কৃষি প্রকল্পের জন্য দ্রুত বন উজাড়ে সেনাবাহিনী নামাল ইন্দোনেশিয়া, হুমকিতে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ
সাম্প্রতিক বন্যায় প্রাণহানি ও বন উজাড়ের ভয়াবহতা দেখার পরও ইন্দোনেশিয়ায় থামছে না বন নিধন। দেশটির অন্যতম জীববৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চল পাপুয়ায় সরকারি কৃষি প্রকল্পের জন্য দ্রুতগতিতে বন কাটা হচ্ছে। আর এ কাজে সহায়তা করছে খোদ সেনাবাহিনী।
বিশ্বের চতুর্থ জনবহুল দেশটির খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে বলে দাবি সরকারের। পরিকল্পনায় রয়েছে পাপুয়া প্রদেশের ৩০ লাখ হেক্টর জমিতে ধান ও আখ চাষ করা। এই বিশাল এলাকার মধ্যে রয়েছে বন, তৃণভূমি ও জলাভূমি।
প্রকল্পের আওতাধীন এলাকাটি লন্ডনের চেয়ে পাঁচ গুণ বড়। পরিবেশবাদীরা বলছেন, এর ফলে পরিবেশের যে ক্ষতি হবে, তা আর পূরণ করা সম্ভব নয়। বাড়বে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ। গত এক দশকে পাম অয়েলের জন্য বন উজাড় রোধে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটি যে অগ্রগতি দেখিয়েছিল, এই প্রকল্পের কারণে তা-ও ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পুরো প্রকল্পটি তদারক করছেন একজন সাবেক জেনারেল। কৃষি প্রকল্পে সরকারকে সহায়তা করতে পাপুয়ায় সেনাবাহিনীর পাঁচটি ব্যাটালিয়ন মোতায়েন করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও অধিকারকর্মীরা বলছেন, সেনারা কেবল নিরাপত্তাই দিচ্ছেন না, সরাসরি বন কাটা ও সাধারণ মানুষকে উচ্ছেদ করার কাজেও জড়িত।
এমনকি জলপাই রঙের পোশাকে এক্সেভেটর (মাটি কাটার যন্ত্র) দিয়ে কাজ করার ভিডিও টিকটকে শেয়ার করেছেন অনেক সেনাসদস্য। দেখা গেছে, কৃষি প্রকল্প এলাকার কাছেই গড়ে তোলা হয়েছে সেনাঘাঁটি।
দক্ষিণ পাপুয়ার মেরাউক শহরের বাসিন্দা অ্যারিস্টন মোইওয়েন। ধান চাষের জন্য তার পৈতৃক জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, 'বন পরিষ্কার করার শুরু থেকেই সেনাবাহিনী সক্রিয়ভাবে জড়িত। ভারী যন্ত্রপাতিও তারাই চালায়।'
স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের মে থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ৪০ হাজার হেক্টরের বেশি জমি পরিষ্কার করা হয়েছে। এর বড় অংশই প্রস্তুত করা হচ্ছে আখ চাষের জন্য, যা থেকে বায়োইথানল উৎপাদন করা হবে।
পরিবেশবাদী সংগঠন 'মাইটি আর্থ'-এর প্রধান নির্বাহী গ্লেন হুরোউইৎজ বলেন, 'পরিবেশ, জলবায়ু কিংবা স্থানীয় মানুষের কল্যাণ—কোনো দিক থেকেই এই প্রকল্পের যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া কঠিন।'
'পাম গাছও তো গাছ, নাকি?'
ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো ২০৬০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যে (নেট জিরো) নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অথচ পাপুয়ায় তার সরকার যে বিশাল কৃষি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, তা সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সম্প্রতি সুমাত্রায় ভয়াবহ বন্যায় হাজারো মানুষের মৃত্যুর পর তিনি বন ধ্বংসের বিরুদ্ধে কথা বললেও বাস্তবে চিত্র ভিন্ন।
পরিবেশবিদ ও সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, সুমাত্রায় খনি ও পাম অয়েলের জন্য বন উজাড়ের ফলেই বন্যা ও ভূমিধস এমন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দুর্গত এলাকা পরিদর্শনের সময় প্রাবোও নিজেও স্বীকার করেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও বন ধ্বংসই এর মূল কারণ। তিনি গাছ কাটা রোধে কঠোর হওয়ার কথাও বলেন।
অথচ গত বছরের শেষের দিকে ভিন্ন সুর ছিল প্রেসিডেন্টের গলায়। তিনি বলেছিলেন, বন উজাড়ের দোহাই দিয়ে পাম অয়েল বাগান সম্প্রসারণ আটকানো উচিত নয়। তাঁর যুক্তি ছিল, 'ভবিষ্যতে আমাদের আরও পাম গাছ লাগাতে হবে। পাম গাছও তো গাছ, নাকি? এর তো পাতা আছে। তাহলে আমাদের কেন বন ধ্বংসের দায়ে অভিযুক্ত করা হচ্ছে?'
সাবেক প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদোর আমল থেকেই এই কৃষি প্রকল্পের পরিকল্পনা শুরু হয়। এর জন্য পাপুয়ায় লাখ লাখ হেক্টর জমির 'সংরক্ষিত বনাঞ্চল'-এর মর্যাদা বাতিল করা হয়েছে। দুর্গম এলাকা হওয়ায় এবং আদিবাসীদের কারণে এতদিন পাপুয়ার প্রকৃতি অনেকটা অক্ষত ছিল। কিন্তু এখন কৃষি ও নিকেল খনির কারণে সেই প্রকৃতি হুমকির মুখে।
হুমকির মুখে বিরল বন্য প্রাণী
আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইইএ) তথ্যমতে, ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম কার্বন নিঃসরণকারী দেশ। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের হাতে আসা সরকারের একটি অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা (জুলাই ২০২৪) বলছে, জমি পরিষ্কার করার ফলে ৩১ কোটি ৫০ লাখ টন কার্বন নিঃসরণ হবে। তবে বেসরকারি সংস্থাগুলো বলছে, প্রকৃত পরিমাণ এর দ্বিগুণ হতে পারে।
সরকারি ওই সমীক্ষায় স্বীকার করা হয়েছে, ধানক্ষেত বানাতে গিয়ে সংরক্ষিত বন ও বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য ধ্বংস হবে। এতে বিপদে পড়বে 'ট্রি ক্যাঙ্গারু'সহ বিরল প্রজাতির অনেক পাখি ও প্রাণী। বাড়বে তাপমাত্রা, নষ্ট হবে পানির উৎস।
অবশ্য সরকার বলছে, এই প্রকল্পের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তারা ১ কোটি ২০ লাখ হেক্টর জমিতে পুনরায় বনায়ন করবে।
