ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার হয়ে যে কারণে আবারও লড়তে পারেন উত্তর কোরিয়ার সেনারা
গোলাগুলির মধ্যেই ঝাঁকে ঝাঁকে যুদ্ধক্ষেত্রে ঢুকে পড়েছিল তারা; ড্রোন কিংবা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের মারাত্মক ঝুঁকিও যেন তাদের কাছে কোনো বিষয় ছিল না। আত্মসমর্পণ না করে মৃত্যুকে বেছে নেওয়া এক বিশেষ 'ভুতুড়ে সেনাদল'—যাদের হাজার হাজার সদস্য লড়াই করে প্রাণ দিয়েছিল। এরপর আপাতদৃষ্টিতে তারা রণক্ষেত্র থেকে যেন হারিয়েই যায়।
২০২৪ সালের শেষের দিকে রুশ ভূখণ্ডে ইউক্রেনের আক্রমণ প্রতিহত করতে মস্কোর বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য সেনা পাঠিয়েছিল পিয়ংইয়ং। তবে এর জন্য তাদের চড়া মূল্য দিতে হয়েছে; মোতায়েন করা ১৩ হাজার সেনার মধ্যে প্রায় ৩ হাজার সেনাই সম্মুখসমরে নিহত হয়।
পরবর্তীকালে তারা কৌশল পরিবর্তন করে এবং রুশ বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে কুরস্ক অঞ্চল থেকে ইউক্রেনীয় সেনাদের হটিয়ে দেয়। এরপর যুদ্ধের ময়দানে তাদের বিষয়ে খুব একটা জানা যায়নি। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মতে, খুব শিগগিরই উত্তর কোরিয়ার সেনা ও তাদের সমরাস্ত্র রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে বড় ধরনের প্রত্যাবর্তন ঘটাতে যাচ্ছে।
গত মাসে জেলেনস্কি সতর্ক করে বলেন, রাশিয়ায় ৫০ হাজার পর্যন্ত উত্তর কোরীয় সেনা মোতায়েন করা হতে পারে। এর আগে এই সংখ্যা ৩০ হাজার হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। এ ছাড়া তিনি নিজের দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে সহায়তার আহ্বান জানান।
কিন্তু এত বিপুল প্রাণহানির পরও উত্তর কোরিয়া কেন রাশিয়ার হয়ে লড়াই করতে আবারও সেনা পাঠাবে? আর প্রথম দফায় পাঠানো সেনাদেরই বা কী পরিণতি হয়েছিল?
সিউলের আসান ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজের সেন্টার ফর ফরেন পলিসি অ্যান্ড ন্যাশনাল সিকিউরিটির রিসার্চ ফেলো ড. ইয়াং উক বলেন, 'তারা এখনো সেখানেই রয়েছে। ইউক্রেনের সম্ভাব্য আরেকটি পাল্টা আক্রমণ প্রতিহত করতে তারা রুশ ভূখণ্ড পাহারা দিচ্ছে। আমাদের ধারণা, তাদের কিছু ইঞ্জিনিয়ারিং কোর বা কর্মী [রুশ দখলকৃত] দনবাস এলাকায় থাকতে পারে; তবে তারা সম্মুখসারির লড়াকু সেনা নয়।'
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রধান গোয়েন্দা পরিদপ্তরের (এইচইউআর) হিসাব অনুযায়ী, এখনো প্রায় সাড়ে আট হাজার উত্তর কোরীয় সেনা রুশ ভূখণ্ডে অবস্থান করছেন। তারা চারটি ব্রিগেডে বিভক্ত হয়ে রুশ বাহিনীর 'নর্থ' গ্রুপের অধীনে দায়িত্ব পালন করছেন। ইউক্রেনীয় বাহিনীর অনুপ্রবেশ ঠেকাতে তাদের কুরস্ক অঞ্চলে রাশিয়ান ফেডারেশনের সীমান্ত সুরক্ষার কাজে নিয়োজিত রাখা হয়েছে।
বিবিসিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এইচইউআর জানায়, 'তারা সরাসরি কোনো সক্রিয় যুদ্ধ অভিযানে অংশ নিচ্ছেন না। ইউক্রেনের সাময়িকভাবে দখলকৃত অঞ্চলগুলোতেও কোরিয়ান পিপলস আর্মির কোনো ইউনিটের উপস্থিতি দেখা যায়নি।'
উত্তর কোরিয়ার জন্য প্রথম
উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উনের জন্য কুরস্কে এই সেনা মোতায়েন ছিল বড় ধরনের এক বাজি এবং বিদেশে পাঠানো দেশটির এযাবৎকালের সর্ববৃহৎ লড়াকু সেনাদল। (এর আগে ১৯৭৩ সালে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইয়ম কিপুর যুদ্ধের সময় মিশরে ১ হাজার ৫০০ সামরিক সদস্য ও প্রশিক্ষক পাঠিয়েছিল উত্তর কোরিয়া। এ ছাড়া ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে উত্তর ভিয়েতনামের হয়ে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে দেশটির আনুমানিক ৮৭ জন বৈমানিক লড়াই করেছিলেন)।
তবে রক্তপাতের পরও এটি ছিল এমন এক বাজি, যা সফল হয়েছে। এতে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত ও বিশ্ব থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন দেশটি অগণিত সুবিধা পেয়েছে, যা তাদের অর্থনীতি ও সামরিক ভাগ্যের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে এটি দুই দেশের মধ্যে আরও গভীর সামরিক সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
ড. ইয়াং বলেন, উত্তর কোরিয়ার সেনারা 'এখন জানে আধুনিক লড়াই আসলে কেমন হয়'।
রাশিয়ায় লড়াইয়ের জন্য পাঠানো সেনারা ছিল উত্তর কোরিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর অভিজাত শাখা 'স্টর্ম কোর'-এর সদস্য। চরমভাবে একঘরে ও সর্বগ্রাসী উত্তর কোরিয়া একটি অতি-সামরিকীকৃত রাষ্ট্র, যেখানে নাগরিকদের কঠোর মতাদর্শিক দীক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে।
শুরুতে রাশিয়া বা উত্তর কোরিয়া কেউই এই সেনাদের উপস্থিতির বিষয়টি স্বীকার করেনি। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ইউক্রেনীয় বাহিনী প্রথমবারের মতো তাদের সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। তবে পরের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের জানুয়ারির আগে কোনো উত্তর কোরীয় সেনাকে জীবিত যুদ্ধবন্দী হিসেবে আটক করা সম্ভব হয়নি।
অবশেষে ২০২৫ সালের এপ্রিলে গিয়ে রাশিয়া প্রথমবারের মতো তাদের ভূমিকার কথা স্বীকার করে। সে সময় রুশ সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের প্রধান ভ্যালেরি গেরাসিমভ যুদ্ধক্ষেত্রে উত্তর কোরীয় সেনাদের 'বীরত্ব'-এর প্রশংসা করেন।
ড. ইয়াং আরও বলেন, 'উত্তর কোরিয়ার সেনারা ভীষণ সাহসী, বিশেষ করে স্টর্ম কোরের সদস্যরা। দেশের জন্য তারা হাসিমুখে জীবন দিতে প্রস্তুত। তবে সমস্যা হলো, কেবল আবেগের জোরে যুদ্ধের কার্যকর দক্ষতা অর্জন করা যায় না... কুরস্ক অভিযানের শুরুর দিকে তাদের প্রচুর রক্ত ঝরাতে হয়েছে, তবে আধুনিক ড্রোন যুদ্ধের বাস্তবতা থেকে তারা অনেক শিক্ষা নিয়েছেন।'
উত্তর কোরিয়ার সেনাদের 'কামানের খোরাক' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ইউক্রেনের ৯৫তম এয়ার অ্যাসল্ট ব্রিগেডের একজন সেনা, যার ছদ্মনাম 'সুলতান'। ২০২৪ সালের শেষের দিকে কুরস্কের লড়াইয়ে তিনি এসব সেনার মুখোমুখি হয়েছিলেন।
সম্প্রতি কিয়েভে বসে সেই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, 'তারা প্রথমে বড় একটি হামলাকারী দল পাঠাত। এরপর একই অবস্থানে আরও ১৫-২০ জন সেনাকে পাঠানো হতো এবং ধারাবাহিকভাবে এই প্রক্রিয়া চলত। উত্তর কোরীয়দের কাজের ধরন কিছুটা ভিন্ন ছিল; তারা রণক্ষেত্রে সবসময় সক্রিয় ও সচল থাকত। এতে তারা কিছু সুবিধা পেলেও তা সিদ্ধান্তমূলক কোনো অগ্রগতি এনে দিতে পারেনি।'
তিনি আরও জানান, রুশ মিত্রদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল বলে প্রতীয়মান হয়েছিল এবং উত্তর কোরীয় সেনাদের যুদ্ধ সরঞ্জামও ছিল অপ্রতুল।
লড়াই শেষে সুলতান ও তার দলের সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও গোয়েন্দা তথ্যের খোঁজে নিহত সেনাদের দেহ তল্লাশি করতেন। নিহত রুশ সেনাদের কাছে ব্যক্তিগত জিনিসপত্র, পরিচয়পত্র ও নানা সামরিক সরঞ্জাম পাওয়া যেত। তবে তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, 'উত্তর কোরীয়দের ক্ষেত্রে বিষয়টি ছিল আলাদা; তল্লাশি করে তাদের কাছে শুধু গোলাবারুদ ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায়নি। আমরা তাদের পোশাকের প্রতিটি ছোট পকেট পর্যন্ত খুঁজে দেখেছি—কোনো ধরনের নথিপত্র বা কিছুই সেখানে ছিল না।'
অন্যান্য ইউক্রেনীয় সেনাও জানিয়েছেন, উত্তর কোরীয় সেনাদের প্রয়োজনীয় বডি আর্মার (বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট), শীতের পোশাক ও হেলমেটের মারাত্মক ঘাটতি ছিল।
ইউক্রেনীয় বাহিনীর একটি অভিযানের লোমহর্ষক ভিডিওতে দেখা যায়, বনাঞ্চলে বরফঢাকা মাটিতে একজন আহত উত্তর কোরীয় সেনা উপুড় হয়ে পড়ে আছেন। ইউক্রেনীয় সেনারা কাছে যাওয়া মাত্রই তিনি নিজের চিবুকের নিচে একটি গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটান; আর মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তে শেষ কথা হিসেবে তিনি নিজের শীর্ষ নেতা কিম জং উনের নাম উচ্চারণ করেন।
২০২৫ সালের এপ্রিলে পিয়ংইয়ংয়ে সদ্য প্রতিষ্ঠিত মিউজিয়াম অব ফরেন মিলিটারি অপারেশন্সে আয়োজিত এক স্মরণসভায় কিম জং উন এমন সেনাদের প্রশংসা করেন, যারা শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ না করে আত্মাহুতি দেওয়াকে বেছে নিয়েছিলেন।
রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই বেলুসভের উপস্থিতিতে নিহত সেনাদের স্বজনদের উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, 'মহান মর্যাদা রক্ষার স্বার্থে তারা ছিলেন এমন বীর, যারা বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ বা আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন।'
কুরস্ক অভিযানে ঠিক কত সেনার মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে উত্তর কোরিয়া কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। তবে সেখানে নির্মিত স্মৃতিসৌধের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিবিসির কোরীয় বিভাগের এক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, রাশিয়ার পক্ষে লড়তে গিয়ে অন্তত ২ হাজার ৩০০ উত্তর কোরীয় সেনা নিহত হয়েছেন।
এদিকে ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা এইচইউআরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই সংখ্যা আরও বেশি—প্রায় ৩ হাজার সেনা নিহত এবং আরও ১ হাজার ৫০০ সেনা আহত হয়েছে।
তবে কেবল যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জনের বাইরেও প্রশ্ন ওঠে, বিদেশের মাটিতে এমন এক যুদ্ধে উত্তর কোরিয়া কেন তাদের সেরা সেনাদের এভাবে আত্মাহুতি দিল?
অর্থনৈতিক সুফল
সিউলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজির সিনিয়র গবেষণা ফেলো লিম সু-হোর মতে, সেনা মোতায়েনের এই পদক্ষেপ দেশটির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এক অর্থনৈতিক সুফল বয়ে এনেছে এবং এটি তাদের জন্য ছিল এক বড় ভূরাজনৈতিক বিজয়।
তার হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়ায় অস্ত্র বিক্রি এবং সেনা পাঠানোর মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত উত্তর কোরিয়া প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে।
তিনি বলেন, 'উত্তর কোরিয়ার বার্ষিক জিডিপি প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার বলে ধারণা করা হয়। এর অর্থ হলো, গত আড়াই বছরে অস্ত্র রপ্তানি এবং সেনা পাঠিয়ে তারা নিজেদের এক বছরের মোট জিডিপির তিন ভাগের এক ভাগ আয় করে নিয়েছে। উত্তর কোরিয়ার মতো ছোট অর্থনীতির একটি দেশের জন্য এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব।'
সেনা ও সামরিক সহায়তার বিনিময়ে উত্তর কোরিয়া খাবার, জ্বালানি তেল ও বৈদেশিক মুদ্রা পাচ্ছে। পিয়ংইয়ংয়ের ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার দাবি চীন করলেও, রাশিয়া তা করছে না।
তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মস্কোর সঙ্গে এই সহযোগিতার ফলে বেইজিংয়ের ওপর উত্তর কোরিয়ার দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র নির্ভরতায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত বছরের সেপ্টেম্বরে বেইজিংয়ে প্রথমবারের মতো চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলেন কিম জং উন—যা ছিল তিন নেতার প্রথম কোনো প্রকাশ্য যৌথ বৈঠক। পুরোপুরি সমকক্ষ হিসেবে না হলেও উত্তর কোরিয়া এখন আর কেবল একা চীনের ওপর নির্ভরশীল নয়।
লিম বলেন, এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; 'এটি একটি বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন।'
তিনি আরও বলেন, 'বিচ্ছিন্ন অবস্থায় যখনই পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠত, সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টায় উত্তর কোরিয়া প্রথমে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান কিংবা বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে হাত বাড়াত—কোরীয় উপদ্বীপের কূটনৈতিক ধারা এতদিন এমনই ছিল। কিন্তু রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ায় কিম জং উন এখন দাবি করছেন, বিশ্ব আজ নতুন এক স্নায়ু যুদ্ধ ও বহুমুখী (মাল্টিপোলার) ব্যবস্থার যুগে প্রবেশ করেছে।'
অর্থনৈতিক ও সামরিক তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে মস্কোর সঙ্গে যে সমঝোতা শুরু হয়েছিল, তা এখন আরও গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে রূপ নিচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। কোরিয়ান ওয়ার্কার্স পার্টির এবারের নবম পার্টি কংগ্রেসে দারুণ আত্মবিশ্বাসী কিম জং উন এমন সব সাফল্যের কথা তুলে ধরেন, যা তার পিতামহ কিম ইল সাং এবং পিতা কিম জং ইলও কখনো অর্জন করতে পারেননি।
তবে সামনে বড় ধরনের ঝুঁকিও রয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো উত্তর কোরীয় সেনা ইউক্রেন কিংবা ইউক্রেনের রুশ দখলকৃত ভূখণ্ডে লড়াই করেনি। তারা যদি তা করে, তবে তার তীব্র কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে; বিশেষ করে ইউক্রেনের মিত্র দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রে। উল্লেখ্য, দেশটি এ পর্যন্ত কিয়েভকে কেবল 'প্রাণঘাতী নয়' এমন সামরিক ও মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে।
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এই বিষয়টির ওপরই জোর দিচ্ছেন এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাসহ উন্নত সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের জন্য সিউলের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। তিনি জানান, গত জুন মাস থেকেই রাশিয়ার ভোরোনেজ অঞ্চলে নতুন করে উত্তর কোরীয় সেনাদলকে গ্রহণ করার প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, পিয়ংইয়ং রাশিয়ায় অতিরিক্ত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হস্তান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
গত জুলাই মাসে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, 'রাশিয়া উত্তর কোরিয়াকে আধুনিক যুদ্ধপদ্ধতি শিখতে, তাদের অস্ত্রের আধুনিকায়ন করতে এবং বাস্তব লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা অর্জনে সহায়তা করছে। এটি এশিয়ার এমন প্রতিটি দেশের জন্যই হুমকি, যারা উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার মধ্যে রয়েছে।'
ইউক্রেনীয় বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে এখন পর্যন্ত মাত্র দুজন উত্তর কোরীয় সেনাকে জীবিত বন্দী করা সম্ভব হয়েছে। কুরস্ক অভিযানে ১১ হাজার থেকে ১৪ হাজার সেনা অংশ নিয়েছিল বিবেচনায় নিলে এই সংখ্যা অবিশ্বাস্য রকমের কম। (দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার মতে, অপর এক সেনাকে জীবিত ধরা হলেও পরে যুদ্ধজনিত ক্ষতের কারণে তার মৃত্যু হয়)।
শত্রুর হাতে ধরা পড়ার চেয়ে আত্মাহুতি বেছে নেওয়া সহযোদ্ধাদের মতো এই দুজনের কেউই জীবিত বন্দী হতে চাননি।
ইউক্রেনের একটি কারাগারে দক্ষিণ কোরীয় টেলিভিশন চ্যানেল এমবিসির একটি প্রামাণ্যচিত্র দলের কাছে সাক্ষাৎকার দেন বন্দী একজন সেনা। তিনি বলেন, 'জোসেওন (উত্তর কোরিয়া)-এর সেনাদের জন্য যুদ্ধবন্দী হওয়াটাই একটি অপরাধ। আমাদের জন্য এমন কোনো সুযোগই নেই। আমরা যুদ্ধবন্দী হতে পারি না।'
বায়েক পিয়ং-গাং (আসল নাম নয়) নামের ওই সেনা ড্রোন হামলায় আহত হয়ে চার দিন পড়ে থাকার পর ধরা পড়েন। তিনি ইউক্রেনীয় সেনাদের ভুলবশত নিজেদের রুশ মিত্র ভেবে বসেছিলেন; ফলে মূলত এক প্রকার বিভ্রান্ত হয়েই তিনি আত্মসমর্পণ করে বসেন।
দ্বিতীয় বন্দী লি কাং-ইউনও একটি ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন। সাংবাদিক কিম ইয়ং-মিকে তিনি জানান, এখনো বেঁচে থাকার কারণে তিনি এক ধরনের অপরাধবোধে ভুগছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে হাত ও চোয়ালে মারাত্মক জখম নিয়ে অর্ধচেতন অবস্থায় তাকে খুঁজে পেয়েছিল ইউক্রেনীয় সেনারা।
তিনি এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, 'আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটানোর (জীবন শেষ করে দেওয়ার) মতো কোনো গ্রেনেড বা ছুরি সে সময় আমার কাছে ছিল না।'
যুদ্ধের শুরুর দিকে ড্রোন হামলায় তার বহু সহযোদ্ধার নিহত হওয়ার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, পুরো যুদ্ধক্ষেত্র তখন 'রক্তের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছিল'।
এই দুই সেনার কেউই আর উত্তর কোরিয়ায় ফিরে যেতে চান না। লি জানান, তার দৃঢ় বিশ্বাস, তিনি বন্দী হওয়ার অপরাধের শাস্তি হিসেবে পিয়ংইয়ংয়ে থাকা তার পরিবারের সদস্যদের 'নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া' হতে পারে। তারা দুজনই জানিয়েছেন, তারা দক্ষিণ কোরিয়ায় আশ্রয় পেতে চান; আর সিউলও তাদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত রয়েছে।
পিয়ংইয়ং নয়, কেবল রাশিয়াই এই যুদ্ধবন্দীদের ফেরত চেয়ে অনুরোধ জানিয়েছে।
তবে সামরিক সহায়তার জন্য সিউলের ওপর চাপ বজায় রাখতে চাওয়া ইউক্রেন এখনো তাদের দক্ষিণ কোরীয় কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। কিয়েভ জানিয়েছে, তারা আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের বাধ্যবাধকতাগুলো মেনে চলবে, যা যুদ্ধবন্দীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো দেশে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোকে নিষিদ্ধ করে।
এই দুই সেনার ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে, মস্কোর হয়ে লড়াই করতে আরও বহু উত্তর কোরীয় সেনা ইউক্রেন যুদ্ধে যোগ দেবেন। এই সেনা সরবরাহ পিয়ংইয়ংয়ের জন্য বিপুল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা বয়ে এনেছে; আবার অন্যদিকে রাশিয়ার জন্যও তাদের উপস্থিতি এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইউক্রেনে মস্কোর সর্বাত্মক আগ্রাসনের সাড়ে চার বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর দেশটিকে এখন তীব্র সেনা সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পশ্চিমা ও ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হিসাব মতে, প্রতি মাসে রাশিয়া যত নতুন সেনা নিয়োগ দিতে পারছে; তার চেয়ে গড়ে প্রায় ৬ হাজার বেশি সেনা রণক্ষেত্রে হারাচ্ছে। ফলে নিজেদের সৈন্যদলের শক্তি বজায় রাখতে কলম্বিয়া, কেনিয়া, ক্যামেরুন এবং উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলো থেকে বিদেশি যোদ্ধা নিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে মস্কো।
মূলত রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার এই আঁতাত হলো এক ধরনের পারস্পরিক সুবিধাভিত্তিক লেনদেন। পরিশেষে বলা যায়, রাশিয়ার হয়ে লড়াইয়ের জন্য উত্তর কোরিয়া তাদের সেনা পাঠানো অব্যাহত রাখবে ঠিকই; তবে তা কেবল ততদিনই চলবে, যতদিন তা পিয়ংইয়ংয়ের জন্য লাভজনক থাকবে।
