সাশ্রয়ী মূল্যে বিরল রোগ সিস্টিক ফাইব্রোসিসের ওষুধ আনল বেক্সিমকো, আশার আলো দেখছেন রোগীরা
ফুসফুস ও পরিপাকতন্ত্রকে আক্রান্ত করা বিরল জেনেটিক রোগ সিস্টিক ফাইব্রোসিসে আক্রান্ত ছয় বছর বয়সি আদিল রহমান গত ১৫ জুন প্রথমবারের মতো নির্দিষ্ট রোগের ওষুধ খাওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
আদিলের পরিবার জানায়, সে এখন আগের চেয়ে ভালো আছে, তার ক্ষুধাও বেড়েছে। এটি সম্ভব হয়েছে বেক্সিমকো ফার্মার সিস্টিক ফাইব্রোসিসের ওষুধ ট্রাইকো দিয়ে চিকিৎসা শুরু করার পর।
আদিলের বাবা, ব্যবসায়ী মো. মোস্তাফিজুর রহমান মুন্সির জন্য মুহূর্তটি ছিল এক দীর্ঘ ও কঠিন যাত্রার অবসান।
আদিলের বয়স তখন মাত্র কয়েক মাস, তখনই এই রোগের প্রথম লক্ষণ ধরা পড়ে। বারবার কাশি ও তেলতেলে মলের সমস্যায় ভুগছিল সে। লক্ষণগুলোকে শুরুতে শিশুদের সাধারণ স্বাস্থ্যগত সমস্যা মনে হয়েছিল।
আদিলের বয়স যখন তিন বছর, তখন বাংলাদেশের একজন চিকিৎসক প্রথম সিস্টিক ফাইব্রোসিসের সম্ভাবনার কথা জানান। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য আদিলকে ভারতের দিল্লিতে যায় তার পরিবার। সেখানে জেনেটিক সিকোয়েন্সিং পরীক্ষার মাধ্যমে ধরা পড়ে, সে সত্যিই এই বিরল রোগে আক্রান্ত।
সিস্টিক ফাইব্রোসিসের কারণে ফুসফুস এবং পরিপাকতন্ত্রে ঘন ও আঠালো শ্লেষ্মা জমতে থাকে, যার ফলে শ্বাসপ্রশ্বাস ও হজমে মারাত্মক জটিলতা দেখা দেয়। কার্যকর চিকিৎসা না হলে এই রোগে মানুষের আয়ু অনেক কমে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাপী প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। ধারণা করা হয়, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম-আয়ের দেশগুলোতে আরও প্রায় ৮০ হাজার রোগীর রোগ শনাক্ত করা হয়নি।
বাংলাদেশে সিস্টিক ফাইব্রোসিস রোগীর সঠিক সংখ্যা অজানা থাকলেও চিকিৎসকদের ধারণা অনুযায়ী, দেশে প্রায় ২ হাজার মানুষ এই রোগে ভুগছে।
এই রোগের নির্দিষ্ট ওষুধ বাংলাদেশে ছিল না। তাই বছরের পর বছর ধরে আদিলের চিকিৎসা বলতে ছিল উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ—নেবুলাইজেশন, চেস্ট ফিজিওথেরাপি, হজমের জন্য এনজাইম ও ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট।
তার বাবা যুক্তরাষ্ট্রের ভার্টেক্স ফার্মাসিউটিক্যালসের তৈরি সিস্টিক ফাইব্রোসিসের যুগান্তকারী ওষুধ ট্রাইকাফটা-র কথা জানতেন, কিন্তু এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
মোস্তাফিজুর টিবিএসকে বলেন, 'আমি থেকেই জানতাম ট্রাইকাফটা নামে একটা ওষুধ আছে, কিন্তু এর দাম বছরে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার ডলার—যা আমাদের মতো পরিবারের জন্য একেবারেই অসম্ভব।'
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে ট্রাইকাফটা বহু রোগীর জীবন বদলে দিয়েছে। তবে দাম চড়া ও সরবরাহ সীমিত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার রোগীর পক্ষে এই ওষুধ পাওয়া সম্ভব হয়নি।
ছেলের চিকিৎসার জন্য মোস্তাফিজুর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। এমনকি বিদেশে পাড়ি জমানোর কথাও ভেবেছিলেন, যেখানে চিকিৎসায় সরকারিভাবে সহায়তা পাওয়া যায়।
চার বছর বয়সে আদিলকে স্কুলে ভর্তি করা হলেও বারবার সংক্রমণের কারণে পড়াশোনা নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। সংক্রমণ হলেই হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয় কয়েকদিন।
এ পর্যন্ত ট্রাইকোর তিনটি ডোজ গ্রহণের পর আদিল স্কুলে ফিরেছে। তার স্বাস্থ্যে আশাব্যঞ্জক উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
তার বাবা বলেন, 'পরিবর্তন চোখে পড়ছে। তার ক্ষুধা বেড়েছে, আগের চেয়ে ভালো আছে।'
ওষুধটি সাশ্রয়ী মূল্যের হওয়ায় তাদের আর্থিক বোঝাও কমেছে। মূল ওষুধের জন্য যেখানে কয়েক লাখ ডলার খরচ হতো, সেখানে আদিলের চিকিৎসায় এখন বছরে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হবে বলে জানান তার বাবা। তিনি আরও বলেন, একজন রোগীকে বছরে কয়টি ডোজ নিতে হবে, তা চিকিৎসকরা নির্ধারণ করে দেন।
বেক্সিমকো ফার্মা বলছে, ট্রাইকোর বার্ষিক মূল্য প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ১২ হাজার ৭৫০ ডলার ও ১২ বছরের কম বয়সি শিশুদের জন্য ৬ হাজার ৩৭৫ ডলার রাখা হয়েছে। ফলে এর দাম মূল আবিষ্কারক কোম্পানির ওষুধের চেয়ে প্রায় ৯৬ শতাংশ কম।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মের অধীনে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের মেধাস্বত্ব ছাড়ের সুবিধার কারণেই ওষুধের দামে এত কম রাখা সম্ভব হয়েছে।
বেক্সিমকো ফার্মার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাব্বুর রেজা বলেন, 'বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হওয়ায় আমরা নির্দিষ্ট কিছু পেটেন্ট বিধিনিষেধ থেকে মুক্ত। এই সুবিধার কারণেই আমরা কম দামে ওষুধ তৈরি করতে পারছি।'
ওষুধের সহজলভ্যতা ও সাশ্রয়ী মূল্যের বিষয়ে তিনি বলেন, 'যদি কোনো ওষুধ থাকে কিন্তু যাদের প্রয়োজন তারা যদি সেটি না পায়, তাহলে সেই ওষুধের কোনো অর্থ থাকে না। আমরা যদি কয়েকশো বা কয়েক হাজার রোগীকেও উন্নত জীবন দিতে পারি, সেটাই আমাদের জন্য বড় অর্জন।'
রেজা বলেন, বিভিন্ন দেশের রোগী ও তাদের পরিবারের সঙ্গে ভার্চুয়াল মিটিং থেকেই এই উদ্যোগের সূচনা। ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে এ ওষুধ তৈরির পরিকল্পনা শুরু হয়।
বেক্সিমকো ফার্মার সিইও বলেন, 'ওই মিটিংগুলো ছিল খুবই আবেগঘন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা—বিভিন্ন দেশের মায়েরা আমাদের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। বলেছিলেন, আমাদের বাচ্চারা মারা যাচ্ছে। আপনারা কেন সাহায্য করতে পারছেন না?'
তিনি আরও বলেন, ওষুধটি যেন মূল পণ্যের গুণগত মান ও কার্যকারিতার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়, তা নিশ্চিত করতে কোম্পানিটি কারিগরি সক্ষমতা অর্জন ও ল্যাবরেটরি পরীক্ষার পেছনে কয়েক বছর সময় ব্যয় করেছে।
প্রচলিত ধারায় রপ্তানি করার পরিবর্তে বেক্সিমকো সরাসরি রোগীদের কাছে ওষুধটি সরবরাহ করার পরিকল্পনা করেছে। বিদেশি রোগীরা সরকার-অনুমোদিত 'নেইমড-পেশেন্ট প্রোগ্রাম'-এর মাধ্যমে অথবা বৈধ প্রেসক্রিপশন নিয়ে বাংলাদেশে এসে এই ওষুধ নিতে পারবেন।
১৫ জুন টঙ্গীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কোম্পানিটি আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ ছয়টি দেশের সিস্টিক ফাইব্রোসিস রোগী এবং তাদের প্রতিনিধিদের হাতে ট্রাইকো তুলে দেয়।
রেজা দক্ষিণ আফ্রিকার একজন রোগীর মায়ের কাছ থেকে পাওয়া একটি বার্তার কথা স্মরণ করেন। ওই রোগী ১৮ বছর ধরে সিস্টিক ফাইব্রোসিসে ভুগছিলেন এবং প্রতি কয়েক মাস পরপর তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হতো।
চিকিৎসা শুরুর পর, জীবনে প্রথমবারের মতো ওই রোগী তার মাকে বলেছিলেন: "আমার ক্ষুধা পেয়েছে।"
ওষুধটি গ্রহণের পর ইতিমধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান রেজা। তিনি বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার এক রোগী ১৮ বছর ধরে এ রোগে ভুগছিলেন, কয়েক মাস পরপর তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হতো। ওষুধ নেওয়ার পর ওই রোগী প্রথমবার তার মাকে বলেছেন: 'আমার ক্ষুধা লেগেছে।'
