যে কারণে চীন সীমান্তের আরেক কৃত্রিম হ্রদ নেপালে আবারও বন্যার ঝুঁকি তৈরি করছে
হিমালয় ঘেঁষা সীমান্ত অঞ্চলে হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যার দুদিন পর নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তে আবারও বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চীন সীমান্তে কৃত্রিমভাবে তৈরি একটি নদী উপচে পড়ে নতুন করে বন্যা ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শুক্রবার (২৮ আগস্ট) দুর্যোগ কবলিত এলাকাগুলোতে উদ্ধার তৎপরতা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।
নেপাল ও তিব্বত সীমান্তজুড়ে হিমবাহ ধসে তৈরি কাদামাটি ও পাথর ধসের কারণে এ পর্যন্ত ৫৪৭ জনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম বিবিসি। এছাড়া সীমান্ত অঞ্চলে এখনও প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছে।
দুর্ঘটনাস্থলে ভূমিধসের বিপুল ধ্বংসাবশেষ জমে একটি প্রাকৃতিক বাঁধ এবং এর পেছনে বড় আকারের কৃত্রিম হ্রদ তৈরি হওয়ায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রতিনিয়ত হ্রদটির পানির স্তর বাড়তে থাকায় নদীর তলদেশের এলাকাগুলোতে পুনরায় ভয়াবহ প্লাবনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
বিপজ্জনক হ্রদ সৃষ্টি ও উদ্ভূত হুমকি
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এই ভয়াবহ দুর্যোগে কেবল একটি নয়, বরং দুটি হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমটি চীনে হিমবাহের কাছাকাছি উজান অঞ্চলে বরফগলা পানি আটকে তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়টি অপেক্ষাকৃত বড় ও অত্যন্ত বিপজ্জনক, যা নেপালের লেন্দে নদী ব্যবস্থার ওপর ধসে পড়া পাহাড়ের ধ্বংসাবশেষ জমা হয়ে গঠিত হয়েছে।
নেপালের রাসুয়া জেলার শীর্ষ কর্মকর্তা নরেন্দ্র পরিয়ার জানান, কৃত্রিম বাঁধের পেছনে পানির প্রবাহ অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। তবে ভৌগোলিকভাবে জটিল পরিস্থিতির কারণে এই হ্রদে ঠিক কী পরিমাণ পানি জমা রয়েছে এবং বাড়ছে তা সঠিকভাবে পরিমাপ করা সম্ভব হচ্ছে না।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিআরআরএমএ) সতর্ক করে জানিয়েছে, যেকোনো মুহূর্তে বাঁধটি ফেটে নদী অববাহিকায় আকস্মিক ধ্বংসাত্মক প্লাবন ঘটতে পারে।
চীনের স্থানিক পর্যবেক্ষণ তথ্য অনুযায়ী, হ্রদটিতে ইতোমধ্যে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমা হয়েছে। পরবর্তী তিন দিনে আরও ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি যোগ হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারসাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, তারা ৮ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের প্রকৌশলী দল পাঠিয়ে ড্রোন সার্ভে ও থ্রি-ডি মডেলিং শুরু করেছে। তবে পাহাড়ের খাড়া ও ঝুঁকিপূর্ণ ভূখণ্ডের কারণে দুর্ঘটনাস্থলে উদ্ধারকারী দল বা ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
হ্রদটি যেভাবে তৈরি হলো এবং ভৌগোলিক অবস্থান
এই ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদটি মূলত নেপালের লেন্দে নদী ব্যবস্থার ছোচেন খোলা এবং পুরেপু সাংপো নদীর সঙ্গমস্থলের কাছে অবস্থিত। এটি দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত ভতেকোশী ও ত্রিশূলী নদীর উজান অঞ্চলে অবস্থিত। এ নদীর পানি সরাসরি দেশটির রাজধানী কাঠমান্ডুর দিকে প্রবাহিত হয়।
কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পবন ভট্টরাই আল জাজিরাকে বলেন, 'হ্রদটি হিমবাহ ও পাথর ধসে সৃষ্ট একটি বাঁধ পড়া বলে মনে হচ্ছে। বরফ ও পাথরের স্তূপ নদী উপত্যকায় প্রচুর পরিমাণে পাথর, বরফ এবং ধ্বংসাবশেষ জমা করেছে, যা নদীর পানি নিষ্কাশরে পথ সংকুচিত করেছে। এর ফলে এই প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে পানি জমে হ্রদটি তৈরি হয়। স্যাটেলাইট চিত্র এবং চীনা সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এই বাঁধ-হ্রদের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।'
হিমবাহজনিত বন্যায় বিশেষজ্ঞ নেপালি গবেষক এবং ভৌত ভৌগোলিক বিজ্ঞানী নীতিশ খডকা আল জাজিরাকে বলেন, 'ধারণকৃত স্যাটেলাইট চিত্র এবং ড্রোন ভিডিওগুলোতে এই ঘটনার পর দুটি হ্রদ তৈরি হতে দেখা গেছে। একটি ওপরের অংশে তৈরি হয়েছে এবং অন্যটি লেন্দে নদীতে।'
খডকা বলেন, 'চীনে অবস্থিত ওপরের হ্রদটি গলে যাওয়া হিমবাহের পানির একীভূত হয়ে প্রাকৃতিক পানি চলাচলে বাঁধার কারণে তৈরি হয়।'
খডকা আরও বলেন, 'আর লেন্দে নদীর ওপর তৈরি হ্রদটি তৈরি হয়, যখন ভূমিধসের পর এর প্রবাহ অবরুদ্ধ করে এবং পানি আটকে পড়ে। এটি একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া এবং এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।'
তিনি আরও বলেন, 'যদি এটি বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে, তবে নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত উপায়ে বাঁধ ভেঙে পানি ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে, তবে দুর্গম ভূখণ্ডের কারণে সেটিও অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে।'
এদিকে, নেপাল-চীন সীমান্তে কাদা ধসের ফলে তৈরি হওয়া হ্রদটির অবস্থান এতটাই দুর্গম এবং খাড়া এলাকায় যে, সেখানে উদ্ধারকারী দল বা ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়াও অসম্ভব।'
ভট্টরাই আরও বলেন, 'হিমবাহ ধস এবং প্রাকৃতিক বাঁধের সৃষ্টি হয়তো ঠেকানো সম্ভব ছিল না।'
'তবে উন্নত স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, নদী অবরোধ ও হ্রদ সৃষ্টির দ্রুত সনাক্তকরণ, রিয়েল-টাইম নদী পর্যবেক্ষণ, সময়মতো সরিয়ে নেওয়া এবং নেপাল-চীনের মধ্যে শক্তিশালী সীমান্তপার আগাম-সতর্কতা ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা হয়তো কমানো যেতে পারত', বলে ব্যাখা দিয়েছেন ভট্টরাই।
হ্রদটি কেন বড় ঝুঁকি?
হঠাৎ কোনো হ্রদ তৈরি হলে চারপাশের পরিবেশ সেটি ধরে রাখার অবস্থায় থাকে না। এছাড়া, কোনো বাঁধ-হ্রদ যখন কেবল আলগা পাথর ও কাদা দিয়ে আটকে থাকে, সামান্য পানির চাপও বাঁধ ভাঙতে পারে এবং তলদেশের দিকে আকস্মিক বন্যা ঘটায়।
ভট্টরাই বলেন, 'বিপদটি কেবল হ্রদের কারণে নয়, বরং আকস্মিকভাবে বাঁধ ভেঙে যাওয়া নিয়ে। এই ধরনের খাড়া উপত্যকায় অল্প সময়ের কোনো বাঁধ ভাঙলে তা তীব্র গতির কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এর ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের লোকজন নিজেদের নিরাপদ করতে খুব কম সময় পাবে।'
চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) হিসাব করে জানিয়েছে, হ্রদটিতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার পানি আটকে আছে। তারা সতর্ক করেছে, পরবর্তী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি এসে জমা হতে পারে। এটি প্রায় ১ হাজার ২০০টি অলিম্পিক-সাইজের সুইমিং পুলের সমপরিমাণ।
খডকা বলেন, 'এটি একটি বড় হুমকি, কারণ যদি আকস্মিকভাবে হ্রদটির বাঁধ ভেঙে যায়, তবে এটি আরেক দফা বন্যা ঘটাতে পারে। এর ফলে উদ্ধার অভিযানও ব্যাহত হবে এবং জলবিদ্যুৎ সুড়ঙ্গে আটকে থাকা মানুষদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলবে।'
এর অর্থ হলো, হ্রদটি যদি নতুন বন্যা সৃষ্টি করে, তবে পানির সঙ্গে কাদামাটি ও পাথর এসে ভাসবে, যা পানির স্রোতকে আরও ভয়ংকর করে তুলবে।
ভট্টরাই বলেন, 'আমরা হয়তো এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ থামাতে পারব না, তবে অনবরত পর্যবেক্ষণ, সম্ভব হলে হ্রদের পানি কমানো, প্রাথমিক সতর্কতা প্রদান এবং স্থানীয় মানুষদের সময়মতো নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে বন্যার ঝুঁকি কমাতে পারি।'
উদ্ধার অভিযানে নেপালের কী অবস্থা?
বন্যা এবং কাদামাটি ধসের কারণে উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া জেলায় বাঁধানো হ্রদটি উপচে পড়ার কারণে শুক্রবার উদ্ধার কাজ কিছু সময়ের জন্য বন্ধ রাখা হয়। তবে সংক্ষিপ্ত বিরতির পর উদ্ধার তৎপরতা আবারও শুরু হয়। সিসিটিভি শুক্রবার জানিয়েছে, পানি উপচে পড়া বাঁধ-হ্রদের ঝুঁকিটি 'নিয়ন্ত্রণযোগ্য'।
শুক্রবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক কর্মকর্তা জানান, বন্যায় ছয়টি স্বাস্থ্য কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আটজন স্বাস্থ্যকর্মী নিখোঁজ রয়েছেন।
নেপাল জানিয়েছে, দেশের এই পরিস্থিতিতে বৈদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী বলেন, 'সহায়তার প্রস্তাব পাওয়াটাই স্বাভাবিক। আমাদের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। এই মুহূর্তে আমাদের বাইরের সহায়তার প্রয়োজন নেই।'
অতীত ইতিহাস ও জলবায়ু ঝুঁকি
যদিও এই নির্দিষ্ট বাঁধ-নদীটি আগে কখনও গঠিত হয়নি, তবে হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধস এবং হিমবাহ হ্রদ উপচে বন্যা হওয়ার ঘটনা পূর্বেও ঘটেছে।
ভট্টরাই বলেন, 'অনুরূপ একাধিক ঘটনার ধারাবাহিকতায় ক্ষয়ক্ষতি আগেও ঘটেছে। নেপালের ২০১২ সালের সেটি নদীর বন্যা এর একটি বড় উদাহরণ, যেখানে শিলাধস, সাময়িক নদী অবরোধ এবং পাথর-বরফের ধস মিলে এক ধ্বংসাত্মক বন্যার জন্ম দিয়েছিল। রাসুয়ার এই ঘটনার মূল কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে, তবে পুরো প্রক্রিয়াটি অভূতপূর্ব নয়।'
সাধারণত হিমবাহ ধসে কখনো কখনো লাখ লাখ ঘনমিটার বরফ, পাথর এবং পানি যুক্ত থাকে, যা পরবর্তীতে চরম গতিসম্পন্ন বরফযুক্ত ধস বা ধ্বংসাবশেষের স্রোতে পরিণত হতে পারে।
২০১৬ সালের জুলাইয়ে তিব্বতের আরু রেঞ্জের একটি উপত্যকা হিমবাহের নিচের অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পাহাড়ে নেমে এসে প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ ঘনমিটার বরফ ছড়িয়ে পড়ে। এতে ৯ জন রাখাল এবং শত শত গবাদি পশু মারা যায়। এটি ভারত-চীন সীমান্ত সংলগ্ন প্যাংগং সো এলাকার কাছে দূর পশ্চিম তিব্বতে ঘটেছিল। দুই মাস পর কাছের আরেকটি হিমবাহ ধসে প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ ঘনমিটার বরফ নির্গত হয়।
২০২২ সালের নভেম্বরে চীনের কুইংহাই প্রদেশের তিব্বত মালভূমির উত্তর প্রান্তে কুনলুন পর্বতমালার বু কাদাবান ফেং হিমবাহ থেকে প্রায় ৪ কোটি ঘনমিটার বরফ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার বিশ্লেষণ অনুসারে, বরফের ধসটি নিচে থাকা একটি হ্রদে আছড়ে পড়ে ১৩ মিটার উঁচু ঢেউ তৈরি করে।
জিএলওএফ উত্তর পাকিস্তানেও আঘাত হেনেছে। ২০২২ সালের মে মাসে গতিশীল শিশপার হিমবাহ দ্বারা গঠিত একটি বরফ-বাঁধ হ্রদ হঠাৎ ভেঙে গিয়ে হুনজা উপত্যকার হাসানাবাদ এলাকায় বন্যা দেখা দেয়।
