জাতিসংঘে ভাষণ দিতে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট আব্বাসের নিউইয়র্ক সফর আটকে দেওয়ার পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের
আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের নিউইয়র্ক সফর আটকে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। টানা দ্বিতীয় বছরের মতো তাকে সেখানে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
গত বছর জাতিসংঘের বার্ষিক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনের আগে এই ফিলিস্তিনি নেতা ও অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভিসা দেয়নি ওয়াশিংটন। সেই নজিরবিহীন পদক্ষেপের ধারাবাহিকতাতেই এবারের সিদ্ধান্তটি আসছে।
পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে আব্বাসের ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে।
দ্য টাইমস অভ ইসরায়েলের তথ্যমতে, গত সপ্তাহে আঙ্কারা সফরকালে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের কাছে এ নিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা জানান আব্বাস। এ বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মধ্যস্থতা করার জন্যও তিনি তুর্কি প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ করেন।
পরে মঙ্গলবার ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন এরদোয়ান। তবে এর পরদিনই এক মার্কিন কর্মকর্তা টাইমস অভ ইসরায়েলকে বলেন, ওয়াশিংটন এখনো আব্বাসকে অধিবেশনে যোগদান করতে না দেওয়ার অবস্থানে অনড় রয়েছে। অর্থাৎ তুর্কি প্রেসিডেন্টের উদ্যোগও মার্কিন প্রশাসনের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনতে পারেনি।
এদিকে শুক্রবার জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক আরব নিউজকে বলেন, তিনি এ-সংক্রান্ত খবর সম্পর্কে অবগত। তবে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্টের ভিসা প্রত্যাখ্যানের বিষয়ে জাতিসংঘ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা পায়নি। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানসহ বিভিন্ন প্রতিনিধিদলের প্রধানদের ভিসার প্রক্রিয়া সরাসরি ওয়াশিংটনের মাধ্যমেই হয়, জাতিসংঘের মাধ্যমে নয়।
দুজারিক বলেন, 'অতীতেও স্বাগতিক দেশ কর্তৃক ভিসা প্রত্যাখ্যানের এমন নজির আমরা দেখেছি। আমাদের আহ্বান ও প্রত্যাশা থাকবে, স্বাগতিক দেশ যেন জাতিসংঘের চুক্তি অনুযায়ী তাদের দায়দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে। জাতিসংঘের দাপ্তরিক কাজে আসা কূটনীতিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের নিউইয়র্কে নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতেই এই চুক্তি করা হয়েছে।'
দুজারিক উল্লেখ করেন, এ ধরনের সমস্যা এবারই প্রথম নয়। 'অন্যান্য প্রতিনিধিদলের ক্ষেত্রেও আমাদের এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে, বিশেষত রাশিয়ান ফেডারেশনের ক্ষেত্রে। এসব বিষয় নিয়ে জাতিসংঘ সচিবালয় সরাসরি স্বাগতিক দেশের সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখবে,' বলেন তিনি।
টাইমস অভ ইসরায়েলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভিসা-সংক্রান্ত ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তার কথা উল্লেখ করে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি সরাসরি নিশ্চিত করেনি। তবে তারা বলেছে, জাতিসংঘ সদর দপ্তর চুক্তির আওতায় নিজেদের বাধ্যবাধকতাকে ওয়াশিংটন 'যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে' বিবেচনা করে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মার্কিন আইন অনুযায়ী দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিদেশি মিশনগুলোর সদস্যদের ভ্রমণের ওপর বিধিনিষেধ বা শর্ত আরোপ করার এখতিয়ার রাখেন।
এর আগে ২০২৫ সালের আগস্টেও ওয়াশিংটন একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিল। সে সময় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের প্রাক্কালে প্রেসিডেন্ট আব্বাসসহ প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) সদস্যদের ভিসা প্রত্যাখ্যান ও বাতিলের ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।
তখন দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানকে এগিয়ে নিতে সৌদি আরব ও ফ্রান্সের যৌথ সভাপতিত্বে জাতিসংঘের এক সম্মেলন আয়োজনের ঠিক আগেই ওই সিদ্ধান্ত এসেছিল। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সেই সম্মেলনের বিরোধিতা করে যুক্তি দিয়েছিল, এ ধরনের পদক্ষেপ হামাসকে পুরস্কৃত করবে এবং গাজায় যুদ্ধ অবসানের প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
এই ভিসা বিধিনিষেধের ফলে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের স্বাগতিক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। পাশাপাশি ইসরায়েলের প্রধান মিত্র ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের অগ্রগতি ব্যাহত করার অভিযোগ ওঠে।
পরে সাধারণ পরিষদে ১৪৫-৫ ভোটে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়, যার মাধ্যমে আব্বাসসহ বিধিনিষেধের মুখে পড়া ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদের ভার্চুয়ালি অধিবেশনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়। তবে সেইসঙ্গে বলা হয়, তাদের সরাসরি উপস্থিত থাকার অনুমতি দেওয়া উচিত ছিল। শেষপর্যন্ত আব্বাস ভিডিও বার্তার মাধ্যমেই সাধারণ পরিষদে তার বক্তব্য তুলে ধরেন।
চলতি বছরের শুরুতে ওয়াশিংটন তাদের বিধিনিষেধের পরিধি আরও বাড়ায়। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ইস্যু করা বা অনুমোদিত ভ্রমণ নথিপত্রধারীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ এবং ভিসাদান স্থগিত করা হয়। অবশ্য নির্দিষ্ট কিছু কূটনৈতিক ও সরকারি ভিসাসহ সীমিত ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।
রামাল্লার সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসন নির্দিষ্ট কিছু কূটনৈতিক উদ্যোগে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে, যার মধ্যে যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত উদ্যোগগুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
