বাংলাদেশে কোনো ‘আদিবাসী’ নেই: সব সরকারই কেন এই বিষয়ে একমত
রাঙামাটি, বান্দরবান এবং খাগড়াছড়ি, গারোদের এলাকা বিরিশিরি, হালুয়াঘাট, সুসং দুর্গাপুর ইত্যাদি আমাদের কাছে এখন পুরোপুরিই টুরিস্ট স্পট। এসব জায়গার আর কোনো পরিচয় নেই। পাহাড়ে বেড়ানো, আদিবাসী রান্না, জুমের সবজি, পাহাড়িদের বাড়িতে থাকা, পরনের কাপড়, শোপিস, সাংস্কৃতিক উৎসব উপভোগ—সবই করি পুরো দমে। রাস পূর্ণিমা, বিজু, নবান্ন, ওয়ানগালার মতো অন্যান্য উৎসবও বাদ যায় না।
শুধু বাদ যায় আদিবাসীদের অধিকার, পরিচয় ও সম্মানের দিকটি। মর্মান্তিক সত্যটি হচ্ছে, আদিবাসী/পাহাড়িদের প্রতি আমাদের চলমান উপেক্ষা। আমরা পাহাড়ে বেড়াই, আনন্দ করি; কিন্তু ফিরে এসে ভুলে যাই সেখানকার মানুষগুলোর অধিকার, দুঃখ-দুর্দশা, না-পাওয়া, তাদের প্রতি হওয়া অবহেলা ও অসম্মানের কথা।
আমরা কি জানতে চাই, প্রতিদিন পাহাড়ে কত মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে? কতজন হানাহানিতে মারা যাচ্ছে, পাহাড় কেটে সাবাড় করছে কারা, বনভূমি উজাড় করছে কারা, আদিবাসীদের জমি দখল করছে কারা, কত আদিবাসী নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন? না, আমরা খোঁজ রাখি না, রাখতে চাইও না।
এমনকি 'ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী' পরিচয়ে বারবার অস্বীকার করছি তাদের আত্ম-অধিকারের দাবি। স্বাধীনতার পর থেকেই আদিবাসীদের পরিচয় নিয়ে একটি সংকট ও টানাহেঁচড়া চলছে। সেই সময় আদিবাসী নেতারা যখন তাদের সাংবিধানিক অধিকারের জন্য দাবি জানিয়েছিলেন, তৎকালীন সরকার সঙ্গে সঙ্গেই সেটা প্রত্যাখ্যান করেছিল। বলা হয়েছিল, বাঙালি হিসেবে থাকাটাই সম্মানের হবে।
অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, আজ স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও অবস্থা তাই রয়ে গেছে। রাজনীতিতে অনেক পরিবর্তন হলেও, আদিবাসীদের পরিচয় নিয়ে সেই টানাহেঁচড়া চলছেই। কেন পরিচয় নিয়ে এই টানাটানি চলছে, সে কথা মোটামুটি আমরা জানি।
এ দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী মনে করে, বিশ্বব্যাপী আদিবাসীদের কিছু সাংবিধানিক অধিকার আছে। তাই এ দেশের আদিবাসীদের 'নৃ-গোষ্ঠী' বললে তারা সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন। যাদের দলিলকৃত জায়গা কম, তাদেরকে সরিয়ে বা উচ্ছেদ করে যখন-তখন জমি বাঙালিদের লিজ দেওয়া সম্ভব। অথবা সরকার চাইলেই ইকো পার্ক করতে পারে।
স্বাধীনতার পর থেকেই এগুলো চলে আসছে সাংবিধানিক অধিকার না থাকার কারণে। আদিবাসী হিসেবে 'সাংবিধানিক স্বীকৃতি' থাকলে এগুলো করার আগে সাংবিধানিক অধিকার অনুসরণ করতে হতো এবং ব্যাপারটা এত সহজ হতো না।
জাতিসংঘের ঘোষণাপত্র স্বাক্ষর করার অর্থ হচ্ছে, সেখানে যেসব বিষয় উল্লেখ করা আছে, সেগুলো মেনে নেওয়া এবং বাস্তবায়নের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া। তাই বাংলাদেশ জাতিসংঘের ঘোষণায় স্বাক্ষর করেনি এবং 'আদিবাসী' শব্দটিও মেনে নেয়নি বলে অনেকে মনে করেন।
'সরকারের সমস্যা হলো, আদিবাসী শব্দের আক্ষরিক অর্থের জায়গা থেকে কাউকে যদি আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে দেওয়া হয় যে, সে এখানে আগে থেকে বসবাস করছে, তাহলে সেই জায়গার ওপর তার একটি দাবি তৈরি হয়ে যায়। বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু তারা সবাই-ই এটাকে স্বীকৃতি দেওয়ার বেলায় সন্দেহপ্রবণ, তাদের আশঙ্কা যে জমি নিয়ে সমস্যা হবে।' (অধ্যাপক হাসান এ শাফী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)
স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারগুলোর 'আদিবাসী' শব্দ নিয়ে অস্বস্তি বা আপত্তির মূল কারণ হলো, আন্তর্জাতিক আইনের বিশেষ সুবিধা, ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ এবং সাংবিধানিক স্বীকৃতি না দেওয়ার মানসিকতা। রাষ্ট্র মনে করে, এই শব্দ ব্যবহার করলে বিশেষ অধিকার বা স্বাধিকারের দাবি জোরালো হতে পারে।
বাংলাদেশের সংবিধানে (পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী) 'আদিবাসী' শব্দটির কোনো আইনি স্বীকৃতি নেই; বরং সেখানে 'উপজাতি', 'ক্ষুদ্র জাতিসত্তা' বা 'নৃগোষ্ঠী' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। সব সরকারই মনে করে, মূলধারার বাইরে এই 'আদিবাসী' শব্দের ব্যবহার সাংবিধানিক বিধানের বরখেলাপ। শব্দের এই আইনি মারপ্যাঁচে চাপা পড়ে গেছে তাঁদের মূল সংকট। এখন পর্যন্ত পাহাড় কিংবা সমতল—সবখানেই আদিবাসীদের প্রধানতম লড়াইটি হলো ভূমি রক্ষার লড়াই।
যে কোনো দেশের সভ্যতার পরিমাপ করা হয় সেই দেশের সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার কতটুকু সুরক্ষিত, তার ওপর ভিত্তি করে। বাংলাদেশে বাঙালি বাদেও প্রায় অর্ধশতাধিক নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ যুগ যুগ ধরে বাস করে আসছেন।
তাঁদের ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনবোধ এবং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের ঐতিহ্য আমাদের এই ভূখণ্ডকে সমৃদ্ধ করেছে। অথচ এই মানুষগুলো পায়নি তাঁদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ভূমির অধিকার। তাঁদের আত্মপরিচয়ের সংকটও কাটেনি।
অপ্রিয় হলেও সত্য যে সরকার পক্ষ এবং বাংলাদেশিদের অনেকেই মনে করে, বাঙালিরাই এই ভূখণ্ডের প্রধান আদি বা মূল বাসিন্দা। তারা এও মনে করেন, পাহাড়ি বা সমতলের জনগোষ্ঠীকে 'আদিবাসী' বললে অন্য একটি স্বতন্ত্র জাতি বা আলাদা স্বাধিকারের প্রশ্ন ওঠে।
এমনকি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পরে রাষ্ট্রের সংস্কার ও রূপান্তরের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়, তাতে পাহাড় ও সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর প্রতিনিধিরা বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি উপস্থাপন করেছিলেন। সেখানেও দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা 'আদিবাসী' পরিচয়ের রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি জানানো হয়েছিল।
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারের বিষয়ে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বিভিন্ন সময়ে সহমর্মিতা জানানো হলেও, শেষ পর্যন্ত আদিবাসীদের অধিকার বিষয়ক স্ট্যাটাসটা সেরকমই রয়ে গেল। দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় অবস্থান অপরিবর্তিতই রয়েছে।
'জুলাই জাতীয় সনদ'-এ সব রাজনৈতিক দল ও অংশীজন একমত হয়েছে যে দেশের সর্বস্তরের মানুষের মূল পরিচয় হবে বাংলাদেশি, যা সার্বভৌমত্ব রক্ষার ভিত্তি।
দেশের প্রচলিত কোটাব্যবস্থার সংস্কারের দাবি নিয়ে জুলাই মাসের প্রথম দিকে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছিলেন। তখন প্রচলিত কোটাব্যবস্থা সংস্কার করে মেধার মূল্যায়নের ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে সমসুযোগ পাওয়ার দাবি ছিল মূল। কিন্তু কোটাবিষয়ক সর্বশেষ সিদ্ধান্তে এসে দেখা গেল, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আদিবাসী ছেলেমেয়েরা। ক্ষুদ্র জাতিসত্তাদের জন্য মাত্র ১ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যেটি খুবই নগণ্য, অন্যায্য ও অযৌক্তিক। কেননা পাহাড় ও সমতলে যেখানে ৫০টির বেশি জাতিসত্তা রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও খুব সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন যে বাংলাদেশে কোনো 'আদিবাসী' গোষ্ঠী নেই, বরং ভৌগোলিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতায় এ দেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী সবাই 'অধিবাসী' এবং তাদের মূল পরিচয় 'বাংলাদেশি'। জাতিসংঘে আদিবাসী অধিকারবিষয়ক ঘোষণাপত্র প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ শুরু থেকেই এ বিষয়ে তার স্পষ্ট অবস্থান বজায় রেখে ভোটদানে বিরত ছিল।
উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের সব আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের ঘোষণাপত্র ঘোষণা করা হয়, যা 'ইউনাইটেড ন্যাশনস ডিক্লারেশন অন দ্য রাইটস অব ইনডিজেনাস পিপলস' নামে গৃহীত হয়।
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের ওই ঘোষণাপত্রের পক্ষে ১৪৪টি দেশ ভোট দিয়েছিল। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছিল বিপক্ষে ভোট। আর ১১টি দেশ ভোটদান থেকে বিরত ছিল। বাংলাদেশ হলো সেই দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।
২০০৭ সালে গৃহীত হওয়া সেই ঘোষণাপত্রে 'আদিবাসীদের' নানাবিধ অধিকারের কথা বলা হলেও সুনির্দিষ্টভাবে 'আদিবাসীদের' কোনো সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি। তবে জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী, আদিবাসী সংজ্ঞায়ন কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। যেমন ঔপনিবেশিক আমল থেকে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে আছে কি না। অর্থাৎ, ওই অঞ্চলের ভূমির সঙ্গে তাদের গভীর সংযোগ থাকতে হবে।
সেই সঙ্গে, যাদের নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থা থাকার পাশাপাশি নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসও অক্ষুণ্ন রয়েছে। কাউকে নিপীড়ন করে ওই ভূখণ্ড দখল করার ইতিহাস যাদের নেই এবং যারা ওই এলাকার আধিপত্যবাদী গ্রুপ নয়।
এই ভূখণ্ডে কে আগে এসেছে এবং কে পরে এসেছে, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে নয়; তারা এই আদিবাসী পরিচয় চায় তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, রীতি-নীতি ইত্যাদি বিবেচনায়। 'আমি আদিবাসী, আমি এই পরিচয়েই থাকতে চাই।'
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীনও মনে করেন, 'আদিবাসী বিষয়টিকে বাংলাদেশে যেভাবে দেখা হয়, অনুবাদ করা হয়... সেখানে প্রথম প্রশ্ন করা হয়, কে আগে এসেছে, কে পরে এসেছে? কিন্তু আদিবাসীর সংজ্ঞায় কে আগে এসেছে, কে পরে এসেছে, তার কোনো সম্পর্ক নাই।' (বিবিসি বাংলা)
উন্নত দেশগুলো তাদের ঐতিহাসিক ভুলগুলো পরে সংশোধন করছে। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা বা নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলো আদিবাসীদের ওপর অতীতের অন্যায় স্বীকার করে সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার নিশ্চিত করছে। বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে আদিবাসীদের ভূমির অধিকার ও রাষ্ট্রীয় অংশীদারিত্ব দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু 'আদিবাসী' শব্দটির ব্যবহার নিয়ে এক ধরনের রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক অস্বস্তি রয়েই গেছে আমাদের। জাতীয় মূলধারার সঙ্গে সমতা আনার জন্য রাষ্ট্র কোটা ব্যবস্থা ও বিশেষ সুযোগ চালু রাখলেও, পাহাড় ও সমতলের জাতিগত বৈচিত্র্যকে ধারণ করার প্রশ্নে আদিবাসী সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যেকার ধারণাগত দূরত্ব এখনও একটি বড় অমীমাংসিত ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে।
উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, নাকি আদিবাসী? ঠিক কোন শব্দের মধ্য দিয়ে 'তাদেরকে' সংজ্ঞায়িত করা হবে? এই বিতর্কে না থেকে আমরা যদি সত্যিকারের একটি বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে চাই, তবে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকারকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্র সবার, রাষ্ট্রের কাছে বাঙালি, পাহাড়ি, আদিবাসী সবার অধিকার সমান হওয়া উচিত।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের অধিকার ও আত্মপ্রত্যয়ের বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার ড. রোডোলফ স্ট্যাভেনহ্যাগেন একসময় বলেছিলেন, 'আত্মপ্রত্যয় এবং গণতন্ত্রের মধ্যে সম্পর্ক থিওরি ও প্র্যাকটিসের মতোই জোরালো করতে হবে। আমাদের চারপাশে যে সহিংসতা দেখতে পাই, এগুলো কিন্তু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আত্মপ্রত্যয়ের কারণে ঘটেনি, এগুলো ঘটেছে তাদের আত্ম-অধিকারের দাবিকে অস্বীকার করা ও সব ধরনের অপ্রাপ্তি থেকে।' এই কথাটি আমাদের জন্য অবশ্য প্রণিধানযোগ্য।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
