৫ বছরের হিন্দ রজবকে বহনকারী গাড়িতে গুলি চালানোর কথা স্বীকার ইসরায়েলি বাহিনীর, তদন্ত শুরু
গাজায় পাঁচ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রজবকে বহনকারী গাড়িতে ইসরায়েলি সেনারা গুলি চালিয়েছিল—প্রথমবারের মতো তা স্বীকার করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। একই সঙ্গে ঘটনাটি নিয়ে ফৌজদারি তদন্ত শুরুর কথা জানিয়েছে তারা।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে হিন্দ রজব নিহত হওয়ার পর এত দিন ওই ঘটনায় নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে আসছিল ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। তার কয়েক মাস পর এক প্রাথমিক তদন্তের বরাত দিয়ে তারা দাবি করে, তাদের বাহিনী ওই গাড়ির কাছাকাছি উপস্থিত ছিল না।
সামরিক বাহিনীর অপরাধ তদন্ত শুরু করা বহুল আলোচিত দুটি ঘটনার একটি এটি। তবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, যুদ্ধের শুরুর দিকে ত্রাণকর্মীদের প্রাণহানির অন্য তিন হামলার বিষয়ে তারা কোনো তদন্ত করবে না।
জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত রিয়াদ মানসুর ইসরায়েলের আগের তদন্তগুলোকে 'স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য নয়' বলে সমালোচনা করেছেন। সিএনএনের জিম সিউটোর সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, এই তদন্তও ভিন্ন কিছু হবে বলে তিনি মনে করেন না। তার মতে, বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত হলে হিন্দ রজব হত্যার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হবে।
উত্তর গাজায় একটি গাড়িতে করে পরিবারের সাত সদস্যের সঙ্গে যাচ্ছিল হিন্দ রজব। এ সময় গাড়িটিতে ইসরায়েলি বাহিনী গুলি চালায়। প্রথম দফার গুলিতে হিন্দ বেঁচে যায়। এরপর কয়েক ঘণ্টা ধরে ফোনে ফিলিস্তিনি প্যারামেডিকদের কাছে তাকে উদ্ধারের জন্য আকুতি জানায় সে। পরে তাকে উদ্ধারে পাঠানো একটি অ্যাম্বুলেন্সও গুলির মুখে পড়ে।
এর ১২ দিন পর গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া একটি গাড়ির ভেতর হিন্দের মরদেহ পাওয়া যায়।
আইডিএফ এক বিবৃতিতে বলেছে, 'তদন্তের ফলাফল থেকে দেখা গেছে, আইডিএফের সেনারা তাদের দিকে এগিয়ে আসা একটি গাড়িতে গুলি চালিয়েছিল।'
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, 'তদন্তের ফলাফল পর্যালোচনা এবং ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্টের অ্যাম্বুলেন্স চলাচলের সমন্বয়ে স্পষ্ট কিছু ব্যর্থতার কারণে সামরিক পুলিশের ফৌজদারি তদন্ত বিভাগকে ঘটনাটি নিয়ে ফৌজদারি তদন্ত শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।'
হিন্দ রজব ফাউন্ডেশন এক বিবৃতিতে বলেছে, ইসরায়েলি বাহিনীর তদন্তগুলো 'বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যথাযথ তদন্ত, বিচার বা শাস্তি ছাড়াই শেষ হয়। অল্প কিছু ঘটনায় সেনাদের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হলেও তাদের দেওয়া শাস্তি প্রায়ই খুবই লঘু হয় অথবা প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।'
প্যারামেডিকদের সঙ্গে হিন্দ রজবের ফোনালাপের রেকর্ডিং আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তার হত্যার পাশাপাশি গাজায় নিহত হাজারো শিশুর হত্যার ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি আরও জোরালো হয়।
ঘটনাটি নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র 'দ্য ভয়েস অব হিন্দ রজব' ২০২৬ সালে অস্কারের জন্য মনোনয়ন পায়।
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ নিয়ে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) যে প্রথম সামগ্রিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তার অংশ হিসেবে হিন্দ রজবের মৃত্যুর ঘটনাটিও তদন্ত করা হয়েছে।
আইডিএফের চিফ অব স্টাফের 'ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং অ্যান্ড অ্যাসেসমেন্ট মেকানিজম' প্রায় ১৫০টি ঘটনার তদন্ত করেছে। এসব ঘটনায় অপরাধ তদন্ত শুরু করা হবে কি না, সে সিদ্ধান্তের জন্য প্রতিবেদনগুলো সামরিক বাহিনীর শীর্ষ আইনজীবীর কাছে পাঠানো হয়। বুধবার এসব ঘটনার মধ্যে পাঁচটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। বাকি ঘটনাগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত এখনো অপেক্ষমাণ।
আইডিএফ জানিয়েছে, ২০২৫ সালের মার্চে অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি সেবার গাড়িতে থাকা ১৫ জন প্যারামেডিক ও উদ্ধারকর্মী নিহত হওয়ার ঘটনাতেও তারা অপরাধ তদন্ত শুরু করেছে।
শুরুতে আইডিএফ দাবি করেছিল, গাড়িগুলো কোনো হেডলাইট বা জরুরি সংকেত ছাড়াই সন্দেহজনকভাবে চলছিল। পরে জরুরি বাতি জ্বালিয়ে গাড়িগুলো চলার একটি ভিডিও প্রকাশিত হলে ওই দাবি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। নিহত উদ্ধারকর্মীদের তাদের জরুরি সেবার গাড়িসহ একটি গণকবরে দাফন করা হয়েছিল।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী পরে ওই ঘটনায় পেশাগত ব্যর্থতার কথা স্বীকার করলেও কোনো নৈতিক বিচ্যুতি হয়নি বলে দাবি করে। তবে বুধবারের বিবৃতিতে আইডিএফ বলেছে, 'ঘটনার সময় হওয়া গুলিবর্ষণ অপরাধের যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ তৈরি করে।'
