বিদেশি ড্রোনের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করলেন ট্রাম্প
চীনা ড্রোন শিল্পকে প্রতিহত করতে এবং দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করার দীর্ঘদিনের প্রচারণা অব্যাহত রেখে ট্রাম্প প্রশাসন বৃহস্পতিবার ড্রোনের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছে। ৫৫ পাউন্ডের বেশি ওজনের কিংবা থার্মাল (তাপীয়) ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন ড্রোনের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক প্রযোজ্য হবে।
এই ড্রোনগুলোর সিংহভাগই চীনে তৈরি এবং এগুলো দাবানল পর্যবেক্ষণ ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে ব্যবহার করায় আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, তুলনামূলক ছোট ড্রোনের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক ধরা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ দুই ছেলের মার্কিন ড্রোন শিল্পের সাথে যোগাযোগ রয়েছে। গত মাসে ট্রাম্প এই শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। বাণিজ্য বিভাগের একটি তদন্তে বিদেশি ড্রোন ও যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরতাকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করার পর তিনি এ সিদ্ধান্ত নেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি হলো, ড্রোন প্রযুক্তির জন্য চীনের ওপর অবশ্যই আমেরিকার নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে হবে। ধারণা করা হয়, চীনের শেনজেনভিত্তিক 'ডিজেআই' নামের একটি একক কোম্পানিই বিশ্বের ৭০ শতাংশের বেশি বাণিজ্যিক ড্রোন তৈরি করে। তবে সমালোচকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দেশীয় ড্রোন শিল্প এই শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না এবং প্রশাসনের এই আকস্মিক নীতি পরিবর্তন সুফলের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করবে।
ক্লিভল্যান্ডের উপকণ্ঠে পুলিশ ও ফায়ার ফাইটারদের নিয়ে গঠিত 'লেক কাউন্টি ড্রোন ইউনিট'-এর প্রধান স্কট ম্লাকার বলেন, এই নতুন শুল্ক আর্থিকভাবে অত্যন্ত চাপের এবং এর ফলে যে সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর থার্মাল ড্রোনের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাদের নাগালের বাইরে চলে যাবে এটি। তিনি বলেন, 'আমাদের বিনীত মতামত হলো—বিদেশি প্রতিযোগিতা দূর করতে মার্কিন প্রস্তুতকারকদের লবিংয়ের ফলেই এর বেশিরভাগ ঘটেছে। এটি জাতীয় নিরাপত্তা নয়, এটি এক ধরনের সংরক্ষণবাদ।'
তিনি জানান, রাতে নিখোঁজ শিশুদের সন্ধান এবং অপরাধী, সন্দেহভাজনদের খুঁজতে তার ইউনিট প্রতিদিন থার্মাল ড্রোন ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের সাথে যৌথভাবে একটি বিকল্প সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি করে চীনের ড্রোন শিল্পের মোকাবিলা করবে—এমন আশায়ও এই পদক্ষেপের ফলে ভাটা পড়েছে। মিত্র দেশগুলোতে তৈরি ড্রোন কিছুটা শুল্ক ছাড় পেলেও তারা সম্পূর্ণ রেহাই পাচ্ছে না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সুইজারল্যান্ড এবং তাইওয়ানে উৎপাদিত ড্রোনের ওপর ১৫ শতাংশ এবং ব্রিটেনে উৎপাদিত ড্রোনের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক ধার্য করা হয়েছে।
একই সময়ে, ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (এফসিসি) থার্মাল ইমেজিং এবং এরোসল স্প্রে করার মতো সাধারণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা ড্রোনগুলোকে "সামরিক গ্রেড" হিসেবে পুনর্শ্রেণীভুক্ত করার প্রস্তাব করেছে। শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বাস্তবায়ন হলে হাজার হাজার মার্কিন ব্যবসা ও জননিরাপত্তা কর্মকর্তা যেসব ড্রোন ব্যবহার করছেন, তার ওপর কার্যকরভাবে একটি পেছনের তারিখ থেকে নিষেধাজ্ঞা (রেট্রোঅ্যাক্টিভ ব্যান) আরোপের সামিল হবে।
গত ডিসেম্বরে এফসিসি কোনো বিশেষ মওকুফ ছাড়া বিদেশি নির্মিত ড্রোনের নতুন মডেল বিক্রি কার্যকরভাবে নিষিদ্ধ করেছিল। সে সময় সংস্থাটি জানায়, পূর্বে অনুমোদিত মডেলগুলো উড়তে ও আমদানি করতে বাধা নেই; কিন্তু বর্তমান প্রস্তাবে অনেক পুরোনো মডেল আমদানিতেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে। অন্যান্য অনেক শুল্কের মতো এই শুল্কও শেষ পর্যন্ত কমানো হবে—এমন আশা রাখেছেন অনেক ড্রোন পাইলট। তবে উপস্থিত ব্যক্তিদের মতে, চলতি সপ্তাহে লাস ভেগাসে আয়োজিত একটি বাণিজ্যিক ড্রোন প্রদর্শনীতে এফসিসির এই প্রস্তাব গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে এবং আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।
প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া আকাশচিত্রগ্রাহক ভিক মস বলেন, 'এ প্রস্তাব যেভাবে লেখা হয়েছে, সেভাবে পাশ হলে এটি পুরো শিল্পকে ধ্বংস করে দেওয়ার মতো একটি নিষেধাজ্ঞা হবে। কারণ এর কোনো দেশীয় বিকল্প বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে নেই।' প্রস্তাবটি সাধারণ মানুষেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অনেকেই বলেছেন, এ নীতি বিশ্বজুড়ে মানদণ্ড হয়ে ওঠা একটি প্রযুক্তি মার্কিনদের ব্যবহারে বাধা দেবে, যা হাজার হাজার ব্যবসাকে ধ্বংস করে ফেলবে।
নির্মাণ স্থান পর্যবেক্ষণে ড্রোন ব্যবহারকারী ভার্জিনিয়াভিত্তিক 'ডব্লিউ.এম. জর্ডান' কোম্পানির ড্রোন পাইলট জাস্টিন জোন্স লিখেছেন যে, এফসিসির প্রস্তাবিত নীতি তাদের কোম্পানির বর্তমান ড্রোনবহরকেও প্রভাবিত করবে। তিনি লেখেন, 'এই পরিবর্তনের ফলে স্বল্পমেয়াদে আমাদের ব্যবসায় সম্ভাব্য শত শত কোটি ডলার এবং দীর্ঘমেয়াদে কোটি কোটি ডলারের ক্ষতি হতে পারে।'
শিল্প কাজে ব্যবহৃত ড্রোন ভাড়া দেওয়া ওয়াশিংটনের সেন্ট্রালিয়ার 'ব্লু স্কাইস ড্রোনস'-এর ডেল হিলটন বলেন, 'এফসিসির পরিকল্পনাটি একটি প্রতিষ্ঠিত, প্রয়োজনীয় ও উৎপাদনশীল বাণিজ্যিক শিল্পের অপূরণীয় ক্ষতি করবে এবং জননিরাপত্তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।' তিনি লেখেন, 'এফসিসির উচিত একটি ব্যবস্থার বাস্তব ঝুঁকি মূল্যায়ন করা। বেসামরিক পরিবহন, রোবোটিক্স, জরিপ, নির্মাণ ও শিল্প ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত সেন্সর থাকার কারণেই কোনো সরঞ্জামকে সামরিক গ্রেড হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক নয়।'
ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ দুই ছেলে এরিক ও ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র 'ডোমিনারি হোল্ডিংস'-এর শেয়ারহোল্ডার ও উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য, যে প্রতিষ্ঠানটি ফ্লোরিডাভিত্তিক ড্রোন প্রস্তুতকারক 'পাওয়ারাস'-এ বিনিয়োগ করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র আমেরিকার শীর্ষ ড্রোন যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক কোম্পানি 'আনইউজুয়াল মেশিনস'-এর উপদেষ্টা বোর্ডেও রয়েছেন।
