মার্কিন হামলার মধ্যেও নৌকা-সতীর্থ ছাড়া অনুশীলন, এশিয়ান গেমসে ইরানি রোয়ারের সোনা জয়
যখন এশিয়ান গেমসের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ইরানি রোয়ার (নৌকাবাইচ খেলোয়াড়) কিমিয়া জারেই, ঠিক তখনই ঘরের বাইরে বিকট শব্দে ফেটে পড়ছিল একটার পর একটা বোমা। দরজার কাছেই বিকট বিস্ফোরণ, জানালা খুললেই চোখে পড়ত ধোঁয়ার কুণ্ডলী। কিন্তু এসব বীভৎসতা দমাতে পারেনি জারেইকে। জানালার বাইরের ধোঁয়া দেখে বুক চেপে ধরে আবার ফিরে যেতেন ইনডোর রোয়িং যন্ত্র অ্যারগোমিটারে (শারীরিক পরিশ্রম পরিমাপের যন্ত্র)। এভাবেই বোমার গর্জন আর মৃত্যুপুরীকে পাশ কাটিয়ে অনুশীলনের পর অবশেষে এশিয়ান গেমসে দেশকে সোনার পদক এনে দিয়েছেন এই অ্যাথলেট।
নারীদের লাইটওয়েট ডাবল স্কালসে জয়নব নওরোজির সাথে জুটি বেঁধে স্বর্ণপদক জিতেছেন কিমিয়া জারেই। এশিয়ান গেমসের আগে টানা ৪৫ দিন জারেই এবং ইরানের পুরো রোয়িং দল যুদ্ধের ভয়াবহতার কারণে নিজ নিজ ঘরে বন্দি অবস্থায় পৃথকভাবে প্রস্তুতি নেন।
কঠিন সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে জারেই বলেন, 'আমাদের একটাই উপায় ছিল—একটি করে অ্যারগোমিটার মেশিন সাথে নিয়ে সোজা বাড়ি চলে যাওয়া। আমরা বাড়িতে বসেই প্রতিদিন অনুশীলনের সেশন শেষ করতাম। কোচের পাঠানো শিডিউল দেখে অ্যারগোমিটারে রোয়িং চালিয়ে যেতাম।'
গেমস শুরু হওয়ার মাত্র ছয় মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক আক্রমণের মুখে ইরানজুড়ে যুদ্ধ শুরু হয়। সংঘাতের প্রথম দিনেই রোয়িং ফেডারেশন তাদের জাতীয় ক্যাম্প বাতিল করে অ্যাথলেটদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়।
ইরানের রোয়িং ফেডারেশনের প্রধান মহসেন শাদি নাগাদেহ বলেন, 'যুদ্ধ শুরুর পর আমরা ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হই। কিন্তু আমরা দমে না গিয়ে নিজেদের শক্তি প্রমাণ করতে চেয়েছি। তাই প্রতিটি রোয়ারকে বাড়িতেই অ্যারগোমিটারের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছিল।'
যুদ্ধের কারণে হামাদানে নিজের বাড়িতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন জারেই। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানে বিমান হামলা শুরু করে। এরমধ্যে ইরানিদের জীবনযাত্রার পাশপাশি বাধার সম্মুখীন হয় ক্রীড়াঙ্গনও।
রোয়ারদের জন্য যুদ্ধের মধ্যেই অনুশীলনের পথ খুঁজে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। জারেই বলেন, 'ইরানের সবগুলো শহরই যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। যুদ্ধের প্রথম মাসে ছিল আগের যেকোনো সময়ের চেয়েও খুব কঠিন।'
বাধা-বিপত্তিও আসছিল। মাঝেমধ্যে বোমাহামলা তীব্র হলে তাদের ঘর ছেড়ে যেতে হতো। কখনো কখনো কাজ থামিয়ে অন্য কোথাও সরে যেতে হতো। কিন্তু অনুশীলন থেমে থাকেনি। সেই প্রথম সপ্তাহগুলোতে তিনি নিজের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন নাকি রোয়িং অনুশীলনের চেষ্টা করছিলেন—জানতে চাওয়া হলে জারেই বলেন, 'দুটিই একসাথে চলছিল।'
বিশৃঙ্খলার মুখে পড়া এশিয়ান গেমসের প্রস্তুতি রক্ষায় কেবল রোয়িং দলই একা লড়াই করছিল না। ইরানের নারী কাবাডি দলের প্রশিক্ষণ শিবিরও যুদ্ধের কারণে ব্যাহত হয়েছিল। আগস্টে ভারতের সোনেপতে যাওয়ার আগে কাবাডি খেলোয়াড়দের বিভিন্ন শহরে ঘুরে ঘুরে অনুশীলন করতে হয়েছিল। সোনেপতে গিয়ে খেলোয়াড়রা সংঘাতের কারণে হারানো ছন্দ ফিরে পেতে দিনে দুবার অনুশীলন করেন এবং প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেন।
জারেইর জন্য সেই প্রথম ৪৫ দিন প্রায় পুরোটাই ঘরের ভেতরে কেটেছিল। তার হিসেব মতে, কোচের পাঠানো ট্রেনিং শিডিউল অনুসরণ করে তিনি তার ঘরের ভেতর একাকী অ্যারগোমিটারে প্রতিদিন প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতেন। তিনি বলেন, 'আমি যখন অনুশীলন শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, ঠিক তখনই বোমাহামলার শব্দ শুনতে পাই। এটি আমাদের বাড়ির খুব কাছেই হয়েছিল। জানালা দিয়ে তাকালেই ধোঁয়া দেখা যেত।'
অবশেষে দলটি প্রশিক্ষণ শিবিরে ফিরতে এবং পানিতে রোয়িং পুনরায় শুরু করতে সক্ষম হয়। জারেই উরমিয়াতে অনুশীলন করেছিলেন, যেখানে ইরানের রোয়িং ফেডারেশনের একটি দুই কিলোমিটার দীর্ঘ ওয়াটার কোর্স ব্যবহারের সুযোগ ছিল। কিন্তু পানিতে ফিরে আসার পরও সেই ৪৫ দিনের অনিশ্চয়তা মন থেকে মুছে যায়নি। সেখানে আরেকটি স্মৃতি তার জন্য অপেক্ষা করছিল।
তিন বছর আগে হাংঝৌ এশিয়ান গেমসে তিনি চতুর্থ স্থান অধিকার করেছিলেন; ইরানের রোয়িং দলের একমাত্র সদস্য হিসেবে তিনি সেবার কোনো পদক না নিয়েই খালি হাতে ফিরেছিলেন। তিনি বলেন, 'সেটি সত্যিই একটি কঠিন মুহূর্ত ছিল।'
চতুর্থ স্থান পাওয়ার সেই স্মৃতি তাকে ক্রমাগত তাড়া করে বেরিয়েছে, ঠিক একইভাবে পরের তিন বছরও অক্লান্ত পরিশ্রম, ইতিবাচক থাকার চেষ্টা এবং আরও ভালো কিছু করার আত্মবিশ্বাস। জারেই বলেন, 'তিন বছরের কঠোর পরিশ্রম, উদ্বুদ্ধ থাকা, ইতিবাচক থাকার চেষ্টা, নিজের ওপর এবং পরম করুণাময়ের ওপর বিশ্বাস রাখার চেষ্টা করা। আজ আমি প্রথম স্থান অর্জন করেছি।'
নাগোয়ায় যখন তিনি ফিনিশ লাইন অতিক্রম করেন, তখন গত তিন বছরের এবং ইরানের সেই কয়েক সপ্তাহের সব আবেগ যেন উগড়ে আসে। জারেই পানিতে হাত দিয়ে আঘাত করেন এবং কান্নায় ভেঙে পড়েন।
পুরো যুদ্ধজুড়ে তিনি ক্রমাগত একই চিন্তায় ফিরে যেতেন। জারেই বলেন, 'আমার একমাত্র চিন্তা ছিল পদকের কথা, দেশের মানুষের কথা, আমার পরিবার এবং ভবিষ্যতের কথা।'
তিনি আরও বলেন, 'কারণ এই পদকটি ইরানের মানুষের জন্য, বিশেষ করে ইরানি মেয়েদের জন্য অনেক বড় অর্থ বহন করে। সেটি এমন একটি মুহূর্ত ছিল যা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।' কথাগুলো বলার সময় কার চোখেমুখে ছিল অর্জনের কান্না।
টানা ৪৫ দিন জারেই কোনো নৌকা ছাড়া, পাশে কোনো সতীর্থ ছাড়া অনুশীলন করেছিলেন; যেখানে মাঝেমধ্যে বোমাহামলার তীব্র শব্দ এসে তার অনুশীলন সেশনে ব্যাঘাত ঘটাত। তিনি বলেন, 'আমি নিজেকে বলেছিলাম, আমি আমার সেরাটা দেব। আমি প্রতিদিন অনুশীলন করব। আমাকে সেরা ফল পেতে দয়া করে সাহায্য করুন।'
