কালো টাকা সৃষ্টি, রাজস্ব ফাঁকি বন্ধে স্থাবর সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের পরিকল্পনা সরকারের
স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর বা কেনাবেচায় রাজস্ব ফাঁকি রোধ এবং অপ্রদর্শিত বা কালো টাকা সৃষ্টি রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। এজন্য স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরে সর্বনিম্ন 'মৌজা মূল্য'-এর পরিবর্তে প্রকৃত বাজারমূল্যে দলিল নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, নতুন এই ব্যবস্থা বাস্তবায়নে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা—এই তিন পর্যায়ে বিশেষ কমিটি গঠন করা হচ্ছে। কমিটিগুলোকে আগামী চার মাসের মধ্যে নিজ নিজ এলাকার জমি, আবাসিক প্লট, ফ্ল্যাট ও অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তির প্রকৃত বাজারমূল্য নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. এমদাদুল হক চৌধুরী টিবিএসকে বলেন, "কয়েকটি ধাপে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে। ইতোমধ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করা হয়েছে। সভার সুপারিশ অনুযায়ী বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কমিটিগুলো গঠন করা হবে। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, জমি ও অন্যান্য সম্পদের বাজারমূল্য নির্ধারণ করা হবে। এটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।"
তিনি বলেন, "কমিটির মাধ্যমে সম্পদের বাজারমূল্য নির্ধারণ একটি অন্তর্বর্তীকালীন উদ্যোগ। এই উদ্যোগের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারের সহায়তায় স্থাবর সম্পদের ভ্যালুয়েশন বা মূল্যায়নের মডেল তৈরি করা হচ্ছে। যার মাধ্যমে বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতিতে সম্পদের প্রকৃত বাজারমূল্য নির্ধারণ করা হবে। এটি স্থায়ী একটি প্রক্রিয়া। এজন্য একটি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে এই উদ্যোগ সম্পন্ন হবে।"
সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ও সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন টিবিএসকে বলেন, সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে।
"তবে শুধু প্রকৃত বাজারমূল্য নির্ধারণ করাই যথেষ্ট নয়। দেশের জমি ও সম্পত্তি নিবন্ধন প্রশাসনকেও আধুনিকায়ন করতে হবে, কারণ বর্তমান ব্যবস্থা এবং দলিল-দস্তাবেজ তৈরির প্রক্রিয়া জটিলতায় ভরপুর," বলেন তিনি।
ড. ফাহমিদা জোর দিয়ে বলেন, "নতুন মূল্যায়ন কাঠামো সুনির্দিষ্ট ও বিজ্ঞানসম্মত হতে হবে— যাতে সারা দেশে তা সমানভাবে প্রয়োগ করা যায়। প্রভাবশালী ব্যক্তি বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী যেন অনৈতিক সুবিধা নিতে এই ব্যবস্থায় ফাঁকফোকর তৈরি করতে না পারে।"
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বহু প্রতীক্ষিত এই সংস্কারের কার্যকর বাস্তবায়ন অবৈধ লেনদেন এবং জমি কেনাবেচায় কালো টাকার প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে আনবে।
তিনি বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান ও সম্পত্তির ধরনভিত্তিক স্পষ্ট মানদণ্ড, নিয়মিত দর আপডেট এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা আবশ্যক। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে বাধ্যতামূলক গণশুনানির আয়োজন করা হলে এই উদ্যোগের ইতিবাচক ফলাফল মিলবে।
২০২৭ সালের জুলাই থেকে নতুন ফি ও কর
কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের সভার সিদ্ধান্তের আলোকেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে গত ৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং আইন ও বিচার বিভাগের সচিবকে চিঠি দিয়ে এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে ভূমি সচিবকে প্রকৃত বাজারমূল্য দলিলে প্রতিফলনের জন্য সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি-বিধান পর্যালোচনা, প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক এবং ডিজিটাল সংস্কারের তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আর আইন ও বিচার বিভাগের সচিবকে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মূল্যায়ন কমিটি গঠন করে আগামী চার মাসের মধ্যে দেশের সব মৌজার প্রকৃত বাজারমূল্য নির্ধারণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
গৃহীত পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিভাগীয় কমিটিগুলো বড় শহরগুলোর জমি ও স্থাবর সম্পত্তির মূল্য নির্ধারণ করবে, জেলা কমিটিগুলো পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার জন্য স্থাবর সম্পত্তির বাজারমূল্য নির্ধারণ করবে এবং দেশের অন্যান্য সকল এলাকার জন্য উপজেলা কমিটিগুলো দায়িত্বপ্রাপ্ত হবে।
কমিটিগুলো বিগত রেজিস্ট্রিকৃত দালিলিক মূল্য, সাম্প্রতিক ক্রয়-বিক্রয়ের তথ্য, ভূমির শ্রেণী, ব্যবহার ও অবস্থান, যোগাযোগ ও অবকাঠামো সুবিধা, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা বা উন্নয়ন কর্তপক্ষের নির্ধারিত মূল্য, স্থানীয় বাজার অনুসন্ধান এবং গণশুনানিসহ বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করবে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিবিএসকে জানিয়েছেন, সারাদেশে মৌজা মূল্য নির্ধারণ কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর, ২০২৭ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি পর্যলোচনা সভা আহ্বান করা হবে।
সভায় নতুন নির্ধারিত মৌজা মূল্যের ভিত্তিতে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ফি ও করের হার প্রয়োগের ফলে মোট হস্তান্তর ব্যয় ও সরকারের রাজস্ব আহরণের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব পর্যালোচনা করা হবে। ওই পর্যালোচনার ফলাফলের ভিত্তিতে, প্রকৃত মূল্যে সম্পত্তি নিবন্ধন উৎসাহিত করা, জনগণের ওপর করভার যৌক্তিক রাখা এবং সরকারের রাজস্ব স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে ফি ও করের হার যৌক্তিকীকরণ বা পুনঃনির্ধারণ করা হবে। নতুন এই ফি ও করের হার ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
পুরোনো দরই রাজস্ব ফাঁকির প্রধান উৎস
অর্থ বিভাগের এক পর্যালোচনার পর এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে দেখা গেছে, বর্তমানে স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় প্রকৃত লেনদেন মূল্যের চেয়ে অনেক কম মূল্যে 'মৌজা মূল্য' হিসেবে রেজিস্ট্রি করা হয়। শহরাঞ্চলের মৌজা মূল্য আসল বাজারদরের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এর ফলে সম্পত্তি হস্তান্তর বাবদ কোটি কোটি টাকার রাজস্ব (কর ও ফি) হারাচ্ছে সরকার। অন্যদিকে প্রকৃত লেনদেন মূল্য দলিলে প্রদর্শিত না হওয়ায়—সেই অর্থ হিসাবের বাইরে থেকে যায়, যা দেশে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ তৈরির প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে।
সম্পত্তির সর্বনিম্ন বাজারমূল্য নির্ধারণ বিধিমালা, ২০১০-এর মাধ্যমে আগে সম্পত্তির বেঞ্চমার্ক মূল্য নির্ধারণ করা হতো। যদিও ২০১৫ সালের নভেম্বরে বিধি ৫ সংশোধন করা হয়েছিল, তবে এর পর থেকে বাংলাদেশে সম্পত্তির দাম বহুগুণ বাড়লেও নতুন করে সমন্বিত কোনো মৌজা দর পুনর্নির্ধারণ করা হয়নি।
গুলশান সাব-রেজিস্টারের কার্যালয় থেকে প্রকাশ করা সর্বশেষ মৌজা মূল্যে পর্যালোচনা করলেই এই ব্যবধানের স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। বর্তমানে এই অফিসের অধীনে আব্দুল্লাহপুর মৌজায় সরকার নির্ধারিত প্রতি শতাংশ বাড়ির জমির দাম ৩২.৩৪ লাখ টাকা, আনুল মৌজায় ১০.০১ লাখ টাকা, কড়াইল মৌজায় ২.০৯ লাখ টাকা, জোয়ার সাহারায় ২৮.৪৮ লাখ টাকা, তেজগাঁও শিল্প এলাকায় ৩৬.০৩ লাখ টাকা, দক্ষিণখানে ১৫.৮৭ লাখ টাকা এবং মহাখালী মৌজায় ৫৯.০৯ লাখ টাকা।
বাংলাদেশে সাধারণত কাঠা একক ধরে জমি কেনাবেচার আলোচনা হয়ে থাকে। এক কাঠা সমান ১.৬৫ শতক বা ১৬৫ অযুতাংশ।
আনুল মৌজার মধ্যে মূলত উত্তরখান ও সংলগ্ন উত্তর-পূর্ব ডেমরা বা আশকোনার আশপাশের কিছু লোকালয় ও কৃষি এলাকা অন্তর্ভুক্ত। কড়াইল মৌজার মধ্যে মহাখালী ও গুলশান-বনানীর মধ্যবর্তী এবং গুলশান লেকপাড়ের এলাকা পড়েছে। অন্যদিকে, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার কিছু অংশ ও তার আশপাশের মহল্লা জোয়ার সাহারা মৌজার অন্তর্গত।
তবে এই মৌজা মূল্যে এসব এলাকার কোথাও জমি বেচাকেনা হয় না। বাস্তবে মহাখালী ও তেজগাঁওয়ের মতো বাণিজ্যিক কেন্দ্র থেকে শুরু করে বসুন্ধরার (জোয়ার সাহারা) মতো আবাসিক এলাকায় প্রকৃত বাজারদর সরকারি নির্ধারিত এই দরের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। অথচ বেশিরভাগ জমির রেজিষ্ট্রি হয় সরকারি সর্বনিম্ন দর– মৌজা মূল্য বা এর খুব কাছাকাছি দরে।
অনলাইন প্রোপার্টি প্ল্যাটফর্মগুলোর বাজারদর বিশ্লেষণ করলেই প্রকৃত চিত্র ধরা পড়ে। বিক্রয় ডটকম-এর মতো প্ল্যাটফর্মে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এন ব্লকে সেকেন্দার গ্রুপ প্রতি কাঠা জমির দাম হাঁকছে ১.১৭ কোটি থেকে ১.২০ কোটি টাকা। একইভাবে প্রবাসী পল্লী গ্রুপ 'ঢাকা-মাওয়া সিটি' প্রকল্পে প্রতি কাঠা জমি ৬০ লাখ টাকায় বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়েছে।
রাজস্ব সম্ভাবনা
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জমি, ফ্ল্যাট নিবন্ধন ফি ও কর বাবদ সরকারের রাজস্ব আদায় হয়েছে ১২ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা–সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) তাদের এক পর্যালোচনায় বলেছে, স্থাবর সম্পত্তির হস্তান্তরের দলিলে প্রকৃত মূল্যের প্রতিফলন না হওয়ায়—এর কর ও ফি থেকে সরকার বছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব কম পায়।
অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশে অধিকাংশ জমি ও স্থাবর সম্পত্তি মৌজা মূল্যে নিবন্ধিত হওয়ায় প্রকৃত ও ঘোষিত মূল্যের মধ্যকার ব্যবধান অপ্রদর্শিতই থেকে যায়—যা একদিকে সরকারকে বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছে, অন্যদিকে অপ্রদর্শিত বা কালো টাকা জমানোর সুযোগ তৈরি করছে।
