ফিলিস্তিনের পাঠ্যবই থেকে ‘ফিলিস্তিন’ শব্দ মুছে ফেলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন টনি ব্লেয়ার, চেয়েছিলেন ইহুদিদের দেওয়া নাম ব্যবহার করতে
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বোর্ড অভ পিসের পক্ষ থেকে সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) কাছে পাঠানো হয়েছিল। তার উদ্দেশ্য ছিল স্কুলের পাঠ্যবইগুলোতে থাকা 'ফিলিস্তিন' শব্দ বাদ দিয়ে ইহুদিদের দেওয়া নাম 'সামারিয়া' ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া।
১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের সাবেক রাষ্ট্রদূত জেরেমি গ্রিনস্টক মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ব্লেয়ার ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলেন। বলেছিলেন, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ যদি গাজায় যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে বোর্ড অভ পিসের কাছে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে চায়, তবে পাঠ্যবই থেকে 'ফিলিস্তিন' শব্দটি মুছে ফেলতে হবে।
ডেভিড হার্স্ট পডকাস্টে দেওয়া বিস্তৃত সাক্ষাৎকারে গ্রিনস্টক বলেন, ব্লেয়ারের এই দাবি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস প্রত্যাখ্যান করেন।
গ্রিনস্টক আরও বলেন, বোর্ড অভ পিসের হয়ে গাজার যুদ্ধোত্তর ব্যবস্থাপনার তদারকির নতুন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তার সাবেক বস ব্লেয়ার বেশ 'কঠিন পরিস্থিতির' সম্মুখীন হচ্ছেন।
গ্রিনস্টক বলেন, 'যত দূর জানতে পেরেছি, বোর্ড অভ পিস সম্প্রতি তাকে রামাল্লায় গিয়ে ফিলিস্তিনি শিক্ষাক্রম থেকে "ফিলিস্তিন" শব্দটি বাদ দেওয়ার কথা বলতে বলেছিল। ৭ অক্টোবরের পর থেকে শুরু হওয়া বর্তমান সংঘাতের অবসানে তারা যদি ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর সক্ষমতা রাখে বলে বোর্ড অভ পিসের কাছে বিবেচিত হতে চায়, তবে এই শর্ত দেওয়া হয়েছিল।" মন্ত্রী পর্যায়ের একটি সূত্র থেকে এই তথ্য পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
যুক্তরাজ্যের সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, 'প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি এমন কোনো কাজ করবেন না।'
তবে ব্লেয়ারের একজন মুখপাত্র সাবেক এই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এমন অনুরোধ করার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, 'এটি সত্য নয়; সম্পূর্ণ বানোয়াট কথা।'
আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কাশনার ও গাজার জন্য নিযুক্ত উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভকে নিয়ে ইসরায়েল সফর করেছিলেন ব্লেয়ার।
এই তিন নেতা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। তবে নেতানিয়াহু গাজার জন্য প্রস্তাবিত রোডম্যাপ আগেই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এরপর তারা কায়রোতে একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট গ্রুপের পাশাপাশি হামাসের সদস্যদের সঙ্গেও বৈঠক করেন। এই টেকনোক্র্যাট গ্রুপেরই গাজার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথা রয়েছে।
সাক্ষাৎকারে গ্রিনস্টক বলেন, ইরাকে আগ্রাসনের আগে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে জাতিসংঘের অনুমোদন নিতে রাজি করিয়েছিলেন ব্লেয়ারই। গাজার পুনর্গঠন তদারকির জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতিষ্ঠিত বোর্ড অভ পিসে ব্লেয়ারের বর্তমান ভূমিকারও কঠোর সমালোচনা করেন তিনি।
গ্রিনস্টক বলেন, 'সরকার ছাড়ার পর ইরাক ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে অতীত রেকর্ডের কারণে তাকে পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবেই দেখা হবে। তাই আমার মনে হয় তাকে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে, এবং তিনি বর্তমানে তা হচ্ছেনও।'
২০০৪ সালের মার্চ মাসে সরকারি চাকরি ছেড়ে দেওয়া গ্রিনস্টক বোর্ড অভ পিসকে 'স্বেচ্ছাচারী কমিটি' বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, 'ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ভবিষ্যতের ব্যাপারে যেসব কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তার ভার বহন করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী কাঠামো বোর্ড অভ পিস নয় বলেই আমি মনে করি।'
গত বছরের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধে ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তথাকথিত এই বোর্ড অভ পিস গঠন করেন।
হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী তাদের নিরস্ত্রীকরণের একটি পরিকল্পনায় সম্মত হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েল সেনা প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল বারবার অবরুদ্ধ এই ছিটমহলটিতে বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
বিশ্বব্যাপী চলমান কর্মসূচির অংশ হিসেবে ইসরায়েল ও তার সমর্থকরা ইতিহাসের বই ও জাদুঘর থেকে 'ফিলিস্তিন' শব্দ মুছে ফেলার জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি পূর্ব জেরুজালেমের রাষ্ট্র পরিচালিত স্কুলগুলোতে ৪৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীর ওপর ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ তাদের নিজেদের শিক্ষাক্রম চাপিয়ে দেওয়া শুরু করে।
এছাড়া অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে পরামর্শের জন্য একটি সংশোধিত শিক্ষাক্রম গোপনে বিলি করা হচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে।
চলতি বছরের শুরুতে ইউএনআরডব্লিউএ লেবানন তাদের পাঠ্যক্রম নিয়ে এক সুসংগঠিত প্রচারণার মুখে পড়ে। ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘের এই সংস্থাকে ইসরায়েল নিষিদ্ধ করেছে।
ইউএনআরডব্লিউএ লেবানন তাদের ষষ্ঠ শ্রেণির আঞ্চলিক ভূগোলের কিছু মানচিত্রে 'ফিলিস্তিন' শব্দের পরিবর্তে 'পশ্চিম তীর' ও 'গাজা উপত্যকা' শব্দ ব্যবহার করেছে। এই পদক্ষেপের কারণে সেখানে ধর্মঘট ও বিক্ষোভের হয়।
ফ্রান্সের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাথরিন কলোনা-র নেতৃত্বাধীন স্বাধীন পর্যালোচনা দল ইউএনআরডব্লিউএ লেবাননের 'নিরপেক্ষতা আরও জোরদার করতে' ৫০টি সুপারিশ দিয়েছিল। এসবের মধ্যেই পাঠ্যবইয়ে এই পরিবর্তনের ঘটনাটি ঘটল।
এদিকে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের প্রদর্শনী থেকে 'ফিলিস্তিন', 'ফিলিস্তিনি' ও''ইসরায়েলি দখলদারিত্ব' শব্দগুলো মুছে ফেলার ঘটনার তদন্ত দাবি করেছে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন দলের আইনপ্রণেতাদের (এমপি) নিয়ে গঠিত একটি ক্রস-পার্টি গ্রুপ।
মিডল ইস্ট আইয়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ইসরায়েলপন্থি কর্মীদের লবিংয়ের সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবেই মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ এই শব্দগুলো সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়।
গ্রিনস্টক বলেন, তিনি নিশ্চিত, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর নেতানিয়াহুর মূল লক্ষ্য হলো তার বাবা বেনজিয়ন নেতানিয়াহুকে দেওয়া একটি প্রতিশ্রুতি পূরণ করা। ইহুদি ইতিহাসের পণ্ডিত বেনজিয়নকে নেতানিয়াহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি পশ্চিম তীরকে 'ইসরায়েলি সার্বভৌমত্বের অধীনে' ফিরিয়ে আনবেন।
