রায়ার এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত পরিচর্যার সামগ্রী বিক্রেতা এক ব্যবসায়ী আল জাজিরাকে বলেন, "আমি আশা করি এবার তারা প্রকৃত একটি চুক্তিতে পৌঁছাবে, যা আমাদের স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন ও ব্যবসা করার সুযোগ দেবে।"
তিনি আরও বলেন, "গত কয়েক মাস ধরে আমরা সংযুক্ত আরব আমিরাতে নতুন অর্ডার দিয়ে ওমান থেকে আসা যাত্রীদের মাধ্যমে পণ্য এনে কোনোমতে ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছি। কিন্তু ব্যবসার জন্য এটি কোনো স্থায়ী পদ্ধতি হতে পারে না।"
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেশব্যাপী ব্যাংকিং ব্যবস্থার বড় ধরনের অচলাবস্থার কারণেও ইরানিরা ভোগান্তির শিকার হয়েছেন, যা দেশটির বেশ কয়েকটি বড় ব্যাংকের সরাসরি এবং অনলাইন সেবা ব্যাহত করেছে। গত মঙ্গলবার এক বড় ধরনের সাইবার হামলার কারণে কার্ড-ভিত্তিক বেশিরভাগ সেবা বন্ধ হয়ে যায় বলে জানায় ইরানি কর্তৃপক্ষ। ফলে পেট্রল পাম্প এবং মুদি দোকানগুলোতে মানুষকে বাধ্য হয়ে নগদ অর্থ দিয়ে কেনাকাটা করতে হয়।
অনলাইন লেনদেনের অনেক ব্যবহারকারী এমন সমস্যার কথা জানিয়েছেন। নিয়োগকর্তাদের অনেকে কর্মীদের বেতন দিতে পারছিলেন না এই ধরনের সমস্যায়। এমনকী অনেক ঋণগ্রহীতা সময়মতো তাদের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারেননি। ইরানের ব্যাংক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বুধবারের মধ্যে বেশিরভাগ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হয়েছে
ইরানিদের ধারণা, এই সমঝোতা স্মারকে ক্ষুব্ধ হয়ে ইসরায়েল এই সাইবার হামলা চালিয়ে থাকতে পারে। এর আগেও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এমন কাজের সন্দেহ করা হয়েছিল। গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ও—দেশটির বেশ কয়েকটি বড় ব্যাংক এবং শীর্ষ ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ সাইবার হামলার শিকার হয়েছিল। তবে কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে দায়ী করেনি।
কট্টরপন্থীদের বিক্ষোভের পরিকল্পনা
এদিকে সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর ইসলামী প্রজাতন্ত্রের কট্টর সমর্থকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা যুদ্ধের প্রথম দিনেই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেওয়ার এবং ওয়াশিংটনের কাছে কোনো ধরনের নতি স্বীকার না করার দাবি জানাচ্ছেন।
তারা নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির একটি লিখিত বার্তার উদ্ধৃতি দিয়ে যুক্তি দিচ্ছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা অবিলম্বে বর্জন করা উচিত এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের কাছ থেকে আরও বেশি আদায় করার জন্য তেহরানের চাপ দেওয়া উচিত।
গত মঙ্গলবার রাতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের চ্যানেল টু-তে এক টকশোতে উপস্থাপক মহসেন আজাদি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে খাদ্যপণ্য কেনার কথা বলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের তীব্র সমালোচনা করেন। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্পের করা এক মন্তব্যের সূত্র ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান হেম্মাতিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, "আপনার তো এতে অপমানিত বোধ করা উচিত। খামেনির হত্যাকাণ্ডের এখনো চার মাসও পার হয়নি। আর আপনি সেই ঘৃণ্য প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে পণ্য কিনতে চান, যিনি এইমাত্র বললেন যে ইরানের মানুষ অনাহারে আছে?"
চুক্তির ওপর ক্ষুব্ধ ইরানের পার্লামেন্টের ৫০ জনেরও বেশি কট্টরপন্থী সংসদ সদস্য জানিয়েছেন, সামরিক হামলা শেষ হওয়া সত্ত্বেও সংসদ অধিবেশন বন্ধ রাখার প্রতিবাদে তারা আগামী রোববার পার্লামেন্ট ভবনের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করবেন। এছাড়া গত কয়েক মাস ধরে তারা সরকারের মন্ত্রীদের অভিশংসন করতে না পারার বিষয়েও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
দেশটির রাষ্ট্রপরিচালিত নিউজ ওয়েবসাইট 'তাবনাক'-এর একটি অনলাইন জরিপে অংশ নেওয়া ৮০ শতাংশের বেশি সরকার-সমর্থক জানিয়েছেন, তারা এই সমঝোতা স্মারকটিকে ইরানের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করেন। তবে কোনো কারণ ছাড়াই চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে জরিপের পেইজটি অনলাইন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
অবশ্য সরকার এবং আলোচনা প্রক্রিয়ার নেতৃত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বক্তব্য হলো, ইরান একটি শক্তিশালী অবস্থান থেকেই আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং তারা "প্রতিশ্রুতির বিপরীতে প্রতিশ্রুতি" নীতি অনুসরণ করবে।
বুধবার আজারবাইজানের বাকুতে ওআইসি (অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন) এর একটি বৈঠকে অংশ নিয়ে ইরানের প্রধান মধ্যস্থতাকারী ও স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, "আমাদের প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে বিশ্বাস থেকে। আর এটিই শত্রুকে তার লক্ষ্য অর্জনে হতাশ করেছে এবং যুদ্ধক্ষেত্র ও আলোচনার টেবিলে তাদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছে।"
