ভাষা আন্দোলনের আলোকচিত্র ও আলোকচিত্রী
ভাষা আন্দোলন (১৯৪৭-১৯৫৬) বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রথম সোপান। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই বাংলার মানুষ তাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়েছে, নিজেদের আত্মপরিচয় সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়েছে। পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই টাকা, মানি অর্ডার, স্ট্যাম্প—এসবে বাংলা ভাষার অনুপস্থিতি যে আমাদের দমিয়ে রাখার কৌশল, তা বাংলার মানুষকে বুঝিয়েছিল সচেতন জনগোষ্ঠীর অংশটি। তাঁদের জন্যেই ১৯৪৭ সালে শুরু হওয়া বাংলা ভাষার স্বপক্ষে আন্দোলনের চূড়ান্ত সংগ্রাম পর্বে ১৯৫২ সালের ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি কতিপয় ছাত্র, জনতা ও শ্রমিক বুকের রক্ত দিয়ে আত্মত্যাগ করেন—এতেই জনবিস্ফোরণ ঘটে। এই ঘটনার জেরে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণয়ন ও গ্রহণের সময় বাংলাকে উর্দুর পাশাপাশি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
বাংলা ভাষা আন্দোলনের তিনটি পর্ব। মনস্তাত্ত্বিক পর্বের শুরু ব্রিটিশ শাসনামলেই—বাংলার বুদ্ধিজীবীদের লেখালেখিতে। প্রথম সংগ্রাম পর্বের শুরু ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার সময় ও তার অব্যবহিত পরে; ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ পূর্ববর্তী সময়ে। দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত সংগ্রাম তথা রক্তাক্ত পর্ব ১৯৫২ সালে। আর সফলতা পর্ব ১৯৫২ সালের পর থেকে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে। আর এই ভাষা আন্দোলনের সফলতার পথ বেয়েই ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাভাষী জনগণের ভূখণ্ড বাংলাদেশ।
ভাষা আন্দোলন একটি চেতনা। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরের ঘটনা একটি ভূখণ্ডের একটি মানবগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার আদায়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিণাম। এটি ছিল শোষণ আর কায়েমি স্বার্থের অনড় জুলুমশাহির বিরুদ্ধে চিরায়ত মানবাধিকারের শাশ্বত আন্দোলন ও অভ্যুত্থান। একুশে ফেব্রুয়ারি এই ভূখণ্ডের পরবর্তী সকল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আন্দোলন, গণতান্ত্রিক অভ্যুত্থান-প্রয়াসে এবং সাংস্কৃতিক-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিবাদী সৃষ্টি-উদ্যোগে প্রেরণা জুগিয়েছে। এই জাগরণ, এই বোধ, এই অগ্রসরতার নামই হয়ে গেছে 'একুশে চেতনা'।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই চেতনার স্মৃতিচিহ্ন হলো বিভিন্ন দলিলপত্র—যার মধ্যে অন্যতম আলোকচিত্র। ভাষা আন্দোলনের তথ্য, লিফলেট, ফেস্টুন, পোস্টার ইত্যাদি অধিকাংশ দলিলপত্রই আমাদের সংরক্ষণ-মনস্কতাবিহীন জাতিগত কারণে আমরা সংরক্ষণ করতে পারিনি। আর সেই সময়টায় সদ্য প্রতিষ্ঠিত দেশে আলোকচিত্রশিল্পও তেমন বিকাশ লাভ করেনি—ফলে ব্যাপক আলোকচিত্র ধারণ করা সম্ভব হয়নি। যতটুকু ধারণ করা হয়েছে, ততটুকুও ঠিকমতো সংরক্ষণ করা হয়নি নানা কারণে। তবুও বেশ কিছু আলোকচিত্র এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়; কিছু বহুলভাবে প্রচারিত ও পরিচিত, আবার কিছু এখনও রয়ে গেছে অনাবিষ্কৃত।
ভাষা আন্দোলনের আলোকচিত্র মূলত দুই ধরনের—১) সরাসরি আন্দোলনের ঘটনাবলির আলোকচিত্র, ২) ভাষা আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট আলোকচিত্র।
সরাসরি আন্দোলনের আলোকচিত্র ধারণ করেছিলেন ঘটনাস্থলে অবস্থান করা আলোকচিত্রীরা। এ পর্যন্ত যাঁদের উল্লেখ পাওয়া যায়—তাঁদের মধ্যে মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ, মোহাম্মাদ ইয়াকুব, রফিকুল ইসলাম, আমানুল হক ও মিজানুর রহমান অন্যতম। এছাড়া আহমেদ রফিক, ডা. এ হাফিজ, ডা. এম আই চৌধুরী ও জামিল চৌধুরীর নামও পাওয়া যায় এই সময়ে আলোকচিত্রগ্রাহক হিসেবে।
আর ভাষা আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট আলোকচিত্রগ্রাহক হিসেবে তৎকালীন সরকারের আলোকচিত্রী (গভর্নর ও মন্ত্রীদের ভাষা আন্দোলনবিরোধী আলোকচিত্র) এবং পরবর্তীতে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিস্থান, উপাদান ও কর্মীদের আলোকচিত্রগ্রাহক হিসেবে কয়েকজনকে পাওয়া যায়। এই বিষয়টি নিয়ে আলোকচিত্রী মনোয়ার আহমেদ বেশ ভালো কাজ করেছিলেন। এই নিবন্ধকারও ভাষা আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট আলোকচিত্র নিয়ে কিছু কাজ করেছেন। এসব আলোকচিত্রের মধ্যে ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন ঘটনাবলি সংগঠনের বিভিন্ন স্থান, ভবন, প্রতিষ্ঠান ও ভাষা আন্দোলনের সৈনিকদের বিভিন্ন সময়ের আলোকচিত্র রয়েছে। এসব আলোকচিত্রও ভাষা আন্দোলনের সচিত্র ইতিহাসের উপাদান।
ভাষা আন্দোলনের আলোকচিত্রী ও তাঁদের ধারণ করা আলোকচিত্রের ভূমিকা আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবদান ব্যাপক।
মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ (১৯২৬-২০১৭): ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ১১ মার্চের বিক্ষোভের আলোকচিত্র তুলে আলোচিত হয়েছেন। কমরেড তকীয়ূল্লাহ নামেও পরিচিত আবুল জামাল মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহর জন্ম ১৯২৬ সালের ৪ নভেম্বর। তিনি বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সন্তান। ১৯৪৩ সালে বড় ভাই মুহম্মদ সফিয়ূল্লাহর কাছ থেকে তিনি একটি ক্যামেরা পান। তখন থেকেই তিনি আলোকচিত্র গ্রহণে সক্রিয় ছিলেন। বড় ভাইয়ের পথ ধরেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। সেই সূত্রেই প্রগতিশীল আন্দোলনে তিনি জড়িত হন—ভাষা আন্দোলনে তাঁর অংশগ্রহণ সে কারণেই। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে তাঁর তোলা আলোকচিত্রগুলো বহুল ব্যবহৃত।
তকীয়ূল্লাহর ক্যামেরাটিতে এক রোলে বি-টু সাইজের ছয়টি আলোকচিত্র তোলা যেত। আলোকসংবেদনশীল সেলুলয়েডকে তাড়াতাড়ি পরিস্ফুটন করার জন্য ডেভেলপের পর সঠিক রাসায়নিকে ঠিকমতো "ফিক্স" না করায় তাঁর নেগেটিভগুলো পরবর্তীতে খুব তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে। তবে নেগেটিভ নষ্ট হওয়ার আগে করা যে প্রিন্টগুলো বিভিন্ন প্রকাশনায় দেখা যায়—তাতে ফুটে উঠেছে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বিক্ষোভকারীদের মিছিল; মিছিলের পেছনে বৃক্ষগাত্রে সাঁটা পোস্টারে লেখা—'শিক্ষা ও কৃষ্টির মূলে কুঠারাঘাত', বিক্ষোভ ঠেকাতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো খাকি হাফপ্যান্ট পরা পুলিশ, পুলিশের সামনে ফেস্টুন হাতে বিক্ষোভকারী, পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তার হওয়া আন্দোলনকারী ইত্যাদি। এই আলোকচিত্রগুলো বিভিন্ন প্রকাশনায় ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি ১৯৪৮ সালের এই আলোকচিত্রগুলোকে ১৯৫২ সালের বলেও প্রচার করা হয়েছে। তবে মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ ১৯৪৮ সালের আন্দোলনে আলোকচিত্র তুললেও ১৯৫১ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজবন্দি ছিলেন। তাই তাঁর পক্ষে বায়ান্নর ছবি তোলা সম্ভব হয়নি।
শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুব: ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের আরেক আলোকচিত্রী হলেন শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুব। জন্ম ১৯১৭ সালে কলকাতায়। কলেজে পড়াকালীন কোডাক বি-টু ফোল্ডিং ক্যামেরায় ফটোগ্রাফি শুরু করেন। ১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার আলোকচিত্র তুলে বেশ সুনাম অর্জন করেন। দেশভাগের পর তিনি স্থায়ীভাবে পূর্ব পাকিস্তানে এসে সরকারি তথ্য দপ্তর পিআইডিতে যোগদান করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অকৃতদার ছিলেন। ফলে ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে অবসর গ্রহণ ও তার কিছুদিনের মধ্যে মায়ের মৃত্যুতে একেবারে নিঃসঙ্গ হয়ে যান। তিনি শেষ বয়সে অবহেলায় কাটিয়ে ১৯৯৫ সালের ৭ জুন ইন্তেকাল করেন।
শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুব ভাষা আন্দোলনে মোট কয়টি ও কী ধরনের আলোকচিত্র ধারণ করেছিলেন, তা এখন বলা মুশকিল। তাঁর সব আলোকচিত্র পাওয়া যায় না—এমনকি তিনি যে ভাষা আন্দোলন ও পরবর্তী সময়ের আলোকচিত্রী ছিলেন, তাও ইতিহাস থেকে মুছে যাচ্ছিল। সম্প্রতি আলোকচিত্রী শাহাদাত পারভেজ খুঁজে বের করেছেন এই বিস্মৃতপ্রায় আলোকচিত্রীর তোলা ও ১৯৭৪ সালের ৭ জুন 'দৈনিক বাংলা'র শেষ পৃষ্ঠায় ছাপা হওয়া ভাষা আন্দোলনের তিনটি আলোকচিত্র। যার দুটি অনেক প্রকাশনায় ব্যবহৃত হলেও সেখানে তাঁর নাম ছিল না। আর আলোকচিত্রী ও সংগ্রাহক সাইফুল আমিন কাজলের গ্রন্থাগার "৩৬৫ ফটোগ্রাফি রিসার্চ সেন্টার"-এ রক্ষিত আরেকটি দুর্লভ প্রকাশনায় মোহাম্মাদ ইয়াকুবের নামে অনেকগুলো আলোকচিত্র ছাপা হয়েছে। সেই প্রকাশনায় মোহাম্মাদ ইয়াকুবের নাম উল্লেখপূর্বক ভাষা আন্দোলনের নয়টি আলোকচিত্র ছাপা হয়েছে। এই দুটি প্রকাশনা মিলিয়ে দেখলে দেখা যায়, উল্লিখিত নয়টি আলোকচিত্রের মধ্যে জনাব পারভেজ আবিষ্কৃত তিনটি আলোকচিত্রও বিদ্যমান—অর্থাৎ দুটি প্রকাশনা মিলিয়ে মোহাম্মাদ ইয়াকুবের তোলা ভাষা আন্দোলনের মোট নয়টি আলোকচিত্র পাওয়া যাচ্ছে।
আলোকচিত্রগুলোতে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চে তৎকালীন সচিবালয় ইডেন বিল্ডিংয়ের সামনে বিক্ষোভকারীদের বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ এবং পুলিশের আক্রমণে আহত ছাত্র ও গ্রেপ্তারের চিত্র ফুটে উঠেছে। আলোকচিত্রগুলো পর্যালোচনা করলে স্পষ্টত বোঝা যায়, এগুলো মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহর আলোকচিত্রগুলো তোলার পরের ঘটনার আলোকচিত্র—অর্থাৎ পুলিশের আক্রমণের পরের দৃশ্য মোহাম্মাদ ইয়াকুবের ক্যামেরায় ধারণ হয়েছে। এছাড়া আরও দুটি আলোকচিত্রে দেখা যায়—শওকত আলীকে রিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন শেখ মুজিবুর রহমান এবং বটতলার সমাবেশের পর ছাত্রমিছিলে শেখ মুজিব, গোলাম মাহাবুব, আব্দুর রহমান ও আনিসুজ্জামান প্রমুখ।
উক্ত প্রকাশনা দুটিতে কয়েকটি আলোকচিত্রের শিরোনাম নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তির অবকাশ আছে—শওকত আলীকে রিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন শেখ মুজিবুর রহমান এবং বটতলার সমাবেশের পর ছাত্রমিছিলে শেখ মুজিব, গোলাম মাহাবুব, আব্দুর রহমান, আনিসুজ্জামান প্রমুখ—এই দুটি আলোকচিত্রে সরাসরি কোনো তারিখ দেওয়া নেই। তবে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়—এই ঘটনাগুলো ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের নয়, বরং ১৫ ও ১৬ মার্চের।
আরেকটি আলোকচিত্রে ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি লেখা আছে—যেমন '১৯৪৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ছাত্র সমাবেশ', 'জগন্নাথ হল তথা পুরোনো পরিষদ ভবন ঘেরাও'। তবে ১৯৪৮ পর্বে ফেব্রুয়ারিতে এই ধরনের কোনো ঘটনার ইতিহাস পাওয়া যায় না। হতে পারে আলোকচিত্রগুলো ১৯৪৮ সালের ১৬ মার্চে সংগঠিত ছোট ছাত্র সমাবেশের। ভুল করে ১৯৫২ সালের কথা লেখা হয়েছে। তিনি নিজে ১৯৫২ সালে আলোকচিত্র তুলেছিলেন কি না তা জানা যায় না—তবে বোঝা যায় ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি আরও আলোকচিত্র তুলেছেন। পত্রপত্রিকা খুঁজলে তাঁর তোলা আরও অনেক আলোকচিত্র পাওয়া যাবে বলে বিশ্বাস।
রফিকুল ইসলাম (১৯৩৪-২০২১): লেখক ও নজরুল গবেষক হিসেবে পরিচিত হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময় থেকেই আলোকচিত্রী হিসেবে সক্রিয় ছিলেন রফিকুল ইসলাম। তিনি ১৯৩৪ সালের ১ জানুয়ারি চাঁদপুরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় যোগ দেওয়ার আগে ছাত্রাবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থান করতেন—ফলে তাঁর ক্যামেরায় ঢাকা শহর, বিশেষ করে রমনা ও তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ধারণ করা আছে।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির আগে ও পরে ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ের আলোকচিত্র ধারণ করেছিলেন রফিকুল ইসলাম। সক্রিয়ভাবে ভাষা আন্দোলনে যুক্ত থাকায় উত্তাল দিনগুলোর রূপ তাঁর আলোকচিত্রে ফুটে উঠেছে। ১৯৪৯ সালে বিলেতফেরত ভাইয়ের কাছ থেকে উপহার পাওয়া জার্মান 'ভয়েগ ল্যান্ডার' ক্যামেরায় আলোকচিত্র তুলে 'জায়দিস' স্টুডিওতে ডেভেলপ করেছিলেন। তিনি পরবর্তী বছরগুলোতেও ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ের অনেক আলোকচিত্র তুলেছিলেন। অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ২০২১ সালের ৩০ নভেম্বর বার্ধক্যজনিত কারণে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ভাষা আন্দোলনবিষয়ক আলোকচিত্রের সংখ্যা নিজেও নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি। বিভিন্ন প্রকাশনা ও জায়গায় রক্ষিত ১৯৫২ সালের ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারির প্রায় ৫০টি আলোকচিত্র পাওয়া যায়। এসব আলোকচিত্রে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির আগের প্রস্তুতি, ছাত্রছাত্রীদের মিছিল-সমাবেশ, পতাকা দিবস পালন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের প্রস্তুতি, ২২ ফেব্রুয়ারি কলাভবনের ছাদে কালো পতাকা উত্তোলন ইত্যাদি আমাদের সামনে ভেসে ওঠে।
বায়ান্ন-পরবর্তী বছরগুলোর প্রাথমিক দিনগুলোতে শহীদ দিবসের আগে-পরের বিভিন্ন ঘটনাবলির বহু আলোকচিত্র তাঁর ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছে—যেমন শহীদ দিবস পালন, ভেঙে দেওয়া শহীদ মিনারের স্থানে কালো কাপড়ে ঢাকা শ্রদ্ধাস্থল, বিভিন্ন হলের শহীদ মিনার, ভাষাশহীদদের কবর জিয়ারত, মোনাজাত, শোকযাত্রা, মৌন মিছিল, নারীদের অংশগ্রহণ, ইডেন কলেজের ছাত্রীদের শহীদ স্তম্ভ নির্মাণে অধ্যক্ষের বাধাদান, ভাষা আন্দোলন স্মরণে প্রদর্শনী, পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলন, সরকারিভাবে ১৯৫৬ সালে শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন পর্যন্ত অনেক ঘটনা রফিকুল ইসলামের ক্যামেরার লেন্স ও সেলুলয়েডে চিত্রায়িত হয়েছে। অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের আলোকচিত্রে ভাষা আন্দোলনের প্রামাণ্যতাই পরিস্ফুটিত হয়েছে—তাতে শৈল্পিকতার চেয়ে সংগঠিত ঘটনাবলির চিত্রায়নই মুখ্য।
আমানুল হক (১৯২৫-২০১৩): আমাদের আলোকচিত্র জগতের আরেক পথিকৃৎ আমানুল হক। বাংলার পথে-প্রান্তরে, বিশেষভাবে নদী ও নদী-তীরবর্তী মানুষের জীবনযাত্রা ও জীবনসংলগ্ন প্রকৃতির চিত্রায়ন করেছেন তিনি। তাঁর ক্যামেরাতেও ভাষা আন্দোলনের সবচেয়ে রক্তাক্ত ঘটনার দলিলচিত্র প্রস্ফুটিত হয়েছে ঠিক ২১ ফেব্রুয়ারির দিনটিতেই।
আমানুল হকের জন্ম ১৯২৫ সালের ৬ নভেম্বর সিরাজগঞ্জে। অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালেই শাহজাদপুরের স্টুডিও ফটোগ্রাফার বীরেন সাহাকে দেখেই ক্যামেরার প্রতি আকৃষ্ট হন তিনি। সেই সময়েই বাবা আব্দুল হক তাঁকে একটি 'বেবি ব্রাউনি' ক্যামেরা কিনে দেন—সেই থেকেই তাঁর আলোকচিত্রযাত্রা। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তিনি যোগ দেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিল্পী ও আলোকচিত্রী হিসেবে। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির বিকেলে তিনি 'জাইস আইকন' ক্যামেরায় তুলেছিলেন ভাষাশহীদ রফিকউদ্দিন আহমদের মৃতদেহের আলোকচিত্র। এ জন্য সরকারের বিরাগভাজন হওয়ায় তিনি কয়েক বছর দেশেও বসবাস করতে পারেননি। পরবর্তীতে তিনি একুশে চেতনার বহু শৈল্পিক আলোকচিত্র তুলেছিলেন। বাংলাদেশের অন্যতম আলোকচিত্রশিল্পী আমানুল হক ২০১৩ সালের ৩ এপ্রিল ইন্তেকাল করেন।
আমানুল হকের সরাসরি ভাষা আন্দোলনের আলোকচিত্র মাত্র দুটি—দুটিই ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে তোলা। একটি হলো—"পুলিশের গুলিতে খুলি উড়ে যাওয়া ভাষাশহীদ রফিকের রক্তাক্ত মুখচ্ছবি"—যে প্রিন্টটি আমরা দেখতে পাই তা হয়তো প্রিন্টের সময় শৈল্পিকতার জন্য 'ক্রপ' করা। নেগেটিভে আরও কিছু অংশ থাকলেও সেটিও তিনি তাঁর শিল্পীমনের মাধুরীতেই তুলেছিলেন—নিছক প্রামাণ্যতার নিদর্শন হিসেবে নয়। তাঁর আরেকটি আলোকচিত্র হলো—"শহীদদের রক্তের মধ্যে পড়ে থাকা ভাষা আন্দোলনের প্রচারপত্র"। ভাষা আন্দোলন ও তার সাংস্কৃতিক প্রভাবের প্রকাশনায় আমানুল হকের "একুশের তমসুক" প্রকাশনাটি একটি শৈল্পিক উপস্থাপন।
মিজানুর রহমান (১৯৩১-২০০৩): ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ রফিকউদ্দিন আহমদের মরদেহের দুটি দৃষ্টিকোণের আলোকচিত্র পাওয়া যায়—যার একটি আমানুল হকের তোলা, অন্যটি তুলেছিলেন মিজানুর রহমান। রফিকের মাথায় গুলি লাগার পর ছাত্ররা তাঁকে ধরাধরি করে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। সেখানেই রফিকের মরদেহের ছবিটি তোলেন তিনি। তবে আলোকচিত্রটি সে সময় ছাপা হয়নি। ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক 'ইত্তেফাক'-এর বিশেষ সংখ্যায় ছাপা স্ট্রেচারে শোয়া রফিকের শরীরের অনেকখানি অংশের আলোকচিত্রটি পরবর্তীতে বাংলাদেশের সংবাদ আলোকচিত্রণের গোড়াপত্তনকারীদের অন্যতম মিজানুর রহমান তুলেছিলেন বলে গবেষক শাহাদাত পারভেজ প্রকাশ করেছেন।
মিজানুর রহমানের জন্ম ১৯৩১ সালে গাজীপুরে। স্কুলে পড়ার সময়ই জয়দেবপুরের এক স্টুডিও ফটোগ্রাফারের কাছে ছবি তোলা শেখেন। ১৯৫১ সালে সাপ্তাহিক 'ইত্তেফাক'-এ সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে শহীদ রফিকের আলোকচিত্র তোলার পর তিনি আলোকচিত্রকে গুরুত্ব দেন। পরবর্তীতে তিনি 'দৈনিক ইত্তেফাক'-এর উচ্চপদে এবং বাংলাদেশ প্রেস ইন্টারন্যাশনাল (বিপিআই) ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-এ কর্মরত ছিলেন। তিনি ২০০৩ সালের ১৮ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন।
উপরে উল্লিখিত আলোকচিত্রী ছাড়াও আরও কয়েকজনের আলোকচিত্র ধারণের তথ্য পাওয়া যায়।
ভাষাসৈনিক ও রবীন্দ্র গবেষক আহমেদ রফিক (১৯২৯-২০২৫) ১৯৫২ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র হিসেবে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর নিজের ভাষা আন্দোলনবিষয়ক প্রকাশনায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির সকালের পুলিশি তৎপরতা ও ছাত্রদের গ্রেপ্তার করে পুলিশের গাড়িতে উঠানোর তিনটি আলোকচিত্র ছাপা হয়েছে—যাতে আলোকচিত্রী হিসেবে তাঁর নামই দেওয়া হয়েছে। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের রাস্তায় তোলা এই আলোকচিত্র তিনটি অন্য কোনো প্রকাশনায় দেখা যায়নি। আর আহমেদ রফিকের কোনো স্মৃতিচারণ বা সাক্ষাৎকারে তিনি যে আলোকচিত্র তুলেছিলেন তার উল্লেখ নেই। এমনও হতে পারে আলোকচিত্রগুলো তিনি কারো কাছ থেকে সংগ্রহ করেছিলেন—প্রকাশের সময় তাঁর নামে ছাপা হয়েছে।
ডা. এ হাফিজ, ডা. এম আই চৌধুরী প্রমুখ তৎকালীন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের তোলা এক-দুটি আলোকচিত্র পাওয়া যায়। ভাষা আন্দোলনবিষয়ক গবেষক এম আর মাহবুবের সংগ্রহ করা ও প্রবন্ধকারের কাছে সংরক্ষিত এই আলোকচিত্রগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় এগুলো ভাষাসৈনিকরাই প্রামাণ্যতার জন্য চিত্রায়ন করেছিলেন।
ঢাকা টেলিভিশনের প্রথম প্রধান জামিল চৌধুরী (জন্ম: ৫ জুলাই ১৯৩৪) একজন ভাষাসৈনিক। তাঁর নামও স্বল্পস্থায়ী প্রথম শহীদ মিনারের আলোকচিত্রী হিসেবে উল্লেখ পাওয়া যায়; আবার কয়েকটি ক্ষেত্রে ওই আলোকচিত্রটি তাঁর সৌজন্যে ছাপা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে তিনি ১৯৫২ সালে ১৬ বছরের তরুণ ছিলেন—তাই মনে হয় আলোকচিত্রটি তিনি কারো কাছ থেকে সংগ্রহ করে রেখেছিলেন।
তৎকালীন সাপ্তাহিক 'ইত্তেফাক' ও ভাষা আন্দোলনের মুখপত্র সাপ্তাহিক 'সৈনিক' পত্রিকায় কয়েকটি ছবি পাওয়া যায়। এছাড়া সরকার পক্ষের পত্রিকা (যেমন মর্নিং নিউজ) ও পাকিস্তান অবজারভার ইত্যাদিতে ভাষা আন্দোলনের আলোকচিত্র থাকার সম্ভাবনা আছে। পরবর্তীকালে প্রকাশিত পত্রপত্রিকাতেও ভাষা আন্দোলনের সরাসরি ও সংশ্লিষ্ট আলোকচিত্র ছাপা হওয়া স্বাভাবিক। পত্রপত্রিকা ও বিভিন্ন প্রকাশনা, বিশেষ করে একুশে সংকলনগুলোতেও হয়তো গুপ্তধনের মতো লুকিয়ে আছে কিছু অদেখা আলোকচিত্র।
ভাষা আন্দোলনের সরাসরি আলোকচিত্র ছাড়াও ভাষা আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট আলোকচিত্রগুলোও আমাদের সংগ্রামের ইতিহাস বিনির্মাণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইতোমধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের অনেক আলোকচিত্র প্রচারিত হয়েছে—প্রকাশ হয়েছে দুই-একটি অ্যালবাম জাতীয় প্রকাশনা। সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রকাশিত এসব প্রকাশনার কয়েকটিতে মারাত্মক তথ্যগত ত্রুটিও বিদ্যমান। আমাদের উচিত এসব আলোকচিত্র সংগ্রহ ও তথ্যত্রুটি মুক্ত করে যথাযথ সংরক্ষণ ও সঠিক প্রচার নিশ্চিত করা। তাহলেই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিজেদের পূর্বপুরুষদের গৌরবজনক অধ্যায় অবলোকনের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠবে।