ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনা নাকচ, হামাস নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজা ছাড়বে না ইসরায়েল
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু রোববার এক বক্তব্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা নিয়ে ১৫ দফা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, হামাস অস্ত্র সমর্পণ না করা পর্যন্ত গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে না।
আগামী ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার মরিয়া চেষ্টা করছেন নেতানিয়াহু। এ কারণে তিনি এখন নির্বাচনি প্রচারের প্রস্তুতিতে রয়েছেন। তবে নেতানিয়াহু এখন মোটেও সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। একদিকে গাজায় ছাড় দেওয়ার কারণে ক্ষুব্ধ কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রীদের, অন্যদিকে তার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক মিত্র ট্রাম্পের- এই দুই পক্ষের চাপের মুখে রয়েছেন তিনি।
ট্রাম্প গাজার সংঘাতের অবসানের পথে অগ্রগতি চান এবং এ জন্য নতুন ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনা দিয়েছেন।
এর আগে গত সোমবার গাজায় যুদ্ধবিরতি তদারকির দায়িত্বে থাকা ট্রাম্পের 'বোর্ড অব পিস'-এর গাজা বিষয়ক দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন। ওইদিন থেকেই গাজায় ইসরায়েলের হামলার তীব্রতা কমে এসেছে।
ইসরায়েলের অবস্থান সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র জানিয়েছে, গাজায় ইসরায়েলি বাহিনী শুধু তাৎক্ষণিক হুমকি হিসেবে বিবেচিত বিষয়গুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে এবং প্রায় প্রতিদিনের ভিত্তিতে যে লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড চালিয়ে আসছিল, তা আর করবে না—এ বিষয়ে তারা সম্মত হয়েছে।
এর মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের চাপের কারণে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা কার্যত বন্ধ রয়েছে।
ট্রাম্পের পরিকল্পনা নিয়ে প্রথমবারের মতো সরাসরি মন্তব্য করতে নেতানিয়াহু বলেন, 'আমি এ বিষয়ে একদম স্পষ্ট হতে চাই: ইসরায়েল এই ১৫ দফার দলিল প্রত্যাখ্যান করছে।'
তিনি বলেন, 'যতক্ষণ না হামাস প্রকৃতপক্ষে নিরস্ত্র হচ্ছে, ততক্ষণ ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কোনোভাবেই প্রত্যাহার করা হবে না। আমাদের সামরিক বাহিনী ও নাগরিকদের লক্ষ্য করে আসা যেকোনো হুমকি নস্যাৎ করার কাজ অব্যাহত থাকবে।'
নেতানিয়াহু আরও বলেন, 'আমরা এখন আমেরিকানদের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছি। তাদের কিছু আইডিয়া আছে; এর মধ্যে কিছু আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য, কিছু গ্রহণযোগ্য নয়। আর সেই অগ্রহণযোগ্য বিষয়গুলোর বিপরীতে কীভাবে শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে হয়, তা আমাদের জানা আছে।'
নেতানিয়াহুর বলেন, 'যতদিন আমি প্রধানমন্ত্রী আছি, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হতে দেওয়া হবে না—গাজাতেও নয়, পশ্চিম তীরেও নয়।'
ট্রাম্পের পরিকল্পনা নিয়ে ইসরায়েল ও হামাসের মতবিরোধ
গত মাসে ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, যুদ্ধ বন্ধে তার পরিকল্পনায় অগ্রগতি হয়েছে। ইসরায়েল ও হামাস উভয়েই ওই পরিকল্পনায় সম্মত হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছিলেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, হামাস অস্ত্র সমর্পণ করার সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার করবে এবং একটি নতুন ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গাজা উপত্যকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
তবে দ্রুতই এতে জটিলতা দেখা দিয়েছে। ইসরায়েল বলেছে, হামাস অস্ত্র সমর্পণ করার আগে গাজায় থাকা ইসরায়েলি সেনাদের প্রত্যাহার করা হবে না। অন্যদিকে হামাস বলেছে, তাদের অস্ত্র হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু করার আগেই ইসরায়েলকে হামলা বন্ধ করতে হবে।
মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকে নেতানিয়াহু বলেন, 'ইসরায়েল ১৫ দফা নথিটি প্রত্যাখান করেছে।'
তিনি বলেন, 'হামাসকে নিরস্ত্র না করা পর্যন্ত কোনোভাবে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করা হবে না। এর অর্থ ভারী অস্ত্র, হালকা অস্ত্র—সব ধরনের অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'প্রতীকী নিরস্ত্রীকরণের কথা নয়, আমরা প্রকৃত নিরস্ত্রীকরণের কথা বলছি।'
তিনি জানান, এই পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েল আলোচনা করছে।
এর আগে, গত মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টেও নেতানিয়াহু একই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন।
নেতানিয়াহু বলেন, 'তারা (যুক্তরাষ্ট্র) কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছে। এর কিছু ইসরায়েল মেনে নিতে রাজি, আবার কিছু ইসরায়েল মেনে নিতে রাজি না।'
তবে তিনি বিস্তারিত জানাননি।
অন্যদিকে হামাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বাসেম নাঈম রোববার রয়টার্সকে বলেন, ১০ দিন আগে কায়রোতে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যে রোডম্যাপ নিয়ে আমরা একমত হয়েছিলাম, তার প্রতি হামাস এখনও অঙ্গীকারবদ্ধ।
তিনি বলেন, আমরা আশা করি মধ্যস্থতাকারী ও যুক্তরাষ্ট্রের গ্যারান্টার নেতানিয়াহু ও তার সরকারকে রোডম্যাপ মেনে চলার জন্য চাপ দেবেন। যাতে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও নির্বাচনি স্বার্থে তারা চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত না করেন এবং এর মাধ্যমে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে না ফেলেন।
এদিকে, কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ নেতানিয়াহুর প্রশংসা করেছেন।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, 'আমরা একটি মূল লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধে গিয়েছিলাম—তা হলো হামাসকে ধ্বংস করা। গাজা উপত্যকা থেকে সেনাবাহিনী এক মিলিমিটারও পিছু হটতে পারে না। হামাস ও গাজা উপত্যকাকে পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং হামাসকে নিরস্ত্র করার আগে গাজা উপত্যকায় পুনর্গঠনের কোনো প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে না।'
ট্রাম্প গত মাসে বলেছিলেন, ইরানের সমর্থনপুষ্ট হামাস অস্ত্র সমর্পণে সম্মত হয়েছে।
গাজায় প্রায় দুই দশক ধরে শাসন করা হামাস ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালানোর মধ্যদিয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী এ গাজা যুদ্ধ শুরু হয়।
অন্যদিকে, হামাস 'নিরস্ত্রীকরণ' শব্দটি এড়িয়ে চলছে। তারা বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট ফিলিস্তিনি কারিগরি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি প্রশাসনের কাছে অস্ত্র হস্তান্তরে তারা সম্মত হয়েছে। ওই প্রশাসন ট্রাম্পের 'বোর্ড অব পিস'-এর তত্ত্বাবধানে গাজার কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
হামাস বলেছে, গাজাবাসীকে আবার কোনো যুদ্ধের মুখে পড়া ঠেকাতেই তারা এই পরিকল্পনায় রাজি হয়েছে।
তবে তারা জানিয়েছে, চুক্তি বাস্তবায়ন নির্ভর করবে ইসরায়েল আগে তার নিজের প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করবে কি না তার ওপর। এর মধ্যে সেনা প্রত্যাহারও রয়েছে।
যুদ্ধ বন্ধে গত অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় চুক্তি হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল বলে আসছিল, ২০২৩ সালের অক্টোবরের হামলায় অংশ নেওয়া প্রতিটি যোদ্ধাকে হত্যা করার পরই তারা লক্ষ্যভিত্তিক হামলা বন্ধ করবে। সোমবারের আগে পর্যন্ত তারা এ ধরনের হামলা চালিয়ে আসছিল।
গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরায়েলের হামলায় ১ হাজার ২৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক।
হামাস অবশ্য তাদের কতজন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন, সে সংখ্যা প্রকাশ করেনি।
ইসরায়েলি সেনারা গাজার দুই-তৃতীয়াংশ দখল করে রেখেছে এবং সেখান থেকে মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে। ফলে ২০ লাখের বেশি বাসিন্দার প্রায় সবাই হামাস নিয়ন্ত্রণাধীন উপকূলীয় একটি ছোট ভূখণ্ডে আটকা পড়েছেন। তাদের বেশির ভাগই অস্থায়ী তাঁবু বা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে বসবাস করছেন।
