বিলিয়নিয়ারদের মহাকাশ যাত্রা!
'তিক্তপ্রাণ' খ্যাতিমান এক লেখকের গল্পের ধনকুবের দিয়েই শুরু করা যাক।
গল্পের এক নিঃস্ব পথশিশু জানতে পেরেছিল, তাদের শহরে পা রেখেছেন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এক ধনকুবের। অবুঝ শিশুটির কল্পনায় কোটিপতি মানেই এক অলৌকিক প্রাচুর্যের রূপকথা—যার দশ আঙুলে শোভা পাবে বিশাল হিরার আংটি, পোশাকের বোতাম হবে খাঁটি সোনা আর দামি জহরত দিয়ে তৈরি, আর আহার হবে পরম রাজকীয় ও বর্ণাঢ্য। সে ভেবেছিল, কোটিপতিদের খাদ্যাভ্যাস নিশ্চয়ই সাধারণ মানুষের মতো নয়; খাবার হজম করার জন্য তাদের হয়তো বিশেষ ধরনের 'তিনটি পাকস্থলী' রয়েছে, যাতে তারা প্রতিদিনের সীমাহীন বিলাসী ভোজ আর আহারের বিপুল সম্ভার অনায়াসে শেষ করতে পারে!
কৌতূহল সামলাতে না পেরে শিশুটি দূর থেকে সেই কোটিপতিকে দেখার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু চোখের সামনের বাস্তব দৃশ্য তাকে চরম হতাশ করেছিল। কোনো চোখধাঁধানো রূপকথা বা অলৌকিক জৌলুশ সেখানে ছিল না। কোটিপতিটি অত্যন্ত সাদামাটা ও সাধারণ পোশাকে বসে নিস্পৃহ মুখে কেবল এক কাপ কালো কফি, ডিম আর টোস্ট খাচ্ছে। তার নেই কোনো অতিরিক্ত পাকস্থলী, নেই জীবনকে উপভোগ করার মতো শারীরিক বা মানসিক সজীবতা। অবাক হয়ে পথশিশুটি জানতে চেয়েছিল, এত বিপুল ধনসম্পদ আর টাকা দিয়ে সে আসলে কী করে? কোটিপতি ঠান্ডা ও যান্ত্রিক গলায় উত্তর দিয়েছিল—'টাকা বানাই।'
আজকের একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা যখন ইলন মাস্ক কিংবা জেফ বেজোসের মতো আধুনিক ধনকুবেরদের দিকে নজর দেই, তখন 'তিক্তপ্রাণ' মহাকালজয়ী সেই গল্পের রূপকটিই এক নতুন বাস্তবতা নিয়ে সামনে আসে। তফাত শুধু একটাই—সেকালের ধনকুবেরেরা পৃথিবীর মাটিতে বসে টাকা বানাতেন। আর একালের মহাকাশ-বণিকেরা অসীম মহাকাশকে বানিয়েছেন তাদের মুনাফা লোটার নতুন ক্রীড়াভূমি। মহাকাশ জয়ের চমৎকার সব 'মানবিক' রূপকথা শুনিয়ে তারা নিজেদের সিন্দুক ভারী করছেন। পাশাপাশি আমাদের এই চিরচেনা সুন্দর পৃথিবীর আসমান-জমিনকে বানিয়ে ফেলছেন এক বিষাক্ত আবর্জনার স্তূপ।
মহাকাশ—ধনকুবেরদের ক্রীড়াভূমি
ইলন মাস্কের মতো প্রযুক্তি-বণিকেরা নিজেদের মুনাফার লোভে মহাকাশ দখলের বেপরোয়া প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছেন। তাদের প্রতিযোগিতার জেরে ধীরে ধীরে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে আমাদের এই গ্রহটাকে। এ সতর্কবার্তা দিয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী লুসিয়ান ওয়াকোভিচ। বহু বছর ধরে পৃথিবীর ধনকুবেরেরা আমাদের কানে একটি মন্ত্র জপছেন। মন্ত্রটি হলো মানবজাতির চূড়ান্ত মুক্তি ও ভবিষ্যৎ নাকি নিহিত রয়েছে মাটির পৃথিবীর বাইরে, দূর মহাকাশে।
বিলিয়নিয়ার ইলন মাস্কের জোর গলার দাবি, 'মানবজাতিকে বহু-গ্রহের বাসিন্দা হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে এক অত্যন্ত শক্তিশালী মানবিক যুক্তি রয়েছে।' তার মতে, মানুষকে যদি শেষ পর্যন্ত মঙ্গল গ্রহে নিয়ে যাওয়া যায়, তবে তা মানবজাতিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করবে। আর তাই মঙ্গল গ্রহ জয় করা আর পৃথিবীর বুক থেকে দারিদ্র্য দূর করা—দুটোই নাকি সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং মানবিক কাজ!
কিন্তু এই চটকদার ও আকর্ষণীয় প্রচারণার আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে এক ভয়াবহ পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞ। স্পেসএক্সের তৈরি 'স্টারবেস' থেকে ঘন ঘন বিশাল সব রকেট উৎক্ষেপণ করা হয়। এতে আশপাশের সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও বন্য প্রাণীর প্রাকৃতিক আবাসস্থল চুরমার হয়ে যায়। একই সাথে সেই এলাকার বহু পুরোনো অধিবাসীদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হচ্ছে। অন্যদিকে মাস্ক প্রতিনিয়ত এক স্বপ্নের ফেরি করেছেন। তার তৈরি এই ভারী রকেটগুলোকে বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের এক দ্রুতগামী (এবং সেই সাথে মারাত্মক দূষণকারী) বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হবে এবং অদূর ভবিষ্যতে চাঁদের বুকেই বসানো হবে বিশালাকার শিল্পকারখানা!
একইভাবে তথাকথিত 'মানবিক' দৃষ্টিভঙ্গির জন্য সমান 'কুখ্যাত' আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা ধনকুবের জেফ বেজোস। তিনিও খুব উৎসাহের সাথে কক্ষপথে বিশালাকার বেলনাকৃতি ভাসমান বসতি তৈরির স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। তার দাবি, পৃথিবীর সব দূষণকারী শিল্পগুলোকে মাটির গ্রহ থেকে সরিয়ে মহাকাশে পাঠিয়ে দিলেই নাকি এই গ্রহ রক্ষা পাবে! অথচ চরম পরিহাসের বিষয় হলো, তার নিজের কোম্পানি আমাজনের নিজস্ব পণ্য পরিবহনের জন্য প্রতিনিয়ত যে বিশাল গাড়ি ও উড়োজাহাজের বহর ব্যবহৃত হয়, তার বিষাক্ত কার্বন নির্গমনের পরিমাণ প্রতিবছর হু হু করে বেড়েই চলেছে।
মহাকাশকেন্দ্রিক এই তথাকথিত 'ভবিষ্যৎমুখী' ও সায়েন্স-ফিকশন মার্কা চিন্তাভাবনাগুলোকে কার্যত একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। পৃথিবী এবং মহাকাশ—উভয় স্থানেই নানা ধরনের ক্ষতিকর ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দিতে এই গালগল্পগুলো ছড়ানো হয়। রাষ্ট্রীয় নজরদারি ব্যবস্থা আরও জোরদার করা। সশস্ত্র সহিংসতা বাড়ানো। মানুষকে তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা।
মহাকাশ-বণিকদের মুনাফার লোভে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথকে মেগাবর্জ্যের ডাম্পিং গ্রাউন্ডে রূপান্তর করা হচ্ছে। মেগাবর্জ্য মানে পরিমাণে বিপুল এবং ধ্বংসক্ষমতা বিশাল বর্জ্য। এই বর্জ্য ভবিষ্যতের যেকোনো মানবিক মহাকাশ অভিযানকে থামিয়ে দিতে পারে। আর চাঁদকে লুটের সম্পদে পরিণত করা এবং আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও রাতের নির্মল আকাশকে দূষিত করার মতো ধ্বংসাত্মক কাজকে এসব মহান বুলি দিয়ে ঢেকে রাখা হচ্ছে।
স্পেসএক্স তাদের বেপরোয়া গতিতে রকেট উৎক্ষেপণ শুরু করার আগে কিংবা মহাকাশে স্টারলিংক কৃত্রিম উপগ্রহের বিশালাকার ঝাঁক পাঠানোর আগে, গণমাধ্যমে তাদের আলোচনার মূল রসদ ছিল ইলন মাস্কের মুখঝুড়ি। বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকার এক অতি ধনী শ্বেতাঙ্গ পরিবারে জন্ম নেওয়া এই প্রযুক্তি-বণিক সব সময় উসকানিমূলক মন্তব্য করে। গুরুত্বপূর্ণ খুঁটিনাটি বিষয়গুলোকে স্রেফ এড়িয়ে গিয়ে নিজের কৃত্রিম কারিশমা জাহির করেন। মহাকাশকে ঘিরে উপনিবেশ স্থাপনের পুরোনো পশ্চিমা ও ঔপনিবেশিক বক্তব্যের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তাকেই নতুন মোড়কে সাজিয়ে মাস্ক মঙ্গলে মানববসতি গড়ার ভবিষ্যৎমুখী রূপকথা দিয়ে বিশ্ববাসীর নজর টানতে পেরেছেন।
মাস্কের যুক্তি অনুযায়ী, মানুষের মঙ্গলে যাওয়া কেবল একটি বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনাই নয়—এটি মানবজাতির জন্য এক পরম 'নৈতিক বাধ্যবাধকতা'। কিন্তু অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, মঙ্গল গ্রহের এই রূপকথা মূলত এক বিরাট চতুর বিভ্রান্তি। মাটির পৃথিবীতে বসে মাস্ক অঢেল টাকা আর রাজনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করছেন। তখনই আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে অন্যমনস্ক রাখার জন্য মঙ্গল গ্রহের টোপ ফেলা হচ্ছে।
মঙ্গলে যাওয়ার যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্য ধরিত্র-বিনাশী নানা কাল্পনিক ভয় ও ভীতির গল্প সামনে নিয়ে আসেন মাস্ক। কখনো দিকভ্রষ্ট বিশাল গ্রহাণুর আঘাত, আবার কখনো কোটি কোটি বছর পর সূর্যের আয়তন বৃদ্ধি পেয়ে পৃথিবীকে গ্রাস করার ভয় দেখান। তিনি যুক্তি দেন, মানুষকে বাঁচতে হলে মঙ্গলে যেতেই হবে।
কিন্তু ধরে নেওয়া যাক, মানুষ যদি কোনোভাবে এই তেজস্ক্রিয় বিকিরণ-দগ্ধ, অত্যন্ত শুষ্ক এবং অক্সিজেনহীন নরকতুল্য গ্রহে গিয়েই পৌঁছায়, তবে সেখানে কী হবে? মাস্কের কাছে যেন তারও অতি সহজ সমাধান তৈরি আছে! কোনো সমস্যা নেই, মাস্ক মঙ্গলের মেরু অঞ্চলের বরফের আস্তরণের ওপর একের পর এক পারমাণবিক বোমা ফেলে সেগুলো গলিয়ে পানি বানিয়ে ফেলবেন! কোনো সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষও জানেন যে পারমাণবিক বোমা দিয়ে কোনো গ্রহকে জীবনের অনুকূল বা বসবাসের উপযোগী করা যায় না। কিংবা অধিকাংশ বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা মাস্কের এসব অবৈজ্ঞানিক দাবিতে চোখ ছানাবড়া করেছেন। অবশ্য তাতে এই কোটিপতির কিছুই আসে যায় না।
এই কথিত 'দূরদর্শী' ভাবমূর্তি তৈরি করে স্পেসএক্স কেবল সাধারণ মানুষের কল্পনাকে তো জয় করেছেন। এক ঢিলে দুই পাখির মতো তারা নিজেদের কর্মীদের মানসিকতাকেও পুরোপুরি বশ করতে সক্ষম হয়েছে। যারা কল্পবিজ্ঞানের জগৎকে বাস্তবে রূপ নিতে দেখতে চান, স্পেসএক্স তাদের সামনে এক পরম লোভজাগানিয়া সুযোগ তৈরি করে দেয়। কিন্তু এই খাতে কাজ করতে আসা তরুণদের খুব কম মানুষই গভীরভাবে ভেবে দেখেন যে, সায়েন্স ফিকশনে দেখানো বহুবিধ ভবিষ্যতের মধ্যে ঠিক কোনটি আসলে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে স্পেসএক্সের ভেতরে চরম বিপজ্জনক ও কষ্টকর কাজের পরিবেশ এবং ব্যাপকভিত্তিক বর্ণবাদী ও লিঙ্গভিত্তিক যৌন হয়রানির খবর পাওয়া যাচ্ছে। তারপরও চোখে মঙ্গলের স্বপ্ন নিয়ে থাকা তরুণ কর্মীরা ক্রমাগত স্পেসএক্সের ফাঁদে পা দিচ্ছেন।
এরই মধ্যে মঙ্গলে পৌঁছানোর এই লক্ষ্যের পেছনে এক কৃত্রিম তাগিদ ও তাড়াহুড়ো তৈরি করেছেন। এতে মাস্ক তার স্পেসএক্সের ব্যবসাকে বেপরোয়া গতিতে প্রসারিত করার সুযোগ নিয়েছেন। প্রযুক্তি খাতের বিখ্যাত 'দ্রুত এগোও এবং ভেঙে চুরমার করো' নীতি মাস্কের। তার সাথে যুক্ত হয়েছে 'বিশ্বের একমাত্র ত্রাণকর্তা' সাজার ভঙ্গি। এই দুই মিলে স্পেসএক্সকে এক মারাত্মক ক্ষতিকর গতি এনে দিয়েছে। ফলে রকেট উৎক্ষেপণ, কক্ষপথের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ সুরক্ষা-সংক্রান্ত যাবতীয় সরকারি নিয়মকানুন ও নীতিমালাই স্পেসএক্সের বেপরোয়া গতির কাছে পরাজিত হচ্ছে। এই কৃত্রিম উন্মাদনা মাস্ককে মার্কিন সামরিক চুক্তির মাধ্যমে বিপুল ধনসম্পদের খনি উন্মুক্ত করার সুযোগ করে দিয়েছে।
স্টারলিংক কৃত্রিম উপগ্রহের সুবিশাল ঝাঁক বা মেগাকনস্টেলেশনের দিকে তাকালেই মাস্কের কৌশল পরিষ্কার বোঝা যায়। মঙ্গলে বসতি গড়ার মহৎ পরিকল্পনার মতোই, ২০২১ সালে বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু করা স্টারলিংককেও এমন এক পরম অপরিহার্য প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। উপগ্রহভিত্তিক এই ইন্টারনেট ব্যবস্থার কথিত জনকল্যাণমূলক গুরুত্বকে কেবল অত্যন্ত স্বার্থপর কোনো ব্যক্তিই অস্বীকার করতে পারে! এর ঢাকঢোল পেটানোর মতলব, বিশ্বের তথাকথিত 'সুবিধাবঞ্চিত' বা ইন্টারনেট সুবিধা না পাওয়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার গালভরা বুলি।
কিন্তু স্টারলিংক মহাকাশের কক্ষপথে শত শত আলো-প্রতিফলনকারী উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করা শুরু করল। সাথে সাথেই জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তীব্র সতর্কবার্তা জারি করলেন। তারা জানালেন, এই কৃত্রিম উপগ্রহগুলো রাতের নির্মল আকাশকে আলোময় ও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন করে তুলছে। এমন কৃত্রিম আলো মহাশূন্য গবেষণায় মারাত্মক বাধা তৈরি করছে। অনেক গবেষকের মতে, স্টারলিংকের মতো এত বিপুল খরচের সেবার আদৌ কোনো দরকার ছিল না। অভাবী মানুষের সহায়তার দোহাই দিয়ে এটি চালু করা হয়েছিল। কিন্তু তারপর 'সুবিধাবঞ্চিত' শব্দটির মূল অর্থ—অর্থাৎ 'অভাবী বা প্রান্তিক মানুষ' না বুঝিয়ে, চতুরতার সাথে 'নতুন বাণিজ্যিক বাজার' হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়।
বর্তমানে মহাকাশে প্রায় ৯,৫০০টি স্টারলিংক উপগ্রহ ঘুরছে। অর্থাৎ একটিমাত্র মার্কিন কোম্পানির এই একক প্রকল্পটিই পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথের প্রায় ৬৫ শতাংশ উপগ্রহের জন্য দায়ী! মাত্র সাত বছরের কম সময়ে ঘটেছে এই বিপজ্জনক পরিবর্তন।
উপগ্রহের এই অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি মারাত্মক সংঘাতের ঝুঁঁকি বাড়াচ্ছে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে 'কেসলার সিন্ড্রোম'। এই শিকল বিক্রিয়ায় সৃষ্ট তীব্র গতির ধাতব বর্জ্য পৃথিবীর চারপাশের মহাকাশকে ব্যবহারের অযোগ্য করে তুলবে। ফলে মানবজাতির মহাকাশযাত্রার দুয়ার চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
আমরা যখন মহাকাশে পুঁজিবাদের এই অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারকে একমাত্র ভবিষ্যৎ ধরে নিই, তখন ভুলে যাই—পৃথিবীর সমস্ত প্রাণ আমাদের আকাশের সাথে কতটা গভীর আত্মিক ও জৈবিক সম্পর্কে যুক্ত।
তবে এই ধ্বংসের প্রভাব শুধু মহাকাশে নয়, মাটির পরিবেশেও স্পষ্ট। স্পেসএক্সের 'ফ্যালকন ৯' রকেটের একটিমাত্র উৎক্ষেপণে যে পরিমাণ কার্বন নির্গত হয়, তা একটি সাধারণ গাড়ি দিয়ে পৃথিবী ৭০ বার ঘোরার সমান!
আবার এসব উপগ্রহের আয়ু মাত্র কয়েক বছর। মেয়াদ শেষে বায়ুমণ্ডলে খসে পড়ার সময় এগুলো পারদের মতো ক্ষতিকর ধাতব দূষণ ছড়ায়। অন্যদিকে টেক্সাসের 'স্টারবেস'-এর কারণে স্থানীয় পরিবেশ ধ্বংস ও বাসিন্দাদের উচ্ছেদের প্রতিবাদে বহু বছর ধরে লড়াই করছেন পরিবেশকর্মীরা।
স্পেসএক্সের তৈরি এসব ভয়াবহ প্রভাব সামলাতে সরকারি সংস্থাগুলো পুরোপুরি হিমশিম খাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের রকেট উৎক্ষেপণ ও পরিবেশ-সংক্রান্ত কিছু নিয়ম থাকলেও মহাকাশের সুরক্ষায় তার কাজ সামান্যই। স্পেসএক্সের এই অভূতপূর্ব উৎক্ষেপণ সামলানোর কোনো আইনি বা কারিগরি সক্ষমতাই তাদের ছিল না। ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে সেই সামান্য নিয়মকানুনও আরও ঢিলেঢালা বানিয়ে দেওয়া হয়।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন এফসিসি কক্ষপথে এআই 'ডেটা সেন্টার' তৈরির প্রস্তাব পাস করে। এর অধীনে স্পেসএক্সকে নতুন ১০ লাখ উপগ্রহ উৎক্ষেপণের অনুমতি দেওয়া হয়! অথচ একটিমাত্র মার্কিন কোম্পানি দিয়ে পুরো পৃথিবীর আকাশ ভরে ফেলার বিরুদ্ধে অন্য কোনো দেশের কথা বলার সুযোগ নেই।
অবশ্য ধনকুবেরদের তাতে কিছুই যায় আসে না। মহাকাশে ১০ লাখ উপগ্রহ পাঠিয়ে মুনাফা লুটতে তারা দাবি করছে—এতে নাকি পৃথিবীর জমি, শক্তি ও পানির ওপর চাপ কমবে! কিন্তু এই যুক্তি ভুল। লাখ লাখ উপগ্রহ পাঠাতে রকেটের বিষাক্ত ধোঁয়া আর বাষ্পীভূত ধাতু শেষ পর্যন্ত আমাদের পরিবেশকেই ধ্বংস করছে।
দিনশেষে সাধারণ মানুষ স্টারলিংকের মূল খদ্দের নয়, তাদের আসল গ্রাহক বিশ্ব সামরিক শক্তি। স্টারলিংকের সামরিক সংস্করণ 'স্টারশিল্ড' ব্যবহারের কারণে সামরিক বাহিনীগুলো মাস্ককে কার্যত রাষ্ট্রনেতা মনে করে। কোন যুদ্ধে কার ইন্টারনেট চালু থাকবে বা বন্ধ হবে—সেই সিদ্ধান্ত এখন তার হাতে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে মার্কিন সামরিক বাহিনী মাত্র ২৮টি উৎক্ষেপণের জন্যই স্পেসএক্সকে ৬০০ কোটি (৬ বিলিয়ন) ডলারের চুক্তি দেয়!
এর ওপর স্পেসএক্স মার্কিন এনআরওর সাথে যৌথভাবে 'গ্রাউন্ড মুভিং টার্গেট ইন্ডিকেটর' বা জিএমটিআই প্রযুক্তি বানাচ্ছে। এটি মহাকাশভিত্তিক এক সর্বব্যাপী নজরদারি ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা পৃথিবীতে মানুষের প্রতিটি চলাচলের ওপর ২৪ ঘণ্টা নজর রাখবে।
স্পেসএক্সের কম উৎক্ষেপণ খরচের কারণে মহাকাশে স্থায়ী মারণাস্ত্র স্থাপনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে 'ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল'-এ ভূরাজনীতি লেখক মাইকেল হচবার্গ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে লেখেন, মার্কিন বিমান বা সেনাকে ঝুঁকিতে না ফেলে মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে শত্রুর বিদ্যুৎকেন্দ্র, সরকারি ভবন, রেলপথ বা রাস্তার মোড়ে ২০০ পাউন্ডের হাজার হাজার বোমা ফেলে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা ভেবে দেখতে হবে!
এদিকে এ নিবন্ধ লেখার সময়ই খবর এল, মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় কক্ষপথে অস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে—প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এমন স্বীকারোক্তি করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। এসব অস্ত্র 'মহাকাশ নিয়ন্ত্রণ' বা স্পেস কন্ট্রোল মিশনের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্স বা মহাকাশ বাহিনী। মার্কিন বিমানবাহিনীর সচিব ট্রয় মেইঙ্ক ১৪ সেপ্টেম্বর এসব কথা জানান।
১৫ বছর আগে গ্রহাণু থেকে মূল্যবান ধাতু লুটের জোয়ার উঠেছিল। এখন সেখানে ভাটার টান। এ খাতের অধিকাংশ সংস্থাই বন্ধ। হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে। গ্রহাণু লুটের খরচ বিপুল, মুনাফা তোলা যাবে না। তাই বেসরকারি কোম্পানিগুলো সরকারি ও সামরিক চুক্তিতেই পকেট ভারী করছে। এবারে তারা মৃগয়ার নতুন জমিনের তালাশে নেমেছে। এ হলো আমাদের যুগ যুগের চাঁদ মামা।
চাঁদের বুকে প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও বেসরকারি কোম্পানিগুলো এখন চাঁদের দিকে নজর দিয়েছে। তবে মানুষের ইতিহাসে মহাকাশকে ঘিরে যে প্রাচীন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ধারণা ছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে তাকে চুরমার করে এক নতুন রূপ দেওয়ার অপচেষ্টায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। প্রথম সামরিক নজরদারি কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানো থেকে শুরু করেই সরকারি চুক্তি ছিল বেসরকারি মহাকাশ কোম্পানিগুলোর আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস। তবে বর্তমান যুগের নতুন দিকটি হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে বেসরকারি করপোরেট শক্তিগুলোকে অবাধ স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা দেওয়া।
বিশেষ করে চাঁদের ক্ষেত্রে এই বাণিজ্যিক আগ্রাসনের রূপটি অত্যন্ত ভয়াবহ। মঙ্গল গ্রহ বা সুদূর গ্রহাণুর তুলনায় চাঁদ মূলত পৃথিবীর খুব কাছেই অবস্থিত। চাঁদে টানা মানুষের অবস্থান নিশ্চিত করা কঠিন হলেও চাঁদের মাটিতে পৌঁছানো এখন আর কোনো জটিল সমস্যা নয়। বিগত কয়েক বছরে ভারত, চীন, জাপান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি মহাকাশ সংস্থাগুলো সাফল্যের সাথে চাঁদের বুকে রোবটিক মহাকাশযান অবতরণ করিয়েছে। এ রকম তৎপরতার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরকারি চুক্তির টাকায় মুনাফা লুটেছে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান 'ইনটুইটিভ মেশিনস' প্রথম স্বাধীন কোম্পানি হিসেবে চাঁদের বুকে নিজেদের যান অবতরণ করাতে সক্ষম হয়।
জাতিসংঘের 'মুন ট্রিটি' চুক্তি মানতে যুক্তরাষ্ট্রের অস্বীকৃতি করপোরেটদের জন্য বড় সুযোগ এনে দিয়েছে। ফলে চাঁদের সম্পদ লুট করে এনে বিক্রি করার পথ এখন খোলা। চাঁদে প্রচুর দামি 'হিলিয়াম-৩' আছে। আর মেরু অঞ্চলে আছে বিপুল পানি ও বরফ। এ দিয়ে রকেটের জ্বালানি তৈরি বা বসতি টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তার সাত মিত্র দেশ মিলে সই করে 'আর্টেমিস অ্যাকর্ডস'। জাতিসংঘের কূটনৈতিক পথ পাশ কাটিয়ে তৈরি হয়েছে এই চুক্তি। এবারে ছোট রাষ্ট্রগুলোকে মার্কিনিদের সম্পদ লুটের ফ্রেমওয়ার্ক মেনে নিতে বাধ্য করছে।
ট্রাম্পের 'আমেরিকান মহাকাশ শ্রেষ্ঠত্ব' নিশ্চিত করার নির্দেশ এবং এই আর্টেমিস অ্যাকর্ডস স্পষ্ট করে দেয়, মহাকাশ আর সর্বজনীন সম্পদ নয়। ফলে সাধারণ স্টার্টআপ থেকে শুরু করে 'লকহিড মার্টিন'-এর মতো অস্ত্র নির্মাতাদেরও এখন চাঁদে দখলদারত্ব ও সম্পদ লুটের লোভে জিবের পানি বাঁধ মানছে না।
বিশ্বজুড়ে কট্টর জাতীয়তাবাদ ও ফ্যাসিবাদের নতুন জোয়ারের প্রেক্ষাপটে, আর্টেমিস প্রোগ্রামের মাধ্যমে চাঁদে মানুষ পাঠানোর মার্কিন প্রচেষ্টা মূলত অতীতের এক কাল্পনিক ভবিষ্যতের দিকে ফিরে যাওয়ার 'টাইম মেশিন' হিসেবে কাজ করছে।
ফ্যাসিবাদের মূল কৌশল হলো, জাতীয় পতনের ভয় দেখানো আর এক কাল্পনিক পুনর্জন্মের স্বপ্ন বেচা। কট্টরপন্থীদের মতে, ১৯৬০-এর 'অ্যাপোলো' অভিযান ছিল থমকে যাওয়া এক রূপকথা, যার উদ্দেশ্য ছিল মহাকাশে মার্কিন সাম্রাজ্য ও বৈষম্যকে স্থায়ী করা। আর্টেমিস প্রোগ্রামের মাধ্যমে চাঁদে 'প্রথম নারী ও পরবর্তী পুরুষ' পাঠানোর ঘোষণা দেন ট্রাম্প প্রশাসনে ন্যাশনাল স্পেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মাইক পেন্স।
পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতায় নারীকে একা চাঁদে ভাবা যায় না, তাই 'পরবর্তী পুরুষ' যোগ করা। এখানে চাঁদকে বাইবেলের 'ইডেন গার্ডেন' বানিয়ে এক পুরুষ-নারী জুটিকে পাঠিয়ে আমেরিকাকে সেই পুরোনো প্রতাপে ফিরিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে।
আর্টেমিস অভিযানে বিভিন্ন বর্ণ ও লিঙ্গের নভোচারী পাঠিয়ে প্রগতির ঢোল পেটাচ্ছে নাসা। অথচ মার্কিন পুলিশ যখন শহরে হাজার হাজার বাস্তুহীন ও প্রান্তিক মানুষকে যখন পুলিশ উচ্ছেদ করছে, তখন গুটিকয়েক অশ্বেতাঙ্গ মানুষকে মহাকাশে পাঠিয়ে মানবমুক্তির কথা বলা নিছক ভণ্ডামি। পাশাপাশি প্রচারণার ডুগি-তবলা বাজানো।
মার্কিন প্রচারণার বহু আগেই—পৃথিবীর সৃষ্টির সূচনা থেকে চাঁদ ছিল আমাদের প্রাণের সহচর। কৃত্রিম আলোয় ঢাকা শহরে চাঁদই রাতের আকাশের একমাত্র স্পষ্ট রূপ। মানব ইতিহাসে চাঁদ কেবল সময় বা জোয়ার-ভাটা গণনার যন্ত্র নয়; এটি আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রেরণার উৎস।
রাষ্ট্র ও করপোরেট চক্রান্তে মহাকাশের সাথে মানুষের এই আত্মিক সম্পর্ক মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। পুঁজিবাদের এই অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার কোনো অবধারিত নিয়ম নয়। পুঁজিবাদ বা ফ্যাসিবাদের বয়স খুব বেশি দিনের নয়, কিন্তু এই মহাজাগতিক বিশ্ব কোটি কোটি বছর ধরে টিকে আছে।
ধনকুবেররা আকাশ লুটের সুযোগ পেতে আমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের গল্প শোনাচ্ছে। অথচ রকেট ঘাঁটির বর্জ্যে ধ্বংস হওয়া বনাঞ্চল, কক্ষপথের আবর্জনা আর ২৪ ঘণ্টার নজরদারি নেটওয়ার্কই সেই গল্পের আসল চেহারা স্পষ্ট করে দেয়। মহাকাশে উপনিবেশ স্থাপনের এই চেষ্টা প্রকৃতপক্ষে মাটির পৃথিবীকে নতুন করে শোষণেরই আরেক রূপ।
তা মঙ্গল গ্রহে উপনিবেশ গড়ার গল্পই হোক, গ্রহাণু থেকে খনিজ উত্তোলনই হোক, মহাকাশ পর্যটনই হোক কিংবা চাঁদে স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি স্থাপনই হোক—তাদের এই সমস্ত চিন্তাভাবনা মূলত এক দেউলিয়া ও কৃত্রিম রূপকথা। এই রূপকথা কেবল গুটিকয়েক করপোরেট মালিকের পকেট কানায় কানায় পূর্ণ করবে। বিনিময়ে আমাদের একমাত্র বাসস্থান এই মাটির পৃথিবীটাকে বানাবে এক পরিত্যক্ত ধ্বংসস্তূপ।
