মহাকাশ যুদ্ধের প্রস্তুতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন: তৈরি হচ্ছে ‘হান্টার’ স্যাটেলাইট ও ‘অরবিটাল’ অস্ত্র
চলতি বছরের জুনে মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকদের কঠোর নজরদারিতে থাকা চীনের একটি অত্যন্ত গোপন মানবহীন মহাকাশ যান পৃথিবী থেকে শত শত মাইল উঁচুতে সামরিক ও বাণিজ্যিক উপগ্রহে ঠাসা একটি কক্ষপথে একটি ছোট স্যাটেলাইট বা উপগ্রহ অবমুক্ত করেছে। অবমুক্ত করার পর অবজেক্টটি আরেকটি চীনা স্যাটেলাইটকে চক্কর দিয়ে পুনরায় মূল স্পেসপ্লেনটিতে ফিরে আসে বলে জানিয়েছে মার্কিন স্পেস-ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠান 'লিওল্যাবস'।
এই স্যাটেলাইট বা মিশনের উদ্দেশ্য কী ছিল, সে সম্পর্কে খুব কমই জানা গেছে। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীও একই ধরনের একটি অত্যন্ত গোপন মানবহীন স্পেসপ্লেন 'এক্স-৩৭বি' পরিচালনা করে, যা দেখতে ছোট শাটল বা রকেটের মতো। রয়টার্সের সংগৃহীত নথিপত্র, স্পেস-ট্র্যাকিং ডেটা এবং বর্তমান ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার থেকে জানা গেছে—ওয়াশিংটন ও বেইজিং মহাকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত সম্ভাব্য কোনো যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে এই বিশেষ স্পেসপ্লেন কর্মসূচিগুলো পরিচালনা করছে।
প্যাটেন্ট সংক্রান্ত নথি, সংগ্রহ সংক্রান্ত নোটিশ এবং একাডেমিক গবেষণাপত্র থেকে জানা গেছে—চীনা গবেষকেরা এমন প্রযুক্তি তৈরি করছেন যা দিয়ে একটি স্যাটেলাইট অন্য মহাকাশযানকে ধাওয়া করতে এবং প্রয়োজনে 'দখল বা ক্যাপচার' করতে পারবে। এমনকি মহাকাশেই স্যাটেলাইটের জ্বালানি রিফুয়েলিং করার প্রযুক্তিও তারা প্রস্তুত করছে। এই অগ্রগতির পাল্টা জবাব হিসেবে, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন একটি সন্দেহভাজন চীনা স্পাই বা গোয়েন্দা স্যাটেলাইটের গতিপথে তাদের ইতিহাসের 'প্রথম যৌথ সামরিক মহাকাশ অভিযান' পরিচালনা করেছে বলে বাণিজ্যিক স্পেস-ট্র্যাকিং ডেটায় ধরা পড়েছে।
মার্কিন স্পেস ফোর্সের চিফ অব স্পেস অপারেশনস জেনারেল চ্যান্স সল্টজম্যান গত জুলাইয়ে বলেন, 'চীনা সামরিক বাহিনী দ্রুত তাদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।' যার মধ্যে রয়েছে ভূপৃষ্ঠে এবং মহাকাশে মোতায়েন করা এমন কিছু অস্ত্র যা শত্রুর স্যাটেলাইটকে জ্যাম করে দিতে বা ধ্বংস করতে পারে। অবসরে যাওয়ার ঠিক আগে সল্টজম্যান সতর্ক করে বলেন, চীনের এই হুমকি অত্যন্ত 'গুরুতর'।
ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে স্যাটেলাইট বা উপগ্রহ এখন অপরিহার্য। যোগাযোগের পাশাপাশি এগুলো স্থল বাহিনীকে জিপিএস নেভিগেশন ও গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে। কিন্তু বর্তমানে সামরিক বাহিনীগুলো এগুলোকে সরাসরি 'অ্যাক্টিভ ওয়েপন প্ল্যাটফর্ম' বা মহাকাশীয় যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে দেখছে, যা লেজার বা জ্যামিং সিগন্যালের মাধ্যমে শত্রুর উপগ্রহকে অন্ধ করে দিতে পারে, এমনকি আস্ত শত্রুর স্যাটেলাইটকে গিলে ফেলতে বা কব্জা করতে পারে।
মার্কিন বিমান বাহিনীর এয়ার ওয়ার কলেজের সাবেক অধ্যাপক এভারেট ডলম্যান বলেন, আমেরিকার মহাকাশ সক্ষমতা ব্যাহত হলে তা পৃথিবীর মাটিতে আমাদের বিশাল সামরিক বাহিনীকে 'পঙ্গু' করে দেবে; যার প্রভাব পড়বে নজরদারি থেকে শুরু করে ক্ষেপনাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর। তাঁর মতে, অত্যন্ত চটপটে এবং স্যাটেলাইট বা মালামাল বহনে সক্ষম এই স্পেসপ্লেনগুলোকে শত্রুরা মূলত 'স্পেস ফাইটার' বা মহাকাশীয় যুদ্ধবিমান হিসেবে দেখছে।
মহাকাশের এই তুমুল প্রতিযোগিতা এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন পৃথিবীর কক্ষপথ দিন দিন উপগ্রহে ঠাসা হয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি পাবলিক মার্কেটে প্রবেশ করা ইলন মাস্কের স্পেসএক্স বর্তমানে প্রায় ১১,০০০ স্টারলিংক স্যাটেলাইট পরিচালনা করছে এবং মহাকাশে বড় আকারের এআই-চালিত ডেটা সেন্টার স্থাপন করার পরিকল্পনা করছে। চীনও এর বিপরীতে নিজস্ব স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক তৈরি করছে, অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের 'গোল্ডেন ডোম' মিসাইল ডিফেন্স প্রোগ্রামের আওতায় মহাকাশে ইন্টারসেপ্টর বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রথম মার্কিন-ব্রিটিশ যৌথ অভিযানের সময় কলোরাডোর একটি ঘাঁটি থেকে মার্কিন স্পেস ফোর্স তাদের একটি সামরিক স্যাটেলাইটকে ব্রিটেনের একটি স্যাটেলাইটের অত্যন্ত কাছাকাছি নিয়ে যায়। মহাকাশ গোয়েন্দা সংস্থা 'স্লিংশট অ্যারোস্পেস'-এর তথ্য অনুযায়ী—ওই সময়েই চীনের 'শিয়ান ১২-০১' নামের একটি সন্দেহভাজন স্পাই স্যাটেলাইট তাদের মাত্র ৮৩ কিলোমিটার নিচ দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছিল, যা মহাকাশের দূরত্বের হিসাবে অত্যন্ত কাছাকাছি।
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ ট্র্যাকিং ফার্ম কোমসপক-এর সাবেক তিন ব্রিটিশ বিমান বাহিনী কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন—এটি মূলত বেইজিংয়ের উদ্দেশ্যে একটি স্পষ্ট 'কৌশলগত সংকেত বা বার্তা' ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল মিত্রদের একতা ও সক্ষমতা প্রদর্শন করা এবং ব্রিটেনের স্যাটেলাইটের ওপর যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে চীনকে সতর্ক করা।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন প্রকাশ্যে এই অভিযানের কথা ঘোষণা করলেও (যা 'ফাইভ আইজ' গোয়েন্দা জোটের দুই সদস্যের প্রথম যৌথ মিশন) তারা চীনা স্যাটেলাইটের এত কাছাকাছি যাওয়ার বিষয়টি গোপন রেখেছিল। ন্যাটোর পরবর্তী স্পেস ফোর্স প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ডগলাস শিয়েস বলেন, অন্য মহাকাশযানের কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে অভিযান পরিচালনা করলে বোঝা যায় মিত্রদের স্যাটেলাইট ঠিকমতো কাজ করছে কি না অথবা কোনো শত্রু মহাকাশযান 'নিষিদ্ধ কোনো কাজ' করছে কি না।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা এই মার্কিন-ব্রিটিশ যৌথ অভিযানের সুনির্দিষ্ট বিবরণ সম্পর্কে অবগত নয়। তবে বেইজিং মহাকাশকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের তীব্র বিরোধিতা করে এবং এর শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের সমর্থন করে। একই সঙ্গে তারা ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে 'গোল্ডেন ডোম' এবং মহাকাশীয় অস্ত্রের মাধ্যমে মহাকাশে অস্ত্রের প্রতিযোগিতা উসকে দেওয়ার অভিযোগ এনেছে। চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া অবশ্য দাবি করেছে—তাদের 'শিয়ান ১২-০১' স্যাটেলাইটটি মূলত মহাকাশ পরিবেশ জরিপের কাজে এবং স্পেসপ্লেনটি শান্তিপূর্ণ বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছে।
'ডগফাইটিং' ও হান্টার স্যাটেলাইট
মার্কিন স্পেস কমান্ডের প্রধান জেনারেল স্টিফেন হোয়াইটিং সতর্ক করে বলেছেন, শত্রুরা যুদ্ধের শুরুতেই আমেরিকার মহাকাশ সম্পদ ধ্বংস বা অচল করার চেষ্টা করবে। এই হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রকে মহাকাশে আরও আক্রমণাত্মক যুদ্ধংদেহী মনোভাব গ্রহণ করতে হবে। এর অর্থ হলো কেবল নিজেদের রক্ষা করা নয়, প্রয়োজনে শত্রুর মহাকাশ সম্পদ ধ্বংস বা স্ট্রাইক করার জন্য কক্ষপথের ইন্টারসেপ্টর ও অন্যান্য মহাকাশীয় অস্ত্র প্রস্তুত রাখা। তিনি গত এপ্রিলে এক সেমিনারে বলেন, 'আমাদের মহাকাশ যুদ্ধের জন্য ভালোভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। যদি প্রতিরোধ ব্যর্থ হয়, তবে আমরা লড়ব এবং জয়ী হব।'
পশ্চিমারা রাশিয়ার একটি বিশেষ অ্যান্টি-স্যাটেলাইট প্রযুক্তির বিষয়েও সতর্ক করেছে, যার নকশা করা হয়েছে পারমাণবিক অস্ত্র বহনের জন্য। তবে মস্কো মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সরাসরি মহাকাশ যুদ্ধাস্ত্রের একটি বিরল তথ্য প্রকাশ করে মার্কিন স্পেস ফোর্স গত জুনে ঘোষণা করেছে—তারা টেক কোম্পানি 'এলথ্রিহ্যারিস টেকনোলজিস'-এর তৈরি একটি বিশেষ ভূপৃষ্ঠে চালিত ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বা তড়িৎ-চৌম্বকীয় অস্ত্র সফলভাবে যুক্ত করেছে, যা শত্রুর উপগ্রহকে অচল বা ডিজেবল করে দিতে সক্ষম।
আমেরিকা মহাকাশে শীর্ষস্থানে থাকলেও চীন অত্যন্ত দ্রুত গতিতে তাদের স্যাটেলাইটের সংখ্যা এবং মিশনের জটিলতা বাড়াচ্ছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন—চীনা স্যাটেলাইটগুলো ইতিমধ্যেই মহাকাশে 'ডগফাইটিং'—(আকাশে দুটি যুদ্ধবিমানের মুখোমুখি লড়াইয়ের মতো স্যাটেলাইটের মহড়া) প্রদর্শন করেছে, যেখানে একাধিক স্যাটেলাইট সমন্বিত উপায়ে অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে মহড়া দেয়। এছাড়া চীনা মহাকাশযানগুলো একটি নিষ্ক্রিয় স্যাটেলাইটকে সরাসরি আঁকড়ে ধরে কব্জা করার এবং সেটির কক্ষপথ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা দেখিয়েছে।
মার্কিন স্পেস ফোর্সের একজন কর্মকর্তার মতে, গত বছর চীন মহাকাশের কক্ষপথেই (অন-অরবিট) জ্বালানি স্থানান্তরের বা রিফুয়েলিংয়ের একটি সম্ভাব্য পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। এই রিফুয়েলিংয়ের সক্ষমতা অর্জন করা একটি বিশাল বড় অগ্রগতি; কারণ কৃত্রিম উপগ্রহগুলো সাধারণত উৎক্ষেপণের সময় সাথে নেওয়া সীমিত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল থাকে। ফলে মহাকাশে পুনরায় জ্বালানি ভরার এই ক্ষমতাই নির্ধারণ করবে যে একটি মহাকাশযান 'শিকারী' হিসেবে টিকে থাকবে নাকি নিজেই 'শিকারে' পরিণত হবে।
চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিনিয়ত এই ধরনের নতুন নতুন সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্যাটেন্ট সংক্রান্ত নথিপত্রে দেখা গেছে—চীনের সবচেয়ে উন্নত সামরিক বিমান প্রস্তুতকারী একটি প্রতিষ্ঠান এমন প্রযুক্তি অর্জন করেছে, যার মাধ্যমে একটি স্যাটেলাইট অন্য কোনো মহাকাশযানকে ধাওয়া করার সময় অত্যন্ত কম জ্বালানি খরচ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে।
একই সঙ্গে, চীনের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব ডিফেন্স টেকনোলজি কর্তৃক প্রকাশিত একটি প্রযুক্তি-হস্তান্তর নোটিশে এমন একটি সুপ্রতিষ্ঠিত সিস্টেমের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যা প্রতিরক্ষামূলক এবং কর্মক্ষম—উভয় উদ্দেশ্যেই একসাথে শত শত উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট পরিচালনা করতে সক্ষম।
প্যাটেন্ট সংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, চীনা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক থাকা দেশটির আরেকটি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এমন 'পিছু ধাওয়াকারী স্যাটেলাইট' তৈরি করছেন, যার ধারণায় একাধিক মহাকাশযান একসাথে 'জাল' ব্যবহার করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু বা শত্রুর স্যাটেলাইটকে সশরীরে বন্দি বা কব্জা করতে পারে।
তবে সংশ্লিষ্ট ওই প্রতিষ্ঠানগুলো এবং চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য করা কোনো অনুরোধে সাড়া দেয়নি। অবশ্য মহাকাশের কক্ষপথে জ্বালানি ভরা এবং অন্য স্যাটেলাইট কব্জা করার মতো এই প্রযুক্তিগুলোর বেসামরিক বা অ-সামরিক ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ব্যবহারিক সুবিধা রয়েছে।
চীনের সামরিক বাহিনীর অফিশিয়াল মুখপত্র 'পিএলএ ডেইলি' ২০২২ সালের এক সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করেছিল—জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা করা, কৌশলগত উদ্যোগ গ্রহণ এবং যুদ্ধে বিজয় অর্জন করার জন্য মহাকাশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত অপরিহার্য।
