হরমুজ অবরুদ্ধ, হুমকিতে লোহিত সাগর: বিশ্ববাজারে তেল পৌঁছাবে কীভাবে?
কয়েক মাস ধরে ইরান যুদ্ধের অন্যতম প্রধান চাপের কেন্দ্র হয়ে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। এখন বিশ্বের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্যপথ হুমকির মুখে পড়ছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলে ইরানের বিধিনিষেধের কারণে সৌদি আরবসহ অন্যান্য তেল উৎপাদক দেশকে এরই মধ্যে বিকল্প পথের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়েছে, বিশেষ করে লোহিত সাগরমুখী পথের ওপর।
কিন্তু ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলজুড়ে ইরান-সমর্থিত হুথি যোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। এই সরু জলপথটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
হুথিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা দখল করেছে। ইয়েমেন সরকারের সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, তারা পেরিম দ্বীপও দখল করেছে। দ্বীপটি সরাসরি বাব আল-মান্দেব প্রণালির মধ্যে অবস্থিত।
এসব ঘটনা এমন একটি নৌপথে জাহাজ চলাচলে হুমকি দেওয়ার ক্ষেত্রে গোষ্ঠীটির সক্ষমতা বাড়াতে পারে, যে পথটি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এর ফলে জ্বালানি বাজারের সামনে ক্রমেই কঠিন একটি প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—হরমুজ প্রণালি যদি কঠোরভাবে সীমিত থাকে এবং লোহিত সাগরের পথ আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, তাহলে এই অঞ্চলের তেল কীভাবে বিশ্ববাজারে পৌঁছাবে?
হরমুজ প্রণালি এখনো মারাত্মকভাবে অবরুদ্ধ
যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করত। কিন্তু নিউইয়র্ক টাইমসের উদ্ধৃত জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ১৯টি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করেছে।
বৃহস্পতিবার কেপলার মাত্র ৯টি জাহাজকে এই প্রণালি অতিক্রম করতে দেখেছে।
মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের উপকূল থেকে দূরে, ওমানের কাছাকাছি জলসীমা দিয়ে কিছু জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে এই তৎপরতা ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
জুলাই ও আগস্ট মাসে ওমানের কাছাকাছি জলসীমায় অন্তত ২৩টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত ২২ জন নাবিক নিহত হয়েছেন।
এমনকি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে চলাচলে অভ্যস্ত জাহাজের মালিকেরাও হামলা বাড়তে থাকায় ওই এলাকায় জাহাজ পাঠাতে ক্রমেই অনিচ্ছুক হয়ে পড়ছেন।
রপ্তানির পরিসংখ্যানেও এর প্রভাব ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। উইন্ডওয়ার্ডের বিশ্লেষক মিশেল উইজ বকম্যানের তথ্য অনুযায়ী, ইরান ছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলোর অপরিশোধিত তেল রপ্তানি আগস্টে যুদ্ধ শুরুর আগের মাত্রার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে।
লোহিত সাগর হয়ে উঠেছিল বিকল্প পথ
সৌদি আরবের ঐতিহ্যগতভাবে কিছু অন্যান্য উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশের তুলনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে। দেশটি পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন দিয়ে নিজ ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে পশ্চিম দিকে অপরিশোধিত তেল পাঠিয়ে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগরের টার্মিনাল থেকে তা রপ্তানি করতে পারে।
২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম দফায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশাধিকার সীমিত করে দিলে এই বিকল্পটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সেখান থেকে জাহাজগুলো বাব আল-মান্দেব দিয়ে দক্ষিণ দিকে এশিয়ার দিকে যেতে পারে। আবার উত্তর দিকে সুয়েজ খাল ও ভূমধ্যসাগরের দিকেও যেতে পারে।
তেল কীভাবে বের হবে?
হরমুজ প্রণালি উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি রপ্তানির প্রচলিত পথ। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি জাহাজ এই পথ দিয়ে চলাচল করত। সেপ্টেম্বরে তা কমে গড়ে ১৯টিতে দাঁড়িয়েছে।
সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদি আরবের ভেতর দিয়ে লোহিত সাগরে তেল পৌঁছানো হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পাইপলাইনটি একাধিকবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং এশিয়ার দিকে যাওয়ার নৌপথের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করেছে। মোখা ও পেরিমে হুথিদের দখল এই গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সুয়েজ-ভূমধ্যসাগরীয় পথ পথ সৌদি আরবের তেল লোহিত সাগর থেকে বের করে আনার আরেকটি সুযোগ দেয়। তবে এশিয়ার ক্রেতাদের কাছে এ পথে তেল পাঠাতে বেশি সময় ও বেশি খরচ হয়।
হরমুজ প্রণালি মারাত্মকভাবে সীমিত, বাব আল-মান্দেব হুথিদের ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে এবং বিকল্প পথগুলোয় সময় ও খরচ দুটোই বাড়তে পারে। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
কিন্তু এখন সেই পথও ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে পড়েছে।
হুথিদের মোখা ও পেরিম দখলের ফলে বাব আল-মান্দেবের আশপাশে ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠীটি আরও শক্তিশালী অবস্থান পেয়েছে।
কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে লোহিত সাগর থেকে বাব আল-মান্দেব দিয়ে মাত্র দুটি সৌদি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করেছে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন একাধিকবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
আরেকটি পথ আছে—তবে খরচ বেশি
সৌদি আরবের হাতে এখনো আরেকটি বিকল্প রয়েছে।
লোহিত সাগরে পৌঁছানো তেল দক্ষিণ দিকে বাব আল-মান্দেব দিয়ে না পাঠিয়ে উত্তরে সুয়েজ খাল ও ভূমধ্যসাগরের দিকে পাঠানো যেতে পারে।
তবে সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় ক্রেতাদের অনেকেই এশিয়ায় অবস্থিত। ফলে এশিয়ার উদ্দেশে তেলবাহী জাহাজ পাঠাতে এই পথে যাত্রা করলে সময় ও খরচ দুটোই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
অর্থাৎ, যে ভৌগোলিক অবস্থান একসময় সৌদি আরবকে হরমুজ প্রণালির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প সুবিধা দিয়েছিল, এখন সেই বিকল্প পথের দুই প্রান্তেই জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
বাব আল-মান্দেব হুথিদের কার্যকর অবরোধ তৈরি হলে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রকে আরও সামরিক সম্পদ নিয়োজিত করতে হতে পারে। একই সময়ে মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল সচল রাখার কাজেও নিয়োজিত রয়েছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করতে হলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সুরক্ষায় ওয়াশিংটনের সক্ষমতা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
তেলের বাজারে চাপ বাড়ছে
বাড়তে থাকা ঝুঁকির প্রভাব জ্বালানি বাজারে ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে।
হুথিদের হামলা বাড়তে থাকায় শুক্রবার তেলের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারের ওপরে উঠে যায়। যুদ্ধ শুরুর আগের দামের তুলনায় যা প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।
এর প্রভাব অপরিশোধিত তেলের বাজার ছাড়িয়ে অন্য ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের গড় দাম প্রতি গ্যালন ৪ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। একই সময়ে ট্রাক পরিবহন, কৃষিকাজ ও শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ডিজেলের দামও প্রতি গ্যালন ৬ ডলারের ওপরে উঠেছে।
আশঙ্কার বিষয়টি এমন নয় যে মধ্যপ্রাচ্যের তেল হঠাৎ করে বিশ্ববাজারে পৌঁছানোর কোনো পথই পাবে না।
বরং বিষয়টি হলো, যে পথগুলো এখনো খোলা রয়েছে, সেগুলো ক্রমেই আরও বিপজ্জনক, আরও ব্যয়বহুল অথবা সামরিক সুরক্ষার ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
আর এর অর্থ হলো, কয়েক মাস ধরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহপথকে কেন্দ্র করে চলা এই সংঘাত এখন দ্বিতীয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে।
