এআই মনিটরিংয়ে তৈরি পোশাকের উৎপাদনশীলতা বাড়ছে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত
বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে দেশের তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানিকারকেরা তাঁদের কারখানার উৎপাদন লাইনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) প্রযুক্তি ও ডিভাইসের ব্যবহার বাড়াচ্ছেন।
কিছু কারখানা ইতোমধ্যে তাদের উৎপাদন লাইনের একাংশে এই প্রযুক্তি বসিয়েছে, আবার কিছু কারখানা প্রতিটি সেলাই মেশিনকেই যুক্ত করেছে এই ব্যবস্থার সঙ্গে। শিল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, রপ্তানিমুখী বেশ কিছু বৃহৎ পোশাক কারখানাও একই ধরনের প্রযুক্তি চালুর পরিকল্পনা করছে।
কারখানা মালিক ও কর্মকর্তারা জানান, উৎপাদন, মেশিনের কার্যক্ষমতা এবং ত্রুটি সম্পর্কিত রিয়েল-টাইম (তাৎক্ষণিক) তথ্য প্রদানের মাধ্যমে এই প্রযুক্তি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে। ম্যানুয়াল (হাতে-কলমে) মনিটরিং পদ্ধতির তুলনায় এই প্রযুক্তির ব্যবহারে উৎপাদনশীলতা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানিয়েছে কিছু কারখানা।
বর্তমানে যেসব কারখানা এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে তার মধ্যে রয়েছে ধামরাইয়ের স্নোটেক্স গ্রুপ, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা অ্যাপারেলস, সাভারের টিম গ্রুপ, আদমজী ইপিজেডের ইউনুসকো গ্রুপের একটি কারখানা এবং ময়মনসিংহের ভালুকার স্প্যারো গ্রুপ। এর মধ্যে কয়েকটি কারখানা আংশিকভাবে এ প্রযুক্তি চালু করেছে।
শিল্প খাতের সূত্রের মতে, ২০২০ সালের শেষের দিকে ফতুল্লা অ্যাপারেলস প্রথম উৎপাদন পর্যায়ে আইওটি-ভিত্তিক উৎপাদন মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করে।
বৃহৎ পরিসরে স্নোটেক্সের প্রযুক্তি গ্রহণ
যোগাযোগ করা কারখানাগুলোর মধ্যে স্নোটেক্স গ্রুপ সবচেয়ে বড় পরিসরে এই প্রযুক্তির বাস্তবায়ন করেছে বলে জানা গেছে।
গত সপ্তাহে ধামরাইয়ে স্নোটেক্সের একটি কারখানা পরিদর্শনের সময় প্রোডাকশন ফ্লোরের প্রতিটি সেলাই মেশিনে আইওটি ডিভাইস সংযুক্ত থাকতে দেখা যায়। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, ২০২৩ সাল থেকে তাদের সব কারখানার প্রায় ১০ হাজার সেলাই মেশিনে এই ডিভাইস ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্নোটেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এসএম খালেদ জানান, এই প্রযুক্তি চালুর পর তাঁরা উৎপাদনশীলতা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে দেখেছেন। তিনি বলেন, "আমাদের অবজার্ভেশন বা পর্যবেক্ষণ হলো, ম্যানুয়াল পদ্ধতির তুলনায় এই ব্যবস্থায় প্রোডাকটিভিটি (উৎপাদনশীলতা) ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।"
এই প্রযুক্তির ফলে কারখানা ব্যবস্থাপকেরা প্রতিটি মেশিন ও অপারেটরের তাৎক্ষণিক উৎপাদন পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। কোনো মেশিনের গতি কমে গেলে বা কোনো ত্রুটি দেখা দিলে তা কেন্দ্রীয় মনিটরিং স্ক্রিনে ভেসে ওঠে। ফলে লাইন চিফ বা প্রোডাকশন ম্যানেজাররা দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারেন।
কর্মকর্তারা জানান, কোনো সমস্যা কি নির্দিষ্ট মেশিনের কারণে নাকি অপারেটরের ভুলের কারণে হচ্ছে—তাও চিহ্নিত করতে পারে এই ব্যবস্থা। এতে কারখানা ব্যবস্থাপকেরা দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ডাউনটাইম (উৎপাদন বন্ধ থাকার সময়) কমিয়ে আনতে পারেন।
অন্যান্য কারখানার উদ্যোগ
প্রায় ছয় মাস আগে এই সিস্টেমের ব্যবহার শুরু করে স্প্যারো গ্রুপ। বার্ষিক প্রায় ৩৫ কোটি (৩৫০ মিলিয়ন) ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক এই প্রতিষ্ঠানটি তাদের মোট সেলাই মেশিনের প্রায় অর্ধেক মেশিনে এই ডিভাইস বসিয়েছে বলে জানান গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম।
তিনি বলেন, "আমরা লক্ষ্য করেছি ম্যানুয়াল পদ্ধতির তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত প্রোডাকটিভিটি বেড়েছে।" শোভন ইসলাম আরও জানান, ২০২৭ সালের মধ্যে সব সেলাই মেশিনে এই ডিভাইস স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। উৎপাদনশীলতা ও গুণগত মান—উভয় তদারকিতেই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হা-মীম গ্রুপ, ডিবিএল গ্রুপ, উর্মি গ্রুপ এবং ফকির ফ্যাশন্সের মতো বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোও এই ডিজিটাল উৎপাদন মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে।
প্রযুক্তিটি যেভাবে কাজ করে
এই প্রযুক্তিতে প্রতিটি সেলাই মেশিনের সঙ্গে একটি করে আইওটি ডিভাইস যুক্ত থাকে এবং সংশ্লিষ্ট অপারেটরের নাম ও আইডি নম্বর সিস্টেমে সংযুক্ত করা হয়।
প্রতিটি প্রোডাকশন ফ্লোরের ডিভাইসগুলো একটি কেন্দ্রীয় সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, যা উৎপাদনের ডেটা প্রদর্শন করে। স্নোটেক্সের ক্ষেত্রে সব কারখানার ডিভাইস একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজের সঙ্গে যুক্ত, যার মাধ্যমে উচ্চপদস্থ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।
কোনো সমস্যার সমাধান হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী একটি নির্ধারিত মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে তা সিস্টেমে নথিভুক্ত করেন। এর ফলে সমস্যার সমাধান কে করেছেন এবং তা সমাধানে কত সময় লেগেছে, তা সহজেই দেখতে পান ব্যবস্থাপকেরা।
কারখানা কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রতিটি কারখানার চাহিদা অনুযায়ী ডিভাইস ও সফটওয়্যারে কিছু ভিন্নতা থাকলেও মূল কার্যপদ্ধতি প্রায় একই রকম।
নাম না প্রকাশের শর্তে একটি কারখানার একজন আইটি বিশেষজ্ঞ জানান, প্রোডাকশন ফ্লোরের সমস্যা চিহ্নিত করা এবং তা সমাধানের সময় অনেকটাই কমিয়ে এনেছে এই প্রযুক্তি।
ওই আইটি বিশেষজ্ঞ বলেন, "আগে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে কোনো ফ্লোরে একটি সমস্যা দেখা দিলে, তা আইডেন্টিফাই (শনাক্ত) করতে সময় লাগত। আবার সমাধানেও দেরি হতো। কিন্তু এখন কোন সমস্যা দেখা দিলে কে দ্রুত সমাধান দিতে চায়, তার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কারণ এটি তার পারফর্মেন্স মূল্যায়নের অন্যতম ইন্ডিকেটর বা সূচক।"
শ্রমিকদের জন্য উৎপাদন বোনাস
ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থার পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য সুনির্দিষ্ট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা এবং প্রণোদনা (ইনসেন্টিভ) স্কিমও চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মেশিন অপারেটরদের জন্য প্রতি ঘণ্টার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিচ্ছে কারখানাগুলো। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারলে কিংবা অতিরিক্ত উৎপাদন করতে পারলে দেওয়া হচ্ছে বোনাস। উৎপাদনের পরিমাণ ও ত্রুটির হার বিশ্লেষণ করে এই বোনাসের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়।
স্নোটেক্সের শ্রমিক আফিজুল জানান, প্রোডাকশন ইনসেন্টিভ বোনাস (পিআইবি) চালু হওয়ায় স্বাভাবিক বেতনের বাইরে গড়ে দুই থেকে তিন হাজার টাকা বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কারখানার অপর এক অপারেটর শারমিন আক্তার বলেন, নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পর মাসে বাড়তি প্রায় ২,০০০ টাকা বোনাস যুক্ত হচ্ছে তাঁর বেতনের সঙ্গে। ওভারটাইম ও অন্যান্য সুবিধা মিলিয়ে মাসে সর্বোচ্চ ২৮ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়েছে বলেও জানান তিনি।
কারখানা কর্মকর্তারা জানান, যেসব শ্রমিকের উৎপাদিত পণ্যে ত্রুটির হার বেশি থাকে, তাঁরা অপেক্ষায়কৃত কম প্রণোদনা বা ইনসেনটিভ বোনাস পান।
কাজের চাপ বাড়ার আশঙ্কা শ্রমিক নেতাদের
তবে শ্রমিক নেতারা মনে করছেন, প্রযুক্তি-নির্ভর উচ্চ লক্ষ্যমাত্রার কারণে শ্রমিকদের ওপর কাজের বাড়তি কাজের চাপ তৈরি হচ্ছে।
আওয়াজ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক নাজমা আক্তার বলেন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং ও উচ্চ উৎপাদনশীলতার অজুহাতে নতুন নতুন প্রযুক্তি এনে শ্রমিকদের কাছ থেকে যে বাড়তি কাজ আদায় করা হয়, সেটি তার শারিরীক সামর্থ্যের তুলনায় বেশি।
তিনি দাবি করেন, বাড়তি কাজের চাপের তুলনায় দেওয়া প্রণোদনা একেবারেই অপর্যাপ্ত।
এনিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। ঢাকার একটি কারখানার এক নারী শ্রমিক জানান, এই মনিটরিং সিস্টেম চালু হওয়ার পর তাঁর প্রতি ঘণ্টার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ২৮-৩০ পিস থেকে বাড়িয়ে ৩৫ পিস করা হয়েছে।
অন্য এক শ্রমিক জানান, কাজের চাপ কিছুটা বাড়লেও মাস শেষে বাড়তি টাকা আয় করা যাচ্ছে, এতে তিনি এতে সন্তুষ্ট।
তবে এই প্রযুক্তি শ্রমিকদের কাজের চাপ বাড়ায়—এমন অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন স্নোটেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম খালেদ।
তিনি বলেন, "কোনো সমস্যা হলে তা মেশিনের ত্রুটি নাকি গাইড বা অন্য কিছুর জন্য হচ্ছে, তা দ্রুত চিহ্নিত করে সমাধান করতে পারছি। এতে উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু শ্রমিকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে না।"
টিম গ্রুপের একজন জ্যেষ্ঠ আইটি কর্মকর্তাও একই অভিমত ব্যক্ত করে জানান, শ্রমিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে অকার্যকর সময় (অফ-টাইম) বা অপচয় কমাতে এবং সমস্যা সমাধান করতেই সিস্টেমটির ডিজাইন করা হয়েছে।
বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ডিজিটাল প্রযুক্তি
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, উৎপাদনশীলতার দিক থেকে বাংলাদেশ এখনো চীন, ভিয়েতনামী, ইন্দোনেশিয়া, এমনকি কম্বোডিয়ার চেয়েও পিছিয়ে রয়েছে। এসব দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ডিজিটালাইজেশন অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
এহসানের মতে, বাংলাদেশে শ্রমিকদের কর্মদক্ষতা (এফিসিয়েন্সি) আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ, যেখানে চীন ও ভিয়েতনামে তা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ।
তিনি বলেন, "আমাদের ব্যবসাগুলোকে প্রতিযোগিতামূলক রাখতে হলে শিল্প খাতে ডিজিটালাইজেশন বা প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার বিকল্প নেই।"
