‘জঙ্গল ধ্বংস হইছে, আমরাও ধ্বংস হইছি’: যেভাবে মাতৃভাষা ও ভূমি হারাল মধুপুরের কোচরা
টাঙ্গাইলের মধুপুর অঞ্চলে কোচ সম্প্রদায়ের বসবাস কয়েক শত বছরের। এই জনপদেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা পীরগাছা গ্রামের নিরঞ্জন চন্দ্র বর্মনের (৭০)। এককালে তার নামের শেষে পদবি হিসেবে যুক্ত ছিল 'কোচ' শব্দটি। তবে এখন এলাকার অন্য অনেক কোচের মতো তিনিও 'বর্মন' পদবি ব্যবহার করেন।
নিরঞ্জনের শৈশব কেটেছে ঘন জঙ্গলে ঘেরা মাটির কুটিরে। তখনকার মধুপুর ছিল পাহাড় ও বনভূমির এক সমৃদ্ধ জনপদ। বানর, হরিণ, ময়ূরের মতো প্রাণীর দেখা মিলত হরহামেশা; মাঝেমধ্যে হানা দিত বাঘ। এই প্রকৃতির সঙ্গেই গড়ে উঠেছিল কোচদের নিবিড় সহাবস্থান। অরণ্যের ফলমূল সংগ্রহ, চাষাবাদ আর নিজস্ব রীতিনীতি মেনে তখন তাদের জীবন ছিল আনন্দের।
কিন্তু মহাকালের আবর্তে সব বদলে গেছে। বন উজাড় হয়েছে, পাহাড় হয়েছে বিলীন, হারিয়ে গেছে অরণ্যের প্রাচুর্য। সেই সঙ্গে ক্ষয়িষ্ণু হয়েছে কোচদের স্বাতন্ত্র্য। অরণ্য ধ্বংসের কোন সন্ধিক্ষণে জাতি হিসেবে তাদের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয়ে গেছে, নিরঞ্জনরা আজ তা ঠিক করে বলতে পারেন না। তবে জঙ্গলে রাজত্ব আর যাবতীয় জৌলুসের সঙ্গে তারা যে অমূল্য সম্পদটি হারিয়ে ফেলেছেন, তা হলো তাদের নিজেদের মাতৃভাষা!
কোচদের খোঁজে মধুপুর
ঢাকা থেকে মধুপুরের দূরত্ব প্রায় ১৩০ কিলোমিটার। তবে গন্তব্যে পৌঁছানোই শেষ কথা নয়, সেখানে গিয়ে খুঁজে পেতে হয় নিভৃত কোচ পল্লীগুলোকে। মধুপুরের ঠিক কোন অঞ্চলে তাদের দেখা মিলবে; তা জানতে চাইলে স্থানীয়রা জানালেন, কোচদের গ্রামে যেতে হলে জলছত্র বাজার থেকে আরও কিছুটা সামনে এগোতে হবে।
মধুপুর থেকে জলছত্র যাওয়ার পথে রাস্তার দুই ধারে চোখে পড়ে বিস্তৃত কলার বাগান। কোথাও আনারসের চাষ, আবার আনারস ক্ষেতের ভেতরেই সারি সারি পেঁপে গাছ। চারদিকে এখন শুধুই কৃষিজমির বিস্তার। রাস্তার পাশেই চলছে ফল প্যাকেজিংয়ের কাজ। এলাকার নতুন পিচঢালা রাস্তাটি বেশ প্রশস্ত, ফলে কৃষিপণ্য ঢাকায় পরিবহনের সুব্যবস্থা রয়েছে। তবে এই রাস্তার ধারে প্রাকৃতিক বনের ছিটেফোঁটাও আর চোখে পড়ে না। কিছুটা এগোলে অবশ্য সারি সারি শালগাছ দেখা যায়, কিন্তু সেগুলো দেখলেই বোঝা যায়, প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা বন নয়, বরং কৃত্রিমভাবে গড়ে তোলা। এই শালবনগুলো এখন পর্যটকদের বনভোজনের স্পটে পরিণত হয়েছে।
জলছত্রে পৌঁছে পরিচিত এক সূত্রের মাধ্যমে সন্ধান মিলল কোচ নেতা গৌরাঙ্গ বর্মনের। তিনি কোচ আদিবাসী সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক। দীর্ঘদিন ধরে কোচ ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা এবং এলাকার ভূমি-সংক্রান্ত নানা বিরোধ নিষ্পত্তিতে ভূমিকা রাখছেন তিনি। মধ্যবয়সী এই মানুষটি আমাদের পথ দেখালেন এবং শোনালেন তার জাতিসত্তার বিবর্তনের নানা কাহিনি। আলোচনার শুরুতেই তিনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, 'আমার ছোটবেলার সেই মধুপুর কিন্তু আর নেই।'
গৌরাঙ্গ জানালেন, মধুপুর অঞ্চলে কোচদের জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় তিন হাজারের কাছাকাছি। এককালে এই বনভূমিই ছিল তাদের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস। কিন্তু বনের অধিকার হারানোর সঙ্গে সঙ্গে তারা তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনধারা থেকেও বিচ্যুত হয়েছেন; ধীরে ধীরে মিশে গেছেন বৃহত্তর সামাজিক স্রোতে। এমনকি নিজেদের পদবিটুকুও বিসর্জন দিতে হয়েছে টিকে থাকার স্বার্থে। তিনি আরও জানালেন, একসময় 'আদিবাসী' পরিচয়ে কোচরা জমির মালিক হতে পারতেন না, জমি কেনাবেচাও ছিল কঠিন। ফলে বাধ্য হয়েই তারা নিজেদের পদবি বর্জন করে বাঙালি হিন্দু মূলধারার সঙ্গে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।
ভুটিয়া বাজারে কথা হলো কয়েকজন গারো বাসিন্দার সঙ্গে। তাদের কণ্ঠেও হারানোর হাহাকার। তারা জানালেন, একসময় এই পথের দুপাশে ছিল গহীন অরণ্য। আদিবাসী গ্রামগুলোতে ঢুকতে তখন বেগ পেতে হতো। আজ সেসব শুধুই চাষের জমি। গারো ও কোচরা এখন কৃষিকাজ করলেও তাদের হাতে থাকা জমির পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য।
তিরিশটি গ্রামের কোচ জনপদ
গৌরাঙ্গ বর্মনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী আমরা পৌঁছালাম পীরগাছা গ্রামে। সেখানে চায়ের দোকানে আড্ডারত একদল প্রবীণ কোচের সঙ্গে কথা হলো। তাদের চোখেমুখে সোনালি অতীতের কোনো আভা নেই, আছে কেবল বর্তমানের রূঢ় বাস্তবতা ও দুঃখবোধ। হারিয়ে ফেলা ভাষার কথা উঠতেই সেই দুঃখ যেন আরও প্রগাঢ় হয়ে এলো। তাদের বয়ানে উঠে এল জঙ্গল হারানোর পর নিজেদের অস্তিত্ব হারানোর আখ্যান।
গ্রামের আশ্রমে কর্মরত প্রবীণ সত্যানন্দ গোস্বামী জানালেন, আশ্রমের এই চত্বরে এককালে পাহাড় ছিল। প্রাকৃতিক বনের গাছপালা এত ঘন ছিল যে সূর্যের আলো পর্যন্ত পৌঁছাত না। আজ সেখানে কোনো প্রাচীন গাছের অস্তিত্বই নেই। নিরঞ্জন চন্দ্র বর্মন স্মৃতি হাতড়ে বললেন, এই অঞ্চলে দুটি বড় পাহাড় ছিল; একটি 'ডাবরের চালা', অন্যটি 'ভানরের চালা'। দুটিই এখন সমতল ভূমি। তিনি বলেন, 'এই জায়গায় আমরা বাঘ দেখছি। এই যে বাইদে [নিচু জমি] আইসা জল খাইছে। হরিণ, ভাল্লুকও ছিল। এখন কিছু বানর আছে খালি।'
মধুপুরে কোচদের মোট গ্রামের সংখ্যা এখন ৩০টি। একসময় এগুলোর প্রতিটিই ছিল বনবেষ্টিত। বর্তমানে বেতুরিয়া, গায়রা আর তেলকি গ্রামে সামান্য কিছু বনের দেখা মেলে। পীরগাছা গ্রামেই ১৯৮৬ সালে প্রায় ৩ হাজার একর জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে দেশের অন্যতম প্রধান রাবার বাগান। ফলে এই গ্রামে প্রাকৃতিক অরণ্য বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
নিরঞ্জন আক্ষেপ করে বললেন, 'জঙ্গল যখন ছিল তখন আমরা চাষবাস, এই যে কিছু কিছু আবাদ করছি। এখন তো ঘন ঘন বসতি হয়ে গেছে। যেখানে ৮ টা পরিবার ছিল সেখানে ২০০ পরিবার উঠছে। এইটুক এরিয়ার মধ্যেই। তাইলে আবাদী ভূমি তো কমবোই। তারপরও কিছু কিছু আমরা হস্তান্তরও করছি। অর্থের অভাবে কারো বাড়তি জমি ১৫-২০ বিঘা থাকলে বিক্রি করে দিছে।'
মধুপুরের বন ধ্বংসের ইতিবৃত্ত
টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত মধুপুর গড় বা বন ধ্বংসের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ব্রিটিশ আমলে রেললাইন স্থাপন ও জাহাজ নির্মাণের প্রয়োজনে নির্বিচারে শালগাছ কাটা শুরু হয়। বনকে 'রিজার্ভ ফরেস্ট' ঘোষণার মাধ্যমে স্থানীয় আদিবাসীদের প্রথাগত অধিকার সংকুচিত করা হয়। পাকিস্তান আমলে শিল্প ও কৃষির সম্প্রসারণ, রাবার বাগান এবং নতুন বসতি স্থাপনের ফলে বন উজাড়ের মাত্রা আরও বাড়ে। স্বাধীনতার পরও কার্যকর বননীতির অভাবে অবৈধ দখল, উন্নয়ন প্রকল্প এবং বিদেশি প্রজাতির গাছ (ইউক্যালিপটাস, আকাশমণি) রোপণের ফলে প্রাকৃতিক শালবন ধ্বংস হয়েছে। ফলে এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
মধুপুর উপজেলার বর্তমান বনভূমি পরিস্থিতি খুবই নাজুক। এখানকার মোট বনাঞ্চলের মাত্র ১৫ শতাংশেরও কম এলাকায় প্রাকৃতিক বন টিকে আছে। বাকি এলাকা দখল করে কলা, আনারস ও পেঁপের বাগান করা হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, বন বিভাগ উচ্ছেদের চেষ্টা করলেও প্রভাবশালী মহলের দখলদারিত্ব এবং সরকারের সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের কারণে প্রাকৃতিক বনগুলো হারিয়ে গেছে অনেক আগেই।
বন কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ভূমিহীন ও নদীভাঙা মানুষরা এখানে বসতি স্থাপন করায় জনসংখ্যা বেড়েছে। ফলে খাদ্যের চাহিদা মেটাতে আরও বেশি বন উজাড় হয়েছে। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, মধুপুর উপজেলার মোট বনভূমি ৪৫ হাজার ৫৬৫ একর। এর মধ্যে মাত্র ৬ হাজার ৭৫৬ একর বা ১৪.৮২ শতাংশ জমিতে প্রাকৃতিক বন রয়েছে। পীরগাছা, হাগুরাকুড়ি, জলছত্রসহ বিভিন্ন এলাকা এখন বনের বদলে আনারস ও কলার জন্য বিখ্যাত।
"জঙ্গল ধ্বংস হইছে, আমরাও ধ্বংস হইছি"
বাংলাদেশে কোচ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের বাস বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে। মধুপুরের অরণ্যে তারা মূলত প্রাকৃতিক সম্পদের টানেই বসতি গড়েছিলেন। এককালে স্থানীয় জমিদারদের খাজনা দিয়ে তারা শান্তিতেই বাস করতেন। কিন্তু পাকিস্তান আমলে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর বনের ওপর তাদের প্রথাগত অধিকার হারায়। অরণ্য ধ্বংস হওয়ার পর কোচরা বাধ্য হয়ে লোকালয়ে চলে আসেন এবং বাঙালিদের সঙ্গে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হন।
৩৫ বছর বয়সী অর্জুন বর্মন কোচ জানান, তাদের পূর্বপুরুষরা সমাজে টিকে থাকতে এবং ভূমি রক্ষার স্বার্থে 'বর্মন' পদবি গ্রহণ করেছিলেন। তারা নিজেদের 'ক্ষত্রিয়' হিসেবে পরিচয় দেন। অর্জুন আক্ষেপের স্বরে বলেন, 'আমাদের এনআইডি কার্ডেও কোচ লেখা নেই, লেখা আছে বর্মন বা রায়। জঙ্গল ধ্বংস হইছে, আর তার সঙ্গে সঙ্গে আমরাও ধ্বংস হইছি।'
কবি ও লোক-গবেষক শিহাব শাহরিয়ার তার 'বাংলাদেশের কোচ জনগোষ্ঠীর সমাজ ও সংস্কৃতি' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় কোচরা ব্যাপক অত্যাচার ও দেশান্তরের শিকার হন। তবে তাদের সবচেয়ে বড় অপূরণীয় ক্ষতিটি হয়েছে স্বাধীনতার পর প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হওয়ার কারণে।
শিহাব শাহরিয়ার বলেন, 'ভূমিদস্যুদের অত্যাচার এবং বাঙালিদের অভিবাসনের ফলে কোচরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। টিকে থাকার তাগিদে তারা বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। তাদের নিজস্ব ভৌগোলিক পরিবেশ রক্ষা করা গেলে হয়তো সংস্কৃতি ও ভাষা টিকে থাকত।'
অরণ্য হারানোর সঙ্গে সংস্কৃতির বিলুপ্তির বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন 'সেন্টার ফর পিপল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট'-এর পরিচালক মুহম্মদ আবদুর রহমান। তার মতে, কোনো জাতিগোষ্ঠী যখন প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল থাকে, তখন তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি অটুট থাকে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, 'আগে কোচরা বন থেকে শস্য সংগ্রহ করত, বনের ফল খেত। তখন তারা নিজেদের ভাষায় কথা বলত। কিন্তু বন উজাড় হওয়ার পর তাদের বাজার ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হতে হয়েছে। বাজারে কেনাবেচা করতে গিয়ে তারা বাংলা ভাষার সংস্পর্শে এসেছে।'
তিনি আরও বলেন, 'বনের সরিষাকে তারা বলত 'সিরষো', ধানকে বলত 'মি'। কিন্তু এখন তাদের বাজার থেকে ধান-সরিষা কিনতে হয়। যেহেতু বাজারের নিয়ন্ত্রণ বাংলাভাষীদের হাতে, তাই লেনদেনের প্রয়োজনে তারা নিজেদের শব্দ ভুলে বাংলা শব্দ গ্রহণ করেছে। এভাবেই এক প্রজন্মের ব্যবধানে শব্দটি হারিয়ে গেছে।'
পূজা ছাড়া আর কোথাও নেই কোচ ভাষা
মধুপুরের কোচরা ধর্মীয় পরিচয়ে হিন্দু হলেও তাদের সাংস্কৃতিক জীবনে কিছু স্বতন্ত্র আচার এখনো টিমটিম করে জ্বলছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো 'গ্রাম পূজা'। শীতের শেষে বা বসন্তের শুরুতে এই পূজার আয়োজন করা হয়।
নিরঞ্জন বর্মন জানান, এই গ্রাম পূজাই এখন তাদের ভাষা ও ঐতিহ্যের শেষ ধারক। তারা তাদের ভাষাকে বলেন 'ফান্তাই'। দৈনন্দিন জীবনে এর ব্যবহার নেই বললেই চলে, তবে গ্রাম পূজার মন্ত্রে এখনো পূর্বপুরুষদের সেই ভাষা উচ্চারিত হয়। এছাড়া প্রাত্যহিক কথাবার্তায় কেবল গুটি কয়েক শব্দ টিকে আছে— যেমন পানিকে তারা বলে 'চিকা', পাহাড়কে 'হাচু', আর লবণকে বলে 'খাইসেম'।
বর্তমানে মধুপুরের কোচদের অধিকাংশই দিনমজুর বা কৃষি শ্রমিক। কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসায় যুক্ত, কেউ হস্তশিল্প বা সেলুনে কাজ করেন। তরুণ প্রজন্মের অনেকে জীবিকার তাগিদে ঢাকায় গিয়ে গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করছেন। দীর্ঘকাল বাঙালিদের সঙ্গে মেলামেশার ফলে তারা বাংলা ভাষাকেই আপন করে নিয়েছেন। বর্তমান প্রজন্মের কোচ শিশুদের কাছে বাংলাই এখন প্রথম ভাষা বা মাতৃভাষা।
স্কুলে বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত কোচ শিশুদের নিজেদের ভাষা সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই। পরিবারের বড়রাও সেই ভাষায় অভ্যস্ত নন। ফলে স্থানীয় কোচদের আশঙ্কা, নতুন প্রজন্মের কাছে এই ভাষা ফিরে যাওয়ার পথ প্রায় রুদ্ধ হয়ে গেছে।
গবেষক শিহাব শাহরিয়ার জানান, নরেন্দ্র কোচ নামে এক ব্যক্তি এই ভাষা সংরক্ষণের শেষ চেষ্টা করেছিলেন। তিনি কোচদের নিজস্ব বর্ণমালা তৈরি এবং একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু জীবিকার প্রয়োজনে তিনি ঢাকা চলে আসায় সেই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আর কোনো আশার আলো দেখা যায়নি।
শঙ্কায় মধুপুরের গারোদের ভাষাও
মধুপুর অঞ্চলের প্রধান দুটি নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে গারোদের সংখ্যাই বেশি। কোচদের ভাষা সেখানে প্রায় বিলুপ্তির পথে হলেও গারোদের মাতৃভাষাও এখন নানামুখী সংকটে।
ভুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পিয়ারা বেগম জানান, তার স্কুলে গারো ভাষার ওপর মাত্র একটি ক্লাস নেওয়া হয়, যাতে কোচ শিক্ষার্থীরাও অংশ নেয়। তবে সব পাঠ্যবই বাংলা ও ইংরেজিতে হওয়ায় এবং গারো ভাষার ওপর কোনো পরীক্ষা না থাকায় শিক্ষার্থীরা কতটুকু শিখছে তা যাচাই করা সম্ভব হয় না।
ভাষাকর্মী জেইসী চিরান বলেন, 'গারো শিশুরা এখন আর প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিজের ভাষা শিখতে পারছে না। আগে ভাষা শেখানোর জন্য শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হতো, এখন তাও নেই। বাচ্চারা এখন মোবাইলে দেশি-বিদেশি কন্টেন্ট দেখে সময় কাটায়, যার সবই বাংলা বা ইংরেজি। শুধু মায়ের মুখ থেকে শুনে একটি ভাষা কতদিন টিকে থাকবে?'
মধুপুরে কোচদের ভাষা আজ ইতিহাস হতে চলেছে। বর্তমান প্রজন্ম তো জানেই না, এর আগের প্রজন্মও স্পষ্টভাবে বলতে বা লিখতে পারে না নিজেদের মাতৃভাষা। প্রবীণদের চোখের বলিরেখায় কেবল হতাশার দীর্ঘশ্বাস। মাটির সঙ্গে ভাষার যে গভীর নাড়ির টান, তা মধুপুরের কোচ পল্লীগুলোতে না গেলে অনুভব করা কঠিন।
মধুপুরের গারোরা চান না কোচদের মতো তাদের ভাষাও হারিয়ে যাক। তাদের প্রাণের আকুতি, পরবর্তী প্রজন্ম যেন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিজেদের মাতৃভাষা শিখতে ও বলতে পারে। কারণ, অরণ্য হারিয়েছে সত্য, কিন্তু মায়ের ভাষাটি যেন অন্তরের গভীরে অন্তত টিকে থাকে।
ছবি: জুনায়েত রাসেল ও ফাইয়াজ আহনাফ সামিন / টিবিএস