আকস্মিক বন্যার জন্য ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জলবায়ুজনিত ক্ষতিপূরণ দাবি করল নেপাল
যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীন-এই তিনটি দেশকে সর্বোচ্চ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী হিসেবে উল্লেখ করে তাদের কাছে 'জলবায়ুজনিত ক্ষতিপূরণ' দাবি করেছে নেপাল।
এক সপ্তাহ আগে হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত নেপালের ভোটকোশি নদীতে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় দেশটির অন্তত তিনটি জেলার বেশ কয়েকটি গ্রাম ভেসে যায়। এ দুর্যোগের পর থেকে এখন পর্যন্ত জরুরি উদ্ধারকারী দল ১ হাজার ১০০টির বেশি মরদেহ উদ্ধার করেছে। এখনও প্রায় সাড়ে ৪ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
তিব্বত-নেপাল সীমান্তে একটি হিমবাহ ধসে প্রচণ্ড ঠান্ডা পানি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল ঢল নেমে আসায় এই আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয় বলে জানা যায়।
দুর্যোগকবলিতদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পুনর্গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা চেয়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ শুরু করেছে নেপাল।
দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেছেন, দুর্যোগ-পরবর্তী সহায়তাকে 'নৈতিক দায়বদ্ধতার' বিষয় হিসেবে দেখা উচিত, 'দয়া হিসেবে নয়'।
কান্তিপুর টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেপালি ভাষায় তিনি এ কথা বলেন। তার সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ নেপালের সংবাদপত্র দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট ও সংবাদ সংস্থা পিটিআই প্রকাশ করেছে।
খানাল বলেন, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান 'প্রায় নগণ্য' হলেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের অসম প্রভাব দেশটিকেই বহন করতে হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে দ্রুত হিমবাহ গলে যাওয়া এবং পাহাড়ি এলাকায় চরম দুর্যোগ।
তিনি বলেন, 'আমরা যে বৈশ্বিক সংকট তৈরি করিনি, তার চূড়ান্ত মূল্য আমাদের দিতে হচ্ছে। হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়া এবং এসব ভয়াবহ পাহাড়ি সুনামি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব।'
খানাল বলেন, নেপাল তার কূটনৈতিক অবস্থান বদলে 'সহায়তা'-নয়, 'ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ'-দাবি করছে
তিনি বলেন, 'এটি দয়ার বিষয় নয়; এটি আইনি ও নৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়।'
প্রধান দায়বদ্ধ কারা
তিনি আরও বলেন, 'বিশ্বের শীর্ষ নিঃসরণকারী দেশ চীন, দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্র এবং তৃতীয় অবস্থানে থাকা ভারত—তাদের নেপালের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঐতিহাসিক দায় রয়েছে।'
খানাল বলেন, কাঠমান্ডু আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে 'পূর্ণ দৃঢ়তা ও স্পষ্টতার সঙ্গে' জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি তুলে ধরার পরিকল্পনা করছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য বড় নিঃসরণকারী দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ চাওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, 'এটি সভ্যতার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার বিষয়। আমাদের হিমালয়ের হিমবাহগুলো যদি বিলীন হয়ে যায়, তাহলে গঙ্গা ও ত্রিশূলীর মতো নদীর ওপর নির্ভরশীল দক্ষিণ এশিয়ার ২০০ কোটির বেশি মানুষের পানির নিরাপত্তা স্থায়ীভাবে হুমকির মুখে পড়বে। আমরা শুধু নেপালের জন্য নয়, দক্ষিণ এশিয়ার সভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষার জন্যও দাবি জানাচ্ছি।'
মন্ত্রী জানান, নেপালের অর্থ মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জলবায়ু ক্ষতিপূরণ দাবি করে চিঠি পাঠিয়েছে।
ভারতের অবস্থান
ভারত বারবার জলবায়ু ন্যায্যতার ওপর জোর দিয়ে আসছে এবং দেশটির মাথাপিছু নিঃসরণ তুলনামূলকভাবে কম বলে তুলে ধরেছে।
নয়াদিল্লির যুক্তি, জলবায়ু-সংক্রান্ত দায়িত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের ঐতিহাসিক নিঃসরণ, উন্নয়নের প্রয়োজন এবং সক্ষমতার পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
নয়াদিল্লি ঝুঁকিপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার উদ্যোগকে সমর্থন করেছে।
একই সঙ্গে ভারত বলে আসছে, যেসব পশ্চিমা দেশ আগে শিল্পায়িত হয়েছে, তারাই বৈশ্বিক কার্বন বাজেটের বড় অংশ ব্যবহার করেছে।
ভারত আরও বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এসব দেশকে সহায়তার জন্য উন্নত দেশগুলোর প্রয়োজনীয় আর্থিক সম্পদ দেওয়া উচিত।
নেপালের সহায়তার আহ্বান
দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৬ আগস্ট ভোটকোশি নদী অববাহিকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর জরুরি আর্থিক সহায়তা চেয়ে নেপাল আনুষ্ঠানিকভাবে লস অ্যান্ড ড্যামেজ মোকাবিলার তহবিলের পরিচালনা পর্ষদের কাছে আবেদন করেছে।
এই ব্যবস্থা ২০২২ সালে কপ-২৭ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কপ-২৮ সম্মেলনে এটি কার্যকর করা হয়।
নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে এবং বন ও কৃষিমন্ত্রী গীতা চৌধুরীর যৌথ স্বাক্ষরিত চিঠিতে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ওই বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি, বিপুল সংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং ঘরবাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, 'অর্থনৈতিক ও অনার্থিক ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ মাত্রা এখনো নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এর প্রভাব ব্যাপক এবং তা নেপালের তাৎক্ষণিকভাবে মোকাবিলার সক্ষমতার বাইরে।'
