চট্টগ্রামে মাল্টার কেজি ৫৫০ টাকা, আমদানি বাড়লেও সরবরাহে টান
চট্টগ্রামে মাল্টার দাম বেড়ে কেজিপ্রতি ৫৫০ টাকায় উঠেছে। চাহিদা বাড়ার মধ্যে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে আমদানি কমেনি, বরং বেড়েছে। আগের আমদানিতে লোকসান এবং জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের কারণে সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছেন আমদানিকারকেরা।
খুচরা বিক্রেতাদের তথ্য অনুযায়ী, এক মাস আগে প্রতি কেজি মাল্টা ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা এবং এক সপ্তাহ আগেও ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এক মাসে ফলটির দাম বেড়েছে প্রায় ৭৭ শতাংশ এবং এক সপ্তাহে প্রায় ৪১ শতাংশ।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে প্রতিদিন মাল্টার চাহিদা প্রায় ১৫ থেকে ২০ কনটেইনার। কিন্তু গত ১০ থেকে ১৫ দিন ধরে প্রতিদিন বাজারে আসছে মাত্র ৬ থেকে ৭ কনটেইনার।
তবে চট্টগ্রাম উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, মাল্টার আমদানি কমেনি, বরং বেড়েছে।
চলতি বছরের জুলাই ও আগস্টে বাংলাদেশে মাল্টা ও কমলা আমদানি হয়েছে ২৫ হাজার ৬৬৬ টন। গত বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ২০ হাজার ৮৮৬ টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ৪ হাজার ৭৮০ টন বা ২২.৯ শতাংশ।
পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও মাল্টা ও কমলার আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ওই অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৯৯৫ টন, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১ লাখ ৫১ হাজার ৫৭০ টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ৩১.৩ শতাংশ। চার অর্থবছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ আমদানির পরিমাণ।
এ ছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে আমদানি প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ৬ হাজার ৬৮৭ টনে দাঁড়িয়েছে।
আগের লোকসান, জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন
আমদানিকারকেরা বলছেন, বর্তমান সরবরাহ সংকটের একটি কারণ আগের সময়ের লোকসান। অতিরিক্ত আমদানির কারণে অনেক ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তারা পণ্য আনা কমিয়ে দিয়েছেন।
ফল আমদানিকারক ওমর ফারুক সিদ্দিকী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, এর আগে আমদানিকারকেরা বাজারের চাহিদার তুলনায় বেশি মাল্টা এনেছিলেন। এতে দাম কমে যায় এবং বড় ধরনের লোকসান হয়।
তিনি বলেন, জুলাইয়ে প্রতি কনটেইনারে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা এবং অগাস্টে প্রায় ১২ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।
এ কারণে অগাস্টের মধ্যে অনেক আমদানিকারক বড় পরিমাণে মাল্টা আনা কমিয়ে দেন বা বন্ধ করে দেন। এর প্রভাব পড়ে সেপ্টেম্বরের সরবরাহে।
আমদানিকারকেরা আরও বলছেন, দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান বন্দরে জাহাজের বিলম্বও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ডারবান থেকে চট্টগ্রামে একটি চালান আসতে সাধারণত প্রায় ৩০ দিন সময় লাগে। তবে বর্তমানে বন্দরে প্রবেশ এবং পণ্য ওঠানোর ক্ষেত্রে জাহাজগুলো দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকছে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি জাহাজের ডারবান বন্দরে প্রবেশ করতেই প্রায় ১৫ দিন সময় লাগতে পারে। এরপর পণ্য ওঠাতে ও বন্দর ছেড়ে যেতে আরও সাত থেকে আট দিন সময় লাগছে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে সিঙ্গাপুর ও কলম্বোর মতো ট্রানজিট বন্দরেও জট তৈরি হয়েছে। আমদানিকারকেরা জানান, স্বাভাবিক সময়ে এক থেকে দুই দিন অপেক্ষা করলেও বিকল্প ট্রানজিট বন্দরে এখন কোনো কোনো জাহাজকে ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
ডেঙ্গুতে বেড়েছে চাহিদা
ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়ায় রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে মাল্টাসহ বিভিন্ন ফলের চাহিদাও বেড়েছে।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৬ দিনে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৩১ জন এবং মারা গেছেন ১৪ জন। এর বিপরীতে পুরো অগাস্টে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২০২ এবং মৃত্যু হয়েছিল দুজনের।
এদিকে চট্টগ্রামের প্রধান পাইকারি ফলের বাজার ফলমণ্ডিতে ১৫ কেজির এক কার্টন মাল্টা বিক্রি হচ্ছে ৭ হাজার ৪০০ থেকে ৭ হাজার ৮০০ টাকায়।
খুচরা বিক্রেতারা বলেন, হাসপাতালগুলোর আশপাশে মাল্টার সরবরাহ বিশেষভাবে কমে গেছে।
কাজীর দেউড়ি বাজারে মাল্টা ও কমলা কেজিপ্রতি ৫৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কাছে এক বিক্রেতা শুরুতে কেজিপ্রতি ৫৮০ টাকা দাম চাইলেও পরে ৫৫০ টাকায় বিক্রি করেন।
ফল বিক্রেতা আবদুল হালিম বলেন, পাইকারিতে দাম বেড়ে যাওয়ায় খুচরা বিক্রেতাদেরও দাম বাড়াতে হচ্ছে। তবে বেশি দামের কারণে ক্রেতারা কম কিনছেন বলেও তিনি জানান।
হাসপাতালের কাছে আরেক বিক্রেতা মোহাম্মদ শাহিন বলেন, কয়েক দিন ধরে মাল্টা পাওয়া যাচ্ছিল না। আগে যারা অল্প পরিমাণে কিনতেন, দাম বেড়ে যাওয়ায় তারাও এখন কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছেন।
ফল আমদানিকারক নাজিম উদ্দিন বলেন, নতুন চালান বাজারে ঢুকলে দাম কমে যাবে। তবে উচ্চ দামে পণ্য ধরে রাখা ব্যবসায়ীরা দাম পরে কমে গেলে লোকসানে পড়তে পারেন।
চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ তৌহিদুল আলম বলেন, অতিরিক্ত আমদানির সময় দাম পড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা আমদানি কমিয়ে দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, এখন বিপুলসংখ্যক ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছে। নতুন চালান আসতে শুরু করলে ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন অভিযোগ করেছেন, ডেঙ্গু বাড়ায় মাল্টার চাহিদা বেড়েছে এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছেন।
সরকার এর আগে মার্চে তাজা ফল আমদানির ওপর শুল্ক কমিয়েছিল, যাতে মাল্টার দাম কমে আসে। তবে এর বিপরীতে ফলটির দাম বেড়েছে।
ভোক্তারা শুল্ক কমানোর সুবিধা পাচ্ছেন কি না তা খতিয়ে দেখতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আরও জোরালো নজরদারি দাবি করেছেন তিনি। পাশাপাশি কৃত্রিম সংকট তৈরি করা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানান।
