১২ দিনেই ‘ট্রিলিয়নিয়ার’ খেতাব হারালেন ইলন মাস্ক, কারণ কী?
প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক মঙ্গলবার তার ট্রিলিয়নিয়ার মর্যাদা হারিয়েছেন। স্পেসএক্সের শেয়ারবাজারে অভিষেকের পর বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদের মালিক হওয়ার দুই সপ্তাহেরও কম সময় পর এই ঘটনা ঘটেছে বলে ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে জানা গেছে।
প্রতিদিন নিউইয়র্ক সময় বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে (ব্রিটিশ সময় রাত ১০টা ৩০ মিনিটে) হালনাগাদ হওয়া ব্লুমবার্গ বিলিয়নিয়ার্স সূচক অনুযায়ী, মঙ্গলবার মাস্কের সম্পদের পরিমাণ ছিল ৯৫৭ বিলিয়ন ডলার (৭২৭ বিলিয়ন পাউন্ড)। এর আগে ১৪ দিনেরও কম সময় আগে তার সম্পদের মূল্যায়ন ছিল ১ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ডলার।
এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দীর্ঘমেয়াদি লাভজনকতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান সন্দেহের কারণে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারবাজারে ব্যাপক পতন দেখা দেয়। এর ফলে স্পেসএক্স ও টেসলার শেয়ারের মূল্যও অনেক বেশি কমে যায় এবং মাস্কের সম্পদের মূল্য কমে যায়।
তবে এই ক্ষতির পরও মাস্ক বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে রয়েছেন এবং তার সম্পদের পরিমাণ এখনও তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় অনেক বেশি।
১২ জুন তার রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের বহুল প্রতীক্ষিত শেয়ারবাজারে আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে মাস্ক ইতিহাস গড়েছিলেন।
ন্যাসডাক শেয়ারবাজারে কোম্পানিটির প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) শেয়ারপ্রতি মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৩৫ ডলার এবং লেনদেন শুরু হওয়ার সময় তা ১৫০ ডলারে উন্মুক্ত হয়েছিল।
এই আত্মপ্রকাশের ফলে রকেট ও কৃত্রিম উপগ্রহ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য ১ দশমিক ৭৭ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি হয়।
মাস্কের মালিকানায় স্পেসএক্সের প্রায় ৪২ শতাংশ শেয়ার থাকায় কোম্পানিটির তালিকাভুক্তি তার কাগুজে সম্পদের মূল্যকে তাৎক্ষণিকভাবে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের সীমার ওপরে নিয়ে যায়।
১৬ জুনের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের প্রবল আগ্রহে স্পেসএক্সের শেয়ারের মূল্য সর্বোচ্চ ২২৫ দশমিক ৬৪ ডলারে পৌঁছে যায়। ফলে মাস্কের মোট সম্পদের পরিমাণও সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৩২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়।
তবে বাজারের এই উত্থান দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
পুঁজির ব্যয় বৃদ্ধি, এআই-এর অবকাঠামো নির্মাণের উচ্চ খরচ এবং একগুঁয়ে উচ্চ সুদের হার নিয়ে উদ্বেগের কারণে প্রযুক্তি খাতে ব্যাপক বিক্রির চাপ সৃষ্টি হয়।
এর ফলে বিশেষ করে এনভিডিয়া, ইন্টেল এবং এএমডির মতো দ্রুত বড় হতে থাকা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বড় আঘাতের মুখে পড়ে।
তবে এই সংশোধনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা সামলাতে হয়েছে স্পেসএক্সকে।
জুনের মাঝামাঝি সময়ের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ৩০ শতাংশেরও বেশি কমে প্রায় ১৫৬ ডলারে নেমে আসে।
২২ জুন মাত্র এক দিনের মধ্যে ১৬ শতাংশ পতনের ফলে মাস্কের ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে আনুমানিক ২৪০ বিলিয়ন ডলার হারিয়ে যায়।
একই সময়ে তার বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার শেয়ারও এক দিন পরে প্রায় ৬ শতাংশ কমে যায়, যা আর্থিক ক্ষতিকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
টেসলার মোট প্রচলিত শেয়ারের প্রায় ১২ শতাংশের মালিক ছিলেন মাস্ক।
মাস্কের ট্রিলিয়নিয়ার মর্যাদা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ তার সম্পদের অত্যন্ত বড় অংশ কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের ওপর নির্ভরশীল।
বহুমুখী বিনিয়োগ পোর্টফোলিও থাকা প্রচলিত ধনকুবেরদের তুলনায় তার সম্পদের প্রায় পুরো অংশই মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের সঙ্গে যুক্ত।
এর মধ্যে স্পেসএক্স তার মোট সম্পদের প্রায় ৮০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব করে এবং বাকি বড় অংশ টেসলা থেকে আসে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, অত্যন্ত উচ্চ মূল্যায়নপ্রাপ্ত প্রবৃদ্ধিনির্ভর প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির পর এ ধরনের ওঠানামা পুরোপুরি স্বাভাবিক।
তবে এই বড় ধরনের মূল্যপতন আসলে অতিরিক্ত প্রত্যাশা এবং বাস্তবতার মধ্যকার গভীর টানাপোড়েনকেই প্রতিফলিত করে।
এজে বেল-এর আর্থিক বিশ্লেষণ প্রধান ড্যানি হিউসন বলেন, 'স্পেসএক্সের মতো একটি শেয়ারের ক্ষেত্রে অনেক সিদ্ধান্তই হয়তো আবেগপ্রসূত ছিল এবং মহাকাশ অনুসন্ধান ও ব্যবহারে বিশাল অগ্রগতির প্রত্যাশার ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এত বড় অঙ্কের অর্থ জড়িত থাকলেও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পরিষ্কার দৃষ্টিভঙ্গি ও ধৈর্য নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।'
জুলাইয়ের শেষ দিকে কোম্পানির ভেতরের শেয়ারধারীদের জন্য ধাপে ধাপে শেয়ার বিক্রির ওপর থাকা বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ার কথা রয়েছে।
ফলে বাজারে বিক্রির চাপ আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
তবে স্পেসএক্সের শেয়ারের মূল্য যদি মাত্র ৬ শতাংশ পুনরুদ্ধার করতে পারে, তাহলে মাস্কের সম্পদ আবার ১৩ অঙ্কের সীমা অতিক্রম করবে।
সেই ক্ষেত্রে তিনি বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে বারবার ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদের মালিক হওয়ার রেকর্ড গড়তে পারেন।
