জার্মানির নতুন আইন: ৪৫ বছরের কম বয়সী পুরুষদের বিদেশে দীর্ঘ সময় থাকতে লাগবে সেনাবাহিনীর অনুমোদন
জার্মানির নতুন সামরিক পরিষেবা আইনের একটি ধারায় বলা হয়েছে, ১৭ থেকে ৪৫ বছর বয়সী পুরুষরা তিন মাসের বেশি সময় বিদেশে থাকতে চাইলে আগে সশস্ত্র বাহিনীর অনুমতি নিতে হবে।
সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করার জন্য বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে দেশটি। এরই অংশ হিসেবে গত ১ জানুয়ারি থেকে 'মিলিটারি সার্ভিস মডার্নাইজেশন অ্যাক্ট' বা সামরিক পরিষেবা আধুনিকীকরণ আইন কার্যকর করা হয়েছে।
জার্মান সংবাদপত্র 'ফ্রাঙ্কফুর্টার রুন্ডশাউ' প্রথম এই বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে। সংবাদপত্রটির তথ্যমতে, সরকার বলছে এটি মূলত একটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। বিশেষ করে যদি স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার হার কমে যায় এবং বাধ্যতামূলক নিয়োগের বিষয়টি পুনরায় বিবেচনা করা হয়, তবে সম্ভাব্য নিয়োগপ্রাপ্তদের ট্র্যাক বা নজরদারিতে রাখতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
জার্মানিতে এখনও সেনাবাহিনীতে পুরোপুরি বাধ্যতামূলক নিয়োগ চালু হয়নি। তবে নতুন আইন অনুযায়ী, সামরিক পরিষেবার জন্য উপযুক্ত কি না, তা যাচাই করতে ১৮ বছর বয়সীদের একটি প্রশ্নপত্র পূরণ করতে হবে।
জার্মানির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, 'আইনের ভাষায়, ১৭ এবং এর চেয়ে বেশি বয়সী পুরুষরা তিন মাসের বেশি সময় বিদেশে থাকতে চাইলে সংশ্লিষ্ট বুন্দেসভের (সশস্ত্র বাহিনী) ক্যারিয়ার সেন্টার থেকে আগাম অনুমোদন নিতে বাধ্য থাকবেন।'
তবে কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, আপাতত বাস্তবে এই নিয়মের কোনো বড় প্রভাব পড়বে না। এর জন্য কোনো শাস্তির বিধান রাখা হয়নি এবং সাধারণত নিয়মমাফিকভাবেই এই অনুমোদন দেওয়া হবে। মূলত এটি স্নায়ুযুদ্ধ আমলের একটি অব্যবহৃত নিয়মেরই প্রতিচ্ছবি।
ওই মুখপাত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, 'স্নায়ুযুদ্ধের সময়ও এই নিয়মটি চালু ছিল, তবে বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ ছিল না। বিশেষ করে, এর জন্য কোনো শাস্তির ব্যবস্থাও নেই।'
তিনি আরও বলেন, 'প্রশাসনিক নিয়মের মাধ্যমে আমরা বিষয়টি পরিষ্কার করব। যতদিন সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি স্বেচ্ছাধীন থাকবে, ততদিন অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলেই ধরে নেওয়া হবে।'
মুখপাত্র জানান, 'যেহেতু বর্তমান আইনের অধীনে সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়া সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাধীন একটি বিষয়, তাই নীতিগতভাবে এই ধরনের অনুমোদন অবশ্যই দিতে হবে।'
কর্তৃপক্ষের এমন আশ্বাসের পরও ওই ধারাটি সাধারণ মানুষের মনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এটি নিয়ে বিক্ষোভও দেখা দিয়েছে।
এই ধারাটি লাখ লাখ জার্মান নাগরিকের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, অনেকেই পড়াশোনার মাঝে বিরতি বা গ্যাপ ইয়ার, বিদেশে পড়াশোনা, নতুন চাকরি কিংবা লম্বা ছুটির (স্যাবাটিক্যাল) জন্য বিদেশে দীর্ঘ সময় কাটানোর পরিকল্পনা করেন।
এই নিয়মের শেকড় মূলত জার্মানির ১৯৫৬ সালের 'কনস্ক্রিপশন অ্যাক্ট' বা বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ আইনের সঙ্গে যুক্ত। আইনটি বেশ কয়েকবার সংশোধন করা হয়েছে। এর সবশেষ সংশোধনটি হয় গত ডিসেম্বরে। এই নতুন পরিবর্তনের আগে, বিদেশে দীর্ঘ সময় থাকার বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানোর বাধ্যবাধকতা কেবল জাতীয় প্রতিরক্ষা বা যুদ্ধ প্রস্তুতির সময়েই কার্যকর ছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রেডিট-এ এই ধারাটি নিয়ে অনেকে নানা রকম প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
একজন ব্যবহারকারী বেশ রসিকতা করে লিখেছেন, 'তাহলে... আমরা সবাই কি কেবল তিন মাসের জন্য প্রতিদিন একটি করে আবেদন ফ্যাক্স করতে থাকব? মানে, এটি তো দিনে মাত্র দুই থেকে তিন কোটি আবেদন। এটি বেশ সহজই হওয়ার কথা।'
দেশের তরুণদের ওপর এর প্রভাব যে 'সুদূরপ্রসারী' হতে পারে, তা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। তারা জানিয়েছে, 'অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়াতে' এই নিয়মে ছাড় দেওয়ার একটি খসড়াও তৈরি করা হচ্ছে।
নিজেদের সামরিক প্রস্তুতি আরও বাড়াচ্ছে জার্মানি। রাশিয়ার দিক থেকে আসা হুমকি এবং ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার জবাবে প্রচলিত সামরিক বাহিনীর আকার বড় করার পরিকল্পনা করছে দেশটি।
এই নতুন নিয়মের প্রধান উদ্দেশ্য হলো, যুদ্ধের মতো কোনো জাতীয় জরুরি অবস্থায় যখন দ্রুত সামরিক বাহিনীতে লোক নিয়োগের প্রয়োজন হবে, তখন রাষ্ট্র যেন যুদ্ধ করার বয়সী পুরুষদের ট্র্যাক করতে পারে। এমনকি প্রয়োজনে তাদের চলাফেরা সীমিত করতে পারে, তা নিশ্চিত করা।
সরকারের মতে, এই সংস্কারের মূল লক্ষ্য হলো ২০৩৫ সালের মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর আকার বর্তমানের প্রায় ১ লাখ ৮৪ হাজার সদস্য থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ ৫৫ হাজার থেকে ২ লাখ ৭০ হাজারে উন্নীত করা।
