স্মৃতিতে একুশ: সত্তর থেকে আজ
ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে ১৫/২০ জন শিশু-কিশোর ও তরুণের একটি দল গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে, গামছায় ঢোল বেঁধে নিয়ে, সাদা কাপড় পরে, বিভিন্ন বাগান থেকে ছিঁড়ে আনা ফুল হাতে নিয়ে এগিয়ে চলেছে। তারা যাবে আসাদগেট থেকে শহীদ মিনার। কণ্ঠে ছিল সেই অমর গান 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি।'
এই গান গাইতে গাইতে আসাদগেট থেকে আজিমপুরে শহীদদের কবরে ফুল দিয়ে, তারপর শহীদ মিনারে পৌঁছে যেতো দলটি। সেটাই ছিল আমাদের প্রভাতফেরীর মিছিল। আমরা গলা ছেড়ে বলতাম, 'প্রভাতফেরী প্রভাতফেরী আমায় নেবে সঙ্গে, বাংলা আমার বচন, আমি জন্মেছি এই বঙ্গে।'
ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলো কীভাবে যে গান গাইতে গাইতে, পরাণভরা ভালবাসা নিয়ে, পায়ে হেঁটে প্রভাতফেরীর মিছিলে অংশ নিতাম—তা এখন আর ভাবতে পারিনা। বিত্ত-বৈভব, নতুন পোশাক, স্টাইল কিচ্ছু ছিল না, ছিল শুধু আবেগ আর ভালবাসা। অদেখা বীরদের জন্য ভালবাসা। আমাদের বুঝানো হয়েছিল এই দেশ, এই ভাষা, এই পরিচয় সব সেই বীরদের দান। কাজেই তাদের শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য আমাদের যেতেই হবে।
প্রভাতফেরীর মিছিলে যাওয়ার আগে আমাদের সংগঠন 'খেলাঘর আসরে'র বড় ভাই বোনেরা বলে দিতো কী করতে হবে, কোথায় যেতে হবে, বাবা-মাকে কী বলতে হবে সবকিছু। প্রতিবছর একুশের গল্প বলে শোনাতেন খেলাঘরের বড় ভাইবোনেরা, ছবি দেখাতেন, ছবি ও পোস্টার আঁকাতেন আমাদের দিয়ে। সেই বয়সেই শুনেছি রফিক, জব্বার, বরকত, সালামের গল্প। শুনেছি শহীদ আলতাফ মাহমুদ, আর আবদুল গাফফার চৌধুরীর কথা।
পাড়ার শিশু সংগঠন 'কলকণ্ঠ খেলাঘর' এর সুবাদে বইয়ে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস পড়ার আগেই, ভাষা আন্দোলনের সাথে জড়িত মানুষগুলোর প্রতি আমাদের ভালবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়েছিল। সেই সূত্র ধরেই বলছি, আবদুল্লাহ আবু সাঈদ স্যার একবার বলেছিলেন, "এই প্রজন্মের কাছে নেই কোনো পাড়া-মহল্লার শিশু সংগঠন, নেই কোনো ক্রীড়াচক্র, নেই পাড়াভিত্তিক লাইব্রেরি। এদের জগত ভিডিওকে ঘিরে। কাউকে কিছু চিন্তা করতে হয়না, সব সামনে চলে আসে। শুধু টেকনোলজিটা শিখে নিলেই চলে। এরমধ্যে থেকে কে, কতটা, কী গ্রহণ করবে বা গ্রহণ করার যোগ্যতা রাখে, সেটা নিশ্চিত করে বলা যায়না।"
স্যারের মুখে সেদিন কথাটা শুনে মনে হয়েছিল আমরা পেছনে হাঁটছি। ৭০/৮০ এর দশকে যখন খেলাঘর করতাম, তখন আমাদের জন্য সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিল আনন্দের মধ্য দিয়ে অনেককিছু জানতে পারা, শিখতে পারা। সেইসময় আমরা অনেকেই খেলাঘর, গার্লস গাইড, বয় স্কাউট, কচিকাঁচার আসর, চাঁদের হাট, শাপলা শালুকের সাথে জড়িত ছিলাম। প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায়, জেলা শহরে, গ্রামেগঞ্জে সবখানে বাচ্চারা বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানে অংশ নিতো।
কেউ আমাদের হাতে ধরে বা জোর করে শেখায়নি দেশ, দেশের ইতিহাস, গান-বাজনা, বিতর্ক করা, ছবি আঁকা, স্বাধীনতা বা বিজয় দিবস উদযাপন, কবিতা আবৃত্তি ও দেয়াল পত্রিকা তৈরি করা। বাসা থেকে যতোটা শিখেছি, খেলাঘর, গার্লস গাইড ও আবৃত্তি সংগঠন থেকে এর চেয়ে অনেক বেশি শিখেছি।
একটি ভাল বিষয়ভিত্তিক দেয়াল পত্রিকা তৈরি করতে গেলে সেই বিষয়ে অনেক কিছু জানতে হতো বলেই পড়তে হতো। পাড়ায় পাড়ায়, এলাকায় এলাকায়, এক খেলাঘরের সাথে অন্য খেলাঘরের বা একটা সংগঠনের সাথে আরেকটা সংগঠনের মধ্যে সুস্থ, সুন্দর প্রতিযোগিতা লেগেই থাকতো। আর এই প্রতিযোগিতার কারণেই আমাদের জানার পরিধি ও সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া জোরদার হতো।
এরও আগে সেই ৭০ এর দশকে আব্বা-আম্মার হাত ধরে একুশের সকালে শহীদ মিনারে যেতাম। ৭০ থেকে ৯০ এর দশকের একুশ ছিল আজকের চেয়ে অনেক বেশি আবেগঘন, মাটির গন্ধমাখা এবং বাঙালি সংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি' গানটি সবার কণ্ঠে কণ্ঠে ধ্বনিত হতো। সবার সাথে আব্বা, আম্মা আর আমিও গলা মেলাতাম।
আমরা আমাদের সন্তানসহ রাত ১২টার পর শহীদমিনারমুখী মানুষের ঢলে অংশ নিয়েছি। পরিবেশ এত চমৎকার ছিল যে, কোনো ভয়-ডর ছিল না আমাদের। মাঝরাতেই সারি ধরে পুষ্পার্পণ করা হতো, পেছনে মানুষ ধীর কণ্ঠে গেয়ে চলেছে গান 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো।' ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হতো প্রভাতফেরি। স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী, সাংস্কৃতিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল সবাই আলাদা ব্যানার নিয়ে বের হতো। হাতে আঁকা প্ল্যাকার্ড, কালো ব্যাজ, সাদা-কালো পোশাক ছিল খুব সাধারণ দৃশ্য। পুরো শহর যেন কয়েক ঘণ্টার জন্য নীরব হয়ে যেত।
৮০ এর দশক থেকে এরশাদের পতন পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ছিল আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন প্রভাতফেরীকে রূপ দিয়েছিল প্রতিবাদ মিছিলে। দেয়াললিখন, পোস্টার, ব্যানারে ভাষা আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে ১৯৯০ এর দাবিজুড়ে দেওয়া হতো। শ্লোগান ছিল 'রাষ্ট্রভাষার সংগ্রাম থেকে গণতন্ত্রের সংগ্রাম'।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়কাল, অর্থাৎ মধ্য ৮০ এর দশক থেকে ২০১২/১৪ অব্দি বইমেলা ছিল বেশি সাহিত্যকেন্দ্রিক। অমর একুশে বইমেলা তখন তুলনামূলক ছোট হলেও ছিল খুব সাহিত্যনির্ভর। আমরা অপেক্ষা করতাম বইমেলায় কার কার বই কিনবো। বিভিন্ন প্রকাশনীর তালিকা সংগ্রহ করতাম। নিজেরা পয়সা জমিয়ে বই কিনতাম, প্রিয়জনকে উপহার দিতাম। পরবর্তীতে সন্তানকে সঙ্গে করে বইমেলায় যাওয়া ও বই কেনাও ছিল অবশ্য কাজের তালিকায়।
লিটল ম্যাগাজিনের প্রাধান্য ছিল বেশি। লেখক-পাঠকের সরাসরি আড্ডা ছিল বড় আকর্ষণ। প্রবীণ-নবীন লেখক, কবি, অভিনেতা, রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক, আঁকিয়ে, আবৃত্তিকার, গায়ক, শিল্পী দিয়ে চারিদিক ছিল সরগরম। কবি শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ, আসাদ চৌধুরী, মহাদেব সাহা, হুমায়ুন আজাদ, আল মাহমুদ, বদরুদ্দীন উমর, হুমায়ুন আহমেদ, শাহরিয়ার কবির, ইমদাদুল হক মিলন, তসলিমা নাসরীন, আনোয়ার হোসেন ও জাফর ইকবালসহ আরো অনেকে।
'উন্মাদ' ম্যাগাজিন ছিল খুব জনপ্রিয়। বইমেলায় তাদেরও একটা স্টল থাকতো। বইমেলায় যাওয়ার বড় আকর্ষণ ছিল কবি-লেখকদের সামনাসামনি দেখা ও অটোগ্রাফ নেয়া।
৮০ দশক ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়, বিশেষ করে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ-এর শাসনকাল ছাত্রছাত্রীদের জন্য খুবই কঠিন সময়। পুরো ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে কবিতা পরিষদ এর ব্যানারে প্রতিদিন অনুষ্ঠান আয়োজিত হতো টিএসসি'র সামনে। আবৃত্তি, গণসংগীত, পথনাটক এসব ছিল একুশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেইসময় একুশ তাই শুধু ভাষা আন্দোলনের স্মরণ নয়, গণতন্ত্র ও অধিকার চেতনারও প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একুশে ফেব্রুয়ারি আর বইমেলা যেন ছাত্রছাত্রী, তরুণ-তরুণী ও যুবাদের প্রাণের পরিচয় হয়ে উঠেছিল। একুশ মানে আমরা জানতাম কবিতা উৎসব, স্বৈরাচার বিরোধী কবিতা পাঠের আসর, গানের আসর, আলোচনা, মিটিং, মিছিল। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর, টিএসসি চত্বর, বইমেলা সব জমজমাট।
স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারকে গদিচ্যুত করার সব আয়োজন যেন এই ফ্রেবুয়ারিকে ঘিরেই করা হয়েছিল। শুধু ছাত্রছাত্রীরা একা নয়, তাদের সাথে হাত মিলিয়েছিল সর্বস্তরের মানুষ। সবাই জানতাম, 'একুশ মানে মাথা নত না করা।'
১৯৯০ সালে ছাত্রজনতার আন্দোলনের চূড়ান্ত অবস্থায় এরশাদের সামরিক শাসন যখন ভেঙে পড়েছিল, সেই বছর ও তার ঠিক আগের বছরের একুশ ছিল খুবই উত্তেজনাপূর্ণ। ভাষা শহীদরা যেন যুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন চলমান গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সাথে। 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো' গানের পাশাপাশি শোনা যেত স্বৈরাচারবিরোধী স্লোগান।
আমরা যারা ভাষা আন্দোলন দেখিনি, যারা স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেইনি, তাদের কাছে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন ছিল স্বাধিকার আন্দোলনের মতোই বড় একটা ঘটনা ছিল। একুশ, একুশের শহীদ, ভাষা আন্দোলন আর শহীদ মিনারকে নিয়ে আমাদের আবেগ এত জোরালো ছিল যে, সেই আবেগকে শক্তিতে রুপান্তর করার মাধ্যমে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন হয়েছে।
ভাষা শহীদদের স্মরণ করে মেয়েরা সাধারণ কালো পেড়ে সাদা শাড়ি পরে, আর ছেলেরা সাদা বা কালো পাঞ্জাবী পরে, খালি পায়ে মিছিলে অংশ নিয়েছে। সেই প্রভাতফেরীতে ছিল না কোনো বিজ্ঞাপন, ছিল না মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির একুশ উদযাপনের স্লোগান, ছিল শুধু ভালবাসা। দিনে দিনে একুশ উদযাপনের সমারোহ বেড়েছে, কিন্তু কমেছে ভালবাসা।
শহীদ স্বপ্নের কাছাকাছি যেতে যেতে লক্ষ্য করলাম সময় বদলে গেছে, আমরাও বদলে গেছি, কিন্তু সেটা আমরা বুঝতেই পারিনি। একদিন লক্ষ্য করলাম শহীদ বেদি থেকে অনেকটাই দূরে সরে এসেছি। সবকিছু ধীরে ধীরে উদযাপিত হতে থাকলো অন্যভাবে, পোশাক-পরিচ্ছদ, মাথায় ফুলের মুকুট, শাল, খাবার অফার, শহীদ দিবসের বিশেষ রান্না এমনকী পটকা ফুটানো পর্যন্ত। চলতি বছরতো বইমেলাটাও হলো না বিভিন্ন কারণে।
যেকোনো ভাল কিছু অর্জন করার জন্য ইতিহাসকে জাগিয়ে রাখতে হয়, সেই শিক্ষা থেকে যখন আমরা সরে আসতে শুরু করেছি, তখন থেকেই অর্জনগুলো সব দূরে সরে গেছে। হয়তো মানুষের মন থেকে, চিন্তা ও চেতনা থেকে একুশকে হটিয়ে দেয়ার কোনো ষড়যন্ত্র!
আমরা একুশকেন্দ্রিক কবিতা, গান, নাটক, ছবি আঁকা এবং বইমেলাটিকেও হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের ইতিহাস হারিয়ে যাচ্ছে। ইতিহাস হারানোর ক্ষতি ইতোমধ্যেই এই জাতি বহন করছে, জানিনা আর কতটা ক্ষতি বহন করতে হবে।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
