বাজারে আসছে চীনের পোর্টেবল লেজার মশা নিধন যন্ত্র, বড় পরিসরে উৎপাদন শুরু
চীনের তৈরি লেজারভিত্তিক মশা মারার একটি যন্ত্রের বড় পরিসরে উৎপাদন শুরু হয়েছে। এর প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান 'ফোটন ম্যাট্রিক্স ল্যাব' ক্রাউডফান্ডিং সাইট 'ইন্ডিগোগো'-তে জানিয়েছে, চলতি মাসের শেষের দিকেই ক্রেতাদের কাছে এর প্রথম চালান পাঠানো শুরু হবে।
কোম্পানিটির দাবি, ছোট এই বহনযোগ্য যন্ত্রটিতে মশা ও অন্যান্য ছোট উড়ন্ত পোকা শনাক্ত করে সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে লিডার, মিলিমিটার-ওয়েভ রাডার, এআই চালিত ক্যামেরা এবং নিখুঁত লেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ফোটন ম্যাট্রিক্স তাদের সবশেষ হালনাগাদ তথ্যে জানায়, আগস্ট মাসেই এর উৎপাদন শুরু হয়েছে। পাশাপাশি তারা একটি অফিসিয়াল অনলাইন স্টোরও চালু করেছে, গ্রাহকেরা সরাসরি যেখান থেকে ইনফ্রারেড ও ব্লু-লেজার ভার্সনের যন্ত্র দুটি কিনতে পারবেন।
চীনে মশা নিধন পণ্যের বাজার যখন দ্রুত বড় হচ্ছে, ঠিক তখনই যন্ত্রটি বাজারে এল। চীনা সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার তথ্যমতে, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটির ঝেজিয়াং প্রদেশের জিনহুয়া শহর থেকেই প্রায় ৪৫ মিলিয়ন ইউয়ান (প্রায় ৬.৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) মূল্যের মশারোধক পণ্য বিদেশে পাঠানো হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৬৫.১ শতাংশ বেশি।
সিনহুয়া শিল্প বিশেষজ্ঞদের বরাতে আরও জানায়, চীনের মশা নিধন বাজারের আকার ২০২৫ সালের ৭.৮৬ বিলিয়ন ইউয়ান থেকে বেড়ে ২০৩০ সালের মধ্যে ১২.৪৩ বিলিয়ন ইউয়ানে পৌঁছাতে পারে। এই চাহিদা কেবল মশার কয়েল, ইলেকট্রিক ভেপোরাইজার কিংবা প্রচলিত মশার ফাঁদের মতো সাধারণ পণ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। চীনা উদ্ভাবকেরা এখন আরও আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন।
'চায়না ডেইলি'-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের হাংচৌ এশিয়ান গেমসের সময় এশিয়ান গেমস ভিলেজে একটি স্বয়ংক্রিয় মশা মারার রোবট মোতায়েন করা হয়েছিল। রোবটটি মানবদেহের তাপমাত্রা ও শ্বাসের অনুকরণ করে মশাকে আকৃষ্ট করত এবং তারপর সেগুলোকে মেরে ফেলত। এশিয়ান গেমস সংক্রান্ত অন্য এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সেখানকার স্মার্ট মশা নিধন রোবটগুলো মশাকে আকৃষ্ট করতে কার্বন ডাই অক্সাইড এবং অতিবেগুনি রশ্মি ব্যবহার করেছিল।
এটি মূলত পুরনো সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির বহুমুখী ব্যবহারের চিত্র তুলে ধরে। প্রথাগত পণ্যগুলো সাধারণত রাসায়নিক, আলো বা সাধারণ ফাঁদের ওপর নির্ভর করে। নতুন প্রযুক্তির যন্ত্রগুলোতে সেন্সর, কম্পিউটার ভিশন, রোবোটিক্স এবং অন্যান্য স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে।
অন্রান্য দেশেও এধরনের পণ্য উঠে আসছে। উদাহরণস্বরূপ, 'জিগো আইরিস' নামে একটি যন্ত্র তৈরি করেছে ইসরায়েলি কোম্পানি 'জিগো', যা কম্পিউটার ভিশন ও ইনফ্রারেড সেন্সরের সাহায্যে মশা শনাক্ত করে এবং একটি কম শক্তির লেজার দিয়ে মশার অবস্থান চিহ্নিত করে। এ যন্ত্রটি নিজে মশাকে মেরে ফেলে না বরং এটি ব্যবহারকারীকে মশার অবস্থান খুঁজে পেতে সাহায্য করে। 'জিগো' বর্তমানে তাদের ওয়েবসাইটে 'আইরিস' যন্ত্রটির দাম ২৯৯ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করেছে।
অপরদিকে, 'ফোটন ম্যাট্রিক্স' ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছে। তারা শনাক্ত করা লক্ষ্যবস্তুকে সরাসরি ধ্বংস করতে শেষ ধাপ হিসেবে লেজার রশ্মি ব্যবহার করে। এই দুই পদ্ধতির একটির মূল লক্ষ্য হলো মশাকে আরও দক্ষতার সাথে খুঁজে বের করা, অপরটি মশা মারার পুরো প্রক্রিয়াটিকেই স্বয়ংক্রিয় করতে চায়।
তবে একই সাথে, এই প্রযুক্তির কিছু ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জও রয়েছে। যেমন, ফোটন ম্যাট্রিক্স যে কার্যক্ষমতার দাবি করেছে, তা এখনো স্বাধীন কোনো পরীক্ষার মাধ্যমে পুরোপুরি যাচাই করা হয়নি। কোম্পানিটি জানিয়েছে তারা শীঘ্রই আরও বিস্তৃত পরীক্ষা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করবে।
সাধারণ ক্রেতাদের কাছে উচ্চপ্রযুক্তির এসব মশা নিধন যন্ত্র শুধু শখের বস্তু না হয়ে উঠতি জনপ্রিয় প্রযুক্তি হয়ে উঠতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে এগুলোর কার্যকারিতা, নিরাপত্তা, নির্ভরতা এবং দামের ওপর। তাই ফোটন ম্যাট্রিক্স মশা তাড়ানোর পুরনো উপায়গুলোকে রাতারাতি বদলে দেবে না, বরং বাজারে প্রযুক্তিভিত্তিক নতুন একটি মাধ্যম যোগ করবে।
