হরমুজ খোলার আশায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের নিচে
কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার বিষয়ে ইরানের সাথে একটি চুক্তির আশাবাদ ব্যক্ত করার পর মঙ্গলবার তেলের দাম তিন সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানান, আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে এবং সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চললে চলতি সপ্তাহেই প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হতে পারে।
এই খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের নিচে নেমে আসে। সম্ভাব্য সরবরাহ সংকট কমতে পারে—এমন প্রত্যাশাই বাজারে এই দরপতনের প্রধান কারণ।
তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একাধিক দফা আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে এবং উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টাও সফল হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক তেলের বাজার এখনও অত্যন্ত অস্থির। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের ওপর পড়ছে, কারণ বিভিন্ন দেশে জ্বালানির খুচরা দাম বেড়ে যাচ্ছে।
মঙ্গলবার ব্রেন্ট তেলের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দামও ৫ শতাংশের বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৬ ডলারে নেমে আসে। উভয় ধরনের তেলের দামই ১৩ জুলাইয়ের পর সর্বনিম্ন অবস্থানে পৌঁছায়।
মার্কো রুবিও বলেন, ইরান ও ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আরও বেশি জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে, যদিও এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি। তবে খুব শিগগিরই এ বিষয়ে অগ্রগতি হবে বলে তারা আশা করছেন।
অন্যদিকে স্কট বেসেন্ট সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, মঙ্গলবার অথবা বুধবারের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি চুক্তি হতে পারে।
তার ভাষায়, আজ অথবা আগামীকাল এমন একটি সমঝোতা হতে পারে, যার মাধ্যমে প্রণালিটি খুলে যাবে এবং চলমান সংঘাত ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থার দিকে এগোবে।
জাহাজ চলাচলের জন্য ইরান কোনো ধরনের অর্থ আদায় করতে পারবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বেসেন্ট বলেন, বিষয়টি মূলত অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার সঙ্গে সম্পর্কিত।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা আলোচনায় অগ্রগতির কথা বলেছেন, সম্ভাব্য চুক্তির কাঠামো বা শর্তাবলি সম্পর্কে এখনো কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে ইরান জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা করছে না এবং এমন কোনো পরিকল্পনাও নেই। বরং তারা মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানান, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ওমানের সঙ্গে তাদের আলোচনা ইতিবাচক হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী কাতারও জানিয়েছে, তারা অন্যান্য মধ্যস্থতাকারী দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে আপাতত দুই দেশের মধ্যে কোনো সরাসরি আলোচনার পরিকল্পনা নেই।
এদিকে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের দীর্ঘ-পাল্লার নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রের বৈশ্বিক মজুতের প্রায় সবটাই ব্যবহার করে ফেলেছে বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র বিবিসির সহযোগী সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে জানিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বের দৈনিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে অধিকাংশ জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও ওই অঞ্চলে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করেছে।
অন্যদিকে ২০ জুলাই থেকে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের বন্দরগুলোর ওপরও অবরোধ কার্যকর করেছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর লোহিত সাগরের এই রুটটি বিকল্প হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু গত এক সপ্তাহে সেখানে একের পর এক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটায় পথটি এখন ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
মঙ্গলবার ইয়েমেন উপকূলের কাছে একটি ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ডুবে যায় বলে ভারতের নৌপরিবহনমন্ত্রী জানান। তবে জাহাজে থাকা ১৪ জন আরোহীকেই নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে তেলবাহী জাহাজের নিরাপত্তা এখন সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে রয়েছে।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান এজে বেলের আর্থিক বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান ড্যানি হিউসন বলেন, বিনিয়োগকারীরা খুব ভালো করেই জানেন যে, এর আগেও বহুবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাই স্থায়ী কোনো সমঝোতা হবে কি না, সে বিষয়ে তারা এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
এই অস্থিরতার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানির খুচরা মূল্য বেড়ে গেছে। যুক্তরাজ্যে এক লিটার পেট্রোলের গড় দাম এখন প্রায় ১ দশমিক ৬০ পাউন্ডে পৌঁছেছে, যা যুদ্ধ শুরুর সময়কার দামের সমান বলে আরএসি মোটরিং গ্রুপ জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও এক গ্যালন পেট্রোলের গড় মূল্য ৪ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। একইভাবে ডিজেলের দামও প্রায় ৫ দশমিক ৪০ ডলার প্রতি গ্যালনে পৌঁছেছে বলে এএএ জানিয়েছে।
সংঘাত তীব্র হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারেরও বেশি বেড়েছে। আবার আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত মিললেই দাম দ্রুত কমে গেছে।
উচ্চ তেলের দামের কারণে বিপি, শেল, শেভরন ও এক্সন মবিলের মতো বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলো বিপুল মুনাফা করেছে।
তবে ড্যানি হিউসনের মতে, এত বড় আয় সত্ত্বেও এসব তেল কোম্পানির ভবিষ্যৎ অনেকটাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও কৌশলের ওপর নির্ভর করছে।
সোমবার ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালুর বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য ইরানের সামনে এটাই শেষ সুযোগ।
তিনি আরও জানান, আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার স্বার্থে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত বড় ধরনের সামরিক হামলা স্থগিত রেখেছেন।
এদিকে সম্ভাব্য সমঝোতার খবর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক আর্থিক ফলাফলের কারণে মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারও ঊর্ধ্বমুখী ছিল।
যদিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগের ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকায় ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে, তবুও বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই খাতে বিনিয়োগ আরও বাড়তে পারে।
