আমেরিকার ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের রেকর্ড ঋণ: চাঁদ ৬ বার ছুঁয়ে আসতে পারবে সেই ঋণের স্তূপ
আমেরিকা এখন এক বিশাল ঋণের জালে বন্দি। দেশটির জাতীয় ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারে। এই সংখ্যাটি এতই বিশাল যে সাধারণ মানুষের পক্ষে এর গভীরতা বোঝা কঠিন। সহজভাবে বোঝার জন্য কিছু তুলনা দেওয়া যাক।
আপনি যদি ১ ডলারের ৪০ ট্রিলিয়ন নোট একটির ওপর আরেকটি সাজান, তবে সেই স্তূপ পৃথিবী থেকে চাঁদে পৌঁছে আবার ফিরে আসতে পারবে—এভাবে মোট ৬ বার যাওয়া-আসা করা সম্ভব। এই ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের মূল্য মানব ইতিহাসে এ পর্যন্ত খনি থেকে উত্তোলিত মোট স্বর্ণের দামের চেয়েও বেশি। এটি চীন, জার্মানি, জাপান, যুক্তরাজ্য, ভারত এবং ফ্রান্সের সম্মিলিত অর্থনীতির সমান।
আমেরিকার এই ঋণের ভাগ যদি প্রতিটি নারী, পুরুষ ও শিশুর মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হয়, তবে জনপ্রতি ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ১৭ হাজার ডলার।
একজন সাধারণ আমেরিকান কর্মী, যিনি বছরে গড়ে ৬৯,৭৭০ ডলার আয় করেন, তার পক্ষে এই পরিমাণ অর্থ উপার্জন করতে ৫৭ কোটি ৩০ লাখ বছরেরও বেশি সময় লাগবে। আবার আমেরিকার বর্তমান ১৬ কোটি ৮০ লাখ কর্মীবাহিনীর সবাই যদি তাদের উপার্জিত প্রতিটি ডলার ঋণ পরিশোধে দিয়ে দেন, তাহলেও এই খাতা সমান করতে অন্তত ৪১ মাস সময় লাগবে।
কোন প্রেসিডেন্টের আমলে কত বাড়ল ঋণ?
২০০৮ সালের মহামন্দার পর থেকেই মার্কিন সরকারের ঋণ আকাশচুম্বী হতে শুরু করে। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যখন নির্বাচিত হন, তখন ঋণ ছিল ১০ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ২০২৬ সালে এসে ৪০.০৫ ট্রিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। রোনাল্ড রিগ্যানের সময় থেকেই মূলত ঘাটতি বাজেটের মাধ্যমে এই ঋণের পাহাড় বড় হতে শুরু করে।
নিচে বিভিন্ন প্রেসিডেন্টের আমলে ঋণের বৃদ্ধির হার দেওয়া হলো:
- রোনাল্ড রিগ্যান: ১.৭৬ ট্রিলিয়ন ডলার (১৮৯% বৃদ্ধি)
- জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ: ১.৪৭ ট্রিলিয়ন ডলার (৫৪% বৃদ্ধি)
- বিল ক্লিনটন: ১.৫৬ ট্রিলিয়ন ডলার (৩৭% বৃদ্ধি)
- জর্জ ডব্লিউ বুশ: ৪.৯ ট্রিলিয়ন ডলার (৮৬% বৃদ্ধি)
- বারাক ওবামা: ৯.৩২ ট্রিলিয়ন ডলার (৮৮% বৃদ্ধি)
- প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প (প্রথম মেয়াদ): ৭.৮ ট্রিলিয়ন ডলার (৩৯% বৃদ্ধি)
- জো বাইডেন: ৮.৪৭ ট্রিলিয়ন ডলার (৩১% বৃদ্ধি)
- প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প (দ্বিতীয় মেয়াদ, আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত): ৩.৮৩ ট্রিলিয়ন ডলার (১১% বৃদ্ধি)
বর্তমানে আমেরিকার ঋণ তাদের মোট জিডিপির ১২৩.৫ শতাংশ। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষেও এই অনুপাত ছিল ১১৬ শতাংশ। মার্কিন ইতিহাসের যেকোনো প্রেসিডেন্টের তুলনায় ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের আমলে ঋণের শতাংশ সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল (৭০ শতাংশ)। তবে ১৯৪৫ সালের পর ঋণের বোঝা কমতে শুরু করেছিল এবং ১৯৮০ সালে রোনাল্ড রিগ্যানের দায়িত্ব গ্রহণের সময় তা সর্বনিম্ন ৩১ শতাংশে নেমেছিল।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় ৪০.০৫ ট্রিলিয়ন ডলারের এই অঙ্কটি অবিশ্বাস্য। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বাদে বিশ্বের অন্য সব দেশের সম্মিলিত জিডিপির চেয়েও বড়।
অর্থনীতিতে এর প্রভাব
নন-পার্টিসান 'কমিটি ফর এ রেসপন্সিবল ফেডারেল বাজেট'-এর প্রেসিডেন্ট মায়া ম্যাকগিনাস এক বিবৃতিতে বলেন, 'এই ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণ কেবল সরকারের হিসাবের খাতায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি পুরো অর্থনীতিতে অনুভূত হয় এবং কোনো না কোনোভাবে সাধারণ মানুষের পকেটেও প্রভাব ফেলে।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'আমরা যত বেশি ঋণ নেব, মুদ্রাস্ফীতি তত বাড়বে, বাজেটের অন্যান্য অগ্রাধিকারমূলক খাতগুলো সংকুচিত হবে এবং অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থা ও আন্তর্জাতিক অস্থিরতার মুখে আমরা আরও দুর্বল হয়ে পড়ব।'
