এলপিজি আমদানির কার্গো আটকে রেখে দাম বাড়ানোর অভিযোগ: তদন্ত চান ব্যবসায়ীরা
এলপিজির কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন ব্যবসায়ীদের এক অংশ। তাদের অভিযোগ, আমদানিকৃত এলপিজির কার্গো খালাসে ইচ্ছাকৃত বিলম্বের কারণে বাজারে এই সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে।
এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে এবং শীর্ষ আমদানিকারকদের মজুত পরিস্থিতি ও কার্গো খালাসের তথ্য তদন্ত করতে সম্প্রতি জ্বালানি বিভাগে একটি লিখিত চিঠি দিয়েছে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সদস্যদের একটি দল।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন বিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
চিঠিতে লোয়াব সদস্যরা উল্লেখ করেন, আমদানির তথ্য বিশ্লেষণে বাজারে এমন সংকট থাকার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখা যাচ্ছে না। আগস্টে যেখানে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার টন এলপিজি এসেছিল, সেপ্টেম্বরে সেই আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন।
অথচ বাজারে সরবরাহ ঘাটতির সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশ শক্তি নিয়ন্ত্রক কমিশন (বিইআরসি) নির্ধারিত ১,৫৮৫ টাকার ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২,০০০ টাকারও বেশি দামে। আমদানির পরিমাণ প্রায় অপরিবর্তিত থাকার পরও বাজারে কেন এমন তীব্র সংকট তৈরি হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
ব্যবসায়ীদের দাবি, গত ২২ সেপ্টেম্বর থেকে বাজারের কিছু শীর্ষ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ এলপিজি কার্গো আটকে রেখেছে। অভিযোগে আইগাজ, ওমেরা, পেট্রোম্যাক্স, বিএম এনার্জি ও যমুনার নাম উঠে এলেও সরকারি তদারকি ও নিয়ামক সংস্থার মাধ্যমে তথ্যগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাইয়ের জোর দাবি জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি, অক্টোবরে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রিমিয়াম বাড়ার আগেই যেসব এলপিজি আমদানি করা হয়েছিল, তা আটকে রেখে পরে বাড়তি দামে বাজারে ছাড়া হয়েছে কি না, তা তদন্ত করার অনুরোধ করা হয়েছে।
তবে এ ধরনের কোনো চিঠি জ্বালানি বিভাগে পাঠানোর কথা অস্বীকার করেছেন লোয়াব সভাপতি ও ডেল্টা এলপিজি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমীরুল হক।
নজরদারিতে কার্গো আটকে রাখার বিষয়
অভিযোগকারী ব্যবসায়ীরা জানান, অক্টোবর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির প্রিমিয়াম টনপ্রতি প্রায় ৬৪ ডলার বেড়েছে। প্রিমিয়াম বাড়ার ঠিক আগমুহূর্তে পণ্য আটকে রাখার এই ঘটনা তাই বেশ সন্দেহজনক।
চিঠিতে বলা হয়, যদি প্রিমিয়াম বাড়ার আগে আমদানি করা কার্গো মজুতে রাখা হয় এবং মূল্য সমন্বয়ের পর তা বিক্রি করা হয়, তবে আমদানিকারকরা বড় ধরনের বাণিজ্যিক সুবিধা পেতে পারেন। এতে মূল বিতরণ শৃঙ্খলে সরবরাহের পরিমাণ কমে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে পাইকারি ও খুচরা মূল্যে।
পরিস্থিতি স্পষ্ট করতে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে এলপিজি মজুতের বিষয়ে আমদানিকারকভিত্তিক অডিট করার দাবি জানিয়েছেন লোয়াব সদস্যরা। প্রতিটি কার্গো কখন এসেছে, কখন খালাস হয়েছে, কোথায় মজুত রাখা হয়েছে, কী পরিমাণ পণ্য মজুতে রয়ে গেছে এবং কখন তা বাজারে ছাড়া হয়েছে—কর্তৃপক্ষকে সেসব তথ্য সংগ্রহের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
অক্টোবরে প্রিমিয়াম বাড়ার আগে আমদানি করা এলপিজির কতটা অংশ মূল্য সমন্বয়ের পরও বাজারে না ছেড়ে রাখা হয়েছিল, তা-ও নির্ধারণ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
উচ্চ প্রিমিয়াম বা চড়া বাজারের আশায় কোনো আমদানিকারক বা বাজারভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইচ্ছাকৃতভাবে কার্গো খালাসে বিলম্ব করেছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছে তারা।
ব্যবসায়ীরা বলেন, স্বাভাবিক বাণিজ্যিক চাহিদা ও বর্তমান বাজার চাহিদার সঙ্গে তুলনা করে এই মজুত পরিস্থিতি পরীক্ষা করা উচিত, যাতে দেখা যায় অস্বাভাবিক উচ্চ মজুত বাজারে এই সরবরাহ সংকট তৈরি করেছে কি না।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ টিবিএসকে বলেন, 'এনবিআরের রিয়েল-টাইম ডেটা অনুযায়ী সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে, যা আগস্টের ১ লাখ ৫৭ হাজার টনের প্রায় সমান। ফলে সেপ্টেম্বরে বাজারে কোনো এলপিজি সংকট থাকার কথা নয়।'
আমদানির পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন
ব্যবসায়ীরা বারবার জোর দিয়ে বলছেন, শুধু আমদানি কমে যাওয়ার কারণে বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে—এই দাবি সত্য নয়। সেপ্টেম্বরে আমদানি হওয়া প্রায় ১ লাক ৫৮ হাজার টন এলপিজি আগস্টের আমদানির চেয়েও কিছুটা বেশি।
তাই বন্দর বা টার্মিনালে আসার পর সেই এলপিজি কীভাবে এবং কখন মূল সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রবেশ করেছে, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত দৈনিক আগমন, মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারির অনুরোধ জানিয়েছেন তারা।
তদন্তে যদি দেখা যায় যে, কোনো প্রক্রিয়া স্বাভাবিক বাজার সরবরাহকে বাধাগ্রস্ত করেছে বা অস্বাভাবিক দাম বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে, তবে তাৎক্ষণিক সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানান তারা।
তবে এই অভিযোগ নির্দিষ্ট কোনো কোম্পানিকে দোষী সাব্যস্ত করার জন্য নয় উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়, প্রমাণ ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো কোম্পানির অপরাধ প্রতিষ্ঠা করা এই অভিযোগের উদ্দেশ্য নয়। বরং সরকারের উচিত স্বাধীনভাবে আমদানিকারকভিত্তিক মজুত ও কার্গো ছাড়ের তথ্য যাচাই করা, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি প্রকৃত সরবরাহ সংকটের কারণে নাকি কৃত্রিমভাবে সরবরাহ সীমিত করার কারণে ঘটেছে।
