বিমান সহায়তা আসেনি, শত্রুশিবিরে ১০০ মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা: কীভাবে মোখা ও পেরিম দখলে নিল হুথিরা
গোয়েন্দা তথ্য ও হামলা চালনার নির্দেশনায় সৌদি আরবকে সহায়তার জন্য ১০০ জনেরও বেশি মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা মোতায়েন ছিলেন। ইয়েমেনের জাতিসংঘ-সমর্থিত সরকারের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারাও বারবার সতর্ক করেছিলেন যে হুথিদের একটি বড় ধরনের হামলা আসন্ন।
এরপরও লোহিত সাগর উপকূলে ইরান-সমর্থিত হুথি যোদ্ধারা যখন তীব্র আক্রমণ শুরু করে, তখন ইয়েমেনি ও সৌদি বাহিনীর বহু আকাঙ্ক্ষিত মার্কিন বা সৌদি বিমান সহায়তা আর এসে পৌঁছায়নি।
ফলাফল—মাত্র ৩৬ ঘণ্টার এক অবিশ্বাস্য অভিযানের মুখে লোহিত সাগরের কৌশলগত মোখা বন্দর এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির প্রবেশদ্বারে অবস্থিত পেরিম দ্বীপ ( যা মায়ুন দ্বীপ নামেও পরিচিত) পুরোপুরি হুথিদের দখলে চলে যায়।
সিএনএনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাসের পর মাস ধরে আগাম সতর্কবার্তা এবং হুথি-বিরোধী অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও—দুটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের এমন দ্রুত পতন—বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এর ফলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ইরানের কড়াকড়ির মধ্যেই বিশ্ববাণিজ্যের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ 'চোকপয়েন্ট' বা সংকীর্ণ সমুদ্রপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপরও ইরান ও তার হুথি সহযোগীদের নিয়ন্ত্রণ আরও মজবুত হলো।
'আসেনি কাঙ্ক্ষিত বিমান সহায়তা'
গত বৃহস্পতিবার সকালে মোখা বন্দরের দিকে হুথিদের চূড়ান্ত ও দ্রুত অগ্রসর হওয়া শুরু হয়।
সৌদি সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা সিএনএনকে জানান, হুথিরা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ভারী অস্ত্রশস্ত্রের সাহায্যে তরঙ্গাকারে হাজার হাজার যোদ্ধা পাঠিয়ে এই হামলা চালায়।
পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটলে ওই কর্মকর্তা মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে ওয়াশিংটন পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সৌদি বিমান সহায়তা অতি শীঘ্রই পৌঁছাবে। কিন্তু যুদ্ধের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কোনো বিমান সহায়তা আসেনি, ফলে মোখা বন্দরের পতন ঘটে দ্রুতই।
পরের দিন হুথি বাহিনী লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশদ্বারে অবস্থিত ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ দখল করে নেয়। দ্বীপটি বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে দুটি প্রধান প্রণালিতে বিভক্ত করেছে, যা বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম ব্যস্ততম সমুদ্রপথের ঠিক মাঝখানে একটি কৌশলগত সামরিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে।
সৌদি যুবরাজের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান ট্রাম্পের
বিমান সহায়তা না পাওয়ার পেছনে মূল কারণ ছিল মার্কিন প্রশাসনের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ না করার সিদ্ধান্ত।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দুই দফায় ফোনালাপ করেন এবং হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন বিমান হামলার অনুরোধ জানান। কিন্তু ট্রাম্প সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন।
হোয়াইট হাউস সিএনএনকে জানিয়েছে, লোহিত সাগরে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতাসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষা করাতেই মনোযোগ দিচ্ছে ওয়াশিংটন। তবে এই আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আঞ্চলিক অংশীদাররাই নেতৃত্ব দিবে এমনটাই চায়।
মার্কিন এই অবস্থানের মাধ্যমে একটি স্পষ্ট বার্তা পাওয়া গেছে: ওয়াশিংটন সামরিক গোয়েন্দা তথ্য এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করলেও—ইয়েমেনের সরকার বা সৌদি বাহিনীর পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়া থেকে নিজেদের বিরত রাখছে।
১০০ জনেরও বেশি মার্কিন উপদেষ্টা
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার এই দ্রুত পতনের ঘটনা মার্কিন সামরিক উপস্থিতির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
সৌদি আরবে হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযানে গোয়েন্দা ও টার্গেটিং সহায়তা দেওয়ার জন্য ১০০ জনেরও বেশি মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা মোতায়েন রয়েছে। ইরান তার ইয়েমেনি মিত্রদের সহায়তা বাড়ানোয় সৃষ্ট যৌথ বাহিনী কমান্ডের অধীনে এসব মার্কিন সেনা কাজ করছেন। এক মার্কিন কর্মকর্তার মতে, সব মিলিয়ে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত আমেরিকান সামরিক কর্মকর্তার সংখ্যা প্রায় ২০০ জন।
এমনকি পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য গত বৃহস্পতিবার সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার নিজেও সৌদি আরবে উপস্থিত ছিলেন। তবে হুথিদের আকস্মিক পদাতিক ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে—শুধু গোয়েন্দা তথ্য ও উপদেষ্টাদের উপস্থিতি যুদ্ধবিমানের বিকল্প হতে পারেনি।
কাগুজে সেনাদের কারণে দুর্বল ছিল প্রতিরক্ষা
পরাজয়ের পেছনে কেবল বিমান সহায়তার অভাবই একমাত্র কারণ ছিল না; হুথি-বিরোধী বাহিনীর ভেতরে থাকা চরম অবকাঠামোগত দুর্বলতাও এ ঘটনায় উন্মোচিত হয়েছে।
অভিযান সম্পর্কে অবগত একটি পশ্চিমা সূত্র সিএনএনকে জানায়, মোখায় প্রবেশকারী হুথি যোদ্ধারা যে ইয়েমেনি সামরিক ইউনিটের মুখোমুখি হয়েছিল, তা কাগজ-কলমে দেখানো সংখ্যার তুলনায় বাস্তবে সদস্য সংখ্যার দিক থেকে অত্যন্ত দুর্বল ছিল।
সামরিক নথিতে অসংখ্য জনের নামই ছিল, যারা বাস্তবে বাহিনীতে ছিলেন না। এমন "ভুতুড়ে সেনা" বা গোস্ট ট্রুপস অন্তর্ভুক্ত করা হয়—শুধু নাম দেখিয়ে বেতন তুলে নেওয়ার জন্য। অর্থাৎ, এটি ঊর্ধ্বতন ইয়েমেনি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির ফসল। ফলে কাগজ-কলমে দেখানো তথ্যের তুলনায় বাস্তবে মাত্র ২০ শতাংশ সেনা মাঠে সক্রিয় ছিল।
এর পাশাপাশি হুথি বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতাও বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। আরব উপদ্বীপ ঝুঁকি সংক্রান্ত বিষয়ে মার্কিন সরকার ও বেসরকারি খাতকে পরামর্শ দেওয়া বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-বাশা সিএনএনকে বলেন, হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত দলগুলোর মধ্যে কোনো রাজনৈতিক ঐক্য ছিল না এবং কোনো একক কমান্ড- অ্যান্ড-কন্ট্রোল কাঠামো ছিল না।
পরবর্তী পরিস্থিতি ও নতুন শঙ্কা
এই পতনের প্রভাব ইয়েমেনের ভূখণ্ডের বাইরেও মারাত্মকভাবে অনুভূত হচ্ছে।
পেরিম দ্বীপটি লোহিত সাগর, এডেন উপসাগর এবং আরব সাগরকে যুক্ত করা সরু বাব আল-মান্দেব প্রণালির প্রবেশমুখে অবস্থিত। চলমান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে অনেক তেলের চালান—লোহিত সাগরের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, যা এই পথটির গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
নতুন এই উপকূলীয় এলাকা ও দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় হুথিরা এখন বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন-বোট হামলা চালানোর জন্য আরও বিস্তীর্ণ সামরিক প্ল্যাটফর্ম পেয়ে গেল।
আর এই অগ্রযাত্রা হয়তো এখানেই থামছে না। বিশ্লেষক আল-বাশা স্যাটেলাইট ইমেজ ও ওপেন-সোর্স ইন্টেলিজেন্স উল্লেখ করে জানান, হুথি বাহিনী নতুন করে পুনর্বিন্যস্ত হচ্ছে এবং খুব শীঘ্রই আরও পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে পারে।
গোয়েন্দা তথ্য, মার্কিন উপদেষ্টা এবং সপ্তাহের পর সপ্তাহ আগাম সতর্কবার্তা সত্ত্বেও মোখা ও পেরিম দ্বীপের পতন ঠেকানো না যাওয়ায় এখন ওয়াশিংটন ও তার আঞ্চলিক সহযোগীদের সামনে বড় প্রশ্ন: হুথিদের পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু দখল করা থেকে কে থামাবে?
