এআই সিস্টেমকে প্রভাবিত করে প্রোপাগান্ডা ছড়াতে ভুয়া গবেষণা প্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন করেছে ইসরায়েল
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সিস্টেমকে প্রভাবিত করতে এবং চ্যাটবটের জবাবে ইসরায়েল-বান্ধব ন্যারেটিভ দিতে একটি ভুয়া মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক এবং একাধিক তথাকথিত স্বাধীন ওয়েবসাইটের নেটওয়ার্কে অর্থায়ন করেছে ইসরায়েল। গার্ডিয়ানের এক তদন্তে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
গাজায় চলমান গণহত্যা এবং বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধের কারণে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক সমর্থনে ধস নেমেছে। সেই পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দিতে তারা অনলাইন তথ্যের বিশ্বকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য বহু মিলিয়ন ডলারের যে প্রচার অভিযান চালাচ্ছে, এই অপারেশন তারই একটি অংশ।
হাজবারা (ইসরায়েলের তথ্য-প্রচার কৌশল)-তে শত শত মিলিয়ন ডলার ব্যয় করার পরও এই বিশাল প্রোপাগান্ডা অভিযান যে ব্যর্থ হচ্ছে, তা ইতোমধ্যেই স্বীকার করেছেন ইসরায়েলি কর্মকর্তারা।
বিভ্রান্তিকর তথ্য সাজানোর কথা প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন এক শীর্ষস্থানীয় ইসরায়েলি তথ্য প্রচারকারী মুখপাত্র—যার মাত্র কয়েক দিন পরই এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এলো। দীর্ঘদিনের লিকুদ পার্টির যোগাযোগ কর্মকর্তা এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাবেক মুখপাত্র এলি হাজান স্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে বলেন, 'সত্য এখন আর কোনো বিষয়ই নয়। তথ্যের কোনো গুরুত্বই আর নেই।'
হাজান আরও বলেন, 'আমি তাদের জবাব দিতে নিজেই ভুয়া খবর তৈরি করি।' তিনি আরও জানান, ইসরায়েলের উচিত পুরো তথ্যমাধ্যমকে তথ্যের বন্যায় ভাসিয়ে দেওয়া এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আদলে নিজস্ব যোগাযোগ কৌশল গ্রহণ করা।
এই মন্তব্যগুলো 'হ্যানোভার ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসি' নিয়ে দ্য গার্ডিয়ানের তদন্তের একটি স্পষ্ট পটভূমি তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটি একটি কথিত মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, যা দেখে মনে হয় ইসরায়েলি সরকার-অর্থায়িত প্রভাব বিস্তার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল।
গার্ডিয়ানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আইনগত কোনো প্রতিষ্ঠান হিসেবে হ্যানোভারের কোনো অস্তিত্ব নেই, এর কোনো ঠিকানা নেই, কর্মী হিসেবে কারও নাম নেই এবং তাদের কোনো প্রতিবেদনে লেখকের নাম উল্লেখ করা হয় না। তা সত্ত্বেও, গত ৬ থেকে ১৪ আগস্টের মধ্যে তথাকথিত ১২৪টি গবেষণামূলক রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, যার শব্দের সংখ্যা ৫ লাখ ৬০ হাজারের চেয়েও বেশি।
এদের প্রায় প্রতিটি সংবাদের শিরোনামই একেকটি প্রশ্নের মতো সাজানো, যা দেখে মনে হয় কোনো ব্যবহারকারী হয়তো এআই চ্যাটবটে সার্চ করার জন্য এই ধরনের প্রম্পট টাইপ করতে পারে—যার মধ্যে নকবা, সেয়োনবাদ-বিরোধিতা, ইসরায়েলের দখলদারিত্ব এবং ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে কি না, সে সম্পর্কিত নানা প্রশ্নও রয়েছে।
এসকল উপাত্ত বা বিষয়বস্তুকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেন এগুলোকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষায়াতনিক ও গবেষণামূলক কাজের মতো মনে হয়। এতে বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ফিলিস্তিনের নিজস্ব পরিসংখ্যান এবং আন্তর্জাতিক আইনগত নথির তথ্যসূত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রতিষ্ঠানটির এই কৌশলগুলো আসলে ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক সমালোচনা প্রশমিত করতে এবং গাজা সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত সাক্ষ্য-প্রমাণের বিষয়ে সংশয় তৈরি করতেই বারবার ব্যবহার করা হয়েছে।
এই কৌশলটি মানুষের পাশাপাশি এআই বা প্রযুক্তিনির্ভর মেশিনের কথা মাথায় রেখে বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
'হ্যানোভার' ওয়েবসাইটটি 'রেস'-এর তৈরি প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্মাণ করা হয়েছিল। 'রেস' নিজেকে একটি "এআই-নেটিভ কনটেন্ট প্ল্যাটফর্ম" হিসেবে পরিচয় দেয়, যার মূল কাজ হলো প্ল্যাটফর্মগুলোকে এমনভাবে সাহায্য করা যাতে চ্যাটজিপিটি, পারপ্লেক্সিটি, ক্লড এবং জেমিনির মতো এআই সিস্টেমগুলো যেন জবাবে তাদের তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহার করে।
হ্যানোভারের পেছনে থাকা নিউ ইয়র্কভিত্তিক মিডিয়া প্রতিষ্ঠান 'পাইরো ইনক'-কে 'এআই স্টোরি অপটিমাইজেশন' নামে একটি সেবা বাজারজাত করতে দেখা যায়।
তারা বড় বড় ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা এলএলএম কীভাবে কোনো তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করে, তা মাথায় রেখে বিশেষভাবে এই ধরনের উপাদান তৈরি করে। পাইরো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের 'ফরেন এজেন্টস রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট' (ফারা)-এর অধীনে ইসরায়েলি সরকারের পক্ষে নিজেদের এই কাজ নিবন্ধিত করে।
এই কৌশলটি মূলত দুটি উপায়ে কাজ করে। প্রথমত, ভুয়া হলেও আপাতদৃষ্টিতে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক কিছু নথিপত্র তৈরি করা, যাতে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন সম্পর্কিত যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় এআই চ্যাটবটগুলো সেখান থেকে সহজে তথ্য খুঁজে নিতে এবং সূত্র হিসেবে তা ব্যবহার করতে পারে।
দ্বিতীয়ত এবং সম্ভবত আরও ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতিটি হলো, এই ধরনের তথ্য বা উপাদানের স্তূপ ইন্টারনেটের বিশাল ডেটাবেজে ছড়িয়ে দেওয়া—যাতে ভবিষ্যতে তৈরি হতে যাওয়া নতুন এআই মডেলগুলোকে ট্রেইনিং বা প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময় এগুলো ব্যবহার করা হয়।
একবার প্রোপাগান্ডা বা ভুয়া তথ্য কোনো এআই মডেলের মূল ট্রেনিং ডেটাবেজে ঢুকে গেলে, ব্যবহারকারীরা সেই নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি বা ন্যারেটিভটি পেয়ে যাবেন, অথচ এই তথ্যের আসল উৎস কোথায়—তা তারা জানতেও পারবেন না।
দ্য গার্ডিয়ানের এই অনুসন্ধানটি সাম্প্রতিক আরেকটি ফাঁস হওয়া তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে—যেখানে জানা যায়, ট্রাম্পের সাবেক ক্যাম্পেইন ম্যানেজার ব্র্যাড পারস্কেলের নেতৃত্বাধীন ডিজিটাল ইনফ্লুয়েন্স কোম্পানি 'ক্লক টাওয়ার এক্স'-এর তৈরি একটি পৃথক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এআই চ্যাটবটগুলোকে "বিষাক্ত" করতে ইসরায়েল কোটি কোটি ডলার ঢেলেছিল।
ইসরায়েলি সরকারের সাথে ক্লক টাওয়ার এক্স-এর ৪৬.৫ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি রয়েছে। তারা এমন ১০টি ওয়েবসাইট তৈরি করে শত শত নিবন্ধ প্রকাশ করেছে, যা গাজা নিয়ে ইসরায়েলি ন্যারেটিভকে ছড়িয়ে দিতে ডিজাইন করা হয়েছে।
এই সাইটগুলো গাজায় গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করার চেষ্টা করেছে, ইসরায়েলের হাতে নিহত ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের অপমান ও তাদের কাজকে খাটো করার চেষ্টা করেছে এবং ছয় বছরের শিশু হিন্দ রাজাব হত্যাকাণ্ডসহ ইসরায়েলি হামলার বহু নথিভুক্ত ঘটনা নিয়ে সংশয় তৈরি করেছে।
এআই-কে প্রভাবিত করতে পরিচালিত ইসরায়েলি এই অপারেশনগুলো আসলে তাদের বিশাল এক ভাবমূর্তি রক্ষার প্রচেষ্টারই অংশ—যার লক্ষ্য হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পেইড ইনফ্লুয়েন্সার, রক্ষণশীল মিডিয়া নেটওয়ার্ক, লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপন (টার্গেটেড অ্যাডভার্টাইজিং), গণ-টেক্সট মেসেজ এবং তথাকথিত স্বাধীন সংস্থাগুলোর মাধ্যমে পুরো ডিজিটাল তথ্যের বিশ্বকে দখল করে রাখা।
তা সত্ত্বেও, ইসরায়েলের তৈরি এই সংকটটি জনসংযোগ কৌশল দিয়ে সামাল দেওয়া ক্রমেই অসম্ভব হয়ে পড়ছে বলে মনে হচ্ছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের প্রমাণ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র—যা ঐতিহ্যগতভাবেই ইসরায়েলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মিত্র—সেখানকার পিউ রিসার্চের চলতি বছরের এক জরিপে দেখা গেছে, ৬০ শতাংশ আমেরিকান এখন ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন; যা ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি।
একইভাবে গ্যালপের জরিপেও দেখা গেছে, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আমেরিকানরা ইসরায়েলিদের চেয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি সহানুভূতি দেখাচ্ছেন, যেখানে মাত্র ৩৬ শতাংশ মানুষ ইসরায়েলের পক্ষে মতামত দিয়েছেন।
এর জবাবে ইসরায়েল তাদের 'হাজবারা' বা প্রচার অভিযানের খরচ ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের জনসংযোগ সংক্রান্ত বাজেট লাফিয়ে প্রায় ৭৩০ মিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছেছে—যা আগের বছরের ১৫০ মিলিয়ন ডলারের বাজেটের চার গুণেরও বেশি এবং গাজা গণহত্যা শুরুর আগের খরচের তুলনায় বহু গুণ বেশি।
এই অর্থের বড় একটি অংশ ঢালা হয়েছে এআই ক্যাম্পেইন, বিদেশী ইনফ্লুয়েন্সার, অ্যাডভোকেসি গ্রুপ এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক ডিজিটাল অপারেশনের পেছনে।
তবে, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা নিজেরাই এখন ক্রমেই স্বীকার করে নিচ্ছেন যে, তাদের এই কৌশলটি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে।
জুলাই মাসে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা সংবাদমাধ্যম 'ওয়াইনেট'-কে জানায়, সরকার "প্রচুর অর্থ ঢেলেছে", অথচ পরিস্থিতি আরও বেশি অবনতি ঘটেছে। ইসরায়েলের জনসংযোগ কাঠামোর এক সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে আরও কঠোর সমালোচনা করে পুরো উদ্যোগটিকে "পোলার্ড কাণ্ডের মতো স্তরের একটি ভয়াবহ প্রতারণা" বলে আখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে আরেক কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন, পারস্কেল লক্ষ লক্ষ ডলার পকেটে পুরে আসলে কী অর্জন করতে পেরেছেন?
'কোয়িন্সি ইনস্টিটিউট'-এর নিক ক্লিভল্যান্ড-স্টাউট—বলেন , এই পুরো কৌশলের মূল ভুলটি হলো ইসরায়েল একটি গভীর রাজনৈতিক সংকটকে নিছক 'যোগাযোগের সমস্যা' (কমিউনিকেশন প্রবলেম) হিসেবে মোকাবিলার চেষ্টা করছে।
এআই-কে ম্যানিপুলেট বা প্রভাবিত করে চ্যাটবটের জবাবে ইসরায়েলি ন্যারেটিভ দিয়ে দেওয়া হয়তো সম্ভব হতে পারে, তবে তিনি বলেন, এটি জনমত জরিপের ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি—যে জনমতই দিনশেষে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
