দেশে আত্মহত্যায় শীর্ষে যশোর, প্রতিদিন গড়ে ৭ জন আত্মহত্যাচেষ্টা করেন
২৫ বছর বয়সী সাকিন হোসেন কাজ করতেন যশোরের স্থানীয় দৈনিক সুবর্ণভূমি ও স্যাটেলাইট গ্রিন টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি হিসেবে। তার প্রাণচাঞ্চল্যের আড়ালে যে এক বুক অভিমান আর মানসিক যন্ত্রণা লুকিয়ে ছিল, তা হয়তো টের পায়নি কেউ।
গত ১৬ জুলাই রাতে নিজ বাড়িতে ঘরের আড়ার সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে চিরতরে বিদায় নেন তরুণ উদীয়মান এই সাংবাদিক। মৃত্যুর আগে 'বিদায় পৃথিবী' লিখে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন তিনি।
সাকিন ছিলেন হতদরিদ্র পরিবারের একমাত্র উপাজনক্ষম ব্যক্তি। যে ছেলেকে ঘিরে বেঁচে থাকার স্বপ্ন বুনছিল পরিবার, সেই ছেলের এমন বিদায় বৃদ্ধ বাবা-মাকে ঠেলে দিয়েছে এক অথৈ সাগরে।
পরিবার জানিয়েছে, বেশ কিছুদিন ধরে পারিবারিক নানা সমস্যায় মানসিক সংকটে ভুগছিলেন ছাকিন। এর জের ধরে নিজ ঘরের ভেতর রশি দিয়ে গলায় ফাঁস দেন তিনি।
যশোরের গণমাধ্যম মুখ ছাকিন এখন শুধুই স্মৃতি হলেও ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল অভয়নগর উপজেলার ফুলেরগাতী গ্রামের ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরীর। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে এসএসসি পরীক্ষায় খারাপ ফলাফলের জেরে বাবা-মায়ের বকুনি খেয়ে কীটনাশক পান করে আত্মহত্যা করেন এই কিশোরী। দ্রুত তাকে অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করানো হয়। পাঁচ দিনের চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে উঠেন তিনি।
শুধু এই দুইজন নয়; যশোরের সিভিল সার্জন অফিসের তথ্যানুযায়ী, গত ছয় (২০২০-২০২৫) বছরে যশোরে ১৪ হাজার ৫১৬ জন নারী-পুরুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৩৪৪ জনের। প্রতিদিন গড়ে সাতজন আত্মহত্যার চেষ্টা করেন জেলাটিতে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যানুযায়ী এ সময়ে আত্মহত্যাচেষ্টাকারীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জেলায় আত্মহত্যার চেষ্টাকারীদের মধ্যে পুরুষ ৫ হাজার ৯০ এবং নারী ৯ হাজার ৬৬ জন। মৃতদের মধ্যে ১১৭ জন পুরুষ এবং ২২৭ জন নারী।
পারিবারিক কলহ, কর্মক্ষেত্রে হতাশাসহ নানা কারণে গলায় ফাঁস ও বিষপানে মৃত্যুর প্রবণতা বেড়েছে। সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এ প্রবণতায় ঝুঁকে পড়ছেন। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টিও হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শান্ত ও উর্বর জেলা হিসেবে পরিচিত যশোরেই যেন নীরবে ডালপালা মেলছে এক গভীর অশান্তি। সম্পর্কের বিষন্নতা আর সামাজিক চাপের মুখে ঘরে ঘরে বাড়ছে মানসিক রোগীর সংখ্যা, যার চূড়ান্ত পরিণতি গিয়ে ঠেকছে আত্মহত্যায়।
তবে আত্মহত্যার এই চিত্র প্রতিনিয়ত ঊর্ধ্বমুখী হলেও, তা প্রতিরোধে নেই কোনো স্থায়ী কার্যকর উদ্যোগ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছর 'বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস'- আসলে র্যালি আর আলোচনাসভার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে সব আয়োজন। বছরজুড়ে মানুষের জন্য মিলছে না কোনো মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কিংবা পেশাদার কাউন্সিলিংয়ের সুযোগ। দুটি উপজেলায় কাউন্সিলিং সেন্টার থাকলেও প্রচারণার অভাবে যান না জনসাধারণ।
যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হামিদুল হক বলেন, 'নৈরাজ্যমূলক আত্মহত্যা (অ্যানোমিক সুইসাইড) প্রবণতা বেড়েছে সমাজে। চাওয়া-পাওয়া ও প্রাপ্তির মধ্যে যখন বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়, তখন মানুষের মনের মধ্যে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়। মনে চাপ তৈরি হয়। এ নৈরাজ্য থেকে মানুষ আত্মহত্যা করে।'
তিনি বলেন, 'বস্তু ও অবস্তুগত চাওয়া-পাওয়ার পার্থক্যে মনে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। অনুভূতিগুলো মনের মধ্যে আটকে থাকছে। মানুষ যখন জীবনের অর্থ খুঁজে পায় না, তখন আত্মহত্যা করে। কারণ মানুষের জীবনের অর্থ নিহিত হয় পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। যখন মানুষের লক্ষ্য ও প্রাপ্তির মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়, তখন নিজের জীবনকে মূল্যহীন মনে করে, আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।'
তিনি আরও বেলন, 'এটি রোধে পারিবারিক, সামাজিক সচেতনা দরকার। শুধু দিবস ঘিরেই এই সমস্যা সমাধান হবে না।'
ফাঁসের ঘটনা বেশি
পুলিশের বিবরণীতে ফাঁস, বিষপান, গায়ে আগুন, রেললাইনে ঝাঁপ ও অন্যান্য—এই পাঁচভাবে আত্মহত্যার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা। এরপর ব্যবহৃত পদ্ধতি বিষপান।
মামলার হিসাবে দেখা যায়, গত ছয় বছরে জেলায় ১ হাজার ৪৫৪টি মামলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)-এর তথ্যমতে, ৬৪ জেলার ভেতর আত্মহত্যায় শীর্ষে যশোর। এরপর বেশি মামলা হয়েছে ঢাকা জেলায়, ১ হাজার ৪০২টি। তৃতীয় স্থানে আছে কুমিল্লা। এ জেলায় একই সময় মামলা হয়েছে ১ হাজার ২৮৮টি।
কাউন্সিলিং সেন্টার থাকলেও আগ্রহ কম
স্বাস্থ্যবিভাগ বলছে, আত্মহত্যার কারণ মূলত মানসিক বিপর্যয়। কিছু মানসিক রোগ আত্মহত্যার পেছনে কাজ করে।
মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দেশের দশটি জেলায় হাসপাতালগুলোতে বিশেষ কর্নার 'মনের বাড়ি' উদ্বোধন করা হয়। ২০২৪ সালে যশোরের মনিরামপুর ও চৌগাছা এই কর্নার চালু করা হলেও জনসাধারণের ভিতর সচেতনার অভাবে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা কম।
যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মাসুদ রানা বলেন, 'যশোর-ঝিনাইদহ অঞ্চলে পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি, আর্থিক টানাপোড়েন এবং চাওয়া-পাওয়ার ফারাক আত্মহত্যার প্রধান কারণ। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম আবেগপ্রবণ হওয়ায় প্রত্যাশা পূরণ না হলে অনেকে চরম সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি বলেন, 'ফসলের মৌসুমে কীটনাশক সহজলভ্য থাকায় গ্রামাঞ্চলে আত্মহত্যাপ্রবণতা বাড়ে। আর শহরে হারপিক ও ভিক্সলজাতীয় জিনিস খেয়ে আত্মহত্যাচেষ্টা বেশি হয়। তরুণ-তরুণীদের মধ্যেই এ প্রবণতা বেশি।'
সিভিল সার্জন বলেন, 'হাসপাতালগুলোতে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা কম হওয়ায় বিদ্যমান চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে উপজেলা পর্যায়ে মানসিক রোগীদের জন্য সেবা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, 'মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য আগে চালু থাকা টেলিমেডিসিন সেবা নানা কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তা পুনরায় চালুর বিষয়ে ভাবছে সরকার।'
