মাহমুদ দারবিশ ও তামার বেন অমি: এক ফিলিস্তিনি কবি আর ইসরায়েলি নৃত্যশিল্পীর অসম্ভব প্রেমের উপাখ্যান
১৯৬০-এর দশকের শুরু। ইসরায়েলের হাইফা শহর। তরুণ ফিলিস্তিনি কবি মাহমুদ দারবিশ প্রেমে পড়লেন এক ইহুদি ইসরায়েলি নৃত্যশিল্পীর। নাম তার তামার বেন অমি। তাদের সেই প্রেম ছিল তীব্র, কিন্তু ক্ষণস্থায়ী। এই নিষিদ্ধ প্রেমের নির্যাস থেকেই কবি রচনা করেন এক মর্মস্পর্শী কবিতা—'রিটা ও রাইফেল'। গোটা আরব বিশ্ব আজও গুনগুন করে গায় সেই গান।
'রিটা আর আমার চোখের মাঝে/ দাঁড়িয়ে আছে একটি রাইফেল/ আর যে রিটাকে চেনে/ সে হাঁটু গেড়ে বসে প্রার্থনা করে/ মধুরঙা চোখের দেবতার কাছে।' আরব দুনিয়ায় এমন কে আছে, যার ঠোঁটে এই লাইনগুলো উচ্চারিত হয়নি? কায়রো থেকে আম্মান, দামেস্ক থেকে বৈরুত—১৯৭০-এর দশক থেকে লেবানিজ গায়ক মার্সেল খলিফের সঙ্গে গলা মেলায়নি এমন কেউ কি আছে? উদ, পারকাশন আর চেলোর মূর্ছনায় 'রিটা ওয়া আল-বুন্দুকিয়া' (রিটা ও রাইফেল) গানটি নিয়ে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন বিশ্বজুড়ে। প্রেয়সীর এই বেদনাবিধুর স্মৃতি কাকে নাড়া দেয়নি?
'আর দুই বছর আমি রিটার মাঝে হারিয়ে ছিলাম/ দুই বছর সে নিদ্রিতা ছিল আমার বাহুডোরে (...)/ আমাদের মাঝে এখন লাখো চড়ুই আর স্মৃতির ভিড়/ আর রাইফেলের গুলিতে ঝাঁঝরা হওয়া অসংখ্য সাক্ষাতের মুহূর্ত।'
বিটলসের 'মিশেল' বা সার্জ গেইনসবার্গের 'এলিসা'র মতোই রিটা এক জনপ্রিয় গানের নায়িকা। তবে এর চেয়েও বড় কথা, তিনি একটি গজলের নায়িকা। মধ্যযুগ থেকে যে ধ্রুপদী প্রেমের কবিতাগুলো আরবি সাহিত্যকে আলোকিত করে রেখেছে, তাকেই বলা হয় গজল। 'রিটা ও রাইফেল' মূলত একটি আধুনিক গজল। ১৯৬৭ সালে ফিলিস্তিনি কবি মাহমুদ দারবিশ (১৯৪১-২০০৮) কবিতাটি লেখার পর থেকেই তা আরব বিশ্বের কল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।
প্রখ্যাত মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং 'কম্পাস' উপন্যাসের জন্য ২০১৫ সালে প্রি গঁকুর বিজয়ী ম্যাথিয়াস এনার্ড বলেছেন, 'যে আরব দেশেই যান না কেন, এই কবিতা সবার জানা। দুই প্রেমিকের মাঝে রাইফেলের দেয়াল তুলে দেওয়ার এই রূপক এবং লেখার উপন্যাসসুলভ শক্তিমত্তা আমাকে মুগ্ধ করেছে।' সেই শক্তির আঁচ পাওয়া যায় খালিফের গায়কিতে, এমনকি আরব বিশ্বজুড়ে দারবিশের নিজের কণ্ঠে আবৃত্তির রেকর্ডিংয়েও। ফিলিস্তিনি ইতিহাসবিদ ইলিয়াস সানবারের ভাষায়, এ অঞ্চলে 'কবিতা কেবল সাহিত্যের আড্ডাতেই সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের মাঝেও।'
দারবিশের বন্ধু এবং অনুবাদক সানবার স্মৃতিচারণ করেন, বিভিন্ন স্টেডিয়ামে হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসত কবির কবিতা শুনতে। সুদানে তাকে একনজর দেখার জন্য মানুষ গাছে চড়ত, আর আলজেরিয়ায় উন্মত্ত জনতাকে সামলাতে হিমশিম খেত নিরাপত্তারক্ষীরা।
দারবিশ প্রায় ২০টি আরবি কাব্যগ্রন্থ লিখেছেন। এগুলোকে তিনি আখ্যা দিয়েছিলেন 'আটলান্টিক মহাসাগর থেকে ইয়েমেন পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল পরিচয়পত্র' হিসেবে। সানবারের মতে, 'তিনি একজন মহান আরব কবি, যার ট্র্যাজেডি আর ল্যান্ডস্কেপজুড়ে শুধুই ফিলিস্তিন।' সেখানেই জন্ম দারবিশের। জীবনের প্রায় ৩০টি বছর কাটিয়েছেন নির্বাসনে। ছিলেন প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) সক্রিয় সদস্য। শেকড়হীনতার যন্ত্রণা নিয়ে লিখে গেছেন অবিরত।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আক্রমণের জবাবে গাজায় শুরু হয় ইসরায়েলের নির্বিচার, ভয়াবহ হামলা। পশ্চিম তীরেও ইসরায়েলিরা শুরু করে সহিংসতা। এরপর থেকেই ফিলিস্তিনি শিল্পকর্মের প্রতি নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে বিশ্বে। সাংস্কৃতিক মহলের নজরে থাকা ফিলিস্তিনি লেখক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও ভিজ্যুয়াল আর্টিস্টদের ভিড়ে 'রিটা ও রাইফেল'-এর স্রষ্টার অবস্থান প্রথম সারিতে।
আরবি সাহিত্যের প্রকাশক—একইসঙ্গে দারবিশের প্রকাশক—ফারুক মারদাম-বে বলেন, 'সমসাময়িক কবিদের মধ্যে তার বই-ই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। উনিশ শতকে ভিক্টর হুগোর যে আভা ছিল, মহান জনদরদি কবি হিসেবে দারবিশেরও ঠিক সেই আভা রয়েছে।' সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সংবাদমাধ্যম—সর্বত্রই আজও তার কথা ব্যাপকভাবে উদ্ধৃত হয়। তবে সানবার একটি বিষয়ে জোর দিয়েছেন: 'কেউ কেউ তার কাজকে নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শের ছাঁচে ফেলতে চান। কিন্তু তার কবিতা কোনো রাজনৈতিক ইশতেহার নয়। এটি এক প্রথাগত এবং সর্বজনীন অনুসন্ধান।'
'রিটা ও রাইফেল'-এর বেলায়ও এমনটাই ঘটেছিল। ১৯৯৬ সালে এক সাক্ষাৎকারে দারবিশ বলেছিলেন, 'যখনই আমি কোনো প্রেমের কবিতা লিখি, মানুষ বলে এটা নাকি দেশের জন্য লেখা। ওই "রিটা" নাকি আসলে ফিলিস্তিন।' সাক্ষাৎকারটি ২০০২ সালে 'লা প্যালেস্টাইন কোমে মেটাফোর' সংকলনে প্রকাশিত হয়। দারবিশ আরও বলেন, 'রিটা একটা ছদ্মনাম ঠিকই, কিন্তু এটা বাস্তবের এক রক্তমাংসের নারীর নাম। (...) রিটা ছিল একজন ইসরায়েলি ইহুদি।'
রিটা ছিলেন ইসরায়েলি। তার আসল নাম তামার বেন অমি। দারবিশের মৃত্যুর ১৮ বছর পর, ২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বার্লিনে ৭৯ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। তিনিই ছিলেন দারবিশের প্রথম প্রেম। ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে দুজনেই সবে কৈশোর পেরিয়েছেন। তারা ভেবেছিলেন, একে অপরকে নির্দ্বিধায় ভালোবাসতে পারবেন। কিন্তু যুদ্ধ সবকিছুতেই বিষ ঢেলে দেয়। তাদের মাঝখানে এসে দাঁড়াল 'একটি রাইফেল'। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৫ বছর পর ইহুদি ও আরবদের মধ্যে শান্তি তখন এক অসম্ভব ব্যাপার। এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এক পক্ষের জন্য নিয়ে এসেছিল দীর্ঘপ্রতীক্ষিত আনন্দ, অপরপক্ষের জন্য চরম বিপর্যয়।
তাদের প্রেম দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। দারবিশ সেই প্রেমকে রূপ দিয়েছিলেন কবিতায়। পরে কয়েক দশকে তার লেখায় 'রিটা' বারবার ফিরে এসেছে এক অসম্ভব প্রেমের প্রতীক হয়ে—সেই আরাধ্যা তরুণী, যার সাথে তিনি অনুভব করেছিলেন 'দ্য সং অভ সংস'। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বই 'মেমরি ফর ফরগেটফুলনেস'-এ এই কথাই লিখেছিলেন কবি। ১৯৯৬ সালের আরেকটি সাক্ষাৎকারে তিরিশ বছর আগে লেখা সেই কবিতা নিয়ে দারবিশ ভেবেছিলেন এভাবে: 'জাতীয়তার পার্থক্য যখন দুটো শরীরকে ভালোবাসতে বা প্রেমের গল্পটা এগিয়ে নিয়ে যেতে বাধা দেয় , এটি যদি সেই সংঘাতের বহিঃপ্রকাশ হয়?'
কয়েক বছর একসাথে চলার পর এই প্রেমিক-প্রেমিকার পথ আলাদা হয়ে গেল। মাঝেমধ্যে একে অপরকে ছুঁয়ে গেলেও তাদের আর কখনোই সত্যিকারের পুনর্মিলন হয়নি। পরে দশকগুলোতে দারবিশের রচনায় অসম্ভব প্রেমের প্রতীক হিসেবে 'রিটা' বারবার ফিরে এসেছে।
আরব-ইসরায়েলি চলচ্চিত্র নির্মাতা ইবতিসাম মারা'আনা ২০১৪ সালে পরিচালনা করেন 'রাইট ডাউন, আই অ্যাম অ্যান আরব' নামক তথ্যচিত্র। দারবিশের অন্যতম বিখ্যাত কবিতা 'আইডেন্টিটি কার্ড'-এর একটি লাইন থেকে এই নাম নেওয়া হয়েছে। এ তথ্যচিত্রে বেন অমি ফিরে তাকিয়েছেন তার ফেলে আসা যৌবনের দিকে, দেখিয়েছেন পুরনো প্রেমের চিঠি। নির্মাতা জানান, 'কথাগুলো বের হতে সময় নিচ্ছিল। মাঝে ছিল দীর্ঘ নীরবতা। কিন্তু নিজের গল্পটা তাঁকে বলতেই হতো।' আর দারবিশ সেই গল্পটা বলেছিলেন তার লেখনিতে। চিরকাল পরাজিত শহর 'ট্রয়ের কবি' হওয়াটাই বেছে নিয়েছিলেন তিনি, 'কারণ ট্রয় কখনো নিজের গল্প বলেনি।'
'হৃদয়ে আছে, কিন্তু জীবনে নেই'
তাদের দেখা হয়েছিল ইসরায়েলের হাইফায়। ১৯৬০ সালে কবি সেখানে থিতু হন। কৈশোর পেরোতেই নির্বাসনের স্বাদ নিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। ১৯৪১ সালে উত্তরের একর শহরের কাছে আল-বিরওয়া গ্রামে দারবিশের জন্ম। ১৯৪৮ সালে সেখান থেকে তার পরিবারকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। লেবাননে আশ্রয় নেওয়ার পর গোপনে তারা নবগঠিত ইসরায়েল রাষ্ট্রে ফিরে আসেন। কিন্তু এসে দেখেন, গোটা গ্রাম মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। হাইফায় পা রাখার মধ্য দিয়েই মূলত তার প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের সূচনা হয়েছিল। তেল আবিবের ঝাঁ-চকচকে নতুন ভবনগুলোতে তখন ভবিষ্যতের ইসরায়েল রূপ নিচ্ছে। তার থেকে বহু দূরে, উত্তরের এই বন্দরনগরী ছিল বেশ প্রাচীন। আরব, ইহুদি, আর্মেনীয়, লেবানিজ, দ্রুজ—সব মিলিয়ে প্রাণবন্ত, কোলাহলমুখর শহর।
তরুণ দারবিশ তখন কবিতা লিখতেন। মঞ্চে তার অভিষেক হয়ে গেছে। তুখোড় বাগ্মীর মতোই তিনি নিজের লেখাগুলো দর্শকদের সামনে তুলে ধরতেন। সাহিত্য পত্রিকাগুলোতে লেখা ছাপা হচ্ছিল। পাশাপাশি লিখতেন রাজনীতি নিয়েও। আর এই 'বিপ্লবী' কথা বলার অপরাধেই ১৯৬১ থেকে ১৯৬৭ সালের মধ্যে তাকে পাঁচবার কারাবরণ করতে হয়। ইসরায়েলি কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। তাদের আয়োজিত নানা সমাবেশে সব সম্প্রদায়ের মানুষ এক ছাতার নিচে জড়ো হতো। ১৯৬৩ সালের একদিন হাইফার অনতিদূরের আরব ও দ্রুজ অধ্যুষিত শহর শেফা আমরে এমন এক অনুষ্ঠানে যোগ দেন দারবিশ। মঞ্চে উঠে বেশ কয়েকটি কবিতা আবৃত্তি করলেন তিনি। তারপর জায়গা ছেড়ে দিলেন একদল নৃত্যশিল্পীর জন্য। সেই দলেই ছিলেন এক তরুণী, যার দিক থেকে কবি আর চোখ ফেরাতে পারেননি।
দারবিশের বয়স তখন ২২, বেন অমির ১৬। হাইফাতেই বেড়ে ওঠা তার। তিনি ছিলেন একজন সাবরা—১৯৪৮ সালের আগে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটভুক্ত ফিলিস্তিনে জন্ম নেওয়া ইহুদিদের ডাকা হতো এই নামে। হলোকাস্টের আগেই তার বাবা-মা পোল্যান্ড ও রাশিয়া থেকে এসে সেখানে বসতি গড়েছিলেন। বেন অমির পরিবার ছিল কমিউনিস্ট মতাদর্শের। দারবিশ ও বেন অমির বেশ কয়েকবার দেখা হলো, প্রেমে পড়লেন দুজনে।
দারবিশ তাকে দীর্ঘ চিঠি লিখতেন। সব চিঠিই লেখা হতো হিব্রুতে। ভাষাটিতে তার দারুণ দখল ছিল; এই ভাষাকে কবি কখনোই অস্বীকার করেননি। তিনি বলতেন, যে পুলিশ কর্মকর্তা তাকে গ্রেপ্তার করেছে বা যে বিচারক তাকে সাজা দিয়েছে, এটা তাদের ভাষা হতে পারে; কিন্তু এই ভাষাতেই এক শিক্ষক তার মনে সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তুলেছিলেন। হিব্রুর মাধ্যমেই তিনি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা ও পাবলো নেরুদাকে আবিষ্কার করেছিলেন। এই মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার কারণেই, তার নিজের ভাষায়, 'ইহুদিদের নিয়ে আমার কোনো একপেশে ও বাঁধাধরা দৃষ্টিভঙ্গি ছিল না।'
প্রেম রাজনৈতিক বিষয় নয়, কিন্তু পরিস্থিতির ফেরে তা হয়ে যায়। মারা'আনার ভাষ্যমতে, 'তামারের পরিবার শান্তি চাইত ঠিকই, কিন্তু ফিলিস্তিনি জামাই তাদের পছন্দ ছিল না।' দারবিশের কাছ থেকে দূরে রাখতে ১৯৬৪ সালে বাবা-মা তাদের মেয়েকে নাচ শেখার জন্য জেরুজালেমে পাঠিয়ে দেন। দারবিশ তাকে আবেগঘন চিঠি লিখতেন। তার কাছে ছুটে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন ইসরায়েলি আইনে আরব নাগরিকদের চলাফেরায় কঠোর বিধিনিষেধ ছিল। কোথাও যেতে হলে অনুমতির জন্য আবেদন করতে হতো তাদের। কবি অবৈধভাবেই জেরুজালেমের পানে রওনা হলেন; যোগ দিলেন এক আবৃত্তির অনুষ্ঠানে। কিন্তু প্রিয়তমার সাথে তার দেখা হলো না।
হাইফায় ফেরার পর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার অপরাধে তরুণ কবিকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিচারের পর তাকে ফের কারাগারে পাঠানো হয়। জেরুজালেমে বসে তরুণী ভেবে পাচ্ছিলেন না এই প্রেম নিয়ে কী করবেন। প্রেমটা বড় বেশি ভারী, বড় বেশি জটিল। পরে মারা'আনাকে তিনি বলেছিলেন, 'ও আমার হৃদয়ে ছিল, কিন্তু জীবনে ছিল না।' দারবিশ তাকে চিঠিতে জানিয়েছিলেন, তাদের এই গল্প নিয়ে দীর্ঘ কবিতা লিখতে শুরু করেছেন তিনি। ১৯৬৭ সালের জুনে বেজে উঠল ছয় দিনের যুদ্ধের দামামা। এই যুদ্ধের সুযোগে গাজা, পশ্চিম তীর আর পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেয় ইসরায়েল। সেইসঙ্গে দখল করে মিশরের সিনাই উপদ্বীপ ও সিরিয়ার গোলান মালভূমি।
'আমি হয়তো তোমার রূপ, তোমার কোমলতা ভুলেই গেছি'
কদিন পরই ইসরায়েলি নৌবাহিনীর অর্কেস্ট্রা দলে সামরিক দায়িত্ব পালন শেষ করেন বেন অমি। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর নতুন রিক্রুটদের মনোবল বাড়াতে এই গায়ক-নর্তকদের দলটি পারফর্ম করত। ইসরায়েল রাষ্ট্রের বয়স তখনো কুড়ি পেরোয়নি। যুদ্ধ তখন জাতীয়তাবাদী আবেগকে উসকে দিয়েছে চরম মাত্রায়। সেনাবাহিনী, দেশ আর নতুন রাষ্ট্র গড়ার প্রকল্পগুলোর বন্দনা করে গাওয়া ওই দলের 'ইয়ে-ইয়ে' ঘরানার গানগুলো তখন তুমুল হিট। সাদাকালো এক ফুটেজে দেখা যায়, একটি যুদ্ধজাহাজের ডেকে অন্য নৃত্যশিল্পীদের সাথে পারফর্ম করছেন বেন অমি। তার বন্ধু, লেখক ও পরিচালক ওর্না আকাদ জানান, শান্তিবাদী এই তরুণী চাইলে 'যুদ্ধবিরোধী হিসেবে সামরিক দায়িত্ব এড়াতে পারতেন। কিন্তু তার পরিবারের কমিউনিস্ট মতাদর্শ দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখাত, যার মানে দাঁড়ায় সেনাবাহিনীর প্রতিও শ্রদ্ধা।'
ইসরায়েলি সামরিক পোশাকে প্রেমিকাকে দেখে রাজ্যের তিক্ততা নিয়ে দারবিশ তাকে লিখেছিলেন: 'আমি তোমার মাঝে কেবল এক অপরাধীকে দেখতে পাচ্ছি। আমি হয়তো তোমার রূপ, তোমার কোমলতা ভুলেই গেছি।' 'লা প্যালেস্টাইন কোমে মেটাফোর'-এর এক সাক্ষাৎকারে কবি বলেন, ১৯৬৭ সালের যুদ্ধ রূপকার্থে 'দুটো শরীরের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছিল। যে অমিলটা এতদিন অবচেতন মনে লুকিয়ে ছিল, যুদ্ধ সেটাকেই তীব্র করে তুলেছিল।' তিনি আরও বলেন, 'ভেবে দেখুন, আপনার প্রেমিকা দখলদার বাহিনীর একজন সেনা, যে বাহিনী নাবলুস বা জেরুজালেমে আপনারই দেশের মেয়েদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এই ব্যাপারটা শুধু হৃদয় নয়, বিবেককেও দুমড়েমুচড়ে দেয়।'
এরপরই তিনি লিখলেন 'রিটা ও রাইফেল'। 'আহ রিটা!/ এই রাইফেলের আগে আর কী ছিল, যা তোমার চোখ থেকে আমার চোখ ফেরাতে পারত/ হয়তো এক-আধটুকরো ঘুম অথবা মধুরঙা মেঘমালা ছাড়া?' ১৯৬৭ সালে 'এন্ড আ দ্য নাইট' কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত হওয়ার পরপরই কবিতাটি তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। সেই সময়েই শুরু হচ্ছিল দারবিশের নির্বাসন জীবন। ১৯৭১ সালে স্কলারশিপ নিয়ে তিনি পাড়ি জমান মস্কোয়। এরপর আর জন্মভূমিতে ফিরবেন না বলে সিদ্ধান্ত নেন। দেশে তার দমবন্ধ হয়ে আসত।
তিনি চলে যান কায়রো, সেখান থেকে বৈরুত। লেবাননের রাজধানী শহর তখন ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বাধীন পিএলওর শক্ত ঘাঁটি। সেই সংগঠনে যোগ দেন দারবিশ। ১৯৭৬ সালে সিরীয় ইতিহাসবিদ ও বুদ্ধিজীবী রানা কাব্বানিকে বিয়ে করেন দারবিশ। রানা ছিলেন প্রখ্যাত আরব কবি নিজার কাব্বানির ভাতিজি। কিন্তু সে সংসার টিকল না। বিচ্ছেদ হলো তাদের। ১৯৭৮ সালে আবারও বিয়ে করলেন তারা, কিন্তু পরিণতি হলো সেই একই—বিচ্ছেদ। কয়েক বছর পর দারবিশ গাঁটছড়া বাঁধলেন মিশরীয় অনুবাদক হায়াত হিনির সঙ্গে। সে সম্পর্কও টেকেনি। তার কোনো সন্তান ছিল না।
১৯৮২ সাল পর্যন্ত বৈরুতে থাকলেন দারবিশ। সে বছরই লেবাননে আগ্রাসন চালায় ইসরায়েল। বাধ্য হয়ে তিউনিসিয়ায় পাড়ি জমায় আরাফাতের সংগঠন। পিএলওর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দারবিশও চলে যান উত্তর আফ্রিকায়। সেখান থেকে যান প্যারিসে। এরপর পিএলওর বিভিন্ন রাজনৈতিক কংগ্রেসে বক্তৃতা দিতে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে প্রায়ই ছুটতেন তিনি।
কবিতা বিতর্ক
প্রাক্তন দুই প্রেমিক-প্রেমিকা ততদিনে একে অপরের জীবন থেকে মুছে গেছেন। মার্কিন আধুনিক নৃত্যের পথিকৃৎ মার্থা গ্রাহামের সহ-প্রতিষ্ঠিত বাতশেভা ড্যান্স কোম্পানি-র কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত হন বেন অমি। নিউইয়র্কের অ্যাভঁ-গার্দ শিল্পধারা, তাই চি আর যোগব্যায়ামের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। টেলিভিশনের বিভিন্ন ভ্যারাইটি শো-তে কোরিওগ্রাফার হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি শিক্ষকতা শুরু করেন জেরুজালেম একাডেমি অভ মিউজিক অ্যান্ড ড্যান্সে। তার একসময়ের ছাত্র হোফেশ শেকতার, পরে যিনি সমসাময়িক বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কোরিওগ্রাফার ও প্যারিসের থিয়েটার দে লা ভিলের নিয়মিত মুখ হয়ে ওঠেন, বলেন: 'অসাধারণ শিক্ষিকা ছিলেন তিনি। তার জন্যই আজ আমি এখানে।' শেকতারের স্মৃতিতে বেন অমি ছিলেন 'দুঃসাহসী আভা ছড়ানো এক অবিশ্বাস্য ক্যারিশম্যাটিক নারী।'
যুদ্ধ একসময় কবি আর নৃত্যশিল্পীকে আলাদা করে দিয়েছিল। কিন্তু ২০ বছর পর সেই যুদ্ধই তাদের আবারও মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল। ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরের শুরুর দিকে গাজায় শুরু হয় প্রথম ইন্তিফাদা। তা অচিরেই ছড়িয়ে পড়ল পশ্চিম তীরে। প্যারিসে বসে দারবিশ লিখলেন তার বিখ্যাত কবিতা, 'দোজ হু পাস বিটুইন ফ্লিটিং ওয়ার্ডস': 'সুতরাং, ছেড়ে যাও আমাদের দেশ/ আমাদের ভূমি, আমাদের সমুদ্র/ আমাদের গম, আমাদের লবণ, আমাদের ক্ষত/ সবকিছু, আর সাথে নিয়ে যাও/ স্মৃতির যত স্মৃতি।'
১৭ মার্চ, ১৯৮৮। ইসরায়েলি দৈনিক 'মারিভ'-এর প্রথম পাতায় ছাপা হলো দারবিশের ছবি। শিরোনাম বিস্ফোরক: 'কবি (...), পিএলওর সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা ফিলিস্তিনিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ইহুদিদের সমুদ্র থেকে জর্ডান পর্যন্ত তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য।' সেখানে কবিতাটির একটি অনুবাদও ছাপা হয়েছিল, তবে তাতে এমন কোনো আহ্বানের উল্লেখ ছিল না। কিন্তু ওই একটি শিরোনামের রাজনৈতিক ধাক্কা ছিল প্রচণ্ড।
'নদী থেকে সমুদ্র পর্যন্ত'—আজও অজস্র ফিলিস্তিনপন্থির কর্মীর কণ্ঠে ধ্বনিত এই স্লোগানের নানা রকম ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে যুগ যুগ ধরে। ১৯৭৭ সালে ইসরায়েলের প্রধান ডানপন্থি দল লিকুদের অন্যতম স্লোগান ছিল এটি। তাদের লক্ষ্য ছিল বৃহত্তর ইসরায়েল গঠন। তবে এই স্লোগান মূলত ব্যবহার করত বামপন্থি দল ও গোষ্ঠীগুলো, যারা দীর্ঘদিন ধরে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে দ্বি-জাতীয় রাষ্ট্রের দাবি জানিয়ে আসছিল। আবার হামাসের মতো ইসলামপন্থি আন্দোলনকারীরাও এই কথাগুলো ব্যবহার করেছে, যাদের লক্ষ্য ইহুদিদের দখলদারিতক্বে অবসান ঘটানো। তবে দারবিশের কবিতায় এই কথাগুলোর অস্তিত্বই নেই।
পরদিন ইসরায়েলি দৈনিক 'হারেৎজ'-এ দারবিশ এমন আহ্বানের কথা অস্বীকার করেন। তিনি স্পষ্ট জানান, তার দাবি কেবল অধিকৃত অঞ্চল থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। কিন্তু রাজনৈতিক মহল এই ঘটনাকে লুফে নেয়। এপ্রিলের শেষে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেট থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইৎজহাক শামির ঘোষণা দেন: 'যাদের দেখার চোখ আর শোনার কান আছে, তাদের এই সন্দেহভাজন কবির বোকা বোকা কবিতার কোনো দরকার নেই, যে আমাদের (...) চিরতরে দেশ ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।'
১৯৯৮ সালের তথ্যচিত্র 'মাহমুদ দারবিশ: অ্যাজ দ্য ল্যান্ড ইজ দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ'-এর পরিচালক সিমোন বিটন। ১৯৮৮ সালে 'এডিশনস ডি মিনুইট' থেকে প্রকাশিত 'প্যালেস্টাইন মাই কান্ট্রি—দ্য পোয়েম কন্ট্রোভার্সি' সংকলনের একটি প্রবন্ধে তিনি তৎকালীন পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন। তার মতে, সে সময় ইসরায়েলি বামপন্থিরা যতটা ভীতু ছিল, ততটাই ছিল নীরব দোসর। দারবিশের বন্ধু, লেখক বা চিন্তাবিদরা কেউই সেদিন তার পক্ষে মুখ খোলেননি। ফরাসি প্রকাশনা সংস্থাটির পরিচালক জেরোম লিন্ডন বইটির মুখবন্ধে লিখেছিলেন: 'অনেকেই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, দখলদারিত্বের কারণে ইসরায়েল তার আত্মাকে হারিয়েছে। কিন্তু অন্যদের অন্তত এটুকু বিশ্বাস করার সুযোগ দেওয়া উচিত, যে দেশ [দারবিশের সমর্থকদের] জন্ম দিতে পারে, তার বুকেই ন্যায়বিচার আর শান্তির ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে।'
তাদেরই একজন ছিলেন বেন অমি। অবশেষে নীরবতা ভাঙলেন তিনি। ইন্তিফাদা তখন তুঙ্গে। এমন এক উত্তাল সময়ে এক টেলিভিশন শোতে এসে তিনি জানালেন, একসময় দারবিশকে ভালোবাসতেন তিনি। স্পষ্ট ভাষায় বললেন, 'মানুষটা ঘৃণার নয়, ভালোবাসার।' তাদের সেই পুরোনো প্রেমের গল্প লুফে নিল সংবাদমাধ্যম। প্যারিসে বসে প্রাক্তন প্রেমিকার এই সাহসিকতার কথা জানতে পারলেন কবি। তাকে ফোন করলেন, ধন্যবাদ জানালেন এবং ফ্রান্সে আসার আমন্ত্রণ জানালেন। তবে সাক্ষাতের দিনক্ষণ কিছু ঠিক হলো না।
প্যারিসের এক ছোট্ট হোটেলে উঠলেন বেন অমি। ডায়াল করলেন দারবিশের দেওয়া নম্বরে। কিন্তু ওপাশ থেকে সাড়া মিলল না। প্রতিদিন চেষ্টা চালিয়ে গেলেন তিনি। এক সপ্তাহের বেশি সময় অপেক্ষার পর অবশেষে ফোনে এক অপরিচিত নারীর কণ্ঠ ভেসে এল। পরদিন বেন অমিকে সেখানে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন ওই নারী। সেই ভবনে, যা সম্ভবত নির্বাসিত পিএলওর কোনো কার্যালয় ছিল, দারবিশের সঙ্গে আবার দেখা হলো তার। কিছুক্ষণ কথাও হলো তাঁদের। কিন্তু হঠাৎ একটা ফোন এল। ফোনটা করেছিলেন আরাফাত। কবি তখন পরদিন নর্তকীর সঙ্গে আবার দেখা করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। কিন্তু পরে ফোনেই জানিয়ে দিলেন, তার পক্ষে আর দেখা করা সম্ভব নয়। সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, মাঝখান দিয়ে অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। অশ্রুসজল চোখে ইসরায়েলে ফিরে গেলেন বেন অমি।
আজীবন বেন অমি বিশ্বাস করতেন, এর পেছনে পিএলওর হাত ছিল। হয়তো তারা গুপ্তচরবৃত্তির সন্দেহ করেছিল। অথবা একজন ইসরায়েলি নারীর সঙ্গে দারবিশকে দেখা গেলে কোনো বিপদ হতে পারে—এমনটাও ভেবে থাকতে পারে তারা। তাছাড়া কবি ততদিনে শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। সংগঠনের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র লিখেছিলেন। সেখানে ফিলিস্তিনকে 'মানবতার প্রতি অবতীর্ণ ঐশ্বরিক বার্তার ভূমি' হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। ১৯৮৮ সালের ১৫ নভেম্বর আলজিয়ার্সে প্যালেস্টিনিয়ান ন্যাশনাল কাউন্সিলের এক বিশেষ অধিবেশনে আরাফাত এই ঘোষণাপত্র পাঠ করেন।
শেষ বিদায়ে আসেননি বেন অমি
১৯৯০-এর দশকের শুরুতে জার্মানি সফরে যান এই নৃত্যশিল্পী। সেখানেই থিতু হন। শিক্ষকতা শুরু করেন বার্লিনের এক স্কুলে। আর প্রেমে পড়েন পূর্ব জার্মানির স্টেজ ম্যানেজার আন্দ্রেয়াস অ্যাপেল্ট-এর। বহু বছর পর এ নিয়ে হাসতে হাসতে তিনি বলেছিলেন: 'আমি একজন ইসরায়েলি ইহুদি, অথচ ভালোবেসেছি দুজন মানুষকে। একজন ফিলিস্তিনি, অন্যজন জার্মান।' তার বিপত্নীক স্বামী অ্যাপেল্ট স্মরণ করেন ১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বরের সেই দিনটির কথা, যেদিন ইসরায়েল ও পিএলওর মধ্যে অসলো চুক্তি সই হয়েছিল। ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসের লনে আরাফাত ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ইৎজহাক রবিনের সেই ঐতিহাসিক করমর্দন দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন বেন অমি। অ্যাপেল্ট বলেন, 'আমরা তখন বার্লিনে। দীর্ঘপ্রতীক্ষিত শান্তি উদযাপনের মুহূর্তে তেল আবিবে থাকতে না পেরে ও ক্ষুব্ধ ছিল।' ঠিক দুই বছর পর, রবিন হত্যাকাণ্ডের দিনে বেন অমির সেই তীব্র বিষাদের কথাও ভোলেননি অ্যাপেল্ট।
অন্যদিকে দারবিশের কাছে অসলো চুক্তি ছিল মোড়ঘোরানো ঘটনা। চুক্তিটিকে যথেষ্ট মনে না করায় তিনি পিএলওর কার্যনির্বাহী কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন। সে সময় ফরাসি দৈনিক 'ল্য মঁদ'কে কবি বলেছিলেন, তিনি 'এই চুক্তির এত বড় দায়ভার কাঁধে নিতে চান না'। চুক্তির পর মানুষের উচ্ছ্বাসকে 'একটু বেশিই অতিরঞ্জিত' এবং উদযাপনকে 'খানিকটা তাড়াহুড়ো' মনে হয়েছিল তার। তবে এই চুক্তির ফলেই তিনি নিজ জন্মভূমিতে ফেরার অনুমতি পান। প্রথমবার ফেরেন ১৯৯৫ সালে, এক বহুল আলোচিত সফরে। সেবার কয়েকদিনের জন্য মায়ের সঙ্গে পুনর্মিলন হয়েছিল তার। এর কিছুদিন পর পাকাপাকিভাবে পশ্চিম তীরের রামাল্লায় ফিরে এলেন তিনি। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) শাসনাধীন এই ভূখণ্ডে ফিরে এক অদ্ভুত 'প্রত্যাবর্তনের বিভ্রান্তি' গ্রাস করেছিল তাকে। যে মাটি তার চিরচেনা, সেটাই আবার মনে হচ্ছিল বড্ড অচেনা, ভিনদেশি। এরপর তার সময় কাটতে লাগল রামাল্লা আর জর্ডানের আম্মানের মধ্যে। তবে বারবারই ছুটে যেতেন প্যারিসে।
২০০৮ সালের আগস্টের গোড়ার দিকে নতুন সঙ্গী অ্যাপেল্টকে নিয়ে উত্তর জার্মানির এলবে নদীর তীরের এক গ্রামে ছুটি কাটাচ্ছিলেন বেন অমি। ইসরায়েলে বসবাসরত বন্ধুদের কাছ থেকে খবর পেলেন, ওপেন-হার্ট সার্জারির জন্য টেক্সাসের হিউস্টনের এক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন দারবিশ। ওই এলাকায় ফোনের নেটওয়ার্ক ছিল খুবই দুর্বল। জঙ্গলের একটা নির্দিষ্ট জায়গায় গেলে কিছুটা সিগন্যাল মিলত। সেখানেই দাঁড়িয়ে তিনি শুনলেন: ৯ আগস্ট শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন কবি।
খবরটা ছড়িয়ে পড়ল বিশ্বজুড়ে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করলেন। কবির শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী ফিলিস্তিনের মাটিতেই সমাহিত করা হলো তাকে। রামাল্লায় তার কফিন ঢেকে দেওয়া হলো ফুল আর ফিলিস্তিনের পতাকায়। শেষযাত্রায় পা মেলালেন প্রায় ১০ হাজার মানুষ। তোপধ্বনি হলো ২১ বার। লাউডস্পিকারে বাজানো হলো তার কবিতা। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের শীর্ষ নেতা, হামাসের সদস্য, নেসেটের আরব-ইসরায়েলি এমপি ও ফ্রান্সের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডমিনিক দ্য ভিলপ্যাঁ উপস্থিত ছিলেন সেই শেষবিদায়ে।
জার্মানিতেই রয়ে গেলেন বেন অমি। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অনুমতি না পাওয়ার ভয়, আর নিজেকে অনাকাঙ্ক্ষিত বোঝার মতো মনে করার শঙ্কায় শেষযাত্রায় যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন তিনি। তবে কয়েক বছর পর গিয়েছিলেন রামাল্লায়। গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কবির কবরের পাশে। কবির নামে সেখানে জাদুঘর তৈরি হয়েছে দেখে গর্বে বুক ভরে উঠেছিল তার। এরপর আরও কয়েকবার সেখানে গেছেন তিনি। দেখা করেছেন কবির পরিবারের সঙ্গে। তারাও উষ্ণ অভ্যর্থনায় বরণ করে নিয়েছেন তাকে। বার্লিন আর তেল আবিব—এই দুই শহরের মাঝেই জীবন কাটছিল বেন অমির। তার অ্যাপার্টমেন্টের বুকশেলফগুলো ঠাসা ছিল দারবিশের বইয়ের আরবি, হিব্রু আর জার্মান সংস্করণে। কবির স্মরণসভাগুলোতে নিয়ম করে যেতেন, তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন নতুন প্রকাশিত কবিতা সংকলনগুলোর দিকে। ২০২৪ সালের জুনে প্যারিসের থিয়েটার দে লা ভিল-এ শেকতারের পারফরম্যান্স দেখতে গিয়েছিলেন বেন অমি। কোরিওগ্রাফার শেকতার জানান, 'ব্যাকস্টেজে গিয়ে তিনি নৃত্যশিল্পীদের সাথে কথা বলেন। জানান, নিজের কোনো সন্তান নেই ঠিকই, কিন্তু অনেক শিষ্য আছে তার। অসম্ভব দয়ালু ছিলেন তিনি, জানতেন কীভাবে মানুষকে এক সুতোয় বাঁধতে হয়।' সিন নদী পেরিয়ে ফ্রান্সের রাজধানীর কেন্দ্রস্থল, ৬ষ্ঠ অ্যারোঁদিসমঁ-র কাই মালাকাইস ধরে প্লেস মাহমুদ-দারবিশ-এ গিয়েছিলেন তিনি। ২০১০ সালে প্যারিসের মেয়র বার্ট্রান্ড ডেলানো ও মাহমুদ আব্বাস 'ফিলিস্তিনের কবি'-র সম্মানে এই স্মৃতিফলক উন্মোচন করেছিলেন। সেই ফলকের সামনে দাঁড়িয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন বেন অমি।
তিনি তখন অসুস্থ। ২০১৯ সালে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন, অস্ত্রোপচারও হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, হামাসের আক্রমণের দিনটিতে স্বামীকে বলেছিলেন, 'আমার নিশ্চিত মনে হচ্ছে ক্যান্সারটা আবার ফিরে এসেছে।' তেল আবিবে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকারের কাছে জিম্মিদের ভাগ্য নির্ধারণ ও শান্তির দাবিতে হওয়া বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। কতজন মুক্তি পেল, কতজনের মৃত্যুর খবর এল—সব কিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব রাখতেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন তার মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে, আর চোখের সামনেই মিলিয়ে যেতে দেখছিলেন শান্তির সমস্ত স্বপ্ন।
৬০ বছর আগে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পুনর্মিলনের স্বপ্ন যতটা অসম্ভব মনে হয়েছিল, আজও তা ঠিক ততটাই অধরা। অবশিষ্ট ছিল কেবল তার একসময়ের ভালোবাসার মানুষটির শব্দমালা। জীবনের শেষ দিনগুলোর বেশ কিছুটা সময় তেল আবিবের এক হাসপাতালে কেটেছে বেন অমির। তার স্বামী স্মরণ করেন: ক্লিনিকের করিডরে খবর রটে গিয়েছিল, স্বয়ং 'রিটা' সেখানে ভর্তি আছেন। তরুণ আরব নার্সরা বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। কবিতার সেই রক্তমাংসের নায়িকাকে চোখের সামনে দেখে আক্ষরিক অর্থেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন তারা।