ইরান যে কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম ধনী দেশ হয়ে যেতে পারে
ইরানের ফুটবল দল চলতি বিশ্বকাপে অভাবনীয় রকমের ভালো খেলছে। ২১ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে তারা বিশ্ব র্যাংকিংয়ের ৯ নম্বরে থাকা বেলজিয়ামকে রুখে দিয়েছে। ম্যাচটি ড্র হওয়ায় তাদের সামনে এখন নকআউট পর্বে যাওয়ার সুযোগ হাতছানি দিচ্ছে। ওদিকে সুইজারল্যান্ডে ইরানি কূটনীতিকেরা আরও ভালো সময় পার করেছেন।
চার দশকের মার্কিন নীতিকে উল্টে দিয়ে ২২ জুন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ আগামী ৬০ দিনের জন্য ইরানি খনিজ তেল উৎপাদন, বিক্রি ও সরবরাহের অনুমতি দিয়েছে। এই পদক্ষেপ ইরান সরকারকে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিয়েছে। আর দীর্ঘমেয়াদে এই ছাড় ইরানকে আবারও ধনী বানিয়ে দিতে পারে।
১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকটের জেরে ধরে ১৯৮০ সালে নিজেদের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ইরানের তেল কেনা নিষিদ্ধ করে আমেরিকা। ২০১০-এর দশকের শুরুতে এই অবরোধের পিঠে চাপে 'সেকেন্ডারি' বা পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা, যা অন্য ক্রেতাদেরও মার্কিন শাস্তির মুখে ফেলে দেয়। ২০১৫ সালে বারাক ওবামার পারমাণবিক চুক্তির আওতায় সেসব নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা হয়েছিল। তবে তিন বছর পর ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই চুক্তি বাতিল করার পর কঠোর রূপে ফিরে আসে সেই নিষেধাজ্ঞা।
এবারের ছাড় অতীতের যেকোনো স্বস্তিকে অনেকদূর ছাড়িয়ে গেছে। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতি চলাকালীন ট্রাম্পের দেওয়া আগের একটি ছাড় কেবল ইতিমধ্যে জাহাজে বোঝাই হয়ে থাকা তেলের ওপর কার্যকর ছিল। ওবামা আমলে তৃতীয় দেশগুলোকে দেওয়া লাইসেন্সে শর্ত ছিল তেল কেনা ক্রমান্বয়ে কমাতে হবে। এর ধাক্কায় ২০১১ সালে দৈনিক ২৫ লাখ ব্যারেলের তেল রপ্তানি ২০১২ সালে নেমে আসে ১৫ লাখ ব্যারেলে। ওবামার পারমাণবিক চুক্তিও কেবল পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞাগুলোই তুলেছিল।
কিন্তু ট্রাম্পের নতুন লাইসেন্স এই সব বাধা সরিয়ে দিয়েছে। মার্কিন শোধনাগারগুলো এখন সরাসরি পারস্যের পেট্রোলিয়াম কিনতে পারবে, ডলারে দাম মেটাতে পারবে এবং কালো তালিকাভুক্ত ট্যাংকার থেকেও তেল নিতে পারবে। এর মাধ্যমে ১৯৭৯ সালের প্রথম নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে হলেও কার্যত উঠে গেল।
আলোচনায় ইরান এখনো বলার মতো কোনো ছাড় দেয়নি, তাহলে ওয়াশিংটন হঠাৎ এত উদার কেন? এর একটা স্পষ্ট উদ্দেশ্য হলো আলোচনাকে লাইফ-সাপোর্টে টিকিয়ে রাখা—এবং লেবাননে ইসরায়েলের ক্রমাগত হামলার জেরে উত্তেজনা তুঙ্গে থাকা সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা। তাছাড়া মার্কিন জ্বালানি বিভাগের উপদেষ্টা ও সাবেক ব্যবসায়ী মিশেল ব্রোহার্ডের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন আশা করছে এই পদক্ষেপ বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমাবে, চীনের সস্তায় ইরানি তেল কেনার সুযোগ বন্ধ করবে এবং ইরানকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা থেকে ঠেকাবে। তবে বাস্তবে এতে ফল পাওয়া যাবে সামান্যই।
এর একটা কারণ হলো, জুনের মাঝামাঝি থেকে ইরানের বন্দরগুলো থেকে মার্কিন অবরোধ উঠে যাওয়ায় ইরানি ক্রুড তেলের প্রবাহ এমনিতেই অনেকটা অবাধ হয়ে গিয়েছিল।
তথ্য বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ভরটেক্সা-র ডেভিড ওয়েচ বলেন, মে মাসে যেখানে ইরানের তেল রপ্তানি কার্যত শূন্যের কোঠায় ছিল, সেখানে এখন তা দৈনিক ১৫ লাখ ব্যারেলে গিয়ে ঠেকেছ। তেহরানের প্রধান রপ্তানি টার্মিনাল খারগ দ্বীপ থেকেও জাহাজে তেল বোঝাইয়ের হার বেড়েছে।
অবশ্য যুদ্ধের আগে দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেল রপ্তানির যে মাসিক গড় ছিল, সেই মাইলফলক ছুঁতে ইরানকে এখনো বেশ অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে।
তবে ট্রাম্পের ছাড় ঘোষণার পর থেকে বিশ্ববাজারে তেলের বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দামের কাঁটা খুব বেশি নড়েনি। এর অর্থ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই বাজার ধরে নিয়েছিল, ইরানি তেলের এই জোয়ার আসতে চলেছে।
রপ্তানি আরও বাড়াতে ও দাম কমাতে হলে ইরানকে এখন তেলের নতুন ক্রেতা খুঁজতে হবে। গত কয়েক বছরে ইরানের প্রায় পুরো তেলই গেছে উত্তর-পূর্ব চীনের ছোট ও স্বাধীন 'টিপট' শোধনাগারগুলো।
তেলের দাম নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান আরগাস মিডিয়া-র টম রিড বলেন, তেল কিনে তা মজুত করে রাখার জন্য আগের মতো আর কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢালতে হবে না ভেবে এই শোধনাগারগুলো 'বেশ রোমাঞ্চিত'। কিন্তু চাইলেই এসব টিপট চট করে তেল ক্রয় বাড়িয়ে দিতে পারবে না। কারণ ইরানি ক্রুডের দাম এখন ওমানি ও আমিরাতি তেলের প্রায় সমান। ফলে সস্তায় পেয়ে দেদার কেনার সেই আকর্ষণ এখন আর নেই।
নতুন ক্রেতারা যে এগিয়ে আসবে, তার আগে তাদের ব্যাংকার, বিমাকারী ও কমপ্লায়েন্স অফিসারদের এই ভরসা পেতে হবে যে, তারা ইরানের সঙ্গে ৬০ দিনের চেয়েও বেশি সময় ধরে ব্যবসা করতে পারবে—আর ট্রাম্প হুট করে এই ছাড় প্রত্যাহার করে নেবেন না।
তাছাড়া ইরানের ওপর ইউরোপ ও ব্রিটেনের নিষেধাজ্ঞাগুলো এখনও বহাল আছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনার্জি আসপেক্টসের অমৃতা সেন বলেন, এর সঙ্গে যুক্ত আছে সরাসরি ইরান সরকারকে অর্থ সরবরাহের অভিযোগ মাথায় নিয়ে পশ্চিমা দুনিয়ায় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার ঝুঁকিও।
এসব বাধাবিপত্তি অনেক সম্ভাব্য ক্রেতাকেই পিছু হটিয়ে দেবে। একসময় ইরান থেকে বিপুল পরিমাণ তেল কেনা ভারত হয়তো কিছু তেল নিতে পারে।
আরগাসের নাদের ইতাইয়িম বলেন, বর্তমান এই ব্যবস্থা যদি অন্তত কয়েক সপ্তাহ টিকে থাকে, তবে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াও নতুন করে তেন কেনার চিন্তা শুরু করতে পারে। তারা ২০১০-এর দশকের শেষভাগেও ইরানের নিয়মিত ক্রেতা ছিল। তবে কোনো স্থায়ী চুক্তি হওয়ার আগে পশ্চিমা দেশগুলো সম্ভবত নতুন করে তেল কেনা শুরু করবে না।
আর হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার ব্যাপারে বলতে গেলে, এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মাধ্যমে আমেরিকা যে স্পষ্ট সুফল আশা করেছিল, তা অসম্ভবই মনে হচ্ছে। ১৭ জুন ট্রাম্প যখন ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রাথমিক চুক্তিতে সই করেন, তার ঠিক কয়েক দিন পরেই ইরান আবার হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয়। চুক্তি সইয়ের পর অ-ইরানি জাহাজের যাতায়াত যেটুকু বেড়েছিল, তা তৎক্ষণাৎ থমকে যায়—যদিও ইরানের জাহাজের চলাচল ঠিকই বাড়ছিল।
এখন অবশ্য হরমুজে জাহাজের যাতায়াত বাড়ছে। কিন্তু সেইসঙ্গে বাড়ছে আমেরিকা ও ইরানের উত্তেজনাও। দীর্ঘমেয়াদে আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে—ইরান হয়তো হরমুজ প্রণালি পারাপারের ওপর টোল বসাতে চাইবে, যা এই রুটে জাহাজ চলাচলকে সংকুচিত করবে। ২২ জুন তেহরান বলেছে, তারা এই নৌপথ 'পরিচালনা' করবে এবং জাহাজ চলাচলের সমন্বয়ের জন্য একটি 'টেলিফোন হটলাইন' চালু করবে।
অন্যভাবে বললে, আমেরিকার দৃষ্টিকোণ থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে তেমন একটা ফল পাওয়া যায়নি। কিন্তু ইরানের জন্য এটি আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ফলে তাদের তেল রপ্তানি যেমন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, তেমনি প্রায় পূর্ণ হয়ে যাওয়া তেল মজুতগারগুলো খালি হওয়ায় থমকে থাকা উৎপাদনও আবার শুরু করা যাচ্ছে।
তাছাড়া লজিস্টিক ও লেনদেনের জটিলতা কমে যাওয়ায় ইরানের তেল কোম্পানিগুলো—এবং স্বাভাবিকভাবেই ইরান সরকার—প্রতি ব্যারেল তেল বিক্রি করে এখন আগের চেয়ে কিছু বেশি মুনাফাও করতে পারছে।
কিছু বিশেষজ্ঞের ধারণা, এই লাইসেন্সের মেয়াদ যদি অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানো হয়, তবে ইরান আরও বড় ও বৈচিত্র্যময় ক্রেতাদেড় টানতে পারবে। এর সঙ্গে যদি যোগ হয় ট্রানজিট ফি বাবদ বছরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের আয়, অবরুদ্ধ হয়ে থাকা সম্পত্তি ছাড় ও ট্রাম্পের প্রতিশ্রুত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ তহবিল—তাহলে আগামী এক দশকের মধ্যেই ইরান পারস্য উপসাগরের অন্যতম ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।
অঞ্চলটি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল এক বড় ব্যবসায়ী বলছেন, এই বিপুল ঐশ্বর্য পেতে ইরানকে তাদের পারমাণবি কর্মসূচি বা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের মিত্র বাহিনীগুলোকে সমর্থনের ক্ষেত্রে খুব একটা পিছু হটতে হবে না। একে কার্যত আমেরিকার 'পূর্ণ আত্মসমর্পণ' হিসেবে দেখা হতে পারে, যার কারণে ট্রাম্পকে সম্ভবত দেশের ভেতরে তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়তে হবে। পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে এমনটা ঘটার সম্ভাবনা দিন দিন জোরালো হচ্ছে।
